বাক্স বদল

লিখেছেন - একুয়া রেজিয়া | লেখাটি 1089 বার দেখা হয়েছে

উনি অফিসে আসতেন সবার আগে আর চলে যেতেন সবার পর!।  কম কথা বলতেন বেশী কাজ করতেন,শব্দহীন ছিল তার হাসি। গেড়ুয়া রঙের জুতো,একটা নীল ব্যাগ,আর ছোট একটা মাম পানির বোতল ছিল তার নিত্য দিনের সঙ্গি। আর আমি বেশ পরে আসতাম এবং ক্লাস থাকতো বলে চলে যেতাম সবার আগে। অনেক বেশী কথা বলতাম...যাকে বলে নন-স্টপ বকবকানি আর ভীষণ শব্দ করা ছাড়া হাসতেই পারতাম না। এ কান থেকে ওই কান পর্যন্ত হাসি সারাদিন আমার মুখে লেগে থাকতো কোন কারন ছাড়াই। আমার সাথে কাজ ছাড়া কখোনো কথা হয়নি উনার।

আমি অফিসে এসে হাসঁফাস করতাম কখন বাড়ি যাব। আমার ডেস্কের পাশের বারান্দার আম গাছের বুড়ো কাকটা কে দেখে উদাস হয়ে যেতাম। অনেক দুরের মেঘগুলো কে দেখে মন খারাপ করে ভাবতাম এই মেঘগুলো কেন আমাকে হুসস করে উড়িয়ে নিয়ে যায় না!!!  তাড়াতাড়ি কাজ শেষ করে মাঝে মাঝে উদ্ভট সব ফিলিপেনো আর ইংলিশ গানের লিরিক বের করে পড়তাম,কিংবা অফিসের পিসিতে গেম খেলতাম। কতদিন উনি হুট করে সামনে এসেছেন, ফাইল দিয়ে যাওয়ার সময় কিছু না বলে,মুচকি হেসে বুঝিয়ে দিয়েছেন...আপনি গেম খেলেন জানি তো,ব্যাপার না,চালিয়ে যান। উনি চলে যাবার পর আমি ঘাড় কাত করে ঝুঁকে দেখতাম উনি আবার গেম খেলার কথা জিএম স্যারকে বলে দিচ্ছেন নাকি? কিন্তু না...কখনোই এমন হয়নি।

 

 

মঝে মাঝে দেখতাম উনি কম্পিউটারের দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছেন,ভাবতাম ভদ্রলোকটা দেখছে কি? আমার অদম্য কৌতুহল মিটে যেত উনি লাঞ্চ টাইমে নামাজে গেলেই...দেখতাম কাজের শেষে উনি টুকটাক ব্লগ এ লিখেন,মাঝে মাঝে আপন মনেই হাসেন। একদিন দেখলাম  গুগল আর্থ থেকে উনি উনার ছোট্ট গ্রামটাকে খুঁজে বের করে দীর্ঘক্ষন যাবত মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছেন। একটা আঁকিবুকি করা ছোট্ট গ্রামের ম্যাপ কাউকে এত্ত আবেগপ্রবণ করে দিতে পারে আমার তা জানা ছিলনা। ধীরে ধীরে উনার এবং উনার ভাই এর ব্লগ গুলো পড়া আমার অভ্যাস হয়ে গেলো। আমি জানলাম ব্লগিং কি!  প্রিন্টিং এর কাগজ কম দিলেই আবারো উনি নামাজে গেলেই নিয়ে আসতাম কাগজ,আমি জানি উনি বুঝতেন কিন্তু কিছু বলতেন না। আমার কলম প্রায় নিয়ে যেত অনেকে,কলম খুজঁতে গেলেও উনার ডেস্কে যেতাম কারন জানি এক্সট্রা কলম উনার কাছে থাকবেই। টাকা ভাঙ্গিয়ে হয়তো কিছু ক্যান্ডি উনার টেবিলে থাকতো আমি অফিসের সব চেয়ে জুনিয়র বলে সেগুলোও আমি পেতাম। আর যে ব্যাপারটা আমার সবচেয়ে ভালো লাগতো তা হল রোজ সকালে উনি অফিসের বারান্দায় রাখা ফুল গাছগুলোতে পানি দিতেন। পিয়নগুলো খামখেয়ালি ছিলো, গাছগুলো মাঝে মাঝে আগে শুকিয়ে যেত, অথচ উনাকে আমি দেখলাম অসম্ভব ভালোবাসা নিয়ে উনি গাছগুলোতে রোজ পানি দেওয়া শুরু করলেন। গাছেরাও মনে হয় মানুষের ভালোবাসা অনুভব করতে পারে। কারণ এরপর পাতাবাহারের পাতার রং ঘন হল, গোলাপ গাছে ফুল ফুটল...আরো কত কি! তাই হুট করেই যেদিন জানলাম উনি জব ছেড়ে চলে যাবেন বেশ অবাক লাগলো আমার,আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম সময় ফুরালেই সবাই চলে যায় বা সবাইকে চলে যেতে হয়...

 

সে মাসের ৩১ তারিখে উনি বিদায় নিলেন,আর আমিও যেন অনুভব এবং আবিস্কার করতে পারলাম, উনি আমার কলিগ না,বড় ভাই না,উনি একজন বন্ধু মানুষ। আর বুঝলাম আমি জানিনা কিভাবে কাউকে বিদায় দিতে হয়। আমি মানতেই পারলাম না আমরা ৫/৬ জন মানুষ যারা গত ১ বছর প্রতিটি দিন এক সাথে কাজ করে গেছি আজ তাদের একজন চলে যাবে। আমার কেমন যেন খারাপ লাগতে থাকে আর চোখ ভিজে আসে, তাও আমি আমার দাঁত বের করা বিখ্যাত হাসিটা দিয়ে বলি-ভাল থাকবেন ভাই,যোগাযোগ রাখবেন।

 

 

বাড়ি ফেরার পথে আমার চোখ দিয়ে ঝরঝর করে পানি চলে আসে। মনে হয় এই কান্নার উৎস কোথায়? ফের মনে হয় মানুষ বড়ই আজীব প্রানী। বাসায় এসে উনাকে একটা মেইল করি। উনার মেইল এর উত্তরে আমি আমার কান্নার কারন খুঁজে পাই।উনি লিখেছিলেন...

একটা গাছ যত পুরনো হতে থাকে তার শেকড় ততই মাটির গভীরে প্রবেশ করতে থাকে। এক সময় হঠাৎ করে একদিন ঐ গাছটা উপড়ে ফেলা খুব কঠিন হয়ে পড়ে। আমার কাছে মানুষকেও অনেকটা গাছের মত বলে মনে হয়। সে দিনের পর দিন যেখানে থাকে সেখানে ক্রমশ তার ডালপালা ছড়িয়ে দিতে থাকে। বিদায় জিনিসটা আমার কাছে বরাবরই অপছন্দের একটি জিনিস। একটি গাছকে শেকড়শুদ্ধ উপড়ে ফেলার মত অনেকটা।“ 

 

 

এরপর থেকে আমি জানি আমিও গাছের মত...আর মায়া নামের একটা বাক্সে আমিও বন্দী। আমাদের চারপাশের সবই তো বাক্স। আমিও এরপর থেকে কাজ শেষ করে  উনার মত টুকটাক লেখালিখি করি, গুগল আর্থ থেকে একদিন কিভাবে কিভাবে যেন আমার গ্রামটা বের করে ফেললাম। যেই গ্রামে আমি কখনো তেমন যাইনি সেই গ্রামকে দেখে আমার অদ্ভুত ভালো লাগলো। নিজেকে গাছ ভাবতে আমার ভীষণ ভালো লাগে। গাছ আমাকে সহিষ্ণু হতে শেখায়। আমি গাছ হয়ে থাকি আর  নিজের শেকড় কতটা গভীরে আছে ভাবি। দিব্যি চলে যাছে জীবন। আরো সামনে এগিয়ে দেখতে চাই এরপর কোন বাক্সটা আমাকে বন্দী করে কোন অনুভূতির বাধঁনে!!!!!

 

পরিশিষ্টঃ

অনেক সময় পেরিয়ে গেছে। পাক্কা একটা বছর। এখনো উনি নতুন বছর আর ঈদ্গুলোতে অফিসের মানুষগুলোর খবর নিতে ভুলেন না। কিছুদিন আগেই ঈদের পরদিন উনার সাথে ফোনে কথা হল। বহুদিন হয়ে গেছে উনি ব্লগিং করার সময় পান না। কুমিল্লা শহরে উনার ব্যবসার কাজ। এটাসেটা নিয়ে নানা কথার মাঝে আমার উনাকে খুব বলতে ইচ্ছে করছিলো... ভাই জানেন আমি আপনাকে নিয়ে একটা লেখা লিখেছি, আপনার কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছি, আপনাকে কোনদিনই বলা হয় নাই আপনি আমার অনেক পছন্দের আর শ্রদ্ধার একজন মানুষ। আমি যদি দু’কলমও লিখি, সেই লেখা যদি কারো ভালো লাগে তাতে আপনার অবদান আছে...”

 

কিন্তু আমি উনাকে কিছুই বলতে পারিনি। গতানুগতিক কিছু কথার মাঝে আমার বিখ্যাত দাঁত বের করা হাসিটা দিয়ে ( যে হাসি ফোনে দেখা যায়না) বললাম- ভাই, একদিন সময় করে দাওয়াত দিয়েন, বন্ধু-বান্ধব নিয়ে হঠাত একদিন কুমিল্লা শহরে চলে আসব। আপনার বাড়িতে বেড়িয়ে যাব...উনি উনার শব্দহীন হাসি দিয়ে বললেন- অবশ্যই...

 

ফোনটা রেখে একটা কথাই তখন মনে হল- Some words are best unsaid....

Share