অপূর্ণতায় পূর্ণ

লিখেছেন - একুয়া রেজিয়া | লেখাটি 1034 বার দেখা হয়েছে

তানিদের বারান্দাটা বেশ বড়। বারান্দার পাশে বিশাল এক আম গাছ আর অনেক পুরনো একটা ল্যাম্পপোস্ট। প্রতিদিন রাতের বেলা তানি নিজের ঘরের বাতি নিভিয়ে বারান্দায় একা একা দাঁড়িয়ে থাকে। ল্যাম্পপোস্টের আলোয় তানির জামা একেক সময় একেক রঙের ছোপ লাগে, কখনো সবুজ, কখনো হলুদ, কখনো লালচে...পোশাকে রঙ বদলের এই সময়টা তানি খুব উপভোগ করে। আজ একটু আগেই বৃষ্টি হচ্ছিল কিন্তু এখন থেমে গেছে, ভীষণ ঠাণ্ডা বাতাস বইছে তাই কেমন যেন একটু শীত শীত লাগছে। দূরের রাস্তায় সাঁই সাঁই করে বড় বড় বাস আর গাড়ি চলে যাচ্ছে। পাগলাটে বাতাসে তানি তার অবাধ্য চুলগুলো সামলে নিতে নিতে একটু ভেজা মাটির ঘ্রাণ নিতে চেষ্টা করে। অনেকক্ষণ থেকে সেলফোনটা বাজছে কিন্তু তার ফোন ধরতে ইচ্ছে করছে না। তানি কি মনে করে নিজের ঘরে ফিরে আসে। অন্ধকার ঘরে সেলফোনের আলো ছাড়া আর কিছুই নেই। তানি সেলফোন হাতে নিয়ে বসে থাকে। জিসান ফোন করে যাচ্ছে। তানি ফোন ধরবে না।সে এখন কারো সাথেই কথা বলতে চায় না। এইটা তার জীবন, সে নিজের ইচ্ছের মালিক। সে চাইলেই কাউকে অবহেলা করতে পারে, চাইলেই জীবনের দিকে ভ্রুকুটি করে তাকাতে পারে।

 

My heart is like an open highway

Like Frankie said

I did it my way

I just want to live while I'm alive

It's my life

 

গুনগুন করে গান গাইতে থাকে তানি। Bon Joviর এই গানটা কখনোই তার কাছে পুরনো হবে না। এই গানটা যেন তার কথাই বলে। অনেকদিন আগে ‘ছুটির দিনে’তে একটা গল্প পড়েছিল সে, প্রেমিকার রাগ ভাঙ্গাতে এক প্রেমিক এই গানটা গেয়ে ঠিক এই গানের ভিডিওর মত মিরপুর রোডের মাঝ দিয়ে ছুটে যাচ্ছিলো। পথিমধ্যে এক রিকশায় ধাক্কা লেগে তার হাত কেটে যায় তারপরের সে ছুটতে থাকে। সেই অবস্থায় তার প্রেমিকা ছেলেটাকে ছলছল চোখে দেখে বলে - তুমি এত পাগল টাইপের মানুষ কেন? ছেলেটা তখন ছলছল চোখে হাসতে হাসতে বলে,- ভালোবাসা মানেই দুজনেরপাগলামি। সেলফোনটা আবারো বিকট ভাবে বেজে উঠে। তানির চিন্তায় ছেদ পরে। কি সব যাচ্ছেতাই সিনেমাটিক গল্প ভাবছে ও! এই গানের সাথে এখন কেনইবা একটা প্রেমকাহিনী মনে পড়বে! ধ্যাত। নিজের উপর বিরক্ত হয় তানি। জিসান ফোন করে যাচ্ছে। সতেরোটা মিসড কল। তানি মিসড কল লিস্টের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। জিসানের সাথে পরিচয়ের প্রথম দিন আজও মনে আছে তার।

 

***

মাস ছয়েক আগে একদিন ক্লাসে বসে সে খুব মনোযোগ দিয়ে তার ডান হাতে ধরা কলমের ক্যাপ চিবুচ্ছে আনমনে। পাশে বসা আরিফ অনেকক্ষণ থেকেই তানির এই কান্ড দেখে শেষ পর্যন্ত বিরক্ত হয়ে বলল- সমস্যা কি তোর খাস কি? -নাকের ঘি...নির্বিকার ভাবে উত্তর দিলো তানি। আর সেই সাথে তার ক্যাপ চাবানোর ইচ্ছেটা আরও চাগিয়ে উঠলো। আরিফ মহা বিরক্ত হয়ে পকেট থেকে সেলফোন বের করে ব্যস্ত হয়ে গেলো। ক্লাসের সবাই গল্প করছে তাই গুনগুন করে কেমন যেন একটা গুঞ্জনের শব্দ হচ্ছে। এমন সময় হাসান স্যার রুমে ঢুকলেন। সবাই চুপ মেরে গেলো। এই স্যার হল মাথা পাগল স্যার। কখন কাকে কি শাস্তি দেন বা অপমান করে বসেন তার কোনই ঠিক ঠিকানা নেই। ঠিক এমন সময় ক্লাসের দরজায় ধড়াম করে বিকট শব্দ হল, পিলে চমকানো এই শব্দে তানির মুখ থেকে ক্যাপ খসে পড়ে। সবাই ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে দেখে প্রায় ৬ ফুট লম্বা একটা ছেলে ক্লাসের দরজার কাছে থাকা সাইড টেবিল উল্টে ফেলে দিয়েছে। আর হতচকিত হয়ে দাড়িয়ে আছে। হাসান স্যার কটমট করে তাকিয়ে বললেন- ইয়ং ম্যান, কি সমস্যা তোমার?

 

-সরি স্যার আমি খেয়াল করিনি। গমগমে ও বিব্রত গলায় উত্তর দিলো ছেলেটি। তারপর কিছুটা আড়ষ্টটা নিয়েই সবচেয়ে পেছনের এক কোনার খালি বেঞ্চে বসতে চলে গেলো। তানি এতক্ষণ চোখ ছানাবড়া করে এই সব দৃশ্য দেখে ফিসফিস করে আরিফকে বলল- দোস্ত, এই ব্যাটা পালোয়ানটা কে? আরিফ, যেনো ষড়যন্ত্র করছে এমন ভাব ধরে গলা খাদে নামিয়ে বলল;-পোলাটা এরিয়াতে নতুন না। আগে আমাদের সাথে কোর্স পরে নাই তাই খেয়াল করস নাই। গত ক্লাসে যে তুই আসিস নাই সেইদিন থেকেই এই কোর্সে। ব্যাপক ভাব নিয়ে থাকে কিন্তু লাভ নাই যেখানে যায় বেটা দুই চারটা জিনিসপাতি ফালায় দেয়। গতকাল মামুনের টঙয়ের দোকানের ফিল্টারটা ফালায় দিসে। এর আগে নাকি কোন; ফ্যাকাল্টিরে ধাক্কা মেরে ফালায় দিসিলো...পোলা পুরাই একটা চলমান দুর্ঘটনা...

আরিফ হয়ত আরও কিছু বলতো কিন্তু তার বাকি কথা শেষ হবার আগেই হাসান স্যার আরিফের দিকে তার মার্কারের ক্যাপ ছুঁড়ে মারেন তাই তানির আর বাকি কাহিনী জানা হয় না। কাহিনী বুঝতে অবশ্য তাকে খুব বেশি অপেক্ষা করতে হলো না, কারণ; সেইদিন ক্লাস শেষে ছেলেটি তার পা মাড়িয়ে দিলো তারপর বেশ কয়েকজনকে আগে পিছে গোটাকয়েক হালকা পাতলা ধাক্কা মেরে ক্লাস থেকে বেরিয়ে গেলো। ক্লাস শেষ করার পর টঙের দোকানে সেই চলমান দুর্ঘটনাকে দেখা গেলো চুপচাপ একটা বেঞ্চে বসে চা খাচ্ছে। আরিফ সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলল- সবাই শুনে রাখ আগামী দশ মিনিটের মধ্যেই এই ভাঙচুর খান একটা না একটা ঘটনা ঘটাবে। সবাই টাইম কাউন্ট করা শুরু কর; কুইক। মিতু, সোহেল,আরিফ, তানি সেলফোন চেক করে রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করতে থাকলো কখন পাশের টঙের দোকানে একটা ঘটনা ঘটবে। ঠিক পাঁচ মিনিটের মাথায় ছেলেটার হাত থেকে চায়ের কাপটা ফসকে মাটিতে পড়ে ভেঙে গেল।

 

সবাই হো হো করে হেসে উঠেছে...ছেলেটা বেশ বিব্রত হয়ে মাটি থেকে কাপের ভাঙ্গা টুকরো তোলার চেষ্টা করছে। এমন সময় টঙের দোকানের ছোট্ট হাবিব ছুটে এসে ছেলেটির হাত চেপে ধরে বলল- জিসান মামা, আমি তুলতেসি। আপনে বসেন তো... আরেকটা চা দিতেসি...সেদিন তানি নিজের অজান্তেই কান পেতে শুনেছিল, ছেলেটার নাম জিসান......

 

এরপর ক্লাস, লাইব্রেরী, টঙের দোকান থেকে জিসানের সাথে পরিচয় তারপর একটু একটু করে বন্ধুত্ব। এতকিছুর পরেও জিসানের ভাঙচুর স্বভাব থেমে থাকেনি। ক্লাসে কারো ব্যাগ ফেলে দেওয়া কিংবা হাঁটতে গিয়ে তানি বা আরিফদের কারো পা মাড়িয়ে দেওয়া জিসানের নিত্য দিনের কাজ ছিল। জিসানের সম্পর্কটা সহজ হয়ে এসেছিল সবার সাথেই। একটাই সমস্যা ছিলো, জিসান মাঝে মাঝে গায়েব হয়ে যেতো; পাঁচদিন, সাতদিন ক্লাসে আসতো না বা ফোন অফ করে রাখতো। ঘন ঘন একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখে সবাই খুব বিরক্ত হতো, শুধু তানির মনটাই খচখচ করতো; জিসানের সহজাত কথাবার্তার মাঝে কেমন যেন একটা অন্ধকার আর ছায়া ছায়া ভাব। অনেক চেষ্টা করেও সে জানতে পারেনি জিসানের কি সমস্যা। জিসান যেন সব কিছুর পরেও নিজেকে একটা দেয়ালের আড়ালে রাখতেই পছন্দ করে। তবে জিসানের সবচেয়ে বড় গুণ; হল সে খুব ভাল শ্রোতা। তানি কথা বলতে ভালবাসে আর জিসানের মত ভাল শ্রোতা হয় না আর; মাঝে মাঝে ফোনে কথা বলার সময় এমন হয় যে, তানি টানা কথা বলেই যাচ্ছে আর অনেকক্ষণ ধরে জিসানের কোন হু হা শব্দও নেই। তানি হুট করেই তখন কথা থামিয়ে বলবে- হ্যালো, জিসান আছ? শুনছো তো? ওপাশ থেকে জিসান গাঢ় স্বরে নরম ভাবে বলবে- তোমার কথা শুনছি না, রীতিমত গিলছি। তানি এরপর কি উত্তর দিবে তার কোন ভাষা খুঁজে পায় না। এভাবে একটা একটা করে দিন কেটে গেছে আর এক সময় সে আবিষ্কার করেছে এই ইন্ট্রভার্ট ছেলেটার জন্যে তার মনে অদ্ভুত একটা মায়া জন্মে গিয়েছে। সারাদিনের ঘটনা এই ছেলেটাকে না বললে তার হাঁসফাঁস লাগে। তবে জিসানের কিছুদিন পর পর গায়েব হওয়ার এই স্বভাবটা আজকাল তানির আর সহ্য হচ্ছে না। জিসান না থাকার সময়টা তার কাছে অদ্ভুত বিষণ্ণ লাগে। ক্লাসে মন দিতে পারে না। সারাক্ষণ ছটফটে একটা অনুভূতি গ্রাস করে রাখে মনকে। এবারো জিসান আট দিন পর ফিরে এসেছে। তানি ঠিক করেছে তার সাথে কথা বলবে না। ক্যাম্পাসে দেখা হলেও কথা বলবে না। ফোন বেজে যাচ্ছে।

 

তানি ফোন ধরবে না, ধরবে না করেও ফোন ধরে ফেলল।

-হ্যালো

-ভাল আছ তানি?

-আমি কেমন আছি তা জেনে তুমি কি করবে? আবার গায়েব হয়ে যাও আর এবার কাইন্ডলি আর ফিরে এসো না। ঝাঁঝালো কণ্ঠে বলে তানি।

- তোমার মেজাজ খারাপ মনে হচ্ছে। কবিতা শুনবে? হালকা গলায় বলে জিসান। -লিসেন, আমার তোমার সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। ফোনটা রাখ।-কিছুক্ষণ চুপ থেকে জিসান বলে উঠে-

 

Don't know how I lived without

you..Cuz every time that I get around you..

I see the best of me inside your eyes..

You make me smile..

 

- কার কবিতা এইটা? লাইনগুলো শুনে তানির গলার স্বর নরম হয়ে আসে। ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখে আরিফ ফোন করছে আর ওয়েটিং পাচ্ছে।

-কবিতা না, এইটা গান। খুব সুন্দর একটা গান। গানের নাম “You make me smile” এই গানের এই কথাগুলো আমাদের সাথে মিলে যায় তাই বললাম। গত কদিনে প্রচণ্ড জ্বরে ভুগেছিলাম, বাসায় থেকে থেকে তখন অনেক গান শুনছিলাম। নিজের অনেক পুরনো প্লে লিস্ট থেকে এই গানটা পেলাম তাই বললাম।

-ও। লাইনগুলো সুন্দর। শোনো, পরশু ল্যাব ক্লাস আছে মিস দিও না, এমনিতেই হাসান স্যার ক্ষেপে আছেন তোমার উপর। কপট রাগের ভঙ্গী করে বলে তানি।

 

-আর মিস দিবো না। আমি এখন সুস্থ। আরিফ ফোন করে যাচ্ছে। তানির ফোন রাখতে ইচ্ছে করছে না। এখন ফোন রাখলে আবার না জানি কখন কথা হবে জিসানের সাথে। মৃদুস্বরে বলে সে-কাল থেকে আবারো রিকশায় চড়লে সব সময় আমার জন্যে পাশে জায়গা রেখে বসবে। তোমার পাশের জায়গাটা খালি থাকলেও ভেবে নিবে আমি পাশে বসে আছি আর বকবক করছি। ওকে!

-হুমম। আমি এমনিতেও রিকশায় বসলে সব সময় একপাশেই বসি। একটা মজার কথা জানো? আমি তোমার সাথে যত গল্প করেছি আর কারো সাথে এত গল্প করিনি। আমার সাথে কখনো কেউই এত আগ্রহ নিয়ে গল্প করেনি। কেউ এভাবে বলেনি......জিসান তার কথা শেষ না করেই চুপ করে যায় তারপর ভরাট গলায় বলে আরেকটা গানের লিরিক শুনবে? তারপর তানির উত্তরের উপেক্ষা না করেই বলে- গানের নাম ‘অপূর্ণতায় পূর্ণ’-

 

“প্রার্থনা আমার সত্যি হয়ে আসবে বুঝি এই রাতের শেষে

 ক্লান্ত দু চোখ রেখেছি মেলে জাগাবে আলো এসে

তোমার বিষণ্ণ দু চোখ আমার পরাজয়ের কথা বলে...

তবুও কেন আমার দেহে তোমার গন্ধ......”

 

ফোনের ওপাশ থেকে ভারি কণ্ঠে আবৃত্তির মত করে জিসান গানের লিরিক বলে যাচ্ছে। তানির মন বৃষ্টি শেষের ঝকঝকে আকাশের মত একটু একটু করে ভাল হয়ে যাচ্ছে। আরিফ যে ফোন করে যাচ্ছে তানি ভুলে গেছে।

 

***

টুন টাং করে চায়ের কাপ আর চামচের শব্দ হচ্ছে রহমত চাচার টঙের দোকানে। একটা বেঞ্চিতে মিতু,আরিফ, আর তানি বসে আছে। একটা হকার এসে ঘুরঘুর করছে ওদের পাশে। বেশ কিছু বস্তির ছেলে মেয়ে খেলা করছে একটু দূরে...রাস্তায় মানুষের ব্যস্ততা...দুপুরবেলার তপ্ত রোদে ঘাম ঝরছে সবার...আরিফের সিগারেটের ধোঁয়ায় বৃত্ত ভাসছে বাতাসে। সোহেল বাসা থেকে পালাইসে জানিস? তানির দিকে হঠাৎ করেই প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয় আরিফ।

 

- কেন? কবে? বিস্মিত হয়ে বলে তানি। পালিয়েছে বললে ভুল হবে বাসায় রাগারাগি করে বাসা থেকে চলে গেছে সোহেল। মিতু শান্ত গলায় বলে উঠে।

– -এতকিছু কবে হয়ে গেলো? সোহেলের তো এমন করার কথা না!

-তুই আর জানবি ক্যামনে? তুই কি আর আগের মত আছস? বিদ্রূপের স্বরে বলল আরিফ। তোকে তো আজকাল পাওয়াই যায় না। সারাক্ষণ ফোন ওয়েটিং। কেউ যেন জাদুটোনা করে ফেলেছে তোরে।

 

-বাজে বকবি না। সোহেলের খবর বের করার চেষ্টা কর যেভাবেই হোক।

-মিতু বলল জিসান নাকি গতকাল থেকে ওর ফেসবুক আবার অন করসে। ওর গায়েবি দুনিয়া থেকে ও আবার ফিরা আসছে নাকি? সূক্ষ্মভাবে তানির মুখে দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে আরিফ। -হুমম। ছোট্ট করে উত্তর দেয় তানি।

-গুড। শালাকে একবার আচ্ছা মত ধোলাই দিতে হবে। হারামি দুই দিন পর পর ঢং করে। -ফালতু কথা বলিস না। ওর জ্বর ছিল তাই গায়েব ছিল।

 

-ও এই দাবী করে নাকি ও! জ্বর থাকলে দিন দুনিয়া থেকে ছুটি নিতে হয় নাকি? ব্যঙ্গ করে বলে আরিফ। তানি কথার উত্তর দেয় না। চুপ করে থাকে। মিতু অবস্থা বেগতিক দেখে কথা ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্যে বলে, আমার একটু লাইব্রেরীতে যাওয়া দরকার। তানি যাবি আমার সাথে? তানি কিছু না বলেই হাতব্যাগটা বেঞ্চের পাশ থেকে তুলে নেয়।

-আজকে ক্লাসের পর আমার সাথে দেখা করিস কথা আছে জরুরী। কথাটা বলেই হাতে ধরা সিগারেটের শেষ অংশটা ছুঁড়ে ফেলে গটগট করে হেঁটে চলে যায় আরিফ।

 

***

তানির আজ মন ভাল। আরিফের সাথে ক্লাসের পরে দেখা করতে ইচ্ছে করছে না তার। আজকের বিকেলটা সুন্দর। এই বিকেলে আরিফের কোন গোলটেবিল বৈঠক টাইপের কথাবার্তা শুনতে ইচ্ছে করছে না। তার চেয়ে বরং জিসানের সাথে দেখা করা যাক। মুক্তমঞ্চে বসে মালাই দেওয়া চা খাওয়া যাক কিংবা জাহাজবাড়ির পাশে চুপচাপ বসে থেকে আকাশের মেঘ দেখা যাক। তানি আরিফের সাথে দেখা না করেই বাসে উঠে পড়লো।

 

জাহাজ বাড়ির লালচে আলোয় ধানমন্ডি লেকের পানি চিকচিক করছে। এই জায়গাটা তানির ভীষণ প্রিয়। সেই স্কুলে পড়ার সময় থেকেই এখানে বিকেলবেলা আম্মুর সাথে এসে বসে থাকতো তানি। এরপর কত বছর হয়ে গিয়েছে অথচ এই জায়গাটার প্রতি আকর্ষণ কমেনি বরং বেড়েছে। জিসান পাশে উদাস হয়ে বসে আছে। তার দৃষ্টি আকাশের দিকে নিবদ্ধ। একটা দুটো করে তারা জ্বলজ্বল করছে আকাশে। জিসানকে দেখে মনে হচ্ছে তারাগুলো যেন ওর ভীষণ পরিচিত। তারাগুলো বুঝি ওকে বহুদিন ধরে জমিয়ে রাখা কথা শোনাচ্ছে।

 

-জানো! একটা সময় ছিল, আমাকে কেউ যদি না বলে চলে যেত, হুট করে ফোনের লাইন কেটে যেত কিংবা কেউ ডুব দিলে আমার রাগ লাগতো। সে যেই হোক না কেন! কিন্তু এখন আমার খুব অদ্ভুত লাগে। মনে হয় বলে কয়ে চলে যাওয়া বা লাইন কেটে বিদায় না নিয়ে সেল ফোনের শেষ টাকা অবশিষ্ট থাকা পর্যন্ত কথা চালিয়ে যেয়ে ঠুস করে লাইন কেটে যাবার পর বিচ্ছিন্ন হওয়ার একটা স্বাদ আছে। কিংবা চ্যাট করার সময় ল্যাপ্পির চার্জ শেষতক চলে যাওয়ার আগ পর্যন্ত কিছুক্ষণ অকারণেই জ্বলজ্বল করে তারপর অফলাইন হবার মজাই আলাদা। কিছুদিন আগে একদিন আমার অনেক রাতে ঘুম ভেঙে গিয়েছিল, তখন তোমার দেওয়া একটা মিউজিক শুনলাম। তুমি বলেছিলে সেই ইন্সট্রুমেন্টাল মিউজিকটা শুনলেই মন খারাপ হবে। আমি বিষণ্ণ সুরটা শুনলাম। আমার মনে হল বিষণ্ণতা হল সংক্রামক ব্যাধির মত। কারণ আমার স্বাভাবিক মন গভীর রাতে সেই অদ্ভুত বিষণ্ণ সুর শুনে নিঃশব্দে কাঁদতে লাগলো। আমার ছোট্ট ঘর জুড়ে শুধু সেই বিষন্ন সুর। সেই সুরে মিশে আছে হাহাকার, শূন্যতা, বেদনা আরও কত কী! মনে হল আমার ভেতর আমি গুমরে গুমরে কাঁদছি। তাপর আমার বাচ্চাদের মত হাউমাউ করে কাঁদতে ইচ্ছে করল। বাচ্চারা হাউমাউ করে কাঁদলে তাদেরকে কেউ না কেউ থামাতে চলে আসে... আমার বেলায় এমন কিছুই হবে না, কেউ আসবে না তাই আমি আর কাঁদলাম না। জমাট বাঁধা একটা কষ্ট নিয়ে চুপচাপ স্তব্ধ হয়ে বসে থাকলাম। সেদিন মনে হয়েছিল- এই সুরগুলো যখন তুমি একা একা শুনো তখন কি কর? কাঁদো নাকি নিজেকে বিষণ্ণ করে শামুকের মত আরও গুটিয়ে যাও?

 

জিসান চুপ করে আছে। তানি একটু থেমে বলল- কি হল? আমার কথা শুনছ? জিসান বিড়বিড় করে বলল- আমি তোমার কথাগুলো মন্ত্রমুগ্ধের শুনছি। তুমি অদ্ভুত সুন্দরভাবে গুছিয়ে কথা বল। আমার শুধু শুনতেই ইচ্ছে করে। উত্তর দিতে ইচ্ছে করে না। তোমার কখনো কান্না-কাটি করতে চাইলে আমাকে ফোন দিও। যখন আমার ফোন অন থাকবে আর কি। মানুষের কান্নার মাঝে অন্যরকম একটা আমেজ আছে। একেক মানুষ একেকভাবে কাঁদে। আর তোমার কান্না সুন্দর হওয়ার একটা সমূহ সম্ভাবনা আছে। আর যখনি খারাপ লাগবে তখনি জীবনে না পাওয়া হতাশা গুলো নিয়ে ভেবো। ভাবতে ভাবতে দেখবে একসময় বিরক্তির মাত্রা ছাড়িয়ে ভালো লাগা শুরু হবে। আমি এইটা করি...জিসান নিঃশব্দে একটা ছোট্ট দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল।

 

তানি হঠাৎ করেই আকাশের তারাগুলোর দিকে তাকিয়ে নিজের কান্নার শব্দ মনে করার চেষ্টা করতে থাকে। সত্যিই কি তার কান্না খুব সুন্দর? মানুষের কান্নার কি আলাদা আমেজ থাকে? ছোট্ট শিশুর কান্না, কোন দুখিনী মায়ের কান্না, নিঃস্ব কোন ভিখারির কান্না, প্রিয়জনের মৃত্যুতে কারো কান্না এই সব কান্নাগুলো কি খুব আলাদা? কান্নার মাঝেও কি কোন নির্মম বা স্নিগ্ধ সৌন্দর্য লুকিয়ে রাখা আছে!

 

***

রাত আটটা নাগাদ বাসায় ফিরে তানি দেখে আরিফ তাদের বাসার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তানি কিছুটা অবাক ও কিছুটা বিরক্ত হয়ে বলে- তুই এখানে?

-তোর না ক্লাস শেষ করে আমার সাথে দেখা করার কথা ছিল? ঠাণ্ডা গলায় বলে আরিফ।

-মনে ছিল না রে। আর একটা কাজ পড়ে গেসিলো তাই চলে আসছিলাম। মনে মনে কথা গুছাতে গুছাতে কৈফিয়ত দেওয়ার মত করে বলে তানি।

-তোর সাথে জরুরী কথা আছে। এখানে বলবো নাকি তোর বাসায় বসে বলবো?

-এখানেই বল। বাসায় আব্বু থাকলে সমস্যা হবে এমনিতেই আজ ফিরতে দেরী হয়ে গিয়েছে।

-তুই জিসানের সাথে আর মিশবি না। তীক্ষ্ণ অথচ শান্ত গলায় বলল আরিফ।

-মানে? তোর কাছ থেকে জানতে হবে নাকি কার সাথে আমি মিশবো? গলার স্বর কঠিন হয়ে যায় তানির।

 

-জিসানের ব্যাপারে কতটুকু জানিস যে ওকে পাওয়ার জন্যে এত মরিয়া হয়ে উঠেছিস? তুই তো এমন ছিলি না তানি? আড্ডাবাজ আর টমবয় টাইপের মেয়ে ছিলি সবসময়। অথচ কত দ্রুত বদলে গেছিস। তুই যে একটা গাধী প্রমাণ করতেসিস নিজেকে।ক্যাম্পাসে অনেকেই তোকে আজকাল সেমি পাগল বলে জানিস? এক নিঃশ্বাসে বলে যায় আরিফ।

-ফালতু কথা বলবি না আরিফ। তানি প্রচণ্ড রেগে যায়।

 

-তানি, তুই সেই কলেজ জীবন থেকে আমার বন্ধু। তোকে, তোর পরিবারকে আমি অনেক আপন করে দেখি। তোর ভাল চাই আমি দোস্ত। জিসান ছেলেটা ভালো না। ওর সাথে মিশিস না। আমি আগে ওর ব্যাপারে কিছু জানতাম না। কিন্তু কিছুদিন আগে জার্মান ভাষা শিখতে গিয়ে, ওদের পাশের বাসার এক মেয়ের সাথে আমার পরিচয় হয়। নাম ফারজানা তাসনীম। তার কাছ থেকে কথা প্রসঙ্গে জিসানের কথা জানতে পারি। ওর মারাত্মক কোন মানসিক সমস্যা আছে। সবাই বলে ও পাগল। যেখানে সেখানে জিনিষ পত্র ফেলে দেওয়া, অস্থির থাকা, নিজেকে গুটিয়ে রাখা, অমিশুক থাকা এই সব কিছুর পেছনে ওর মানসিক সমস্যা দায়ী। দীর্ঘদিন ডাক্তার দেখাইসে কিন্তু সুস্থ হয় নাই। কিছুদিন পর পর ওর অসুস্থতা বেড়ে যায়। তখন ও গায়েব হয়ে যায়। কে জানে হয়ত ও এডিক্টেড। ইয়াবা টিয়াবাও খায় হয়তো। এমন একটা ছেলের প্রেমে পড়ে তুই হাবুডুবু খাচ্ছিস? আমি যত তোকে দেখতেসি, তত তোকে নিয়ে শঙ্কিত হচ্ছি।

 

তানি স্তব্ধ হয়ে থাকিয়ে থাকে আরিফের দিকে। পায়ের নিচের মাটি সরে গেছে যেন ওর। -তানি, দোস্ত আমার। একটু ভেবে দেখ জিসানের ব্যবহারে কি কোন স্বাভাবিকতা আছে? কারো সাথেই ঠিক মত মেশে না। একা থাকতে পছন্দ করে, তার উপর ও যদি তোকে সত্যিই ভালোবাসতো তাহলে কি তোর কাছ থেকে এই কথাগুলো গোপন রাখতো?

 

তানির চোখে পানি জমতে শুরু করেছে। কোনরকমে সে বলল-তুই শিওর মেয়েটা সত্য কথা বলেছে? -হ্যাঁ আমি শিওর কারণ তিনশ দুই ব্যাচের রাকিব জিসানের সাথে একই কলেজে পড়ত। সেও একই কথা বলেছে। তুই জিসানের সাথে যোগাযোগটা অফ করে দে। এই সব ইনফ্যাচুয়েশান। ঠিক হয়ে যাবে। তোর পাশে আমরা সব বন্ধুরা আছি। আর জিসান

যদি তোকে ডিস্টার্ব করতে আসে একবার বলবি, শালাকে সোজা এবার পাগলা গারদে পাঠায় দিবো।

-আরিফ তুই বাসায় যা। ক্লান্ত গলায় বলল তানি। আমার কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। তারপর আরিফকে কথা শেষ করতে না দিয়ে তানি বাসার দিকে এগিয়ে যায়।

 

***

-জিশান, তোমাকে একটা কথা বলি।

-কি ব্যাপার তোমার গলার স্বর এমন হয়ে আছে কেন? মন খারাপ?

- ফারজানা তাসনীম নামে তুমি কাউকে চিনো?

কিছুক্ষণ চুপ থেকে জিসান উত্তর দেয়- চিনি। আমাদের পাশের এপার্টমেন্টে থাকে ও। -আর আমারদের ভার্সিটির তিনশ দুই ব্যাচের রাকিব কি তোমার সাথে একই কলেজে পড়তো?

 

একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে জিসান বলে- হ্যাঁ পড়তো।

-আমাকে কি তোমার কিছু বলার আছে জিসান? তুমি কি বুঝতে পারছ আমি তোমার কাছ

থেকে কি জানতে চাইছি?

-আমি বুঝতে পেরেছি তানি। কিন্তু আমি কি বলবো ঠিক বুঝতে পারছি না। হঠাৎ করেই নিজেকে খুব অবশ লাগছে।

-বুঝতে পারছ না মানে? তীব্র কণ্ঠে বলল তানি। এতকিছু লুকিয়েছ আমার কাছ থেকে? তোমার সাথে এত গল্প, এত যোগাযোগের পরেও আমাকে অন্যর কাছ থেকে শুনতে হবে তোমার জীবনের কথা? এইটাই বাকি ছিল... তানির দু চোখ থেকে ঝরঝর করে পানি পরে যাচ্ছে। ফোনের ওপাশ থেকে জিসানের কাতর স্বর ভেসে আসছে-প্লিজ আমার কথা শোন একটু। আমাকে ব্যাখ্যা করতে দাও প্লিজ... আমাকে একটু সময় নিয়ে কথাগুলো গোছাতে দাও......

 

তানি কাঁদতে কাঁদতে সেলফোনটা সজোরে দেয়ালে ছুঁড়ে মারলো। সশব্দে সেলফোনটা মাটিয়ে পড়ে চৌচির হয়ে গেলো।

 

***

তানি তার ঘর অন্ধকার করে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। আজ তার সবুজ জামা ল্যাম্পপোস্টের আলোয় ফ্যাকাসে হলুদ লাগছে। দূরে সাঁই সাঁই করে বড় বড় বাস আর গাড়ি চলে যাচ্ছে। তানির মন ভারাক্রান্ত। গত তিন দিন থেকে সে ঘর থেকে বের হচ্ছে না। ভয়ংকর এক কষ্টে তার বুক ফেটে যাচ্ছে। বারবার কান্নার দমকে তার শরীর কেঁপে উঠে। বাসার সবার সাথে প্রাণপণে স্বাভাবিক ব্যবহার করার চেষ্টা করছে সে। এই স্বাভাবিকতার অভিনয়টা যেন ওকে আরও কুঁরে কুঁরে খাচ্ছে। ঘরের দরজায় ঠকঠক শব্দ হল। তানি বাতি জ্বালিয়ে দরজা খুলল। বাসার কাজের মেয়েটা বলল- আপা, মিতু আপা একটু আগে বাসায় আইসা এই খামডা দিলো। একটা

খাকি রঙের খাম ধরা মেয়েটার হাতে। তানি হাত বাড়িয়ে খামটা নিয়েই দরজা লাগিয়ে দিলো। খাম থেকে জিসানের লেখা চিঠি বের হয়েছে। তানি চিঠি পড়ছে। চিঠি পড়তে গিয়ে তার হাত কাঁপছে-

 

তানি,

তোমাকে মেইল করতে যেয়েও করলাম না যদি আমার মেইল দেখে তুমি না পড়! তারচেয়ে বরং চিঠিই ভাল, সাদা কাগজে আমার নিজের হাতে লেখা কথাগুলো পড়ে হয়ত তুমি একটু হলেও আমাকে কম খারাপ মনে করবে। আমি সব সময় বলতাম তোমার কান্নার শব্দ ভীষণ সুন্দর হবে। সেদিন আমি প্রথম তোমার কান্না শুনলাম। সত্যিই তোমার কান্নার শব্দ অন্যরকম সুন্দর। কিন্তু সেই কান্নার সুর আমার ভিতর একটা হাহাকারের জন্ম দিয়েছিল। আমি আর সেই সুর শুনতে চাই না। কখনোই না। তুমি ফারজানা বা রাকিবের কাছ থেকে যা জেনেছ তার অনেকটুকুই সত্যি।

 

খুব ছোটবেলা থেকে আমি আর আমার মা, বাবার কাছ থেকে অমানুষিক অত্যাচার পেয়ে আসছি। আমার বাবা মদ্যপ ছিলেন। নেশাগ্রস্ত অবস্থায় তিনি ভয়ংকর খিটখিটে মেজাজি হয়ে উঠতেন আর আমাকে ও মাকে নির্মমভাবে পিটিয়ে পৈচাশিক আনন্দ পেতেন। আমি তিন বছর বয়স থেকে এই ঘটনা দেখে আসছি। প্রথমদিকে আমাকে মারার সময় মা এসে বাবাকে থামানোর চেষ্টা করতেন, ফলাফলস্বরূপ বাবা আমাকে এবং মাকে অত্যাচারের পরিমাণ আরো বাড়িয়ে দিতেন। বাঁধা পেয়ে আরও হিংস্র উঠতেন। এভাবে কয়েক বছর যাবার পর আমার মধ্যে কারণ ছাড়া অস্থির থাকার একটা প্রবণতা দেখা দিলো। বাবা বাসায় না থাকলেও আমি সারাক্ষণ ভয়ে ভয়ে থাকতাম। লুকিয়ে থাকতাম। সব সময় মনে হতো বাবা আমাকে মেরে ফেলার ষড়যন্ত্র করছেন। আমার মা অনেক সাদাসিধে ও দুর্বল মনের মানুষ ছিলেন। তার কাছ থেকে আমি কখনই কোন নির্ভরতা পাইনি। তার সান্ত্বনাগুলো বরং আমাকে আরও বেশি ভীত করে রাখতো। আমার মানসিক অবস্থার এতই অবনতি ঘটল যে আমি ঠিকমত পড়ালেখা বা কোন কাজ করতে পারতাম না। আমার উপর অত্যাচার চলতে থাকলো। আমি প্রতিবার ভাবতাম বাবা আমার মাকে মারতে গেলেই আমি ঠেকাবো বা তার হাত চেপে ধরবো কিংবা আমাকে মারতে এলে আমি পালিয়ে যাব। কিন্তু পারতাম না। কোন এক অদ্ভুত শক্তি এসে যেন আমাকে মাটির সাথে আটকে রাখতো। আমি মার খেতাম। প্রচণ্ড মার খেয়ে অচেতন হয়ে ঘোরের মধ্যে চলে যেতাম। যখন চেতনা আসত তখন আবার অস্থির আর ভীত হয়ে যেতাম। দিনকে দিন আমার মনে হতে লাগলো বাবার মত করে আমাকে যে কেউ মেরে ফেলতে চাইবে। আমি যখন সদ্য কলেজে উঠলাম তখন আমার বাবা লিভার সিরোসিস হয়ে পেটে পানি জমার কারণে অসুস্থ হয়ে মারা গেলেন। তার মৃত্যুটা হল ভয়ংকর। অসুস্থ থাকার সময়ে উনি সবার কথা শুনতে পারতেন কিন্তু বুঝতে পারতেন না, কাউকে চিনতে পারতেন না। সব সময় সবাইকে অকথ্য ভাষায় গালাগালি করতেন। দিন দিন তার অসুস্থতার পরিমানে বাড়তে থাকলো একসময় তার ধূমপান ও মদ্যপান তার মৃত্যুর কারণ হল।

 

বাবার মৃত্যুর পরেও আমার মানুষিক অবস্থার পরিবর্তন হলো না। ডাক্তার দেখালাম ও জানলাম- আমার অসুখ করেছে। সাইকোলজির ভাষায় এই অসুখের নাম “প্যারানয়েড ডিজর্ডার”। এটাকে এক ধরণের ডিলিউশন বলা যায়। ডিলিউশন মানে হচ্ছে কোন ব্যাক্তির কোন কিছুর প্রতি মিথ্যা বিশ্বাস যা যতই যুক্তি দিয়ে বুঝানো হোক না কেন সে যেটা মনে করে সেটাই ঠিক মনে করে। প্যারানয়েড ডিজিজে আক্রান্ত ব্যাক্তি সবসময় একটা দুঃশ্চিন্তার মধ্যে থাকে। একেক জনের এটা একেক কারণে হয়ে থাকে। কেউ তার ব্যবসায় নিয়ে, কেউ পরিবার নিয়ে আবার কেউ নিজেকে নিয়েই। সারাক্ষণ এই দুঃশ্চিন্তায় থাকে যে যেকোন সময়ে যে কেউ তাকে মেরে ফেলতে পারে। সবার কাজ কর্মকে সে ভাবতে থাকে তাকে হত্যা করার জন্যই এমন করা হচ্ছে। এই প্যারানয়াতে আক্রান্ত ব্যাক্তিকে সারাক্ষণ নানারকম anxiety তে ভুগতে হয়। এই রোগের রোগী কারণ ছাড়াই সবসময় মনে করে সবাই তাকে মেরে ফেলার ষড়যন্ত্র করছে। চিকিৎসা করালাম কিন্তু লাভ হলো না। কিছুদিন ভাল থাকি কিছুদিন আবার আগের মত হয়ে যাই। যখন অসুস্থতা বাড়ে তখন নিজেকে সব কিছু থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলি। তোমার ভাষায় বললে বলা যায়- “গায়েব হয়ে যাওয়া”।

তুমি হয়ত ভাবতে পারো কেন তোমাকে এই কথাগুলো আগে বলিনি। বলিনি কারণ- অসম্ভব প্রিয় মানুষের চোখে নিজের জন্যে করুণা দেখতে ইচ্ছে করেনি আমার। তোমার প্রাণবন্ত গল্পগুলোকে আমার সমস্যার কথা বলে প্রাণহীন করতে চাইনি। আমি সারাজীবন একা বড় হওয়া মানুষ। আমি সব সময় অন্ধকার জগতের নিঃসঙ্গ মানুষ। আমাকে এর আগে কেউ তোমার মত করে আপন করে নেয়নি। আমার সারাজীবন কোন বন্ধু হয়নি। তোমার মাঝে আমি বন্ধু, প্রেমিকা ছাড়াও আর অদ্ভুত একটা মমতার রেশ খুঁজে পেয়েছিলাম। যেন তুমি আমার খুব আপনজন। আমি এই প্রাপ্তি হারাতে চাইনি। হয়ত আমি ভুল ছিলাম। স্বার্থপরের মত ভেবে তোমাকে কষ্ট দিয়ে ফেলেছি। মাঝে মাঝে নিজের বোকামির জন্য অবাক লাগে। মনে হয় আসলে অনেক বিষয়ে এখনো অপরিপক্ব আমি। এই জন্যই অনেকে কষ্ট পায়। আমার মাকেও আমার কাছ থেকে অনেক কষ্ট পেতে হয়েছে। এর জন্য আমার কারো কাছাকাছি আসাটাই হয়ত অনেক ভয়ঙ্কর। আমার জীবনের সাদা কাগজের দু এক ফোটা রঙিন কালিও আমার মাঝে আসক্তি ধরায় আবার অন্যদিকে অনেক কিছুর মিস ইন্টারপ্রেটেশন হয়।

 

তোমার মুখোমুখি হওয়ার সাহস আমার নেই। তোমাকে অনেক কষ্ট দিয়ে ফেলেছি। তাই নিজের জমাট বাঁধা অন্ধকারটুকু নিয়ে নিজেই থাকতে চাই। গত ছয়টা মাস আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় ছিল। সেই সময়ের স্মৃতি ধারণ করে আমি সহস্র বছর কাটিয়ে দিতে পারবো। আর ছোট্ট একটা কথা জানিয়ে যাচ্ছি। প্রবল বৃষ্টির মাঝে যখন আবার আগের মত রিকশার হুড ফেলে একা একা ভিজবো তখন পাশের জায়গাটা খালি রাখবো। আমি জানি তুমি এসে আর কখনো বসবে না। কিন্তু আমার ভাবতে ভালো লাগবে যে তুমি আছ......

 

ভাল থেকো...

 

***

গভীর রাতে তানি জিসানের দেওয়া চিঠি জড়িয়ে ধরে ঘুমাচ্ছে। জিসান যেন চিঠির মধ্য দিয়েই কথা বলছে।

-তানি...

-উঁ!!

-রঙ্গন ফুল আমার খুব প্রিয়। আজ রঙ্গন ফুল নেবে আমার কাছ থেকে?

-নিবো...রঙ্গন ফুল নিয়ে তোমার সাথে রিকশা করে অনেক ঘুরবো। আজকে তোমার পাশের জায়গাটা আর খালি থাকবেনা। তানি নিজে থেকে হাত বাড়িয়ে জিসানের হাত স্পর্শ করে।

 

লম্বা এক পথে জিসান আর তানি হাঁটছে। দুপাশে অনেক অনেক কৃষ্ণচূড়া ও

রাধাচূড়া গাছ। খোলা আকাশ আর কালো মেঘ দেখতে দেখতে দুজন অনেকটুকু পথ হেঁটে ফেলেছে। জিসান রঙ্গন ফুল খুঁজছে... লালচে রঙ্গন ফুল......


Share