জল টলমল

লিখেছেন - একুয়া রেজিয়া | লেখাটি 784 বার দেখা হয়েছে

 বছরখানেক আগে ১৬ই ডিসেম্বর বা ২৬শে মার্চ উপলক্ষে খুব সম্ভবত বাংলা লিংকের কিংবা গ্রামীন ফোনের একটা বিজ্ঞাপন প্রচারিত হত। মধ্যবয়স্কা এক মহিলা ১৯৭১ সালে তার হারিয়ে যাওয়া ছোট্ট ভাইয়ের কথা বলছেন। যেই ভাইকে ছোটবেলায় তিনি সব সময় হিংসা করতেন সেই ছোট্ট ভাইটিকে একাত্তরের যুদ্ধে হারিয়ে মহিলাটি আজও সব ছেলেদের মাঝে তার ভাইকে খুঁজে বেড়ান, আর ভাবেন তার ভাইটি কত বড় হত? তার কি গোঁফ থাকতো? চৌচল্লিশ, পয়তাল্লিশ বছরের সেই ভাইটি বেঁচে থাকলে কি চোখে চশমা পড়তো? অসাধারণ সেই বিজ্ঞাপনটি দেখে পৃথিবীর যে কোন আবেগপ্রবণ মানুষের চোখে পানি চলে আসবে। আমি আমার বড় বোনকে দেখতাম সে প্রতিদিন টিভির সামনে বসে বাংলা চ্যানেলগুলোতে খুঁজে খুঁজে সেই বিজ্ঞাপনটা দেখছে। যতবার দেখছে ততবার চোখ মুছছে। হয়ত বা একটা নাটকে কোন বিরহের দৃশ্য দেখাচ্ছে আমরা সবাই মন দিয়ে নাটক দেখছি পাশ থেকে শুনতে পাব কেউ একজন ফোঁস ফোঁস করে নাক টানছে, বলা বাহুল্য পাশে তাকিয়ে দেখা যাবে আমার বড় বোনের চোখ থেকে ঝর ঝর করে পানি পড়ছে আর সে একটু পর পর নাক টানছে। কিছু কিছু মানুষের মাঝে বিশুদ্ধ আবেগ থেকে যায়। তাদের চারপাশের সবকিছু বদলায়, সময় বদলায় কিন্তু তাদের আবেগ একই থাকে। আমার বড়বোন এমনই একজন মানুষ।

 

 

আমি সহজে কাঁদি না। কান্নার প্রবনতা আমার মাঝে বরাবরই অনেক কম। আমি আবেগ জমিয়ে রাখা আবেগপ্রবণ মানুষ। আবেগকে আমি বাক্সবন্দি করে উচ্ছ্বাসকে আমি সব সময়ই মুক্ত করে দেই। আমার অবসরের একান্ত সময়গুলো কাটে নিজের সাথে অথবা কম্পিউটারে, ডায়েরীর পাতায়, প্রিয় গানের লিস্টে, গল্পের বই কিংবা ফাইনান্সিয়াল রিপোর্টিং এর হিসাবের খাতায়। আজ রাতেও রোজকার মত খাবারের পর নিজের ঘরে এসে বই নাড়াচাড়া করছিলাম আর দেখছিলাম আমার লাল টেবিল ল্যাম্পের উপর ধুলোর আস্তরণ পড়েছে, গোলাপি-সবুজ গ্লাস পেইন্টার রঙটা কেমন বিবর্ন গিয়েছে। আনমনা হচ্ছিলাম আবার হচ্ছিলামও না......

 

আমাদের বাসার ড্রয়িং রুমে বিশাল বড় এক বইয়ের আলমিরা আছে। মাঝে মাঝেই নানান রকম বই ঘেঁটে দেখি আমি। প্রায় সব বই আমার পড়া তবুও পুরনো বইগুলো ঘাঁটতে খুব আপন লাগে। আজও রাত বারটা নাগাদ কি সব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে বইয়ের আলমিরার সামনে যেতেই দেখি বড় আপু এত রাতে বেশ মনোযোগ দিয়ে টিভি দেখছে। কিছুটা কৌতূহলী হয়ে পাশে গিয়ে বসলাম। সে নিউজ দেখেছে। এই কথা সেই কথা থেকে নানা বিষয়ে কথা শুরু হয়ে গেলো আমাদের। আমার ছেলেবেলার কথা, আপুর ছেলেবেলার কথা, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কষ্ট, আমাদের পরিবারের বড় বড় বিপদগুলো কিংবা ভয়ংকর দুঃসময়ে পাশে থাকা অসম্ভব ভালো, বোকা মানুষগুলোর কথা আমরা দুজনে মিলে মনে করছিলাম। কথার ফাঁকে ফাঁকে আপু টিভির চ্যানেল বদলাচ্ছিলো। এক সময় দেখলাম একটা চ্যানেলে একটা মুভির গান হচ্ছে। সেই স্কুলে পড়ার সময় ছবিটা দেখেছিলাম। মদন মোহনের সুরে করা লতা মঙ্গেশকরের গানের জন্যে মুভিটা চলতে থাকলো। আর আমরা দু বোন গল্পের মাঝে নিজেদের অজান্তেই ছবিটা দেখতে শুরু করলাম।

 

হয়ত আমরা দুজন অনেকদিন পর সময় করে কথা বলতে বসেছিলাম বলে আমাদের মন শান্ত ছিলো। হয়ত আমরা পুরনো সব কথা মনে করে নস্টালজিক হয়ে গিয়েছিলাম কিংবা আমাদের মন ভারাক্রান্ত ছিলো। কারণ এক সময় আমাদের গল্প থেমে গেলো। রাত গভীর হচ্ছে, খাওয়ার ঘরের ছোট্ট টিমটিমে বাতি ছাড়া সব ঘরের বাতি নেভানো। আমার ভাগ্নীগুলো ঘুমুচ্ছে, ভাইয়া ঘুমুচ্ছে শুধু আমি আর আপু টিভি দেখছি। টেলিভিশন নামক চতুষ্কোণ বাক্সটা আমাদের দুজনকে মোহগ্রস্থ করে রেখেছে। আমরা বহু আগে দেখা একটা ছবি দেখে অনেকদিন পর দুজনেই ভীষণ চুপচাপ হয়ে গিয়েছি। যেখানে হাসার কথা দুজনেই হাসছি, যেখানে কাঁদার কথা দুজনেই কাঁদছি। টিভির লাল নীল আলো ছাড়া ঘরে কোন আলো নেই। এর মাঝে আমার পাশ থেকে একটু পর পর ফোঁস ফোঁস করে কান্নার শব্দ আসছে। আমি অবাক হয়ে আবিস্কার করছি আমারও দু চোখ একটু পরে পরে ঝাপসা হয়ে আসছে। আসলে হয়ত আমরা মানুষরা যত বড় হইনা না কেন আমাদের মাঝে একটা ছোট্ট শিশু বাস করে। সেই শিশু সব সময় নিজেকে লুকিয়ে রাখে কোন এক বিশেষ মুহূর্তে নিজেকে প্রকাশ করে। হয়ত বা রাত যত গভীর হয় মানুষ ততই কোমল মনের হয়ে যায়। রাতের কালো অন্ধকারের মতই মানুষের মনে কালো কষ্টগুলো তখন জেগে উঠে। আমার মনে হল সেই ছোট্ট বেলায় যেমন ভাল মন্দ না বুঝেই যে কোন কিছু খুব বিশুদ্ধভাবে অনুভব করে ফেলতাম, কান্না পেলেই কাঁদতাম, খুশি হলেই হাসতাম অনেকদিন পরে আমি তেমন হয়ে আছি। হোক না সেটা একটা হিন্দি সিনেমা হোক না সব অভিনয় তবুও এই সব কিছু ছাপিয়ে বাইশ বছর কোন প্রিয়জনকে না দেখার কষ্ট টিভি ফুঁড়ে আমাদের দুজনের মনের মধ্যে ছড়িয়ে পরেছিল।

 

 

একটা মুহূর্তের জন্যে হলেও আমি অনুভব করে ছিলাম আমার সব কাছের মানুষগুলোকে, চেনা মুখগুলোকে, ভার্চুয়ালি আপন হয়ে যাওয়া অচেনা মানুষগুলোকে আর সব প্রিয়জনকে। কতজনের সাথে বহুদিন দেখা নেই, কতজন বছরের পর বছর ধরে দেশের বাইরে। সবাই কত দূরে। আমি অনুভব করেছিলাম আমি এইসব মানুষগুলোকে ভীষণ ভালোবাসি। পরিবারের কেউ হোক, বন্ধু হোক, শুভাকাঙ্ক্ষী হোক, যেই হোক আমি এই সব মানুষগুলোকে সব সময় দু চোখ ভরে দেখতে চাই। আমার এই উপলব্ধি আমার অনেক আপন। হোক না সেটা হুট করে কোন সিনেমা দেখে অনুভব হওয়া কোন উপলব্ধি, হোক না সেটা কিছু মানুষের অভিনয় দেখে আসা উপলব্ধি। আমার মনে হল-  life is so beautiful when you have your own people around!!  আমার মনে হল দীর্ঘদিনের চাপা কষ্টগুলো কাছের কোন মানুষকে বলতে বলতে ঝর ঝর করে বিরামহীনভাবে কাঁদতে পারার মাঝে অনেক শান্তি আছে। মুভি শেষ হবার পরেও অনেকদিন পর আমার আজ ভীষণ কাঁদতে ইচ্ছে হল। মনে হল এই কান্না আমার মনের কোন দুর্বলতার প্রকাশ না বরং অনেকদিন মেঘ হয়ে জমে থাকা কষ্টগুলো ঝুম বর্ষার বৃষ্টির মত ঝরে গেলেই বুঝি আমার মনের আকাশ ঝকঝকে হয়ে যাবে। আজ অনেকদিন পর এই মধ্যরাতে আমার আমার মন কাঁদলো...সত্যিই কাঁদলো......

 

কাছে আছে দেখিতে না পাও...তুমি কাহার সন্ধানে দূরে যাও?মনের মতো কারে খুঁজে মর?সে কি আছে ভুবনে?সে যে রয়েছে মনে ...

----রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

 

** এই লেখাটা লিখেছিলাম গত ২০শে মার্চ । এইটা কোন গল্প নয়, বলা যায় কিছু ভাবনা বা ছেঁড়া চিন্তা যেগুলো কে একত্রে কিছু শব্দের মাঝে ছড়িয়ে দিয়েছিলাম--- 

 

**মধ্যরাতে সাদামাটা দুটি মানুষকে আবেগপ্রবণ করা মুভিটির নাম “বীর-জারা”

 

Share