বিজয়ের চেতনা ও পথকলি...

লিখেছেন - একুয়া রেজিয়া | লেখাটি 637 বার দেখা হয়েছে

ডিসেম্বর মাসটা অয়নের খুব প্রিয়। এই মাসে ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হয়ে যায়, অনেক লম্বা ছুটি থাকে, নানুর বাসায় ঘুরতে যাওয়া যায়, সব কাজিনরা তাদের বাসায়  বেড়াতে আসে। সব মিলিয়ে সারা মাস পার্টি পার্টি মুডে থাকে। কিন্তু এই বছর এমন কিছুই হচ্ছে না। কারণ ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হয়ে গেলেও অয়নকে বেশ কিছু স্কুলে এডমিশন টেস্ট দিতে হবে। আরও ভালো একটা স্কুলে চান্স পেতে হবে। আম্মু দিনরাত তাকে পড়ার টেবিলে বসিয়ে রাখছে, অয়নের আর ভালো লাগে না। ক্যালেন্ডারের পাতায় সে মার্কার দিয়ে দাগ দিয়ে রেখেছে কবে তার মডেল টেস্ট আর এডমিশন টেস্ট আছে। একেকটা দিন শেষ হয় আর ছোট্ট অয়ন অস্থির হয়ে উঠে কবে সে ছুটি পাবে? কবে বেড়াতে যাবে?

 

শুক্রবার বিকেল ৫ টা। অয়নের বাবা মিঃ হাসান ল্যাপটপে বসে বসে কাজ করছেন আর অয়নের সাথে গল্প করছেন। এমন সময় দরজায় ঠক ঠক শব্দ হল। ডোরবেল বাজলে কিংবা দরজায় শব্দ হলেই অয়ন ছুটে দরজা খুলতে চলে যায়। অয়নের অনেক প্রিয় একটা কাজ এইটা। চারতলার  নাজনীন আন্টির মেয়ে ফারহা তাই তাকে সব সময় দারোয়ান বলে ক্ষ্যাপায়, কিন্তু তবুও অয়নের উৎসাহে কোন ভাটা পড়েনা। দরজা খুলে অয়ন রীতিমত একটা ছোটখাট ধাক্কা খেলো, অসম্ভব ময়লা একটা গেঞ্জি আর হাফ প্যান্ট পড়ে তার বয়সি একটা ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। দুই পা খালি, হাতের কনুইয়ে ছড়ে যাওয়ার দাগ, মাথার চুলগুলো ধূলোয় ধূসর। অয়ন একটু ঢোক গিলে বলল-তুমি কে?

 

-আমি আকমল। এইডা এই বাড়ির ৩ তালা না?

 

অয়ন কিছু বলার আগেই পেছন থেকে মিঃ হাসানের কথা ভেসে আসে।– অয়ন বাবাই, ওকে ভিতরে নিয়ে এসো আর আম্মুকে একটু ডেকে দাও।

 

অয়ন আম্মুকে ডাকতে ভিতরে চলে যায় আর ভাবতে থাকে এই ছেলেটা নিশ্চয়ই তাদের বাসায় থাকতে আর কাজ করতে এসেছে? অয়ন মনে মনে খুশি হয়, এই ছেলেটা তাদের সাথে থাকলে কাজ শেষ করে হয়ত অয়নের সাথে খেলা করবে। এতদিনে সে নতুন একটা খেলার সঙ্গী পাবে...

 

মিসেস হাসান আকমলকে দেখেই নাক কুঁচকালেন-এইটা কে? বলেই মিঃ হাসানের দিকে প্রশ্ন নিয়ে তাকালেন।

 

মিঃ হাসান এক গাল হেসে বললেন- ছেলেটার নাম আকমল, গত পরশু বিকেলে আমার গাড়িটা সামনের ভাঙ্গা রাস্তার খাঁদে পড়ে গিয়েছিল। তারপর এই ছেলেটা আরও কিছু ছেলেপিলে মিলে আমাকে গাড়িটা তুলতে সাহায্য করেছে। বকশিশ দিতে চেয়েছিলাম তাও নেয়নি। তাই বাসায় আসতে বলেছি। অয়নের পুরোনো শীতের কাপড় আর অন্যান্য পুরোনো কাপড়গুলো দিয়ে দাও।

মিসেস হাসান দ্রুত ঘরের ভিতর চলে গেলেন। অয়নের আশা ভঙ্গ হল। ধুর,এই ছেলেটা তো তাদের সাথে থাকবে না। তার আর খেলার সঙ্গী পাওয়া হল না। অয়ন একটু দুঃখ দুঃখ ভাব নিয়ে প্রশ্ন করলো-

 

-তুমি কোথায় থাক?

- যেইখানে রাইত সেইখানেই তো আমি কাইত, এমনে  মাঝে  মইধ্যে মসজিদে থাকি। পরিস্কার জাইগা। আকমল একটু ভাবলেশহীন ভাবে উত্তর দেয়।

-খাও কোথায়?

- খাওনের তো কোনই ঠিক ঠিকানা নাই।

-ও...অয়ন আর কথা খুঁজে পায়না। একটু পর পর শুধু আকমলকে ঘুরে ঘুরে দেখতে থাকে।

 

এমন সময় হঠাৎ মিঃ হাসান ল্যাপটপে কিছু একটা দেখে বেশ উত্তেজিত হয়ে  উঠে দাঁড়ালেন আর বললেন-তোরা একসাথে কতগুলো ছেলেপিলে থাকিস?

-পাঁচসাত জন তো হইবই...

-১৬ ডিসেম্বর যে আমাদের দেশের বিজয় দিবস জানিস?

-হ, জানি। অনেক অনেক পতাকা থাকে ওই দিনে। ওই দিন পতাকার বিক্রি সবচাইতে বেশি হয়।

-আর কিছু জানিস না? তোর মত কত ছেলের, কত মানুষের ত্যাগের বিনিময়ে বিজয় এসেছে জানিস না?

আকমল মিঃ হাসানের কথার অর্থ খুঁজে না পেয়ে  তাকিয়ে থাকে। কি উত্তর দিবে তা বুঝে উঠতে পারে না...

 

এমন সময় মিসেস হাসান বেশ কিছু পুরোনো কাপড় একটা বড় ব্যাগে প্যাক করে আকমলের হাতে তুলে দেন। মিঃ হাসান এগিয়ে এসে আকমলের মাথায় হাত রেখে বলেন- ১৬ই ডিসেম্বর দুপুর ৩টায় তোর বন্ধু বান্ধব কে নিয়ে আমার বাসার নিচে চলে আসবি। তোদের কে নিয়া বড় পর্দায় সিনেমা দেখতে যাব। সেইখানে তোর মত অনেক অনেক ছেলেপিলে থাকবে। কি? আসতে পারবি না??  এতক্ষণে আকমলের চোখ চকমক করে উঠে। সে ঘার নেড়ে বলে- আইচ্ছা।

 

সিড়ি দিয়ে নামতে নামতে আকমল ভাবতে থাকে, এই সাহেব মানুষটাকে তার অনেক ভাল্লাগসে। এই মানুষটা আর সবার মত না, কথা দিয়া কথা রাখে। লাল সবুজ পতাকার দিনে সে অবশ্যই জামাল, টিপু, সোলায়মান, জসিম কে এই বাসায় চলে আসবে। তারপর সবাই সিনেমা দেখতে যাবে... আকমল জীবনেও বড় পর্দায় সিনেমা দেখে নাই। আকমলের বুক ঢিপ ঢিপ করতে থাকে। এই মাসের ১৬ তারিখ আইতে আর কতদিন!!!

 

২.

 

আকমল চলে যেতেই মিসেস হাসান বলে উঠেন- ১৬ ডিসেম্বরে সিনেমা দেখতে যাবে মানে? আর এই ছেলেকেই বা কেন নিয়ে যাবে?

 

মিঃ হাসান ল্যাপটপটা ঘুরিয়ে দিয়ে বললেন- এই দেখো, “ভালবাসার গল্প" নামের ফেইসবুকের একটি   জনপ্রিয় ফ্যানপেইজ, আসছে ১৬ ডিসেম্বরে  ঢাকা শহরে এখানে সেখানে ছড়িয়ে থাকা পথশিশুদের কে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা দেখার আয়োজন করেছে। জীবনকে চালিয়ে নেয়াই তো পথশিশুদের জন্য কঠিন, তাই বিনোদনের চিন্তা করাটাও বিলাসিতা। এই একটি দিনে এইসব পথশিশু, কচিমুখগুলোর কাছে নির্মল কিছু আনন্দের অনুভূতি পৌছে দেওয়ার শপথ নিয়েছে একঝাঁক তরুণ তরুণী। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নির্মিত "আমার বন্ধু রাশেদ" নামের চলচ্চিত্রটি এই বাচ্চাগুলোকে দেখানো হবে। একটা বেলা খাবারের আয়োজনও করা হয়েছে পথশিশুদের জন্যে। এছাড়াও আরো অনেক কিছুই হবে সেদিন। আমি মাত্রই এই ইভেন্টটা দেখলাম। ভাবলাম অয়নকে নিয়ে আকমলদেরকে নিয়ে চলে যাব। নতুন প্রজন্মের জন্যে এই ধরনের উদ্যোগ আর পদক্ষেপগুলোর দরকার আছে। আর আমরা যদি সহযোগিতার হাত বাড়াই তাহলে আর কি লাগে বলো?

 

-কিন্তু ১৭ তারিখে তো অয়নের এডমিশন টেস্ট! ও পড়বে কখন? আজকাল স্কুলগুলোতে যা প্রতিযোগিতা...

 

মিঃ হাসান কথা শেষ না করতে দিয়ে বললেন-১৬ তারিখের বিকেলে অনেক অনেক পথশিশুদের সাথে মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা দেখে,  মুক্তিযোদ্ধাদের মুখ থেকে যুদ্ধের গল্প শুনে, ছবি দেখে  আমার ছেলে যে বোধ অর্জন করবে তা ওকে জীবনের হাজার হাজার টেস্টে সফল হওয়ার সাহস যোগাবে। আমার ছেলেকে আমি একজন যোদ্ধা হিসেবে দেখতে চাই, এসময়ের ছেলেমেয়েগুলোকে আমি স্বপ্নভুক হিসেবে দেখতে চাই, আকমলদের মধ্যেও আমি বোধের প্রাবল্য দেখতে চাই। একটা আকমল যদি দেশপ্রেম উপলব্ধি করতে পারে তবে তা সে দশটা আকমলের মাঝে ছড়িয়ে দিতে পারবে। এইসব শিশুরা দেশকে যত জানবে, ইতিহাস যত জানবে তাদের মধ্যে ততই দেশপ্রেম জেগে উঠবে।

 

-কিন্তু পথশিশুদের তো তিন বেলা খাবার যোগাতেই দিন যায় ওদের এই বাস্তবতা আর সংগ্রামের মাঝে তুমি বা তোমরা কতটুকুই বা দেশপ্রেমের বোধ দিতে পারবে?  

 

-আমাদের সমস্যাটা কি জানো? আমরা আজকাল সব কিছুতেই বড্ড বেশি হিসেব কষি। ভালোবাসা কখনোই হিসেব কষে হয়না। ১৯৭১ সালে লাখ লাখ মানুষ যখন দেশের জন্যে যুদ্ধ করেছিল তাঁরাও অভাবী ছিলো, সংগ্রাম করতো আর দেশের জন্যে ভালোবাসা থেকেই তাঁরা আকুন্ঠ চিত্তে এগিয়ে এসেছিল। সেই ইতিহাস ও স্মৃতিকে সামনে রেখেই আমাদের উচিৎ সকল শিশুদের মাঝে আমাদের দেশের ইতিকথা, মুক্তিযুদ্ধের কথা তুলে ধরা। আমরা কেন হিসেব কষে ওদের কে কিছু শেখাবো? ওদের কে ছেড়ে দাও, ওরাই জানুক ওরা কি অনুভব করতে চায়...ওদেরকেই বেছে নিতে দাও ওদের অনুভূতি...

 

মিসেস হাসান চুপ করে থাকেন।

 

মিঃ হাসান অয়নের দিকে হাত বাড়িয়ে দেন-কিরে বেটা যাবি না আমার সাথে?

অয়ন খুশিতে আত্নহারা হয়ে খপ করে বাবার হাত ধরে বলল-যাবোওওওওওও...... তারপরের দুই হাত প্লেনের মত দু দিকে ছড়িয়ে দিয়ে সে চিৎকার করে সারা ঘরে ঘুরে বেড়াতে থাকে...

 

৩.

 

১৬ ডিসেম্বর। মহান বিজয় দিবস।

খুব সকালে ঘুম ভেঙ্গে গেছে অয়নের। গতকাল রাতে সে  ফারহার কাছ থেকে ছোট্ট দুইটা লাল সবুজ পতাকা গিফট পেয়েছে। একটা সে নিজে রাখবে আরেকটা সে আকমলকে দিয়ে দিবে। অয়ন ছটফট করছে, কখন সে বাবা আর আকমলদের সাথে সিনেমা দেখতে যাবে? অয়নের আর তর সইছে না.. আব্বু তাকে আমার বন্ধু রাশেদের উইকি পড়তে দিয়েছে, এরপর থেকে অয়ন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে রাশেদের সাথে দেখা করার জন্যে...কখন বিকেল ৪টা বাজবে? কখন?

 

 

 

জামাল, টিপু, সোলায়মান, জসিম আর আকমল কাগজের অনেকগুলো লাল সবুজ পতাকা সংগ্রহ করেছে। এই পতাকাগুলো দিয়ে তারা মালা গাঁথবে আর বিকেলে সিনেমা দেখতে যাওয়ার সময় মাথায় পতাকার মালা পড়ে নিবে। আকমলের খুব খুশি খুশি লাগছে...মসজিদের ইমাম চাচা, সামনের মুদি দোকানের রাজিব ভাইসহ অনেকেই জানে আজকে তারা মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা দেখতে যাবে। আজকে তাদের ঈদ...আকমল জামালদের সাথে পতাকা জমাচ্ছে আর মাঝে মাঝেই মুদি দোকানে গিয়ে জিজ্ঞেশ করছে-ভাই কয়টা বাজে? ৪টা বাজবো কতক্ষনে???   

 

 

(“আমার বন্ধু রাশেদ” এই উপন্যাসটি  শৈশব জীবন থেকেই আমাকে অনেক কাঁদিয়েছে,ভাবিয়েছে। এত বছর পর মুভিটি দেখেও চোখ ভিজে এসেছে। আপনারাও হয়ত এই বইটি পড়ে, মুভিটি দেখে আবেগপ্রবণ হয়েছেন। শিশুদের শুদ্ধ আবেগের চেয়ে অসম্ভব সুন্দর কিছু আর কি বা হতে পারে???  ১৬ ডিসেম্বর, মহান বিজয় দিবসে বিকেল ৪টায়  “ ভালোবাসায় '৭১” ইভেন্টে চলে আসুন। অনেক অনেক আকমলরা থাকবে, অয়নরা থাকবে আর থাকবো আমরা...

 “ভালবাসার গল্প” পরিবারের সবাই অধীর আগ্রহে আপনারদের জন্যে অপেক্ষা করছে। আপনারা আসছেন তো?) 

 

Share