টোনাটুনির গল্প

লিখেছেন - -তৃপ্ত সুপ্ত- | লেখাটি 2367 বার দেখা হয়েছে

টুনির ভিষন মন খারাপ। আজ তার জন্মদিন। জন্মদিন উপলক্ষে আজ সারাদিন তার মহা ভালো কাটা উচিত ছিলো। কিন্তু সেই আনন্দের কানাকড়িও হয়নি। টুনি ভেবেছিলো, সে আর টোনা বাহিরে খেতে যাবে, কিছুমিছু শপিং করবে, কিন্তু কীসের কী!! টোনা জন্মদিনের কথা একদম ভুলে গেছে। এই অপরাধ কি মাফ করার মতো, আপনারাই বলুন?? তাও যাই হোক, টুনি কিছুক্ষণ কেঁদেকেটে টোনাকে মাফ করে দিয়েছে। তারপর রাঁধতে বসেছে টোনার প্রিয় খাবারগুলো। কিন্তু সেখানেও টোনার গাফেলতি। টুনি বেচারী এত কষ্ট করে, হাত পুড়িয়ে টোনার জন্য রান্না করলো, আর সে কিনা বাহির থেকে খেয়ে এসেছে !! অফিসিয়াল ডিনার পার্টি ছিলো নাকি!! টুনি রাগে দুঃখে হাত পা ছড়িয়ে ভেউ ভেউ করে কান্না শুরু করলো।

 

এইদিকে টুনির কান্না দেখে টোনা পড়ল বিপদে। টুনিকে বললো "বউ প্লিজ, চুপ কর। পাশের ফ্ল্যাটের ওরা ভাববে, আমি বুঝি বউ পেটাচ্ছি।" টুনি জবাব দিল, "বেশ হবে। তুমি জানো আমার রাঁধতে কত কষ্ট হয়েছে? রান্না শিখেছি আমি কখনো? কত কষ্ট করে কুটলাম, রাঁধলাম, আর তুমি কিনা!! যাও, মিশিনা আমি তোমার সাথে..." টোনা যত বোঝায়, টুনি তত জোরে কাঁদে। কি বিপদ বলুন তো দেখি !!!

 

ওহহো, আপনারা জানবেন কি করে? আমি তো এখনো টোনা টুনির পরিচয়ই করিয়ে দেইনি আপনাদের সাথে!! আচ্ছা, খানিক দাঁড়ান। এই বলছি ওদের কথা।

 

একটা ছিলো টোনা আর একটা ছিলো টুনি। টোনা আর টুনি দুজনেই ঢাকা ভার্সিটিতে পরত। একই ডিপার্টমেন্টে, তবে টোনা, টুনির চেয়ে তিন বছরের বড়। টোনা হলো চশমা পড়া পড়ুয়া মানুষ, সারাদিন এই বই থেকে ওই বইয়ে, এ লাইব্রেরী থেকে ওই বইয়ের দোকানে ছুটোছুটি। আর আমাদের টুনি? টুনির হলো একেবারেই টুনটুনি স্বভাব। সারাদিন ডিপার্টমেন্টের বারান্দায় কিচমিচ করে বেড়াতো। বন্ধুদের সাথে আড্ডা, ফুচকা নিয়ে হুড়োহুড়ি তার রোজকার রুটিন।

 

একদিন হলো কি, টোনা যাচ্ছিলো লাইব্রেরীতে। অমনি হঠাৎ দৃশ্যপটে টুনির আগমন। আমাদের টুনি আসবে আর কিচিমিচি হবেনা, তা কি কখনো হয়? টোনা তো আর আগে থেকে তার স্বভাব জানে না, টুনির এই কিচমিচ দেখে সে ধপাশ করে তার প্রেমে পড়ে গেল।

 

কিন্তু প্রেমে পড়লেই তো আর হলো না, টুনিকে সেটা জানাতেও তো হবে, তাইনা? সমস্যা হলো টোনা একদম ভোলাভালা, লক্ষী টাইপ শান্ত ছেলে। সে কি আর জানে, কি করে মেয়েদের "ভালোওওওওবাসি" বলতে হয়? টোনা তো ভাবতে ভাবতে একদম কাহিল!! পড়া হয় না, খেতে ইচ্ছে করে না, সে এক এলাহী কারবার!! কিন্তু এভাবে কি আর চলতে দেয়া যায়, আপনারাই বলুন? অনেক ভেবেচিন্তে, বন্ধু বান্ধবের সাথে শলা পরামর্শ করে, দুআ দরুদ পড়ে সাহস সঞ্চয় করে, টোনা গেলো টুনিকে ভালোবাসি বলতে।

 

যেই না টোনা ভালোবাসি বলেছে, অমনি টুনি হাসতে হাসতে কাঁত। বেচারা তো লজ্জ্বায় লাল হয়ে গেল। মনে মনে ঝেড়ে দৌড় দেয়ার চিন্তা ভাবনা করে ফেলেছিলো আমাদের টোনা। ভাগ্যিস পালায়নি, তাহলে আজ আমি গল্পটা লিখতাম কি করে?

 

যাই হোক, টানা আধ ঘন্টা কাঁচ ভাঙা হাসির পর টুনি জানালো সে রাজি, তবে একটা শর্ত আছেন। শর্তটা কি জানেন? প্রতিবার দেখা হলে তাকে একটা করে গোলাপ দিতে হবে, লাল টুকটুকে গোলাপ। টোনা হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। এইটুকু দাবী তো মানাই যায়!! পরে অবশ্য টুনি স্বীকার করেছে, টোনাকে সে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখতো। সারাদিন বই নিয়ে বসে থাকা ছেলেটাকে তারও ভালো লেগেছিলো অনেক।

 

এরপর আর কি!! টোনাটুনি প্রেম করল তিন বছর। টোনা পাশ করল, একটা ভালো চাকরী পেল। এখন আর রোজ রোজ দেখা হয় না ওদের। এই ছুটির দিনে একটু এখানে সেখানে উকিঝুকি, তারপর মুঠোফোনে আড্ডাবাজী তো আছেই। টুনির কিচমিচও কমেছে কিছুটা, সে এখন সবার সিনিয়র হয়েছে তো, তাই। কিন্তু টোনার কাছে এলেই, টুনি এখনো সেই দুষ্টু টুনটুনি. . . .

 

তারপর একদিন টুনির বাবা টোনাকে ডেকে পাঠালো। টোনাতো ভয়েই মরে আরকী। টুনির বাবা বললেন, 'দেখো বাপু, অনেক হয়েছে। এবার আমি টুনিকে বিয়ে দিতে চাই, ঝটপট তোমার বাবা মাকে খবর দাও দেখি!!" ফের আর কি হবে? টোনা আর টুনির বিয়ে হয়ে গেল। ওদের বিয়ের বয়স এক মাস। দুজনে মিলে নিজেদের ছোট্ট, সুন্দর একটা সংসার পেতেছে, যাকে বলে একদম টোনাটুনির সংসার।

 

এবার তো টোনাটুনির পরিচয় দেয়া শেষ, এবার শুরুর ঘটনাটা বলি? এখন কিন্তু কেউ আর প্রশ্ন করতে পারবেন না কে টোনা, কে টুনি?

 

যা বলছিলাম, টোনা বাইরে থেকে খেয়ে আসায় টুনি ভিষন রাগ করেছে। বেশ কিছুক্ষণ কান্নাকাটির পরে টুনিটা রাগ করে না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়লো। কিন্তু বোঝেন ই তো। টুনির হলো এই এতটুকু একটা পেট। কতটুকুই বা খানা আঁটে? ক্ষিধে তো লাগারই কথা, নাকি?

 

রাত অর্ধেক যেতে না যেতেই টুনির ঘুম গেলো ভেঙে। এই মাঝরাত্তিরের ক্ষিধেয় সে কাহিল। পাশ ফিরে দেখলো টোনা আরাম করে লেপমুড়ি দিয়ে ঘুমুচ্ছে। টুনির এমন রাগ হলো, এমন রাগ হলো, কেমন রাগ হলো সেটা আমি বলে বোঝাতে পারবো না বাবা!! আপনারাই বুঝে নিন।

পেটের ক্ষিধেয়, মনের দুঃখে টুনি আবার কিছুক্ষন ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদলো। তারপর পা টিপে টিপে চলল ডায়নিং এর দিকে। পা টিপে টিপে যাওয়ার কারণ হল, টোনা টের পেলে পরে রোজ এটা নিয়ে টুনি কে ক্ষেপাবে।

 

কিন্তু ডায়নিং এ এসে টুনির তো ভিড়মি খাবার অবস্থা। পুরো রুমটায় মোমবাতি জ্বলছে, টুনির রান্না করা খাবার গুলো সব টেবিলে সাজানো, সাথে কেক। রুমের ঠিক মাঝখানে টোনা দাড়িয়ে। টোনার হাতে ইয়া বিশাল একটা টেডি বিয়ার আর পাশে রাখা টুনির সবচাইতে প্রিয় লাল গোলাপ। এক কোণা দিয়ে একটা চকলেট বক্সও উঁকিঝুকি দিচ্ছে। টুনি ছুটে এসে টোনাকে বলল, "এসব কি!!!!"

 

টোনা কি বললো জানেন?

 

সারপ্রাইজ !!!!!!!!!!

 

এরপর? এরপর আর কি হবে? সব কী আমিই বলে দেবো নাকি, আপনারা বুঝে নেবেন না? এরপর টোনাটুনি সুখে শান্তিতে বসবাস করতে লাগল।

 

"আমার কথাটি ফুরোলো,

নটে গাছ মুড়ালো।"

 

-তৃপ্ত সুপ্ত-

Share