ভটুগল্প

লিখেছেন - একুয়া রেজিয়া | লেখাটি 1016 বার দেখা হয়েছে

 হাসপাতাল থেকে আমি হন্তদন্ত করে বের হলাম,ক্লাশের জন্যে দেরী হয়ে যাচ্ছে। এক্ষুনি আমাকে সি,এন,জি নিয়ে কোনক্রমে ক্লাশ ধরতেই হবে। এক অসুস্থ বন্ধুকে দেখতে এসে নিজেই ফ্যাসাদে পরে গেছি। আমার পেছনে ছিল দুই জুনিয়র ভাই,এদের সাথে দুই একবার কথা হয়েছে,ভালো করে চিনিওনা। একপাশে পাঁচ ছয়টা সি,এন,জি দাঁড়িয়ে আছে।আমি সময় বাঁচানোর চেষ্টা করে প্রত্যেক কে না বলে,সবার সামনে এসে হাঁক দিলাম্‌-শঙ্কর কে যাবেন???৫০ টাকা ৫০ টাকা...জুনিয়র ছেলে দুইটাই হাসছে।সি,এন,জি ওয়ালারা মুখ চাওয়া চাওয়ি করছে। এরমাঝে একজন এসে বলল-চলেন আফা।আমি দৌড়ে গিয়ে একলাফে চলে গেলাম সি,এন,জির কাছে।

 

দিন দুয়েক পরে খোমাবইতে একটা এড রিকোয়েষ্ট আসল,সাদাকালো একটা ছবিতে মোটকা করে একটা ছেলে কে,এফ,সির জিঞ্জার বার্গারে বিশাল এক কামড় বসাচ্ছে। আমি বার কয়েক মনে করেও ছেলেটা কে চিনতে পারলাম না। অতএব ইগনোর করলাম।পরের দিন আবারো রিকোয়েষ্ট আসল, বিরক্ত হয়ে আবারও ইগনোর করলাম। তৃতীয় বার এড আসার সাথে এল একটা ছোট্ট মেসেজ, তাতে লেখা-“খবরদার আপু ইগনোর করবেন না। আমি অমিত। মনে নাই সেদিন হাসপাতালে দেখা হইসিলো! আপনে ৫০টাকার সি,এন,জি খুঁজতেছিলেন?” আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে সাথে সাথে তাকে এড করে ফেলি। সেই থেকে অমিতের সাথে আমার পরিচয়।

 

এরপর থেকে সে মেসেঞ্জারে এসে আমাকে অনলাইনে দেখলেই গল্প করতে শুরু করে। একদিন তার আকার আকৃতির জন্যে আমি তাকে মটুরাম বলার সাথে সাথেই সে ব্যাপক উত্তেজিত হয়ে বলে-প্লিজ আপু আমাকে কখোনো মটুরাম বলবেন না। আমি থতমত খেয়ে বললাম-সরি ভাইয়া,আমি তো ফান করে বলেছি। আর কখোনো বলব না। এবার সে আগে চেয়েও বেশি উত্তেজিত হয়ে বলে-আহহা!মটুরাম নামটা তো কমন,আপনি আমাকে ভটু বা ভটুরাম বলেন প্লিজ...আমি ঢোক গিলে বলি-উকে। মাঝে মাঝে ভটুকে ফেবু কমেণ্টে কখনোও বা ভটু লিখলে সে বলে-আস্তে আপু সবাই জেনে ফেলবে।এই নামে আমাকে শুধু আপনি আর অনন্যা ডাকেন। আমি বললাম-অনন্যা কে? ভটু তখন মহা মহা টাইপের উত্তেজিত হয়ে বলতে শুরু করল অনন্যার কথা। তার ভালোবাসার মানুষ। আমি মাথা চুলকাই।আর সব কাহিনী শুনে আমার অনন্যাকে দেখার আগ্রহ বেড়ে যায়। মাঝে মাঝে ভটু আমাকে কোল্ড প্লে,সিস্টেম অফ এ ডাউনের গান পাঠায়...মেসেঞ্জারে এলে কমপক্ষে বিশ কি পঁচিশটা Buzzz দিয়ে চেক করে যে আমি ইনভিজিবল হয়ে আছি কিনা। খোমাবইতে  গুষ্টি কিলাই টাইপের ষ্ট্যাটাস দেয় আর আমার ষ্ট্যাটাসে একই কথা বার তিনেক না লিখলে তা ভালই লাগেনা। যেমন_ “আপু কেমন আছেন?কেমন আছেন?কেমন আছেন? আমি কিন্তু ভালো আছি, ভালো আছি, ভালো আছি” আমিও ওর মত করে লিখতাম-দিব্যি আছি...দিব্যি আছি...দিব্যি আছি...দিন কে দিন চমৎকার একটা বন্ধুত্ব হয়ে যায় আমাদের। 

 

একদিন জানতে পারি ভটুর মন খুব খারাপ কারন, অনন্যা তার ফ্যামিলি সহ লন্ডনে চলে যাচ্ছে। সেদিনই আমার কথা হয় অনন্যার সাথে। আমি কথা বলা শুরু করার আগেই সে একগাদা কথার ডালি খুলে বসে,আর সব কথাই হয় ভটুকে নিয়ে। সে ভটুকে নিয়ে সারাক্ষন ত্যক্ত ও টেনসিত থাকে,না জানি কখন ভটু কি না কি উদ্ভুট্টি কাজ করে বসে। অনন্যার সাথে কথা বলে আমার মনে হয় আমি ওকে অনেক দিন থেকে চিনি। আমিও যেন ওর খুব চেনা। পাগলাটে ভটু সেদিন অনেক খুশি হয়ে যায় তার প্রিয় দুইটি মানুষের গল্প হচ্ছে জেনে। এরপর অনন্যা লন্ডন চলে যাওয়ার মাসখানেক পর গত ডিসেম্বারের কনকনে শীতের এক রাতে ঘুম আসছে না বলে রাত প্রায় তিনটার দিকে মেসেঞ্জারে এসে দেখি তারা দুইজনেই অনলাইন। আমাকে দেখা মাত্রই তারা দুইজন কমপক্ষে বিশ,ত্রিশটা Buzz দিয়ে দিল। আর দুইজনের আমার সাথে গল্প করতে থাকল। অনন্যার কাছ থেকে জানা গেলো,রাত ৩টায় এই শীতের মাঝে ভটু শুধু একটা হাফ প্যান্ট পরে ছাদের রেলিং এ বসে অনন্যার সাথে চ্যাট করছে। অনন্যা এদিকে হা হূতাশ করছে। আমাকে বলল-প্লিজ আপু কিছু করেন। অমিত আপনার কথা শুনবে। আমার কোন কথাই সে শুনে না। আমি সাথে সাথেই ভটুকে ফোন দিয়ে বললাম-ভটু তুমি নাকি জন্মদিনের হাফ পোষাকে ছাদের রেলিং এ বসে আছ! কাহিনীকি? লাফটাফ দেওয়ার ইচ্ছে থাকলে দিয়ে ফেলো আর এমন কোন ইচ্ছে না থাকলে এক্ষুনি ঘরে যাও নইলে মাথা ভেঙ্গে ফেলব। ভটু দুঃখ দুঃখ গলায় বলে-আপনারে অনন্যা বলে দিসে তাই না? আর শান্তিতে থাকা গেল না। ভটুর দুঃখ ভাব আরও বেড়ে যায়। আর আমি অনন্যার অবস্থা চিন্তা করে হাসি। 

 

মাঝে মাঝে হুট করে যদি কখনো ইনভিসিবল হয়ে অনেক রাতে ওনলাইনে আসি, তখন দেখি ওদের নাম দুইটা জ্বজ্বল করছে। আমি জানি আমাকে দেখলেই ওরা ২জন মিলে অনেকগুলো Buzz হয়ে বসবে আর একসাথে লিখবে আপুউউউউউউউউউউ কেমন আছেন?কেমন আছেন?কেমন আছেন?আমার কেন যেন এই বাচ্চা দুইটাকে ঘাটাতে ইচ্ছে করেনা। পৃথিবীতে মাঝে মাঝে অনেক অদ্ভুত সুন্দর সম্পর্ক দেখা যায়।  ভটুর পাগলামি আর আর অনন্যা দুশ্চিন্তায় ভরা এই ভালোবাসা দেখতে আমার ভালো লাগে। এই বছরের শুরুতে ভটুর সাথে আমার পরিচয়ের ১বছর হল। এক জন্মদিনের পার্টিতে তার সাথে আবার আমার দেখা হয়। আমাকে দেখা মাত্রই তার চেহারা ১০০০ ওয়াটের বাল্বের মত করে ঝলসে উঠলো। এক ভাইয়া কে ডেকে বলল-ভাই প্লিজ আপুর সাথে আমার একটা পিক তুলে দেন না। ক্লিক ক্লিক করে সেই মুহূর্ত্বটি ফ্রেমে বন্দি হয়ে গেলো।  সেই পিক দেখে আমার মনে হল-মায়া খুব অদ্ভুত একটা জিনিষ,কে,কখন,কাকে,কেন,কি জন্য ভালোবাসবে,পছন্দ করবে তার আসলে কোন ঠিক নেই।মানুষের অনুভূতিগুলো সব সময় আমার মনে দাগ কেটে যায়। আবারো তাই আরেকটি ছবি আমার সেই সাদামাটা মনের রংচঙ্গে বাক্সে বন্দি হল।

 

 

ভটুগল্পের শেষ পরিণতি অবশ্য খুব কষ্টদায়ক ছিল। এই বছরই অনন্যার ব্রেন টিউমার ধরা পরে, এপ্রিল মাসে সিড়ি থেকে পড়ে যেয়ে বেশ অনেক দিন  জ্ঞানশূন্য থাকে অনন্যা এবং এক সময় মারা যায়। ভটুর আর আমি মাঝে মাঝে একসাথে আড্ডা দেই। আমি জানি আজও বৃষ্টি হলে ও অনন্যার পুরোনো বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। ওদের স্মৃতিময় সব জায়গায় একা গিয়ে বসে থাকে। আমি ওকে কখনো অনন্যাকে নিয়ে কিছু বলিনা। কিছু কিছু কষ্টকে দেখেও না দেখার ভান করতে হয়। আর আমরা মানুষ...আমরা জানি আমরা কতটুকু অনুভূতি গোপন করার ক্ষমতা রাখি।  

 

“I've learned that people will forget what you said, people will forget what you did, but people will never forget how you made them


Share