চোখের আলোয় দেখেছিলেম

লিখেছেন - ফারহানা নিম্মী | লেখাটি 1034 বার দেখা হয়েছে

প্রচন্ড বিরক্তি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিস রুমের সামনে দাঁড়িয়ে আছি । অফিস বন্ধ হয়ে গেছে । টাকাটা আর জমা দেয়া হলো না । আব্বা জানতে পারলে আজ কাঁচা চিবিয়ে খাবেন । এটা অবশ্য নতুন কিছু না । বড় হওয়ার পরও প্রায়ই নানা কারণে ভদ্রলোকের মার খেয়েছি । ফাইন সহ টাকা দিতে হবে একথা শুনলেই আমার খবর আছে । মারের চিন্তায় চোখে ধাঁধাঁ দেখছি । আব্বার মনে মায়া-দয়া বরাবরই কম ।

 

বন্ধুদের কারো থেকে কি টাকা নেয়া যায় ? টিউশনের টাকা পেতে আরো এক সপ্তাহের মতোন বাকি । একবার মনে হলো মা কে বলি,পরক্ষণেই উড়িয়ে দিলাম । তাকে বলে বিশেষ লাভ নেই । তিনি নিজেই বাবার ভয়ে তটস্থ থাকেন । প্রচন্ড কান্না পাচ্ছে এখন । আশেপাশে একদুইবার তাকিয়ে,আমি সত্যি সত্যি কাঁদতে শুরু করলাম । শীতকাল,তাই নাক দিয়ে পানি পড়ে একাকার হয়ে যাচ্ছে । গায়ের শাল দিয়ে নাক মুছতে মুছতে লাল করে ফেলেছি ।   

 

আজকের দিনটাই কুফা । গতকাল রাতে রুবা ম্যাসেজ দিয়ে জানিয়েছে,আজ সেমিস্টার ফি জমা দেয়ার লাস্ট ডেট । ৩ টার ভিতর টাকা জমা না পড়লে জরিমানা দিতে হবে । পরীক্ষার সিডিউল ও দিয়ে দিয়েছে । দুই-দুইটা দুঃসংবাদ দেখে মিনিট দশেকের মতো কোমায় চলে গেলাম । আব্বা মূল টাকা দিতেই হিমশিম খাচ্ছেন,এর উপর জরিমানার কথা শুনলে আমাকে কুচিকুচি করে নালায় ফেলবেন ।

 

এক মূহুর্তও দেরী না করে তড়িঘড়ি করে রেডী হলাম । কোন মতে নাস্তাটা সেরেই রিকশা নিয়ে সোজা বাস স্ট্যান্ডে হাজির হলাম । বাসে উঠেও জায়গা পাইনি । হ্যান্ডেল ধরে ঝুলে দাঁড়াতে হলো । বসার জায়গা ছাড়া,দাঁড়িয়ে থাকার জন্য বাস মোটামুটি ফাঁকা,তাই অসুবিধা তেমন হচ্ছিলো না ।

 

একটু পর খেয়াল হলো,মানুষজন কিভাবে যেন  তাকাচ্ছে । সাথে সাথে এক হাতের আঙ্গুল দিয়ে চুল আঁচড়াতে লাগলাম । কেনো জানি মনে হচ্ছিলো তাড়াহুড়ায় হয়তো চুল আঁচড়াতে ভুলে গেছি । এরপর কাপড়-চোপড়ের দিকে নজর দিতেই পায়ের দিকে চোখ আটকে গেলো । দুই পায়ে দুই রকমের স্পঞ্জের স্যান্ডেল !! তারো একটা আবার তুনতুন-বুবুন আঁচড়ে কামড়ে রেখেছে । তুনতুন আর বুবুন বাবার পোষা খরগোশ ।   

 

শীতকালে ঠান্ডার কারণে বাসার সবাই স্পঞ্জের স্যান্ডেল পরে হাঁটাহাঁটি করে  ।  সকালে তাড়াহুড়া করে বেরুতে গিয়ে আমার আর আরিশার স্যান্ডেল জোড়া থেকে একটা করে তুনতুনের আধখাওয়া স্যান্ডেল পরে বের হয়ে গেছি । বুবুন আর তুনুতুনের মধ্যে তুনতুনের স্পঞ্জের স্যান্ডেল খুব প্রিয় । তাই মনের খুশিতে বাসার সব স্পঞ্জের স্যান্ডেল অদ্ভুতভাবে খেয়ে রেখেছে । আব্বার আবার পশু-পাখির প্রতি গভীর ভালোবাসা । পোষা খরগোশ দুইটার স্বাস্থ্য দেখলেই তা ব্যাপক ভাবে বোঝা যায় । আমরা অবশ্য খুবই বিরক্ত । টানা-পোড়েনের সংসারে বাড়তি দুটো প্রাণীর উপস্থিতি বাবা ছাড়া সবাইকেই ত্যাক্ত-বিরক্ত করে ছেড়েছে ।

 

সে যা হোক,বাসে এই জিনিস যতক্ষণে খেয়াল করলাম,ততক্ষণে আরো বিশ-পঁচিশ মিনিটের রাস্তা পেরিয়ে গেছি । এভাবে ভার্সিটি তে যাওয়া সম্ভব না । তাই আবার বাসায় রওয়ানা হলাম । দেরী হয়ে যাচ্ছিলো,তাই বাসের জন্য অপেক্ষা না করে সি এন জি নিয়ে বাসায় এলাম । এতো কারিগরি করেও যখন ভার্সিটিতে পৌঁছালাম,তখন অফিস রুমের সামনে একটা মাছিও নেই ।

 

এইবারই ভার্সিটিতে নতুন ভর্তি হয়েছি । তাই এখনো নিয়ম কানুন ঠিকমত বুঝে উঠতে পারিনি । আব্বা তো পড়াতেই রাজী ছিলেন না । মাও আব্বার সাথে তাল মিলিয়ে বলেন,"এত পড়ে কি হবে ? মেয়েদের তো বিয়ে করে ওই ঘর সংসারের কাজই দেখা লাগে । "

 

অনেকটা জোর করেই ভর্তি হয়েছি । এই সামান্য কারণে পড়ালেখাই না বন্ধ হয়ে যায় আবার । মধ্যবিত্তের নানা জ্বালা । অনেক কিছু না চাইলেও সহ্য করে যেতে হয় । এইসব সাত-পাঁচ ভেবে মন সীমাহীন খারাপ । এতোটাই যে আর বাসায়ই ফিরতে ইচ্ছা করছে না । এলোমেলো ভাবে তাই ভার্সিটির করিডোরে হাঁটছি । তখনই কেউ একজন পাশ থেকে বলে উঠল,"তুমি নিমিশা না ? "

 

 

আমি প্রশ্নকর্তার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালাম...

 

-আমি আরাফ । তোমার দুই ইয়ার সিনিয়র । রুবা চেনে আমাকে ।

 

-কি চাই ?

 

-তুমি কি বিরক্ত হচ্ছ? আমি তাহলে পরে কথা বলি ।

 

অন্য সময় হলে,আমার বিরক্তি এই লোক বুঝে ফেলেছেন,তাই তাকে ভুল প্রমাণ করে উলটাটা বলতাম । কিন্তু আজ ইচ্ছাটা জোর করে সামলালাম । ব্যাটা বুঝুক আমার বিরক্তি । নিজ থেকেই আপদ দূর হবে ।

 

-তোমার সাথে পাঁচ মিনিট কথা বললেই হয়ে যাবে । আমার যা বলার আমি এর ভিতরেই বলে শেষ করতে পারবো ।

 

 

বুঝাই যাচ্ছে ব্যাটা চুড়ান্ত রকমের হাঁদারাম । যাচ্ছি বলেও সাথে সাথে ঘুরছে । আমি এদিক ওদিক তাকিয়ে দ্রুত পা চালাচ্ছি । ব্যাচ্‌মেট দের কেউ দেখে ফেললে আগামি কয়েক মাস সবার পঁচানি খেতে হবে ।

 

-তিন মিনিট পার হয়ে গেছে,আর দুই মিনিট হলেই হবে ।

 

এবার আমি একটু অবাক হলাম । জিজ্ঞেস করলাম,"কিসের তিন মিনিট হয়েছে ?"

 

-ঐ যে দূরে আমার বন্ধুরা বসে আছে । ওদের সাথে বেট্ ধরেছিলাম । তোমার সাথে আমি পাঁচ মিনিট কথা বলে দেখাতে পারবো । আর তুমিও আমার সাথে কথা বলতে কোন আপত্তি করবে না ।

 

 

আমি ছেলেটার দিকে তাকালাম । সে হাসছে । সাথে সাথে আমার কি যে হলো জানিনা । সিনিয়রিটির গুষ্টি কিলিয়ে আমি হঠাৎ করেই হাতের ডায়েরীটা ছুঁড়ে মেরে বসলাম । এতোক্ষণ নিঃশব্দে কাঁদছিলাম,এই কান্ডের পর আশেপাশের সবাইকে চমকে দিয়ে বেশ জোরেই কাঁদতে শুরু করলাম ।

 

ছেলেটাও ঘটনার আকস্মিকতায় হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে গেছে । আচমকা ঝাড়ি খেয়ে সে যত না অবাক হয়েছে,আমার কান্না দেখে তার দ্বিগুণ পরিমাণ ভড়কে গেছে ।

 

 

মূহুর্তে কয়েকজন আপু-ভাইয়া  আমার পাশে চলে এলো । তারা বললেন,"কি হয়েছে আপু ? কাঁদছো কেনো ?" এরপর কিছু একটা বুঝে ফেলেছেন ভাব নিয়ে বলতে লাগলেন,"এই ছেলেটা কি তোমাকে বিরক্ত করছে ? "

 

হ্যাঁ,না কিছু বলার মতো অবস্থা আমার নেই । আমি হেঁচকি তুলে কেঁদেই যাচ্ছি । কান্না থামাতেই পারছিলাম না ।  

 

 

আমার অবস্থা দেখে,কয়েকজন ভাইয়া শার্টের হাতা গুটিয়ে ছেলেটার দিকে এগিয়ে যেতেই সে জমে গেলো । বারবার তার চশমাটা চোখের উপর টেনে উঠিয়ে বলতে লাগলো,"মানে...ইয়ে...আমি কিছু...ও ই আমাকে মারলো...আমি থার্ড ইয়ারের..."

 

ভাইয়াদের কেউ একজন বললো,"তুমি থার্ড ইয়ারে পড়ে কি ইভ টিজিং এর সার্টিফিকেট পেয়ে গেছো ?"

 

 

আমি দেখলাম ঘটনা নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে যাচ্ছে । এমন গাধা ছেলে যে এখনো ঝেড়ে দৌড় না দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে । আমি কিছু না বললে এই ছেলে সত্যি সত্যি গণধোলাই খাবে । আমি বলে উঠলাম,"আরাফ ভাই,বাসায় যাব ।"

 

শুনে,পাশ থেকে একটা আপু বললেন,"এই নিয়াজ,ছেলেটা বোধহয় ওর পরিচিত । কিছু করিস না । ছেড়ে দে । "

 

নিয়াজ নামের মানুষটা আরাফকে বললেন,"তিন বছর ভার্সিটিতে পড়েও তো গবেট ই রয়ে গেছো । বললেই তো হতো,তুমি একে চিনো । যাই হোক,ব্যাপার না । আমি ফাইনাল ইয়ারে আছি । প্রেমঘটিত কোন সমস্যায় টিপ্‌স নিতে হলে আমার কাছে চলে এসো । তা নাহলে সারাজীবনই গার্লফ্রেন্ডের চড়-থাপ্পড় খেয়ে জীবন পার করতে হবে ।" কথা শেষে আরাফের দিকে তাকিয়ে চোখ টিপে ইশারা দিতেই আপুটা প্রায় টেনে হিঁচড়ে নিয়াজ ভাইকে নিয়ে গেলেন ।

 

আরাফ ভাই অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে আমার পিছে পিছে হাঁটছেন । আমি তার দিকে ঘুরে দাঁড়ালাম । এখন লজ্জা লজ্জা লাগছে । বেচারাকে এতোটা নাস্তানাবুদ না করলেও পারতাম । লজ্জা কাটানোর জন্যই অপ্রাসঙ্গিক ভাবে বলে উঠলাম,"আজ টাকা জমা দেয়ার লাস্ট ডেট ছিলো,দিতে পারিনি । বাসায় গেলে কপালে মার আছে । টেনশনের চোটে বেয়াদবী করে ফেলেছি । কিছু মনে করবেন না ।"

 

আরাফ অবাক হয়ে বললেন,"মার খাবে মানে ? তোমাকে বাসায় মারে নাকি ?"

 

আমি বললাম,"না তো !! এমনিতেই বললাম । "

 

বলেই হাসলাম । তারপর বাস স্ট্যান্ড পর্যন্ত রিকশা ঠিক করে উঠে বসলাম । একবার মানুষটার দিকে তাকাতেই সে হাত নেড়ে হাসল । রিকশা যখন চলতে শুরু করে তখন আমার প্রচন্ড মন খারাপ । আমার মাথায় তখন ঘুরপাক খাচ্ছে,এতো তাড়াতাড়ি বাসায় গিয়ে কি হবে ? ছেলেটার সাথে আরো কিছুক্ষণ কথা বলতে পারলে ভালো হতো । বেট্‌ এ জিতলে কি পাবে,তাও তো জিজ্ঞেস করা হয়নি ।

 

আব্বা থাকলেই বাসার ভিতর সবসময় কেমন থমথমে হয়ে থাকে । ভুতুড়ে একটা অনুভুতি হয় তাতে । সন্ধ্যায় চা-নাস্তা সেরে আব্বা টিভি দেখতে বসেন । আম্মাকে এই ফাঁকে রুমে ডেকে সেমিস্টার ফির কথা বলতেই মা ভড়কে গেলেন । বললেন,"তোর আব্বা শুনলে খুব রাগ করবে নিমি । "

 

আমি বললাম,"রাগ করলেও বলতে হবে আম্মা । আমি টাকা কোথায় পাব ? "

 

রুমে বসেও আমি শুনতে পাচ্ছি আম্মা আব্বাকে টাকার কথা বলছেন ।

 

-আপনি মেয়েটার উপর রাগ করবেন না । ও তো ইচ্ছা করে কিছু করেনি । হঠাৎ করেই ভার্সিটি তে নোটিশ দিলো ।"

 

-নিমিকে বল,আমার রুমে এসে কথা বলতে ।

 

-আপনি ওকে কিছু বলবেন না,দোহাই লাগে ।

 

-ঢং করবে না একদম । যা বললাম করো ।

 

 

বাবার রুমে দাঁড়িয়ে আছি । কেমন শীত শীত লাগছে ।

 

-তোমার আম্মা যা বললো তা কি সত্যি ?

 

 

আব্বার আওয়াজে ঘরের ভিতর গমগম করে উঠল । টের পেলাম,শরীরের ভিতর দিয়ে শীতল কিছু একটা বয়ে গেছে । আমি কেঁপে উঠলাম ।

 

-ভার্সিটিতে কেনো যাও ? পড়ালেখার খোঁজ খবর রাখ না,টাকা পয়সার খোঁজ রাখো না ? কি করে বেড়াও ওখানে গিয়ে,আমি কি কিছু বুঝি না? বেয়াদব মেয়ে ! আমার কি কাড়ি কাড়ি টাকা যে তোমার জরিমানার টাকাও দিতে হবে আবার ? শরীরে বিষ হয়েছে অনেক,না?  

 

আমি অনেক চেষ্টা করেও বলতে পারলাম না,গত কয়েকদিন জ্বরে ভুগেছি বলে ভার্সিটিতে যাই নি । কাপ থেকে সামান্য চা ছলকে তোমার গায়ে পড়েছে বলে কি মার টা মারলে,কাপের সমস্ত গরম চা আমার গায়ে ছুঁড়ে মারলে, মনে নেই ? সেদিন গায়ে হাত তুলেছো,কিছু বলিনি । আজ একদম আমার গায়ে হাত তুলবে না তুমি,একদম না ।

 

তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলাম আব্বা একটা লম্বা লাঠি বের করে হিস হিস করে আমার দিকে এগিয়ে আসছেন । আর কিছু দেখতে পেলাম না । জ্ঞান হারাবার আগে প্রতিটা মূহুর্ত আম্মা আর আরিশার ভয়ার্ত চিৎকার শুনতে পেলাম  শুধু ।

 

জ্ঞান ফিরার পর অনুভব করলাম নড়ার শক্তি নেই শরীরে । মা পাশে বসে শরীরে হাত বুলাচ্ছেন । চোখ থেকে পানি পড়ার সময় মাথার বাঁ পাশটায় জ্বলুনি হওয়াতে বুঝলাম কেটেছে ওখানটায় । আরিশা পাশে বসে গজ গজ করছে,"সব দোষ তোমার আম্মা,তুমি চাইলেই আব্বাকে আটকাতে পারো । আপাকে কিভাবে মারল । তুমি উঠিয়ে এনে আপাকে বিছানায় শুইয়ে দিলে,আব্বাকে কিছুই বললে না । "

 

আম্মা বললেন,"মা রে,তোর আব্বার রাগ বেশি । কিন্তু লোকটা খারাপ না । তোদেরকে অনেক ভালোবাসে । টাকার অভাব অনেক খারাপ জিনিস । অভাবেই লোকটার স্বভাব নষ্ট হয়ে গেছে । দুইদিন পর তোদের বিয়ে হয়ে যাবে । তখন বুঝবি,অনেক কিছু খারাপ লাগলেও চুপ করে সহ্য করতে হয় ।"

 

 

কথা শুনতে শুনতেই আমি ঘুমিয়ে পড়ি । শরীরে প্রচন্ড ব্যাথা । চোখ ফুলে গেছে,তাই বেশিক্ষণ চোখ মেলে রাখতে পারি না ।

 

আমিও জেগে থাকার চেষ্টা করিনা । জেগে থাকলে শরীরের ব্যথা আরো প্রবল ভাবে অনুভূত হয় । ঘুমানোই ভালো ।

 

ঘুম নামতেই স্বপ্ন ঝাঁপি খুলে বসে চোখে । আমি স্বপ্ন বড় বেশি দেখি । জীবনের অতৃপ্তি গুলো মনে হয় এর একটা বড় কারণ । অনেক না পাওয়া,আমি স্বপ্নে পেয়ে পুষিয়ে নেই । প্রায়ই স্বপ্নে দেখতাম,আমরা সবাই আমাদের গ্রামের বাড়ির উঠানে বসে আছি । আব্বা কিভাবে যেন খুব ভালো হয়ে গেছেন । আমি আর আরিশা আব্বার দুপাশে বসে কিছু  একটা নিয়ে হাসাহাসি করছি । আম্মা উলের কাঁটা হাতে কি যেন বুনছেন আর কিছুক্ষণ পরপর বিরক্ত চোখে আমাদের দিকে তাকাচ্ছেন । আমরা কিন্তু পরিষ্কার বুঝতে পারছি,আম্মা মুখ আড়াল করে প্রশ্রয়ের হাসি হাসছেন । স্বপ্নটা আজ আবার দেখলাম ।

 

হঠাৎ করেই স্বপ্নে আমাদের বাড়ির জায়গায় একটা দোতলা বাড়ির বারান্দা দেখতে পেলাম । কেউ একজন ইজি চেয়ারে বসে একটা গল্পের বই পড়ছে । আমি চায়ের কাপ নিয়ে বেতের টেবিলে রাখলাম । এরপর বইটা মুখের উপর থেকে সরাতেই মানুষটা হাসল । স্বপ্নের মানুষটাকে খুব চেনা চেনা লাগছে । এতটুকু বুঝতে পারছি,সে আমার খুব কাছের কেউ । মানুষটা হাত বাড়িয়ে বইটা নেয়ার চেষ্টা করতেই কপট রাগ দেখিয়ে কোমরে হাত রেখে দাঁড়ালাম আমি । সে এখন চোখের চশমাটা হাত দিয়ে নাকের উপর ঠেলছে আর কেমন অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে তাকাচ্ছে ।

 

 

সাথে সাথেই ঘুমটা ভেঙ্গে  গেলো । এইমাত্র আমি কি আরাফ নামের মানুষটাকে স্বপ্নে দেখেছি ? প্রচন্ড অবাক হই । স্বপ্নে দেখার মতো পরিচয় তো তার সাথে নেই । তবুও স্বপ্নের রেশটা কেনো জানি কাটতেই চায় না । এতো সত্যি মনে হলো স্বপ্নটাকে...আচ্ছা,এতো সুন্দর বাস্তব কি আসলেই হয় ?   

 

হঠাৎ ড্রয়িংরুম থেকে বাবার কথা শুনতে পাই আমি ...

 

-তোমার মেয়ের জন্য ভালো একটা বিয়ের প্রস্তাব এসেছে । ছেলে দেশে থাকতেই বিএ পাশ করেছে, এখন কুয়েতে থাকে । ছেলের বাপ চেনা-পরিচিতের মধ্যেই । আমার সাথে চাকরি করে । আজকাল কই পাওয়া যায় এমন সম্বন্ধ ? মেয়েকে বুঝিয়ে দিয়ো,পড়ালেখা আর করতে হবে না । বিয়ের জন্য ওরা বেশি পড়ালেখা জানা মেয়ে চায় না ।

 

আর শুনতে পারি না আমি । গাল ভিজিয়ে দেয়া গরম পানির ধারা আমাকে বুঝিয়ে দেয়,আমাদের আসলে স্বপ্ন দেখতে নেই । বাস্তবতা অনেক কঠিন । সেখানে অনেক নিমিশার স্বপ্নই হারিয়ে যায় প্রতিদিন । বাস্তবের নিমিশাদের জীবনে স্বপ্নের আরাফেরা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যায় সবসময়...

 

 

নিজেকে মিথ্যে সান্তনা দেই... একদিন তো সব ঠিক হয়েই যায় ...

তবুও কোথায় যেন অপূর্ণতা বুকে শেঁলের মত বিঁধেই থাকে...  

 

 

Share