অথৈ সমাচার

লিখেছেন - ফারহানা নিম্মী | লেখাটি 1246 বার দেখা হয়েছে

১.

 

 -বাবুনি,বাবুনি, আমি ঘোড়া ঘোড়া খেলব...

 

সকালে প্রাপ্তির ডাকে ঘুম ভাঙল...চোখ মেলে দেখি প্রাপ্তি বুকের উপর চেপে বসে আছে...প্রাপ্তি আমার দুই যময মেয়ের একজন...দুজনই আমাকে বাবুনি,আর অথৈ কে আম্মুনি ডাকে...পৃথা-প্রাপ্তি কে আদর করে মামণি ডাকি,তাই আমাদের নামের এই সংস্করন...

কথা শিখার পর প্রাপ্তির এক মুহুর্তের বিরাম নেই,সারাদিন কুটকুট করে কথা বলছে তো বলছেই...অথৈ বা আমি,আমরা কেউই এত কথা বলি না...এত কথা বলার অভ্যাস এই মেয়ে কই পেলো,কে জানে??

 

পৃথা হয়েছে,প্রাপ্তির একেবারে উল্টো...ওর মধ্যে ছোটবেলা থেকেই বুদ্ধিজীবী-বুদ্ধিজীবী ভাব...কথা খুব একটা বলে না,কিন্তু হঠাৎ হঠাৎ বেশ মজা করে কথা বলে.....আমার এই মেয়েটাকে আশেপাশে কোথাও দেখছি না ।

প্রাপ্তির ধাক্কা-ধাক্কিতে আর শুয়ে থাকা যাচ্ছে না...তাই চোখ মেলে তাকাতে বাধ্য হলাম...

 

- বাবুনি,উঠো না, উঠো...এখুনি উঠো...এখুনি...এখুনি...এখুনি...

ঃ তোমার ঘোড়া বাবুনি তো চিৎপটাং হয়ে আছে মামণি...আগে ফ্রেশ হয়ে নিই,তারপর খেলব...কেমন??

- তাহলে তাড়াতাড়ি উঠো,আমি এখনো নাস্তা করিনি...

 

একটু চমকালাম মনে মনে...অথৈ তো এতক্ষন পর্যন্ত বাচ্চাদের না খাইয়ে রাখে না...সকাল থেকে অথৈ এর চিৎকার একবারও শুনিনি...কে জানে কি করছে???

 

- আম্মুনি কই,প্রাপ্তি??

ঃ জানি না ...পৃথু জানে...

- জানো না মানে??পৃথু কই??

ঃ ও তো রান্নাঘরে,ডিম ভাজি করে...

 

বুকের ভিতর ছ্যাৎ করে উঠল...পৃথু রান্নাঘরে মানে !! বিছানা থেকে লাফিয়ে উঠে পড়িমরি করে রান্নাঘরের দিকে ছুটলাম...গিয়ে দেখি সে রান্না ঘরের মেঝেতে পা ছড়িয়ে বসে আছে...এক হাতে চামচ আর আরেক হাতে ডিম নিয়ে ভ্রু কুঁচকে ডিমের দিকে তাকিয়ে আছে...

 

দেখে একটু হাসি পেলো...পৃথু তার মায়ের স্বভাব কিছুটা পেয়েছে...সামান্য বিষয় নিয়ে সিরিয়াস হয়ে ভ্রু কুঁচকানো অথৈ এর স্বভাব...আমি এগিয়ে গিয়ে বললাম,

 

- কি করছ,মামণি??

ঃ ডিম ভাঙ্গি...

- পারছ না?

ঃ উহু,চামচ দিয়ে বাড়ি মারলে সব নিচে পড়ে যায়...

 

অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম,"ডিম ভেঙ্গেছ নাকি একটা-দুইটা??"

পৃথু হাত উঁচু করে ময়লার ঝুড়ির দিকে দেখালো.....আমি কাছে গিয়ে দেখি,এক ডজন ডিমের আটটিই এই করুণ পরিণতির শিকার...

 

- তোমার ডিম ভাজতে হবে না,মামণি...আম্মুনি কোথায়??

ঃ আম্মুনি তো চলে গেছে...বলেছে,আর কখনো আসবে না...তোমার জন্য চিঠিও দিয়েছে...

 

এই বলে সে তার ফ্রকের পকেট থেকে চিঠি বের করে আমার হাতে দিলো...

 

 থাক আপাতত চিঠিটা ... আগে মেয়ে দুটোকে খাওয়ানোর ব্যাবস্থা করা যাক...দুজনকে ডাইনিং রুমে বসিয়ে মোড়ের দোকান থেকে পাউরুটি কিনে আনলাম...তারপর ডিম ভেজে মেয়ে দুটোকে খাইয়ে ড্রয়িং রুমে বসিয়ে আসলাম...টিভি তে টম এন্ড জেরি,না কি যেন একটা দেখাচ্ছে...দুজনই হা করে টম এন্ড জেরি গিলছে...

মাঝে মাঝেই "বাবুনি দেখে যাও,দেখে যাও" বলে চিৎকার করছে...

 

আমি অথৈ এর চিঠিটা নিয়ে ডাইনিং রুমের চেয়ার টেনে বসলাম...

 

       "তূর্য,

 

        অর্ণব দেশে এসেছে,কথাটা আমাকে না জানিয়ে ঠিক করনি...আমি চলে

        যাচ্ছি...মেয়ে দুটোকে দেখে রেখ..

 

                                                                       - অথৈ "

 

 ঠিক এই ভয়টাই করছিলাম মনে মনে...অর্ণবের কথা কিভাবে জানল ও??দেশে এসে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছে নিশ্চয়ই...এই মুহুর্তে কোথায় থাকতে পারে অথৈ??নিশ্চয়ই,জুঁই এর বাসায়...এই শহরে জুঁই ছাড়া আমদের পরিচিত আর কেউ নেই...আচ্ছা,ও অর্ণবের কাছে চলে যায়নি তো??ভাবছি,আর ঘোর লাগা চোখে চিঠির দিকে তাকিয়ে আছি...হঠাৎ,পৃথুর কথায় ঘোর ভাঙ্গল...

 - আম্মুনি আমাদের কে ছেড়ে চলে গেছে...আর কখনো আসবে না,তাই না??

 

মনে মনে বেশ চমকালেও শান্ত গলায় বললাম,"না মামণি,তোমার আম্মুনি বেড়াতে গেছে...কয়েকদিন পরেই চলে আসবে..."

 

পৃথু আমার কথায় খুব একটা আশ্বস্ত হল বলে মনে হলো না ।

 

 

২ .

 

দুদিন আগে অর্ণব এসেছিলো অফিসে...ভুত দেখার মত চমকে উঠেছিলাম ওকে দেখে...এসেই আমার সামনে রাখা চেয়ারটা টেনে বসতে বসতে বলল,

 

 - কেমন আছিস??

ঃ এটা জানতে এসেছিস ??

 - নাহ..অথৈ এর ব্যাপারে জানতে এলাম...

তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে বলেছিলাম, "এতোদিন পরে কি মনে করে এই বোধদয় হলো??বিয়ের পর যখন অথৈ কে ফেলে কাপুরুষের মত বিদেশে পালিয়ে গিয়েছিলি,তখন একবারও মনে হয়নি,ও কেমন আছে??আজ চার বছর পর অথৈ এর কথা মনে পড়ল??"

 

জবাবে,অর্ণব আমাকে বলেছিলো,"ও আমাকে কখনোই সত্যিকার অর্থে ভালোবাসেনি...তা নাহলে,আমি চলে যাওয়ার দেড় মাসের মাথায় অথৈ তোর সাথে "সুখের সংসার" পাতাতো না...আর তুই ই বা কার জন্য আমার সাথে এভাবে কথা বলছিস??তোর বউ এর জন্য??মেয়েদের জন্য??

হাসালি আমাকে...

আর হ্যাঁ,আমি কিন্তু অথৈকে এখনো ভালবাসি...

সোজাসুজিই বলি,অথৈ এর আপত্তি না থাকলে,আমি আমার বউ এবং মেয়েদের কে নিতে এসেছি..."

 

ঃ আমার এখন লাঞ্চ ব্রেক...আমি কেন্টিনে খেতে যাব...

 - আমাকে চলে যেতে বলছিস?? আমি কিন্তু আবার আসব...

 

অর্ণব,অথৈ এর প্রথম স্বামী...আমরা তিনজনই একসাথে পড়ালেখা করেছিলাম...অথৈ কে ভালবাসতাম, কিন্তু কখনো কাউকে বলিনি সেকথা...অর্ণবের কারণে বলিনি...

অথৈ অর্ণব কে নিয়ে সুখেই ছিলো...সেই সময়,অর্ণব-অথৈ জুটি, ভার্সিটির সেরা জুটি ছিলো... প্রা্য় ৫ বছর প্রেম করে কাউকে না জানিয়েই দুজন বিয়ে করে ফেলেছিলো...কথা ছিলো অর্ণব সুযোগ বুঝে বাসায় জানাবে...ততদিনে সে নিজেও কিছু একটা করে নিজের পায়ে নিজে দাঁড়াতে চায়...

 

আর আমি??অথৈ এর জন্য আমার ভালোবাসা আমার বুকেই চাপা পড়ে রয়ে গেলো...

 

পড়ালেখায় অর্ণব বরাবরই তুখোড় ছিলো... বেশ ভালো একটা রেজাল্ট করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিলো সে...দেশের বাইরে পড়ালেখা করার জন্য স্কলারশিপও পেয়ে গেলো...কিন্তু,অথৈকে সে কিছু না জানিয়েই,বিয়ের তিন মাস পর দেশের বাইরে চলে গেলো অথৈ কে ফেলে...

পরে জানলাম,অর্ণবের পরিবারে অথৈ কে মেনে না নেয়ায়,অর্ণবের এই নীরব পলায়ন...

 

খুব আঘাত পেয়েছিলো অথৈ...আত্মহত্যার চেষ্টাও করেছিলো...পড়ালেখার জন্য ঢাকায় হোষ্টেলে একলাই থাকত সে...ওর রুম মেটরা আর আমি সেবার দৌড়াদৌড়ি করে ওকে বাঁচালাম...

অল্প কয়দিন পরেই অথৈ কে আমি বিয়ে করি...আমি ওকে হারাতে চাইনি...প্রেয়সী হিসেবে না হোক,প্রিয় বন্ধুর মত করেই অথৈকে পেতে চেয়েছিলাম...ওর হাত ধরে রাখতে চেয়েছিলাম সারাজীবন...কখনো চাইনি,কোন ছোটলোকের জন্য অথৈ জীবনের কাছে পরাজিত হোক...

মাঝে মাঝে অতীতের স্মৃতিগুলো অথৈকে তাড়িয়ে বেড়াত...আমি তখন পরম মমতায় ওকে আগলে রাখতাম...একসময়,আমি ওর অভ্যাসে পরিণত হলাম...হয়তো ভালবাসতেও শুরু করেছিলো আমাকে...

আমি আমার ছোট্ট পৃথিবীতে ভালই ছিলাম...অথৈ,পৃথু,প্রাপ্তি আমার জীবনকে ভালবাসায় ভরে দিয়েছিলো..জীবনে এর চেয়ে বেশি কিছু চাইবার ছিলো না আমার...

সংসার আর আমার মামণিদের নিয়ে অথৈ এর ছুটোছুটি দেখে একসময় ভেবেছিলাম ও আমার সাথে সুখেই আছে বেশ...

 

আজ সবই অভিনয় মনে হচ্ছে...নিজেকে পরাজিত মনে হচ্ছে...পুরুষ মানুষের নাকি কাঁদতে নেই...কিন্তু,আজ আর চোখের পানি থামছে না...খুব রাগ হচ্ছে,নিজের উপর,নিজের ভাগ্যের উপর...

 

 

৩.

 

রাতে কখন ঘুমিয়েছি জানি না... ঘুম ভাঙ্গল কলিংবেলের আওয়াজে...এতো ভোরে কে এসেছে কে জানে??আর কিছুক্ষন এভাবে কলিংবেল বাজতে থাকলে,পৃথা-প্রাপ্তি দুইজন সুর মিলিয়ে কাঁদতে থাকবে...অথৈ ছাড়া কান্না থামানো তখন অসম্ভব হয়ে যাবে...

ঘুম ঘুম চোখে দরজা খুলে দেখি,অথৈ দাঁড়িয়ে আছে...

 

আমাকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে ও ঘরে ঢুকে গেলো...আমি বুঝার চেষ্টা করছি,কি হচ্ছে...প্রাথমিক ভাবে মনে হচ্ছে স্বপ্নে দেখছি...

 

নাহ,স্বপ্ন না...এইতো আমাকে বকছে...আর বারবার বলছে,"আমাকে ছাড়া তুমি একদিন ও চলতে পারো না??আমি নেই,আর তুমিও ঘর কে শ্মশান

ঘাট বানিয়ে রেখেছ..."

 

"আমার মামণিরা কই??" বলতে বলতে,পৃথা-প্রাপ্তিকে ঘুম থেকে উঠালো...ওদেরকে নাস্তা করালো,গোসল করালো...আমি অবাক হয়ে দেখছি..অথৈ এর কান্ড-কারখানা দেখে মনে হচ্ছে কিছুই হয়নি...

 

আমি রুমে গিয়ে আবার শুয়ে পড়লাম...ঘুম থেকে উঠে হয়তো দেখব,বাসা শূন্য....

 

টিভির আওয়াজ কানে আসছে...দুই বোন পাল্লা দিয়ে চিৎকার করছে...

 

অথৈ রুমে এসে দরজা ভিড়িয়ে দিলো...শাড়ির আঁচল কোমরে গুঁজে আমার পাশে বসল...নির্ঘাত ঝগড়া করার প্রস্তুতি নিচ্ছে...আমি কম্বলটা মাথার উপর টেনে দিতেই,অথৈ হুঙ্কার দিলো...

 

- খবরদার আবার ঘুমাবে না...উঠে বসো...

 

আমি কথা না বাড়িয়ে উঠে বসলাম...

 

অথৈ বলল,

 

- আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল,আমি তোমাকে বিয়ে করেছি...তোমাকে বিশ্বাস করেছি....কারণ,তুমি আমাকে বিশ্বাস কর না...কিভাবে ভাবলে,আমি অর্ণবের কথা শুনলে তোমাকে ছেড়ে চলে যাব...এই বিশ্বাস নিয়ে আমি ৪ বছর তোমার সাথে সংসার করছি??তুমি অনেক খারাপ...অনেক,অনেক বেশি খারাপ...

 

বলতে বলতেই অথৈ আমার বুকে ঝাপিয়ে পড়ল...আর আমি??দুহাত বাড়িয়ে ভালোবাসার চাদরে জড়িয়ে নিলাম আমার অথৈকে...গলার আওয়াজ আজ আমার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে..."খুব ভালবাসি তোমাকে" একথাটি তাই আর বলা হলো না...

 

 

 

Share