মেঘ ঢেকেছে মন

লিখেছেন - -তৃপ্ত সুপ্ত- | লেখাটি 807 বার দেখা হয়েছে

(১)

আমি ভেবেছিলাম আমার হয়তো বিভ্রম হচ্ছে। এতদূর থেকে একটা মানুষের চোখের বিষাদ দৃষ্টি আমার নজরে পড়ার কথা নয়। কিন্তু রোজ বিকেলের বেশ কিছুটা সময় মেয়েটাকে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আমার বিশ্বাসটা পাকাপোক্ত হচ্ছিলো। মেয়েটার দাঁড়িয়ে থাকাটাতেই কেমন যেনো দুঃখ দুঃখ ভাব। এলোমেলো চুল, দূরে কোনদিকে দৃষ্টি, শাড়ির আঁচলটা মাটিতে লুটোপুটি খায়… মেয়েটা বারান্দার গ্রীলে গালটা চেপে ধরে আকাশের দিকে থাকে। পুরো সময়টা সে আর কোন দিকেই তাকায় না। আজান দেয়ার খানিকটা আগে ওদের ছোট্ট কাজের মেয়েটা এসে ওকে ডাক দেয়, সাথে সাথে ঘোর ভেঙে মেয়েটা ঘোমটা মাথায় তুলে ত্রস্ত পায়ে ভেতরে ঢুকে যায়। পুরো ব্যাপারটাই কেমন যেন বিষন্ন…

 

আমার বেশ গোছানো জীবন। ভালোবেসে বিয়ে করেছিলাম নিয়াজকে। ও বরাবরই আমার ভালবাসার সম্মান রেখেছে। নিয়াজের পরিবারের সদস্যরাও হাসিমুখে মেনে নিয়েছিলো আমাদের সম্পর্কটাকে। বিয়ের পর বেশ কিছুদিন একটা মাল্টিন্যাশনালে জব করেছিলাম। এরপর পৃথু এলো, ওকে সময় দেওয়া, চাকরী… সব মিলিয়ে হাপিয়ে উঠছিলাম। পৃথুর লেখাপড়া, সেই সাথে বেড়ে ওঠার সময়টাতে ওর প্রতি একটু বেশি মনোযোগ দেয়া উচিত মনে করে চাকরীটা ছেড়ে দিয়েছি। এসব ব্যাপারে নিয়াজ বরাবরই খুব উদার। আমার চাকরী করাতেও ওর যেমন আপত্তি ছিলো না, ছেড়ে দেয়ার ব্যাপারেও ও আমার মতামতকে শ্রদ্ধা জানিয়েছে।

 

সারাদিন বিশাল একটা সময় আমার পৃথুর পেছনেই চলে যায়। নিয়াজ আর আমি, দুজনেই খুব গোছালো স্বভাবের। অথচ মেয়েটা তেমন গোছানো হয়নি। সকালের ব্রাশ করা, ব্যাগ গোছানো, টিফিন, পানির ফ্লাক্স গুছিয়ে দেয়া, সন্ধ্যায় হোমওয়ার্ক সবকিছুতেই তার মামণীর সাহায্য চাই। পাঁচ পেরিয়ে ছয়ে পড়লো, এখনো মাঝে মাঝেই বায়না ধরে খাইয়ে দিতে হবে। ওর নানা আবদার মিটিয়ে ঘরের যাবতীয় কাজ সেরে কেবল নিজের জন্যে একান্তভাবে খুব অল্পই সময় বাঁচে। বিকেলের সময়টা সেই অল্প সময়ের মধ্যে পড়ে।

 

বিকেলের সময়টুকুতে আমার হাতে তেমন কোন কাজ থাকে না। পৃথু টিচারের কাছে পড়তে যায়। ফেরে সন্ধ্যার বেশ খানিকটা পরে। নিয়াজও আসে সন্ধ্যা ছুঁই ছুঁই সময়ে। হোষ্টেলে থেকে পড়াশোনা করার কারণে দুপুরের ভাতঘুমের অভ্যেস ছিলোনা আমার কোনকালেই। ওই একান্ত সময়টুকু আমি তাই আমার বারান্দার মানিপ্লান্টের চারাগুলোকে দেই। একজোড়া লাভবার্ডস আছে। ওরাও আমার বিকেলবেলার সঙ্গী। তবে ইদানিং পাশের বারান্দার মেয়েটাকেই কেন যেন সবচেয়ে আপন লাগে। কত হবে বয়স? আঠারো- উনিশ? খুব বড়োজোর বিশ। বাচ্চা একটা মেয়ে সবসময় শাড়ি পড়ে থাকে দেখে আমার প্রথম প্রথম খুব অবাক লাগতো। আজকাল মেয়েরা তো কামিজেই বেশি সাচ্ছন্দ বোধ করে!! এখন অবশ্য আর অবাক লাগে না। বরং ওকে দেখলেই আমার মন ভালো হয়ে যায়। এমন মিষ্টি চেহারার মেয়ে আমি বহুদিন দেখিনি। শ্যামলা একহারা গড়ন, টানা টানা চোখ, একদম কুচকুচে চুলের গোছা। মেয়েটা যখন বারান্দায় এসে দাঁড়ায়, আমার খুব ওকে ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে করে। বয়সের বিস্তর ব্যবধান থাকা সত্বেও মেয়েটাকে সই বানাতে ইচ্ছে করে।

 

(২)

আমি যখন স্কুলে পড়তাম, আমার ঠিক এমন একটা মেয়ের সাথে ভীষন বন্ধুত্ব ছিলো। এরকমই মায়াকাড়া চেহারা। ওর নাম ছিলো সাথী, কিন্তু ক্লাসের সবাই ওকে মায়া ডাকতো। মায়া নামটা ওর চোখদুটোর জন্য দেয়া হয়েছিলো বোধহয়। আমি আর মায়া একদম বিপরীত স্বভাবের ছিলাম, কিন্তু মেয়েটাকে কেন যেন বড় ভালবাসতাম। আমার হোমওয়ার্কের খাতায় মায়ার নাম লেখা থাকতেই হলো। দুজনে বায়না করে একই রং এর জামা কিনতাম, একইভাবে বিণুনি বাঁধতাম, পেন্সিলে টানা ছবি আঁকতাম, আর গলা জড়িয়ে সই পাতাতাম রোজ। কাগজের নৌকোয় মনের ইচ্ছের কথা লিখে ভাসিয়ে দিতাম জোড়া দিঘীর পাড়ে, ও দিঘী কে যে সবাই ইচ্ছে পূরণ দিঘী বলতো!!! ইচ্ছে আর কি? একটাই তো… যেন দুই সই পাকাপোক্তভাবে আজীবন একসাথে থাকতে পারি।

 

রোজ মায়ের আচারের বয়াম থেকে ওর জন্যে আচার নিয়ে আসতাম। মায়ার যে আচার বড় পছন্দ ছিলো!! আর মায়া আমাকে এনে দিতো ওদের গাছের কুল। দুপুরের রোদে এক টুকরো ছায়া খুঁজে, সেখানে পাটি পেতে নুন মরিচ দিয়ে কুল খাওয়ার স্বাদই আলাদা ছিলো… এই কুলের জন্যই আমি আমার সইটাকে হারিয়ে ফেলেছি। কুল গাছটা পুকুরের ওপরে ঝুঁকে পড়া ছিলো। মায়া অনেক ভালো সাতার পারতো। কিন্তু কেন যেন সেদিন দুপুরে কুল পাড়ার সময় টুপ করে পুকুরে পড়ে গিয়ে আর কখনো উঠলো না। কত খুঁজলাম সবাই মিলে, অথচ মায়াকে আর খুঁজে পেলাম না। তিনদিন বাদে মায়ার শরীরটা ভেসে উঠেছিলো। কিন্তু আমার সইটাকে আমি একেবারেই হারিয়ে ফেলেছিলাম।

 

সময়ের হুড়োহুড়িতে মায়াকে আমি একদম ভুলে গিয়েছিলাম। বহু বছর পর এক ক্লান্ত দুপুরে হঠাৎ করেই মায়া আমার ভুলে যাওয়া স্মৃতির পাতা থেকে আমার পাশের বারান্দায় উঠে এলো। বারান্দার মেয়েটাকে দেখলেই আমার কেবল মায়ার কথা মনে হয়। প্রথম প্রথম আমি কেবল মায়ার কথাই ভাবতাম। আজকাল এই মেয়েটার ব্যক্তিগত সত্বাটাকেও আমি অনুভব করতে পারি। ওর অনুভূতিগুলোকে উপলব্ধি করতে পারি। মেয়েটা উড়তে চায়, কিন্তু আটকে গেছে, খয়েরী রং এর গ্রীলের খাঁচায়…

 

(৩)

নিয়াজকেও সেদিন বলছিলাম মেয়েটার কথা। ওর একাকিত্বের কথা। মেয়েটার বিষন্ন দৃষ্টির কথা। নিয়াজের একটা বড় গুণ হলো, সে সব কথাই মনোযোগ দিয়ে শোনে, সাধ্যমতো মতামত দেয়ার চেষ্টা করে। কথার মাঝখানে ফোড়ন কাটে না, কিছু পছন্দ না হলে বিদ্রুপ করে না। আমার নাম না জানা বন্ধুটির বর্ণনাও সে খুব মনোযোগ দিয়ে শুনেছে। তবে একাকিত্বের বিষয়টা ওর তেমন মনে ধরেছে বলে আমার মনে হয় না। ওর ভাষ্যমতে মেয়েটা নিতান্তই বাচ্চা, নব্য বিবাহিত হবার সম্ভাবনা শতভাগ। হঠাৎ করে সংসার জীবনে মানিয়ে নিতে পারছে না বলেই হয়তো এমন উৎভ্রান্ত আচরণ। ওর কথায় যথেষ্ট যুক্তি আছে। তবুও কেন যেন শুধুই মনে হচ্ছে বড়সড় কোন ঘাপলা আছে। এটা কি কেবল আমার মনের ভুল কিনা বুঝতে পারছি না, কিন্তু খচখচানি অনুভূতিটা খুব পোড়াচ্ছে আমায়।

 

বেশ কয়েকবার ভেবেটেবে আমি ওবাড়িতে একটা ঢু মারার সিদ্ধান্ত নিলাম। যান্ত্রিকতার নিয়মে প্রতিবেশীর বাড়িতে পুকুরের মাছটা, গাছের ফলটা পাঠিয়ে দেয়ার মতো দূর্লভ ঘটনাসমূহ ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই নিয়েছে। অ্কারণ আন্তরিকতাকে এখন তীর্যক দৃষ্টিতে দেখা হয়। যে যার জীবন নিয়েই পড়ে আছে। পাশের ফ্ল্যাটে কেউ বেঁচে রইলো না খুন হলো, তা দাঁড়িয়ে দেখার মতো সময় কারো নেই। তবুও এই যে আমি নিতান্তই অযাচিতের মতো ওবাড়িতে যাবো ভাবছি তার পেছনে কাজ করছে আমার কখনো শেষ না হওয়া কৌতুহল।

 

কী যে অযথা ভাবছিলাম আমি, তা ওখানে গিয়েই টের পেলাম। দ্বিধাদ্বন্দের বেড়াজালে আটকে পড়ে আমি যখন যাবো যাচ্ছির গন্ডিতে দাঁড়িয়ে জাবর কাটছিলাম, ওবাড়ির মানুষেরা আমাকে বেশ উষ্ণভাবেই গ্রহণ করলো। বেশ ছিমছাম পরিবার ওদের। চারজনের পরিবার… বাবা, মা, ওদের একটামাত্র ছেলে, আমার সই এর বর আর সে। নিয়াজের কথাই সত্যি। মাত্র মাস চারেক হলো ওদের বিয়ে হয়েছে। সবচেয়ে আশ্চর্য্যের বিষয় হলো এই মেয়েটার নামও মায়া!! মায়া নামটা যেনো ওর জন্যই জমিয়ে রাখা ছিলো, এ মেয়ের নাম মায়া ছাড়া আর কিছু হতেই পারতো না!!!

 

মায়ার সাথে আমি অনেক গল্প করলাম। এক মুহূর্তেই সে আমাকে আপন করে নিলো, বাবার বাড়ি, শ্বশুড় বাড়ির নানা কথা বলতে বলতে একদম কাহিল। আমার মতো সেও গ্রামের মেয়ে। তবে পরিবারের অবস্থা তেমন ভালো নয়। আরো কটা ছোট ছোট ভাইবোন আছে ওর। ভালো পাত্র পাওয়ায়, তাই অল্প বয়সেই মায়ার বিয়ে দিয়ে কন্যাদায় মুক্ত হয়েছেন তার বাবা। মেয়েটা মোটেই চুপচাপ নয়, বরং অনেক কথা বলে। এই মেয়েটাই বিকেলবেলা এত শান্তভাবে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকে কি করে, ভাবতেই আমার অবাক লাগে!! বহুদিন পর শহুরে জীবনে অকৃত্তিম আপ্যায়ন পেলাম। মায়ার সম্পর্কে উল্টোপাল্টা ভাবনার কথা চিন্তা করে নিজের বোকামীতে লজ্জ্বিত হলাম। মায়া কে আমার বাড়িতে বেড়াতে যাবার নিমন্ত্রণ দিয়ে ফিরে এলাম ঘরে, পৃথুর স্কুল থেকে ফিরে আসার সময় যে হয়ে এসেছিলো প্রায়!!

 

সেদিন বিকেলে মায়াকে যখন আমি বারান্দায় দেখলাম, ও বেশ হাত নেড়ে আমাকে স্বাগত জানালো। বিষন্ন হাসিটা ওর মুখে দেখিনি সেদিন। আমি আবারও নিজেকে বকলাম খুব করে। ছিঃ ছিঃ কি অদ্ভূত কথা ভাবছিলাম!!!

 

এরপর বেশ কয়েকবার আমি ওবাড়িতে গিয়েছি, মায়াও এসেছে দু একবার। প্রতিবারই একই আন্তরিকতা পেয়েছি, কেবল একটা জিনিস ছাড়া। মায়া বা ওবাড়ির কেউই মায়ার স্বামীর সম্পর্কে কিছু বলে না। আমি বেশ কয়েকবার প্রশ্ন করেও এর তেমন কোন সদুত্তর পাইনি, কেবল অনেক চাপাচাপির পর ওর শাশুড়ি একবার বলেছিলেন, মায়ার বর ব্যবসার কাজে বেশিরভাগ সময়ই এখানে সেখানে যান। আরো কিছু জানার ছিলো, কিন্তু আমার অযথা আগ্রহে বিব্রতবোধ করবেন ভেবে ব্যপারটা চেপে গেলাম। তবে, মেয়েটার বিষন্নতার একটা কারণ শেষমেষ আমি খুঁজে পেলাম। নতুন নতুন বিয়ের সময়টাতে স্বামীকে কাছে না পাওয়াটা যে কোন মেয়ের জন্যই সুখকর বিষয় নয়। সেই তুলনায় মায়াতো নিতান্তই ছোট্ট একট মেয়ে। নিয়াজকে বিষয়টা জানাতেই, সেও আমার মতই রায় দিলো।

 

(৪)

মায়ার সাথে ইদানিং আমার ঘনিষ্টতা খুব বেড়েছে। আমার পৃথুটা তো মায়া চাচীমা বলতেই পাগল। এর মাঝে ওবাড়ির সবাইকে একদিন নিমন্ত্রণ করেও খাওয়ালাম। মায়ার কাছ থেকে খুশির সংবাদ পেয়েছি। ওদের পরিবারে লোকসংখ্যা বৃদ্ধি পেতে যাচ্ছে। মায়ার শ্বশুড় শাশুড়ি তো বেজায় খুশি। ওদের খুশি দেখে আমারও খুব আনন্দ হলো। মেয়েটাকে আমি বড় পছন্দ করি।

আশ্চর্য্যের বিষয় হলো এতবড় একটা সংবাদেও মায়ার স্বামী ওকে দেখতে এলো না! ব্যাপারটাতে আমার ভিষণ মেজাজ খারাপ হয়েছে। সেদিন তো মাসীমা কে বলেই ফেলেছিলাম এসব ব্যবসা বাদ দিয়ে ছেলেকে এবার থিতু হতে বলেন। সংসার বাড়ছে, এখন কি আর এত উদাসীন হলে চলে? মানছি, মায়াকে দেখা শোনা করার জন্যে সবাই আছে। কিন্তু মেয়েটার মনেরও তো কিছু খোরাক আছে! এসময় এমন গায়েব হয়ে রইলে কি চলে??

 

আমি আরো কিছু বলতে চাইছিলাম, কিন্তু নিয়াজ আমাকে ওদের পার্সোনাল ব্যপারে বেশি মাথা ঘামানো ঠিক হচ্ছে বলে চাপা ধমক দিয়ে থামালো। হয়তো ঠিক হচ্ছে না, তবুও আমার লোকটার ওপর অসম্ভব রাগ হচ্ছে!! মায়ার মতো লক্ষী একটা মেয়েকে কেউ এতটা অবহেলা করতে পারে, তা আমার ধারণারও বাহিরে ছিলো। ওর জায়গায় আমি হলে হয়তো কখনই মেনে নিতাম না ব্যপারগুলো। অথচ মায়া দিব্বি হেসেখেলে সামলে নিচ্ছে সব। এইটুকু একটা মেয়ের মাঝে এত দৃঢ়তা আসে কি করে, আমি ভেবে অবাক হই!!!

 

প্রথম দিককার সময়গুলোতে মেয়েদের নানা সমস্যা হয়। পৃথুর সময়টাতে আমি একদম কিছু খেতে পারতাম না। মায়ার অবস্থাও হয়েছে তাই। মেয়েটা ভিষণ দূর্বল হয়ে গেছে। চোখমুখ শুকিয়ে আধখানা হয়ে গেছে, ঘুম হয় না নাকি একেবারেই। সেদিন মাসীমা ওকে চেকআপে নিয়ে গিয়েছিলো। ফেরার পর থেকেই সে মুখ শুকনো করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ওর হাসিমুখটা দেখেছি কবে, মনেই করতে পারছি না। সারক্ষণ কি যেন কি ভাবে! শরীর ভেঙে পড়ছে একদম। আমি বেশ কয়েকবার জানতে চাইলাম, ডক্টর কি বললো, তার একটাই জবাব… সব ঠিক আছে!! গত কমাসে মায়াকে আমার খুব চেনা হয়ে গেছে। আমি নিশ্চিত বুঝতে পারছি… ঘাপলা আছে কোথাও।।

 

(৫)

কাজকর্ম সেরে চুপচাপ বসে টিভি দেখছি, এমন সময় মায়াদের কাজের মেয়েটা দরজার বেল বাজালো। দরজা খুলতেই হাউমাউ করে চেচিয়ে বললো “ মায়া ভাবীরে বাঁচান… আমনে ছাড়া আর কেউ বাঁচাইতে পারবো না তারে”

 

কান্নাকাটি করে চেঁচাতে চেঁচাতে মেয়েটা যা বললো, তাতে আমার মাথা ঘুরিয়ে উঠলো। আমার ঠিক চোখের সামনে থাকা মেয়েটা যে এত অত্যাচার সইছিলো, আমি কোনদিন ঘুণাক্ষরেও টের পাইনি। মায়ার স্বামী মোটেই কোন ব্যবসায়ী নয়। এমন কি সত্যিকার অর্থে তার কোন স্বামীই নেই। মায়ার বিয়ে হয়েছিলো প্রবাসী এক যুবকের সাথে, টেলিফোনে। ছেলেটা ওখানেই এক গাড়ি একসিডেন্টে মারা যায়। ওর শ্বশুড় শ্বাশুড়ির সে একমাত্র সন্তান ছিলো। ছেলের মৃত্যুর সাথে সাথে বংশ শেষ হয়ে যাক, এটা তারা চাননি। গত কটা মাস মায়ার শ্বশুড় তার ওপর পৈশাচিক অত্যাচার চালিয়েছে… নমানুষীয় অত্যাচার... সেদিনকার ডাক্তারী রিপোর্টে এসেছে, মায়ার সন্তানটা মেয়ে। তাই গর্ভাপাত করা হবে আজ……… পুরো ব্যাপারটার ভয়াবহতা চিন্তা করে আমার গা গুলিয়ে উঠলো। ঠিক কতটা অমানুষ হলে কেউ এতটা নীচে নামতে পারে, আমি ভেবে পাচ্ছিলাম না। মানুষ দুটোকে খুন করার তীব্র ইচ্ছেটাকে বুকে চাপা দিয়ে আমি ওর কাছে দৌড়ে গেলাম।

 

মায়াকে নিয়ে আমি হসপিটালের দিকে ছুটে যাচ্ছি। বাচ্চা মেয়েটা কুঁকড়ে গেছে যন্ত্রণায়, তাও জড়িয়ে আছে আমার একটা হাত। চোখটা ঝাপশা হয়ে আসছে বারবার, মায়াকে কেবল মনে হচ্ছে আমার পৃথু। চোখের সামনে মায়া পৃথুর চেহারা মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে। আমার মেয়েটা মা মা করে আর্তনাদ করছে… ডুবে যাচ্ছে… এবার আমি আর কিছুতেই আমার মায়াকে হারিয়ে যেতে দেবো না… আমার মেয়েটা, সইটা এবার বাঁচবেই…

 

Share