স্বপ্নকান্না...

লিখেছেন - একুয়া রেজিয়া | লেখাটি 840 বার দেখা হয়েছে

মাত্র ৩ বছরের তুলতুল...এখনো চকলেট খেতে দিলে দু হাতে চকলেট মাখিয়ে ফেলে। আর মাঝে মাঝেই রুমকির লিপিস্টিক নিয়ে দু ঠোঁট লালে লাল করে একাকার করে। জিতু মুগ্ধ হয়ে নিজের সাজগোজ পাগল মেয়েকে দেখছিল আর ভাবছিল সেইদিনই তো তুলতুলের জন্ম হল, সে নিজেই তো তুলতুল কে কোলে তুলে আবেগে বোবা হয়ে গিয়েছিল।এরই মাঝে ৩ টা বছর চলে গেল!মেয়েরা এত্ত তাড়াতাড়ি বড় হয় কেন???রুমকি রুমাল দিয়ে তুলতুলের গাল মুছে দিচ্ছিল, এমন সময়  জিতু একগাল হেসে বলল,

 

-দেখতে দেখতে আমার মেয়েটা এত বড় হয়ে গেল, আর কয়েক বছর পর দেখা যাবে হুট করে একদিন বলবে,বাপি,আমার বয় ফ্রেন্ড হয়েছে। অট্টহাসি দেয় জিতু।

 

-নাহ...তীক্ষ্ণ কাটা কাটা স্বরে বলল রুমকি। আমার মেয়ে প্রেম করবেনা।

 

 

-আরে ক্ষেপসো কেন? মজা করলাম।এখনকার ছেলে মেয়েরা অনেক ফাষ্ট,পিচ্চি পিচ্চি বাচ্চারাও এফেয়ার করে,তাই বললাম।জিতু মনে মনে প্রমাদ গুনে পরিস্থিতিটা ঠান্ডা করতে চেষ্টা করে।

-না তুমি মজা করেও এসব বলবানা। আমি সহ্য করতে পারিনা।

 

মেজাজ খারাপ হয় এবার জিতুর...

-সব কিছুতেই এত্ত ওভার রিয়েক্ট কর কেন?

 

-কারন...কারন...আমি চাইনা আমার মত করে আমার মেয়ে একটা সম্পর্কের জালে আটকে পড়ুক।আমি চাই না ও একা একা কাদুঁক,অনুতপ্ত হোক...ওর স্বপ্নগুলো ভেঙ্গে যাক...আর আর...

জিতু দেখতে পায় রুমকির চোখে পানি জমতে শুরু করেছে...জিতু তাকে কথা শেষ করতে না দিয়েই দ্রুত ঘর থেকে বের হয়ে যায়।এখন কথা বাড়ালেই তুলকালাম কান্ড হবে।

 

২।

রাতে খাবার পরেই জিতু মাঝে মাঝে ছাদে হেঁটে বেড়ায়, সিগেরেটে কয়েক টান মারে, আগামি কালের কাজ কি কি করবে তা মনে মনে গুছিয়ে ফেলে, তারপর ঘরে এসে একটু খেলা বা খবর দেখে।  এমন করেই দিন যায়। কিন্তু  আজ কে কিছুতেই কোন কাজে মনে বসছে না। রুমকি তুলতুল কে খাবার খাওয়াচ্ছে। জিতু হাফ খেয়েই উঠে হাত ধুয়ে ছাদে চলে যায়। রুমকির দুপুরের চিৎকারটা কানে বাজছে...এমনি অনেক শান্ত মেয়ে রুমকি, কিন্তু মাঝে মাঝে এমন করে কেন!

 

 

একটু পর ঘরে এসেই সে রুমকি কে বলে,-আজ দুপুরে তুলতুলের সামনে এভাবে রিয়েক্ট না করলেও পারতে। বাচ্চাদের মানুষিকতা নষ্ট হয়।

 

-আমি কখনোই চাইনা তুলতুল প্রেম করুক, আর করলেও খুব অল্প বয়সে কোন ভুল করুক, করে কষ্ট পাক। চোয়াল শক্ত হয়ে যায় রুমকির।

 

-ফালতু কথা বলবে না ওর বয়স মাত্র ৩ বছর। মেজাজ চড়ে যায় জিতুর।

 

রুমকি কিছু না বলে খাবার টেবিল গুছাতে থাকে। জিতু পাশের ঘরে চলে যেতে নেয়...

-আমার বাবা স্বপ্ন দেখতেন আমি ডাক্তার হব। মৃদু গলায় প্রায় না শুনতে পাওয়া কন্ঠে বলে রুমকি।

জিতু থেমে যায়...। রুমকি আপনমনে বলতেই থাকে...

 

-এস.এস.সি তে অনেক ভাল রেসাল্ট করেছিলাম আমি মনে আছে? তোমার চেয়েও ভাল...এর পরেই কোচিং এ তোমার সাথে পরিচয়। তারপর বন্ধুত্ব। তোমার সাথে অনেক কথা হত, বেষ্ট ফ্রেন্ড ছিলে তুমি আমার। এরপর কি হল হঠাৎ একদিন বললে আমাকে নাকি ভালবাসো। আমি না করে দিলাম। আমি তখন ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখি, সারাদিন পড়ি, প্রেম নিয়ে কোন ভাবনা নেই, বস্তুত প্রেম-ভালোবাসা কাকে বলে তা জানতামই না। সম্পর্ক করার মত কোন ম্যাচিউরিটিও হয়নি আমার। বিয়ে নিয়ে এতটুকুই শুধু ভাবতাম, যাকে বিয়ে করবো তাকেই ভালবাসব... 

 

অথচ তুমি পাগলের মত আমাকে প্রতিদিন বলতেই থাকলে তোমার ভালবাসা গ্রহন করতে। আমি এড়িয়ে চললে কষ্ট পেতে আর বলতে, আচ্ছা আমরা শুধু ফ্রেন্ড হয়েই থাকবো, আমি একটু ঠিক হলেই আবারো আমাকে বকাঝকা করতে তোমাকে বুঝিনা বলে...ছোট্ট একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বলে রুমকি।

 

জিতু চোখের সামনে দেখতে থাকে বাকি কাহিনীটুকু। ও ছাড়া রুমকির  কোন ছেলে বন্ধুও ছিল না। রাগ লাগতো ওর, যে রুমকি কেন বুঝেনা ওর ভালবাসা, ওর আবেগ। প্রতিদিন পড়ার বাহানা করে ওকে ক্লাশের পর আটকে ভালবাসার কথাগুলো বলতো। আর রুমকির ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া মুখ দেখে নিজের পরাজয় দেখতো। রুমকি একটা অজানা জড়তায় আর শঙ্কায় আচ্ছন্ন থাকতো। ওর কখনোই সাহস ছিল না এই কথা কাউকে বলার।

 

 আর জিতু  নিজে মরিয়া ছিল রুমকি কে পাওয়ার জন্যে। রুমকি একদিন বলেছিলো- আমাকে আমার ভাবনা, আমার সংস্কার আর আভ্রু নিয়ে থাকতে দাও। আমি অন্য সবার মত এত খোলামেলা নই। আমি আজ পর্যন্ত আমার মায়ের কাছে কোন কথাই লুকাইনি, আজকাল আমি তোমার ব্যাপারে তাকে বলতে গিয়েও ভয়ে বলতে পারছিনা। আমার জন্যে দিন দিন সারভাইভ করা কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে। রাগে ফেটে পরেছিল তখন জিতু-ভালোবাসার সাথে আভ্রুর কি সম্পর্ক!!!  এরপর একদিন ক্লাশ শেষ করে ও প্রচন্ড রাগে...

 

-আমাকে তুমি ক্লাশের কোনায় জোর করে ধরে চুমু খেয়েছিলে...আমার মধ্যে চিৎকার করার শক্তিও ছিলনা। আমি ভয়ে পেয়েছিলাম, তার চেয়েও বেশি অবাক ছিলাম। হিসহিস করে তুমি বলেছিলে-এই আভ্রু, এই সংস্কার দিয়ে কি হবে?  এসব কি দেখা যায়??? দেখ এক নিমিষেই সব মুছে যায়। আমি বাসায় এসে মার দিকে চোখ তুলে তাকাতে পারিনি। পড়ার মন বসাতে পারিনি। বার বার সাবান দিয়ে নিজের হাত, মুখ ধুচ্ছিলাম...

 

-কিন্তু পরের দিন আমি এসে তোমার কাছে ক্ষমা চেয়েছিলাম...বিড়বিড় করে জিতু।

 

-হ্যা...চেয়েছিলে...আর আমি ক্ষমাও করেছিলাম। তুমি ঠিক ছিলে এরপরের কিছুদিন আর তারপর??? আবার আগের মত...আমি মাকে বলতে ভয় পেতাম তোমার কথা। তুমি বারবার ক্ষমা চাইতে, আর বারবার আমাকে জোড় করতে। একদিন আমি না পেরেই বলেছিলাম-আচ্ছা তোমার কথা রাখলাম, মেনে নিলাম সব। আর তুমি পরদিন থেকেই আমাকে জোড় করে কোচিং ফাঁকি দিয়ে বেড়াতে নিয়ে গেলে...

 

সম্পর্ক হবার পর তুমি অনেক  খুশি হয়ে গেলে। আর  আমি বদলে যেতে থাকলাম। ক্লাশে মন বসতো না। সারাদিন ল্যান্ডফোনে ফোন করতে। নিজেকে আয়নায় চিনতে পারতাম না আমি। কিভাবে কিভাবে যেন মিথ্যে বলা শিখে গেলাম, আর মা,বাবার চোখের দিকে তাকাতেও পারতাম না। তুমি আমাকে ছুঁয়ে ফেলেছো বলে ভাবলাম সব মেনে নেই, সম্পর্ক জড়িয়ে যাচ্ছি তাও বুঝতে পারছিলাম। একঅদ্ভুত অপরিণত সম্পর্ক! প্রতিদিন খবরের কাগজে একেকটা মেয়ের জীবনের দুর্বিষহ অবস্থা পড়ে গায়ে কাঁটা দিত, সেই ভয়ে আরও সঙ্কুচিত হয়ে যেতাম। আমি দুর্বল ছিলাম, ভীতু ছিলাম। নিজের স্বপ্নের কথা, ইচ্ছে অনিচ্ছার কথা মাথা তুলে স্বগর্বে বলতে পারিনি কখনো। তাই ধীরে ধীরে ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন থেকে হয়ে গেলাম তোমার প্রেমিকা!!!

 

কয়েক মুহূর্তের মাঝে জিতু ১১/১২ বছর আগের সেই দিনে চলে যায়। রুমকি একদিন কাঁপা কাঁপা গলায় বলেছিল,-তুমি যে আমার সাথে প্রেম করছো...আমাকে বিয়ে করবে তো!

 

সেদিন জিতু বিরক্ত হয়েছিল, মেয়েরা সব কিছুতেই এত্ত সিকিউরিটি আর কমিটমেন্ট চায় কেন?

 

৩।

 

জিতু ভাবতে থাকে, সময় মানুষ কে কত্ত বদলে দেয়। এরপর এইচ.এস.সি এর রেসাল্ট বের হয়। ভয়ঙ্কর খারাপ রেসাল্ট করে রুমকি। ওর বাবা মার সাথে সম্পর্ক খারাপ হতে থাকে।ভালো কোথাও চান্স না পেয়ে একটা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি থেকে কোনভাবে গ্র্যাডটা শেষ করে ও। আর জিতুর ভাগ্যক্রমে মোটামুটি ভালই রেসাল্ট থাকায়, আর চটপটে থাকায় বি.বি.এ করেই চাকরি পেয়ে যায়। এরপর এম.বি.এ করে ফেলে। এর মাঝে একটা অন্য মেয়েকে বেশ ভাল লাগে ওর, তখন রুমকির সাথে সম্পর্ক খুব খারাপ চলছিল,  ওই মেয়েটাও পরে বিদেশ ফেরত ছেলে পেয়ে বিয়ে করে ফেলে। সেই ভালোলাগার ওইখানেই ইতি। এরপর রুমকির সাথে ওর বিয়ে হয়ে যায়। রুমকি বাসায় কেউ রাজি থাকেনা। তাও বেশ ভালই থাকে ওরা বিয়ের পর। ছোট্ট গুছানো সংসার তাদের। কিন্তু...প্রতিবার আগের কথা উঠলে...রুমকি কেমন যেন বদলে যায়। যেন ১৬/১৭ বছরের রুমকি যা পারেনি ও তাই এখন পারতে চায়।

 

রুমকি তুলতুল কে ঘুম পাড়াচ্ছে, জিতু দরজার আড়ালে গিয়ে দাড়ায়, রুমকি একা একা কথা বলছে,

 

-মাম্মা, তোকে কেউ কষ্ট দিতে পারবেনা, তুই তাই হবি যা তুই জীবনে হতে চাস, তাকেই ভালবাসবি যাকে তুই ভালোবাসতে চাস, কিন্তু ভুল করে বা ভুল সময়ে না। কারো জোড় জবরদস্তিতে না...কোন কান্না না, কোন পাপবোধ না...কোন কষ্ট থেকে মেনে নেওয়া সম্পর্কের বোঝা যেন তোকে বইতে না হয়। আমি তোর বেষ্ট ফ্রেন্ড হব...যা আমার মা হতে পারেনি...কিংবা হয়ত আমি তাকে ভাবতে পারিনি। কিন্তু তোর বেলায় এমনটা হতে দিবোনা। তুইতো আমার আরেকটা মা...আমার কষ্ট হলে আমি তোর কাছেই মুখ লুকাবো...

 

জিতু ভাবতে থাকে কেন সে তখন এমন করেছিল? রুমকি তো এমন জীবন চায়নি, ওর স্বপ্নগুলো সে মৃত করে ফেলেছে তা কেন বুঝেনি তখন? তারও বয়স কম ছিল কিন্তু তাই বলে কেউ তাকে তো অধিকার দেয়নি অন্য কারো স্বপ্ন নষ্ট করার...তুলতুলের সাথে কেউ এমন করার চেষ্টা করলে নির্ঘাত জিতু তাকে খুন করে ফেলবে...এখনকার ছেলেরা যা বদমাশ হয়...হাতের মুঠি শক্ত হয়ে যায় ওর...

 

জিতু আবার থেমে যায়। রুমকি সাথে ওর ব্যাপারটা তখন রুমকির বাসায় জানলে নিশ্চয় ওর বাবাও এমনই ভাবতো। জিতু আর ভাবতে পারেনা। সে প্রানপণে মন কে বুঝাতে থাকে সে তুলতুল আর রুমকি কে অনেক ভালবাসবে। অনেক সুখি রাখবে। কিন্তু বারবার ১৬/১৭ বছরের রুমকি এসে ওর সামনে দাঁড়িয়ে বলে—

“আমার আর ডাক্তার হওয়া হল না...তুমি যে আমার সাথে প্রেম করছো...আমাকে বিয়ে করবে তো”!!!

 

জিতু ছটফট করতে করতে সেই রুমকি কে এখন অনেক কিছুই বলতে চায়-কিন্তু বলতে পারে না...জিতু যেন তুলতুলের মাঝেই সেই ছোট্টবেলার রুমকিকে দেখতে পায়। অনেক অনেক প্রশ্ন আর ব্যথা নিয়ে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। বড় বড় চোখে একটু একটু করে গভীর জল জমছে। কোথাও যেন এমন করে ও হাজারো রুমকির চাপা আর্তনাদ শুনতে পায়...........

 

 

*** ( স্বপ্নকান্না তারাই কাঁদে যাদের স্বপ্ন ভেঙ্গে গেছে। এই কান্নার হয়ত কোন পরিসমাপ্তি নেই। তাই তাদের জন্যে ছোট্ট একটি Quote-- “Nobody can go back and start a new beginning, but anyone can start today and make a new ending.”)

Share