কোন গল্প নয়!!

লিখেছেন - -তৃপ্ত সুপ্ত- | লেখাটি 932 বার দেখা হয়েছে

আমার খুব কম মন খারাপ হয়। আমার অনেক বন্ধু আমাকে অনায়াসে সুখী মানুষের তালিকায় ফেলে দেয়, আমিও নিজেকে তাই ভাবি।। সুখী, পরিতৃপ্ত একজন মানুষ। সহজেই মন ভালো করে ফেলি, কিংবা হুটহাট কাঁদতে পারি, তাই বেশিক্ষণ মন খারাপ থাকে না। ছোট ছোট জিনিসে সুখ খুঁজি। কাব্যিক কিছু নয়, সাধারণ কিছু। কেউ প্রশংসা করলে ভালো লাগে, কেউ আমাকে আপন ভাবলে তাকেও আপন মনে হয়। প্রিয় লেখকের বই উপহার পেলে আমাকে দিয়ে যেকোন দুঃসাধ্য বা পরিশ্রমের  কাজ করিয়ে নেওয়া সম্ভব। অল্প জিনিস চাই, তাই আমার ভেতরে অতৃপ্তি আসে না। কিছু না পেলে সেটাও মেনে নিই, ভেবে নিই সবাই তো সব কিছু পায় না। চলার পথে কিছু হারিয়ে গেলে ভেঙে পড়ি না। ফিরে পেতে চাই, কিন্তু না পেলেও জীবনকে থমকে যেতে দিই না। সোজা কথায় আমি আমার জীবন কে ভালবাসি। ভালবাসি বেঁচে থাকতে।।

 

আজ একটা মজার ঘটনা ঘটেছে। আমার একজন বন্ধু, অনেক দিনের পুরোনো আর আমার খুব ভালো বন্ধু। মানুষ হিসেবে অসাধারণ, আমি তাকে খুবই পছন্দ করি।। আমাকে বললো, দোস্ত আমার জন্য একটা মেয়ে খুঁজে দে। আমি তাকে বললাম প্রেম করবি না বিয়ে? বিয়ে- জবাব এলো। আমি জানতে চাইলাম রিকোয়ারমেন্ট কি? সে বললো, মেয়েটা দেখতে ফাটাফাটি হতে হবে দোস্ত, আমার সুন্দরী মেয়ে বিয়ে করার খুব ইচ্ছা!! আমি বললাম বেশ... আর কি চাই? আরো কিছু তো খুঁজবিই নাকি?? সে বললো মেয়েটা ভদ্র হতে হবে, সংসারী। গোছানো কিন্তু দুষ্টু। আমার ফ্যামিলীর সাথে মানিয়ে নেবে এমন। কাজ পারুক বা না পারুক, তাতে সমস্যা নেই, আম্মা শিখিয়ে দেবে।

 

কিছুক্ষণ পর সে বললো, মেয়েটা আসলে তোর মতো হতে হবে। আমি যা যা বলছিলাম, তার সবই তোর মধ্যে আছে। শুধু তোর চেয়ে একটু ছোট হতে হবে, বয়সের গ্যাপটা জরুরী। আমি একটু হেসে তাকে বললাম, আমার মতো হলে তো হবে না রে... সে খুব অবাক হলো, বললো কেন?? কি সমস্যা?? তুই তো অসাধারণ একটা মেয়ে। যে কোন ছেলেই তোকে পেলে সৌভাগ্যবান হবে (আমার বন্ধুর ভাষ্য)!!! আমি তাকে বললাম, আমি তো ফাটাফাটি দেখতে নই!! তোর একদম প্রথম চাওয়াই তো মিললো না!!

 

সে কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থাকলো, তারপর বললো সরি দোস্ত!! আমি এতক্ষণ তোর গুণগুলো ভাবছিলাম, কিন্তু চেহারার ব্যাপারটা ভাবি নি। আমি মাঝে মাঝেই নানা জায়গায় গলাবাজী করে বেড়াই যে ছোট মানসিকতার লোকেরাই কেবল চেহারা কে প্রাধান্য দেয়। আসলে আমরাও দিই, নিজের অজান্তেই দিই। চেহারার ব্যাপারটা ভাবার পর এখন আর তোকে আমার চাওয়ার সাথে মেলাতে পারছি না। আমি লজ্জ্বাবোধ করছি, কিন্তু এটাই সত্যি। বউ হিসেবে আমার কল্পনায় সুন্দর দেখতে একটা মেয়েই আসে কেবল।

 

আমি আগেই বলেছি আমার বন্ধুটা খুবই দারুণ একটা ছেলে। তাকে কিছুতেই পাজী, দুষ্টু লোক বলা যাবে না। সে কখনোই কারো খারাপ চায় না। ওকে গালাগাল করার তো প্রশ্নই ওঠে না। বরং আমি নিজেই ওর কিছু ক্ষেত্রে মানসিকতার জন্য তাকে অনেক সম্মান করি। ওর বেশি কিছু চাওয়া নেই, এটুকু সে চাইতেই পারে। কিন্তু তারপরও ওর কথা শুনে আমার খুব মন বিষন্ন হলো।

 

আমার চেহারা জনিত কারণে আমার মন খারাপ না। আমি নিজেকে খুব স্পেশাল ভাবি। কে কি ভাবলো তাতে আমার কিছু এসে যায় না। আমি কেবল ভাবছি তাদের কথা, যারা নিজেকে এই বিষন্নতা থেকে টেনে বের করতে পারে না। বেশিরভাগ মেয়েই এই কমপ্লেক্সে ভোগে, যে সে দেখতে ভালো নয়। দেখতে ভালো হওয়াটা কেবল বিয়ে কিংবা প্রেম করার ক্ষেত্রেই জরুরী নয়। গায়ের চামড়ায় সুন্দরীদের কদর সব জায়গায়। সুন্দরী মেয়েদের সাথে সবাই বন্ধুত্ব করতে চায়। বাসায় দুটো মেয়ে থাকলে তাদের সৌন্দর্য্যের এক অঘোষিত প্রতিযোগীতায় নামতে হয়। বাবা মা অসুন্দর মেয়েটিকে তার পছন্দের রঙের জামা পড়তে দেন না মানাবে না বলে। আত্মীয় স্বজনরা অবলীলায় সুন্দরী বোনটিকে অসুন্দর বোনটির চেয়ে আলাদা করে দেয়।

 

আমি এক মেয়েকে চিনতাম। বাচ্চা একটা মেয়ে, সে তার মায়ের সাথে কোথাও যেতে চাইতো না। খুব চঞল মেয়েটা হঠাৎ করে একদম চুপচাপ হয়ে যায়, এমনকি সে স্কুলেও যেতে চাইতো না। অনেক প্রশ্ন করেও তার কাছে কোন জবাব পাওয়া যায় নি। শেষে মেয়েটাকে যখন একজন চাইল্ড সাইকোলজিষ্টের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়, তার সমস্যার মূলটা বের করা সম্ভব হয়। তার এক বান্ধবীর বার্থডে পার্টি তে সে বান্ধবীর মা আর তার মার কথপোকথন শুনতে পেয়েছিলো। মহিলাটি তার মার কাছে জানতে চাইছিলো এই মেয়েটি তার আপন মেয়ে কিনা। পরিবারের বাকী সবাই এত ফর্সা, কিন্তু এই মেয়েটি এত কালো, এর জন্যেই তার মনে এই প্রশ্নের উদ্ভব হয়েছে। মেয়েটি কাউকে কিছু না বলে নিজেকেই গুটিয়ে নিয়েছিলো। আমার ছোটবোনটি ফর্সা হবার কারণে এমন সমস্যার মুখোমুখী আমি অনেক বার হয়েছি, তাই অনুভূতিটুকু বুঝতে পারছি। সবচেয়ে মজার ভেদাভেদ দেখা যায় তখন যখন আমি রিকশা পাইনা অনেক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকেও, আমার বোন দু মিনিটেই সেটা জোগাড় করে ফেলে।

 

ছোটবেলা থেকেই আমরা শিখে গেছি কালো মানে খারাপ। যেকোন খারাপ কিছুই কালো, আর ভালো মানে সাদা। অসৎ ব্যবসায়ী হলো কালোবাজারী, অন্যায় পথে উপার্জিত অর্থ হলো কালোটাকা। নোংরা কাজ করে পরিচয় হলো কালোমুখ আর অশুভ সময় কালবেলা। এভাবেই কালো গায়ের রঙ মানে কুৎসিত মানুষ হবে, এটাই স্বাভাবিক। আর বিজ্ঞাপনের এই যুগে কালো হলে যে মোটামুটি জীবন কি রকম দুর্বিষহ হয়ে ওঠে তা কি আর ব্যাখার প্রয়োজন আছে?? সময় করে আমাদের বিজ্ঞাপনগুলো দেখে নিলেই চলবে।

 

কালো মেয়েদের নিয়ে অনেক কিছু লেখা হয়। কিন্তু এই বিপদ কেবল কালোদের নয়। যার দাঁতটা একটু উঁচু, যার চোখটা একটু ট্যারা, যে শহুরে পোষাকে অভ্যস্ত নয়, গায়ের চামড়ায় যার কোমলতা নেই। যে মেয়েটা গ্রাম্য ভাষায় কথা বলে, যার চলাফেরায় স্মার্টনেস ঝলসে ওঠে না।  সেই মানুষটা কি মানসিকতায় কখনো অসাধারণ হতে পারে? তার একটাই পরিচয়... সে অসুন্দর।।

 

যে মেয়েটা নিজকে পন্য করে তুলতে চায়, তার কথা বরং নাই বলি। কিন্তু যে মেয়েটা কেবল অসুন্দর হবার কারণে জীবনে হোচট খাচ্ছে প্রতিনিয়ত, তার জন্য সহমর্মিতা আমাদের সবার কাছেই আছে হয়তো, কিন্তু সমাধান আমাদের কারো কাছে নেই।

 

না, আমার কাছেও সমাধান নেই। আমি জানি সমাধানের কোন প্রয়োজনও নেই। এই মেয়েগুলো খুব শক্ত মন নিয়ে পৃথিবীতে আসে। এদের বিধাতা মায়া নামের একটা জিনিস খুব বেশি করে দিয়ে দিয়েছেন। আমরা মায়া দিয়ে সবাইকে জড়িয়ে নিই। যদি তাই না হতো, তবে পৃথিবীতে রোজ রোজ অসুন্দর মেয়েদের মৃত্যু সংবাদে ভরে উঠতো প্রতিটি পত্রিকার পাতা। আমরা অপমানের প্রতিশোধ নিই না। তাহলে খুনের খবর ছড়িয়ে পড়তো সারা পৃথিবীতে। আমরা দুঃখ পেলে একটু কাঁদি, কিন্তু আবার ক্ষমা করে দিই অনায়াসে। প্রার্থনা করতে জানি আমরা। আমরা প্রার্থনা করি, একদিন এই পৃথিবীর সৌন্দর্য্যপিপাসু মানুষেরা নিজেদের মনে সৌন্দর্য্যের আলো নিয়ে আমাদের দিকে তাকাবে। আমাদের মতো ওরাও একদিন সাদা হবে......

 

Share