কনে দেখা আলো

লিখেছেন - একুয়া রেজিয়া | লেখাটি 1301 বার দেখা হয়েছে

বিমান-বন্দরে প্লেনটি ল্যান্ড করার সাথে সাথে রাসেলের মন অশান্ত হয়ে যায়।প্রায় ২.৫ বছর আগে সে স্কলারশিপ পেয়ে আমেরিকায় চলে যায়।সেতু কে কিভাবে বলবে বুঝে উঠতে পারে না,কারন সে জানত সহ্য করতে পারবেনা সেতু।তাইতো সে না বলেই......এরপর কত মেইল/ফোনকল/মেসেজ,কিন্তু সেতুর কোন প্রতিউত্তর আসেনি।যদিও বন্ধুদের থেকে সব খবর সে পেয়েছে।একটা প্রাইভেট ব্যাঙ্ক এ কাজ করছে ও।আজও বিয়ে করেনি।সেতুর বাবা কিছুদিন আগেই মারা গেছেন,এরপর নিজেকে আর ধরে রাখতে পারেনি রাসেল...যখন তার হুঁশ হল তখন সে প্লেনে।নিজেকে আপাদ-মস্তক বাস্তববাদী দাবী করা রাসেল কে আজ সে নিজেই চিনতে পারেনা।

 

বিমান বন্দরের হাজার অচেনা লোকের ভীড়ে বারবার সে চমকে উঠে।এই বুঝি সেতু দাড়িয়ে,কিংবা তার কোন বন্ধু এসে তাকে জড়িয়ে ধরবে,কিন্তু রাসেল জানে এমন কিছুই হবেনা।সে কাউকেই তার আসার খবর দেয়নি।

 

নীলচে থাই গ্লাসে বৃষ্টির ঝাপটা আছড়ে পরে নিচে গড়িয়ে যায়।ধোয়া ওঠা কফি নিয়ে সেদিকে তাকিয়ে সেতু মুগ্ধ হয়ে যায়।অজান্তেই একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস আসে।গত কয়েক বছরে তার জীবন কত বদলে গেছে।বন্ধুগুলো পাশে না থাকলে এত দিনে সে রোবট হয়ে যেত।কর্পোরেট জগৎ তাকে এখনো তা বানাতে পারেনি।ছুটির দিনগুলো এখনও তার কাটে দ্রীক গ্যালারী,টি.এ.সি তে আর ফটোগ্রাফিতে।সবাই চলে যাচ্ছে তাকে ছেড়ে,রাসেল...বাবা...আর ভাবতে চায়না সে।হাতের কাজগুলো শেষ করতে হবে তাকে।অনূভুতির ঠুনকো বেড়াজালে সে আর নত হবে না।

 

ক্লান্ত বিকেল,কেমন যেন মায়া জোড়ানো রোদ গাল ছুঁয়ে দিচ্ছে।অদ্ভুত এক অচেনা আলো।কোথায় যেন শুনেছিল এমন আলোকে নাকি কনে দেখা আলো বলে।নিজের ছোট্ট একতলা বাড়ীর গেইট খুলে সেতু,আর একটা বিট মিস করে তার হার্ট।কে এটা?বাগান বিলাসের নিচে রাখা কাঠের বেঞ্চে বসে!!!ক্লান্ত,এলোমেলো,উস্কখুস্

ক চুল...রাসেল???

সেতুকে দেখেই রাসেল উঠে দাড়ায়,মৃদু স্বরে বলে_"অনেক ক্ষন থেকে অপেক্ষা করছি,একটা গ্লাস পানি যদি..."

চোখ ফেটে কান্না আসে সেতুর।দলা পাকিয়ে উঠে আসে রাগ,অভিমান,অভিযোগ,কষ্ট,আর্তনা

দ...না সে কিছুতেই ভাঙবে না রাসেলের সামনে।কোন মূল্যেই নাহ।ঠান্ডা গলায় বলে_"পাঠিয়ে দিচ্ছি"বলেই পাশ কাটিয়ে ঘরে ঢুকে যায় সে।অনুভব করে রাসেল স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।বুয়াকে দিয়ে পানি পাঠিয়ে দেয় সে।কেন এসেছে রাসেল?চলে যাক,নেই প্রয়োজন তার,একা থাকতে শিখে গেছে সেতু।আর সে চায়না কোন অযথা স্বপ্ন।

 

একটা ডায়েরী রেখে যায় বুয়া,সেতু অবাক হয়।৩ বছর আগে রাসেলকে দিয়েছিল সে এটা।পাতা উল্টায়।প্রতিদিনের কষ্টগুলো,অনূভুতিগুলো লেখা,সেতুর আঁকা কার্টুনগুলো,তোলা ছবি সব আছে।ঝরঝর করে কাঁদতে থাকে সেতু।জানালা দিয়ে বাইরে তাকায় সে,কৃষ্ণচূড়া গাছের পাশ দিয়ে রাসেল ক্লান্ত পায়ে হেঁটে যাচ্ছে।ওর মনে পড়ে,বাবা বলেছিলেন_"মানুষ যেদিন সব হিসেব করতে শিখে যাবে,সেদিন থেকে ভালবাসতে ভুলে যাবে।"

 

সেতু ছুটে যেয়ে রাসেলের হাত চেপে ধরে।রাসেল অবাক হয়ে তাকায় আর তারপর অসম্ভব দৃঢ়তা নিয়ে সেতুর হাত আঁকড়ে ধরে।এই মেয়েটা সে একা রেখে চলে গিয়েছিল।আর এই হাত ছাড়বেনা সে।তাকে দেখলে মনে হয় সে ভাবছে সেতুর হাতটি ছেড়ে দিলেই বুঝি সেতু হারিয়ে যাবে...তাই সে কিছুতেই এমন হতে দিবে না...কখনোই না।

 

হঠাৎ আকাশের মেঘগুলো ছুটোছুটি শুরু করে।কনে দেখা আলোটা যেন ঠিক সময় বুঝে সেতুর মুখেই ঠিকরে পড়ে।

 

Share