মধ্যবিত্ত

লিখেছেন - ফারহানা নিম্মী | লেখাটি 813 বার দেখা হয়েছে

 আমার চোখের সামনেই যখন আমার বান্ধবী ভিক্ষুক কে ২০ টাকার নোট ধরিয়ে দিল

,সাথে সাথে আমি আঁৎকে উঠে হিসাব করতে লাগলাম,এই টাকা আমার প্রতিদিনের

ভাড়ার অন্তত অর্ধেক তো হবেই ।২০ টাকা তো দূরেই থাক,২ টাকার একটা নোট

দেয়ার জন্যও আমাকে একশ বার ভাবতে হয় ।মধ্যবিত্তের এই হচ্ছে নমুনা ।

 

আমার খুব মনে আছে,কলেজে পড়ার সময়,আমার একজন স্যার একদিন বলেছিলেন,"কখনো

মধ্যবিত্তের সীমানার ভিতর থাকবি না ।উচ্চবিত্ত,মধ্যবিত্ত এবং নিম্নবিত্ত

এই তিনটির মধ্যে,মধ্যবিত্তের ক্যাটাগরি টা খুব বাজে ।এরা কখনো নিম্নবিত্ত

পরিবার গুলোর মত কিছু না থাকার কষ্টটা বুঝতে পারে না,আবার উচ্চবিত্তের মত

সব পেয়ে যাওয়ার আনন্দটাও বুঝতে পারে না । এদের কাজ হচ্ছে মাঝামাঝি ঝুলে

থেকে,কিছু না পাওয়ার জন্য আফসোস করা ।যদিও এদের যা আছে,দেশের অধিকাংশ

মানুষের হয়তো তা ও নেই ।"

 

খুব খারাপ লেগেছিল কথাগুলো শুনে ।আমি নিজে মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে

।কিন্তু আমি তো কখনো এ নিয়ে লজ্জাবোধ করিনি ।হয়তো করতাম ও না,যদি

অবাঞ্ছিত ভাবে তোমাকে ভালবেসে না ফেলতাম ।

 

ভালবাসার কথাগুলো বেশিরভাগ সময় আমার মাথার উপর দিয়ে যেত ।আমার প্রায় সব

বান্ধবীরই বয়ফ্রেন্ড ছিল ।যাদের ছিল না,তারাও এ ব্যাপারটিতে খুব উৎসাহিত

ছিলো বলেই মনে হত ।কিন্তু আমার মনে হত,ছেলেরা কত ফালতু খরচ ই না করতে

পারে ।নিয়ম করে ফোন করে মেয়ে বান্ধবীটির খোঁজ নেয়া,ফাষ্টফুডের দোকানে বসে

প্রেমালাপের সাথে সামান্য পেটপূজা করা,মেয়ে বান্ধবী টিকে খুশি করার জন্য

প্রথম দেখা হওয়া থেকে শুরু করে,প্রথমবার 'ভালবাসি' বলা,প্রথম হাত ধরা

ইত্যাদি বিশেষ বিশেষ উপলক্ষে উপহার আদান-প্রদান করা আরো কত কি!!

ন্যাকামো আর কি!! কি দরকার টাকা-পয়সা এভাবে উড়ানো ? এই টাকা দিয়ে কয়দিনের

ভাড়া হয়,কেউ কি ভাবে ? কতদিন টিফিন পিরিয়ডে না খেয়ে,টাকা

জমিয়েছি..যাতে,যেদিন খুব ক্লান্ত থাকব,সেদিন না হেঁটে রিকশায় করে বাসায়

যেতে পারি । এত লম্বা রাস্তা বাসে করে আসার পর,১৫-২০ মিনিটের পথ হেটে আসা

আসলেই কষ্টের..

 

তাই,যখন কাউকে ভালো না বেসে আমি মহাসুখে আছি,এবং ভাবছি,ভাগ্যিস আমার

দ্বারা সময় ও টাকা দুটিই বেঁচে যাচ্ছে ;তখন স্রষ্টা আমাকে শিক্ষা দেয়ার

জন্যই বোধহয় তোমাকে পাঠালো ।তোমাকে চিনতাম তো অনেক আগে থেকেই,কিন্তু

তোমাকেই যে শেষমেষ ভালবেসে ফেলব,তা কি আর জানি?

 

দেখতে আহামরি কিছু নই,তা জানি ।কিন্তু তাই বলে একদম ফেলনা,তাও নয়

।ভালবাসার আবেদন কে সবসময়ই এড়িয়ে চলেছি ।কারণ,আমার সীমাবদ্ধতা আমি জানি

।হয়তো তাই বন্ধুত্বের বাইরে যাওয়ার সাহস করিনি কখনো ।

বন্ধু ছিলে,কখন সেই গন্ডি পেরোলে আমি বুঝতেও পারিনি ।কখনো তো কাউকে

ভালবাসতে চাইনি...তবে কোন সে মাহেন্দ্রক্ষণ,যেদিন মধ্যবিত্তের সীমা

পেরিয়ে তোমাকে ভালবেসে বসে আছি ?

 

নির্লজ্জের মত কি কান্না টাই না কাঁদলাম ।ভালবাসা না জানানোর

কষ্টে,মধ্যবিত্ত পরিবারের বড় মেয়ে হওয়ার কষ্টে,বাবা-মার সব আশার মধ্যমণি

হওয়ার কষ্টে ।কখনো কি তুমি জানবে,কতটা ভালবেসেছিলাম তোমাকে?কখনো কি আমার

হাত টা ধরে বলবে,"এইতো আমি আছি তোমার পাশে,তোমাকে আর কখনো কাঁদতে দিব

না,দেখো.."

 

হয়তো কোন লক্ষী মেয়ে একদিন তোমার বউ হবে ।অনেক ছেলেমানুষী

আবদার,অভিমান,ভালবাসায় তোমার জীবন পরিপূর্ণ করে তুলবে ।কিন্তু কেউ কি

জ়ানবে,এই মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়েটি কতটা অভিমান নিয়ে ভেবেছিল,"একদিন তুমি

ভুল করে হয়তো আমাকে ভালবেসে ফেলবে?"

 

Share