ভাবকুমার-চন্দ্রাবতী

লিখেছেন - ফারহানা নিম্মী | লেখাটি 1140 বার দেখা হয়েছে

শোন,২৩ তারিখে নীল শাড়ি পরে আসবি । আমিও পাঞ্জাবী পরে আসব । তারপর,হুমু(হুমায়ুন আহমেদ) স্টাইলে দুইজন রিকশায় চড়ে পুরা শহর চক্কর দিব ।

 

- পারব না । বাসায় কি বলব ? শাড়ি পরে মজনুর সাথে প্রেম করতে যাচ্ছি ? এসব ঢং আমি করতে পারব না ...আর,তুই পাঞ্জাবী পরবি,মানে ? বান্দরের পাঞ্জাবী পরার দরকার কি ? তোর যে চেহারা,তোকে যে সিটি কর্পোরেশনের লোকজন ধরে চিড়িয়াখানায় দেয় নি,সেইটা তোর লাখ জনমের ভাগ্য । পাঞ্জাবী পরলে তোকে তো মানুষ টিকিট কেটে দেখতে আসবে । হি হি হি ...

 

 তোর সাথে আগামী ২ সপ্তাহের মধ্যে এটাই আমার লাস্ট মিটিং । ফোনেও আমাকে জ্বালাবি না । খবরদার !

 

- আমার বয়েই গেছে । তোকে জ্বালানো ছাড়াও আমার অনেক ইম্পর্টেন্ট কাজ থাকে ।

 

 এসব শোনার পর মেজাজ টাই খিচড়ে গেছে । আমি পার্কের বেঞ্চ থেকে উঠেই গটগট করে হাটা দিলাম । একবার হলেও তো অর্ণা ফিরে যাওয়ার জন্য ডাকবে ......তখন একটু ভাব নিয়ে ওর কাছে ফিরে গেলেই হল । হাটতে হাটতে গেইটের কাছাকাছি চলে এলাম,তবুও ডাকার নাম-গন্ধ নাই । মেয়েটা ফাযিল হয়ে গেছে....সব আমারই দোষ,অতিরিক্ত লাই দিয়ে ফেলেছি ....আর এখন আমার মাথার উপরেই উঠে কাঠাঁল ভাংছে ।

 

এখন ডা্কলেও আর ফিরে যাব না । এত সুন্দর একটা মেয়ে,আর এমন বদের বদ । কোন কুক্ষণে এই ফাজিল মেয়ের প্রেমে পড়েছি,আল্লাহই জানে...রাগে গা টা জ্বলে যাচ্ছে । এখন ফিরে গেলেও মনের সুখে ইনসাল্ট করবে.....পার্ক ফেলে অনেকদূর হেটে চলে এসেছি । ফিরে যাবো,কি যাবনা ভাবতে ভাবতেই ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি না্মল ।

 

 মেয়েটা আবার বৃষ্টিতে ভিজছে না তো ? গতবার যখন দুজন মিলে বৃষ্টিতে ভিজেছিলাম,১ সপ্তাহ মেয়েটা বিছানায় জ্বরে কাতরেছে । দৌড়ে পার্কে গিয়ে দেখি,অর্ণা নেই । রাগে গজগজ করতে করতে নিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম,আজকে একলা একলাই বৃষ্টিতে ভিজব ,একদম সন্ধ্যা পর্যন্ত । দরকার হয়,নিউমোনিয়া না বাধাঁনো পর্যন্ত বৃষ্টিতে ভিজব ।

 

 ২৩ তারিখে আমাদের দুজনের ভালবাসাবাসির ৫ বছর পূর্ণ হবে । কোথায় দুজন একটু রোমান্টিক রোমান্টিক ভাব নিয়ে প্রেমের কথা-বার্তা বলব,তা না । অবশ্য আজ পর্যন্ত একজন আরেকজন কে "তুমি" করেই বলতে পারলাম না ,রোমান্টিক কথা বলব কি । অর্ণাকে প্রপোজ করার মাসখানিকের মাথায় যখন ওকে বললাম ,এখন থেকে আমরা দুজন,একজন আরেকজনকে তুমি করে সম্বোধন করব,ওর সে কি হাসি ... একটু রোমান্টিক ভাব ধরতে গেলেই অর্ণা হেসে কুল পায় না ।

প্রথম যে চিঠিটা ওকে লিখেছিলাম,সেটায় ওকে "চন্দ্রাবতী" বলে সম্বোধন করেছিলাম(কেনো এই নাম দিয়েছি,মনে নেই) । আমার প্রপোজাল মেনে নেয়ার সময়,ও আমাকে শক্ত করে বলেছিল,"এসব ফকিরা নামে আমাকে আর কখনো ডাকবে না । যদি ডাক,তাহলে তোমার সাথে আমি আর নাই ।" এই পাঁচ বছরে আমার দেয়া এই নাম নিয়ে অর্ণা আমাকে কম করে হলেও পাঁচশ বার পঁচিয়েছে ।

 

হাসলে অনেক মিষ্টি লাগে অর্ণাকে । মাঝে মাঝে মনে হয়,মেয়েটাকে বানানোর সময় বিধাতা ভুলে অন্য আরেকজনের রুপ ও অর্ণাকে দিয়ে ফেলেছেন । আগে তো চুপচাপ ই ছিলো, দশটা কথায়ও একটা বলত না । কিছুদিন যেতে না যেতেই, দেখি আমার প্রত্যেকটা কাজেই ওর একশটা করে অবজেকশন ।

 

- এই,তুই এই বিশ্রী শার্ট টা পরে আমার সাথে দেখা করতে এলি কেন ? মানুষ কিভাবে যেন তাকাচ্ছে ।

- আরে,তুই মাথায় বাটিছাট দিয়ে রেখেছিস কেন ? আক্কেল নাই তোর ? তোকে তো গলা ছিলা মুরগীর মত দেখা যাচ্ছে ....আশ্চর্য !!

-কার কাছ থেকে ছ্যাকা খেয়ে আমার সাথে দেখা করতে এসছিস ? মুখ ভর্তি খোচাখোচা দাঁড়ি ।যা,শেভ করে আয় এক্ষুনি .....নাইলে ক্ষুর দিয়ে যদি আমি তোর মাথা ন্যাড়া না করি..

.................................ইত্যাদি ইত্যাদি ।

 

এইসব ভাবতে ভাবতে যখন বাসায় পৌঁছালাম,তখন মাথা কেমন যেনো ভারভার হয়ে আছে... আয়না না দেখেও বুঝতে পারছি চোখ টকটকে লাল হয়ে আছে ।

কলিংবেল টিপতেই,মা এসে দরজা খুলে দিলেন । আমার দিকে তাকিয়ে মা চিলের স্বরে চিৎকার করে বলে উঠলেন,"কি হয়েছে আমার তূর্যের ??এই তূর্য,তুই এমন করছিস কেন ?? কি হয়েছে বাবা ??  "

 

বাসার দরজায় বমি করে ভাসিয়েই,মাথা ঘুরে পড়ে গেলাম আমি ।জ্ঞান তখনই পুরাপুরি হারাই নি তাই বুঝতে পারলাম, বাসার সবাই চলে এসেছে...তারপর আমাকে পাঁজাকোলা করে নিয়ে বিছানায় শোয়ানো হল । গা টা জ্বরে পুড়ে যাচ্ছিল । তাই চোখের সামনে রঙের খেলা দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়লাম কিংবা জ্ঞান হারালাম,জানি না...

 

ডাক্তার ডাকা হল পরেরদিন সকালে । এভাবে শুয়ে শুয়ে কয়দিন পেরোল তা বোঝার মত অবস্থাও তখন ছিলো না...শুধু জানি,ডাক্তার একগাদা অষুধ দিয়ে,বিছানায় শুয়ে থাকার অর্ডার দিয়ে গেছেন ।

 

কিন্তু,শুয়ে থাকলে তো চলবে না । পরশুদিন অর্ণার সাথে দেখা করতে যেতে হবে । কত কিছু চিন্তা করে রেখেছি মনে মনে । বেলীফুল মেয়েটার অনেক পছন্দের ।

বেলীফুল কিনে আনতে হবে ওর জন্যে । শাড়ি পরে এলে,বলব চুলে গুজে নিতে । প্রচন্ড খারাপ লাগছে । অর্ণাকে একটু দেখতে পারলে হত । ও যদি মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দিত , তাহলে জ্বর টাও নিশ্চয়ই ভাল হয়ে যেত ।

 

ভাবতে ভাবতেই দেখি অর্ণা বিছানার কাছে দাঁড়িয়ে আছে । স্বপ্নে দেখছি না তো ? নীল শাড়ি পরে, খোঁপায় বেলীফুল গুজেছে অর্ণা । হুম,বেলীফুল ই তো.....মিষ্টি ঘ্রাণে রুমটা ভরে গেছে । এসে আমার বিছানার কছে চেয়ার টেনে বসল । মাথায় হাত রাখতেই,চুড়ির টুংটাং শব্দ কানে এলো । হুম,স্বপ্নই তো....আমার অর্ণা তো সর্বদা যুদ্ধংদেহী । সারাদিন কত অজস্রবার ছোটখাট হাজার ব্যাপার নিয়ে আমার সাথে ঝগড়া করে । স্বপ্নের অর্ণাটা অনেক ভাল । এইতো আমার সাথে কি আদুরে গলায় কথা বলছে । চোখের কোণায় একফোটা পানিও চিকচিক করে উঠল । কেন কাঁদছে,বোকা মেয়েটা ?

 

আমি তোমাকে সারাদিন অনেক জ্বালাই,না?

- হুম,জ্বালাও ই তো ।

আমার কথায় এতো বেশি রাগ করেছিলে । আমাকে বকা দিতে । কেন অসুখ বাধিয়ে বিছানায় শুয়ে আছো ? আজকে না আমাদের রিকশা ভ্রমনের কথা ছিলো ? তুমি না পাঞ্জাবী পরবে ?

- পাঞ্জাবীতে তো আমাকে ভাল লাগে না । তুমি ই না বললে ?

এটাতো আমি আমার জানটুস কে আদর করে বলেছিলাম ।

 

বুঝতে পারলাম,স্বপ্নেই দেখছি । অর্ণা তো আমাকে তুই করে বলে ।

 

স্বপ্নের অর্ণার সাথে কথা বলতে বলতেই ঘুমিয়ে গেলাম আমি...

 

দুদিন পর ভাল হয়ে,অর্ণার সাথে দেখা করতে গেলেই,অর্ণা চেচিয়ে উঠল,

 

লজ্জ্বা করে না অসুখ বাঁধিয়ে বিছানায় পড়ে থাকতে ? কত কষ্ট করে বাসায় ম্যানেজ করে,শাড়ি পরে তোমাকে সারপ্রাইজ দিতে এসে দেখি , তুমি মরার মত বিছানায় পড়ে আছ । এখন আমার সামনে কান ধরে উঠবোস কর ।

 

দাঁত কেলিয়ে হাসলাম আমি । তার মানে সত্যিই সেদিন অর্ণা এসেছিল । পাঁচ বছরে প্রথম বারের মত ও শাড়ি পরেছিল,আর আমি বিছানায় পড়ে ছিলাম ??আসলেই তো আমার কান ধরে উঠবোস করাই উচিৎ ।

 

আমি কানে ধরার উপক্রম করতেই , অর্ণা এগিয়ে এসে হাত ধরল । কত অজস্র বার এই হাত ধরেছি , তবুও যত বারই অর্ণা হাত ধরে,হৈমন্তির অপুর মত মনে হয়,"আমি ইহাকে পাইলাম........."

 

 

 

 

Share