বর্ষার মৌনতা

লিখেছেন - একুয়া রেজিয়া | লেখাটি 944 বার দেখা হয়েছে

শ্রাবণ মেঘের দেয়া বৃষ্টি যেখানে পরে,

ভেজা সেই মাঠে গান গাওয়া,

টুকরো সুখের দেয়া,একটু আদর ছুঁয়ে

অভিমান জলে ভেসে যাওয়া...

বলতে না পারা কথা,বলে গেল সেই সুর,

ভাসলো আকাশ,অজানায় বহুদূর...

 আপন মনে গেয়ে চলেছে শ্রীকান্ত। গানের কথাগুলো শুনে মনে হচ্ছে ঠিক যেন বৃষ্টির আগ মুহূর্তের জন্যেই গানটি বাঁধা হয়েছিল। আজ ভর দুপুরবেলায়ও অন্ধকার হয়ে এসেছে চারদিক। প্রচণ্ড ঝড়ের আগের অদ্ভুত এক অন্ধকার। এই অন্ধকার ভীষণ টানে মীরাকে।ও বেড়িয়ে এসেছে এক চিলতে বারান্দায়। খুব মন দিয়ে গেঁথে নিচ্ছে প্রকৃতিটাকে। পথের ওপাশের সবুজ ভাব বাড়িটাকে কেমন যেন ফ্যাকাসে নীল লাগছে দেখতে। আকাশের বিষণ্ণতা কে নিজের মাঝে ধারণ করে তিরতির করে কাঁপছে ছোট্ট লেকের স্বচ্ছ পানিটুকু। সমস্ত প্রকৃতি আয়োজন করে প্রস্তুতি নিচ্ছে এলোমেলো হওয়ার, লন্ড ভণ্ড হওয়ার কিংবা নতুন করে মুগ্ধ হওয়ার। আকাশ, মেঘ, বৃষ্টি এমন আকুল করে টানে কেন ওকে, জানেনা মীরা। সে শুধু জানে এই ঝড়ো অন্ধকার কিংবা প্রচণ্ড বৃষ্টি ঘরে থাকতে দেয় না ওকে। বর্ষার এক গভীর রাতে অনেক বৃষ্টি ঝরিয়ে তার জন্ম বলেই কি সে এমন!

 

আগামী কাল অনেক খটমটে একটা পরীক্ষা আছে, অথচ এখন একদম পড়তে ইচ্ছে করছে না। আকাশের ঝড়ো-ভাব দেখে কেন জানি খুব বলতে ইচ্ছে করছে-“তুমি এসেছ এলোমেলো সময়ে”। মা এখনো টের পায়নি, পড়ার টেবিল থেকে উঠে এসেছে ও। টের পেলেই... প্রচণ্ড শব্দ হল কোথাও। চমকে গেলো মীরা। আর নিশ্চুপ হয়ে গেলো শ্রীকান্ত। ভয় পেলো নাকি সে? ক্ষণিকের জন্যে চমকে যেয়ে নিমিষেই আপনমনে হেসে উঠে ও। ইলেক্ট্রিসিটি ফেইলিওর।

 

পাক খেয়ে খেয়ে উঠে আসছে ঠাণ্ডা বাতাস। মেঘ গুলো মহা ব্যস্ত ভঙ্গীতে কোথাও উড়ে যাচ্ছে। যেন ফিরতি ট্রেন না ধরতে পারলে সর্বনাশ হয়ে যাবে। মীরার খুব ইচ্ছে করছে মেঘ হয়ে যেতে। মেঘ হয়ে ওদের সাথে ব্যস্ত হয়ে, ঠাণ্ডা বাতাসের মাঝে উড়ে যেতে।“ ও মেঘ, নেবে আমাকে তোমাদের সাথী করে”! ফিসফিস করে ঝড়ো বাতাসের কানে বার্তা পাঠিয়ে দেয় মীরা। বারান্দার গ্রিল দিয়ে বাতাসে হাত মেলে দেয় ও, আর সাথে সাথেই মনে পড়ে যায় অদিতের কথা। এক বৃষ্টি ভরা দিনে কলেজ শেষ করে ফেরার পথে ইচ্ছেমত ভিজেছিল ওরা। সোনালু ফুলের ডালি গুঁজে দিয়েছিল ওর হাতে অদিত। বৃষ্টিতে ফুলের রঙ ও যেন চকমক করছিল। রাস্তা পার হয়ে, রেল লাইনের পিছু নিতে নিতে কাকভেজা হয়ে চলে গিয়েছিল বহুদূর। কাদাভরা পথ বা রেল লাইনের স্লিপারে পা পিছলে যাওয়ার ভয় হলে হাতটা আর একটু শক্ত করে আঁকড়ে ধরা। অকারণেই হেসে ফেলা...

 

কি স্বপ্নময় আর উদ্দাম দিন ছিল সে সময়। বছর কয়েক আগেও। নিজেকে ভীষণ পরিপূর্ণ মানুষ মনে মনে হত ওর। দিন গুলো হূ হূ করে কেটে যেত। আহ! মানুষ কত দ্রুতই না বদলে যায়। মাঝে মাঝে বাস্তবতা মেনে নিতে খুব কষ্ট হয়। কত দিন অদিতের সাথে দেখা নেই। বর্ষা আসে বর্ষা যায়... শেষ পর্যন্ত আসলে সব ভালবাসার গল্পই ফুরিয়ে যায়, সংলাপগুলো শুধু থেকে যায়। আর কিছুই ভাবতে চায়না মীরা। থাক না যে যার মত করে! খুব বেশি কিছু কি আসে যায়। ঝরা বকুলের মত না হয় পড়েই থাকুক কিছু স্মৃতি।

 

 

 

 

 

“এক জীবনের কতটা আর নষ্ট হবে?

একটা মানুষ কতটাই বা কষ্ট দিবে? ”

 

বিড়বিড় করলো ও। কার যেন কবিতা, মনে পড়ছে না এখন। থাক সব সময় সব কিছু মনে পড়ার দরকারও নেই। মীরা এখন থেকে ক্ষণে ক্ষণে বদলে যাওয়া দুর্বার মেঘ হবে, প্রবল বৃষ্টি হবে, প্রচণ্ড ঝড় হবে... পাশের ঘর থেকে মায়ের চিৎকারে ভাবনার ঘোর কাটে ওর।

 

-কিরে? কখনো থেকে তোর ফোনটা বেজে যাচ্ছে, ধরছিস না কেন? বারান্দা থেকে ঘরে এসে সে সেলফোনটা তুলে নীল। অচেনা নম্বর। বার কয়েক হ্যালো বলার পরেও ওপাশ থেকে কোন শব্দ নেই। রেখে দিতে যাবে, হঠাৎ একটা মুহূর্তের জন্যে থমকে গেলো ও, একটা হার্ট বিট মিস হয়ে গেলো। ওপাশে সেই অনেক দিনের চেনা ভরাট কণ্ঠ। কত দিন কত যুগ পর শুনল এই স্বর। –“মীরা, তোর প্রিয় বৃষ্টি হচ্ছে। সেই কলেজ জীবনের মত, ভিজবি আমার সাথে???” মৃদু মৃদু জলে মীরার চোখের কোন ভিজে উঠছে। একটা জমাট বাধা কষ্ট, ব্যথা থেকে থেকে উঠে আসছে। সেলফোনটা খুব শক্ত করে কানে চেপে ধরে থাকল ও। বাইরে তখন শীতল বাতাসে... প্রথম বর্ষণে তৃপ্ত মাটি সোঁদা গন্ধ ছড়াচ্ছে...।

 

Share