একপক্ষীয় দৃশ্যপট (ক্ষুদে কল্পন)

লিখেছেন - -তৃপ্ত সুপ্ত- | লেখাটি 647 বার দেখা হয়েছে

নির্লিপ্ত হয়ে বসে আছে মেয়েটি। কোন ঘটনাই তাকে স্পর্শ করছে না। গা চিরচির করা রোদের মাঝে ঠায় বসে আছে চার চারটে ঘন্টা। চারপাশের মেতে থাকা চেহারা বদলে যাচ্ছে কিছুক্ষণ পরপর... মেয়েটিই শুধু এক জায়গায় স্থানু হয়ে আছে। ঠিক যেন হাত টিপে বানানো মূর্তি কোন। অথবা ওকে ঘিরে থাকা সময়গুলো অজ্ঞাত কারণে থমকে গেছে। কিছুই অসম্ভব নয়। আশেপাশের অচেনা মুখগুলো প্রশ্নালু দৃষ্টিতে মেয়েটাকে দেখছে। কেউ কেউ সঙ্গীর সাথে ফিসফিসও করছে। তাদের দৃষ্টিই বলে দিচ্ছে অভ্যন্তরীন অশ্রবনযোগ্য আলোচনার বিষয়বস্তু এই নিশ্চুপ মেয়েটিই। সঙ্গীহীন মানুষ খুব বেশি নেই এই কফিশপে। একাকী মেয়ের সংখ্যা……. কেবল একজন।

 

কফিশপের এই টেবিলটা নিয়ে গ্রাহকদের অভিযোগের শেষ নেই। দুপুরের কড়া ঝাঁঝালো রোদটা কাঁচের দেয়াল চিরে চোখেমুখে এসে পড়ে। রোদ চড়ে বসলে তাই ভারী পর্দা চাপানো হয়। তাতে টেবিলটা ঘোলাটে অন্ধকারে চাপা পড়ে যায়। খোলামেলা কফিশপে এই অনিচ্ছার আঁধারকে উপদ্রপই মনে হয় সবার কাছে। দিনের রৌদ্রকালীন সময়টাতে কফিশপের এ টেবিলটাই তাই সবচেয়ে কম জনপ্রিয়।

 

অথচ মেয়েটার কোন বিকার নেই। কফি মগে আঙুল ঘুরিয়ে খেলছে কেবল, দৃষ্টি দূরে কোথাও। কফিশপের মালিক নিঃসন্দেহে বেশ রুচিবান। চমৎকার ডেকোরেশনের আড়ালে এসিটাকে  কোথাও লুকিয়ে ফেলেছেন, যেটা এই মুহুর্তে কফিকে ঠান্ডা করার কাজটা নিষ্ঠার সাথে পালন করে যাচ্ছে। কলাপাতা সবুজ রঙের কফি মগের ছাইরঙা ধোয়ার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে মেয়েটা। ধোয়ারা ক্ষ্যান্ত দিলেই হাতের ইশারায় ওয়েটারকে ডাকে মেয়েটা। প্রথম দুবার ঠোঁট গোল করে বলেছে “ক-ফি” এরপর থেকে ওয়েটার ছেলেটাই বুঝে নিচ্ছে অর্ডারটা কি হবে!

 

কফিশপের দরজায় উইন্ডচাইম বাঁধা। পুশ লেখা কাঁচ-দরজার হাতল ঠেলে কেউ ভেতরে ঢুকলেই উইন্ডচাইমটা বেজে ওঠে। প্রথম ক-বার মেয়েটা বেশ আগ্রহ করে তাকিয়েছে সেদিকে। চোখে নেশা বুদবুদ অপেক্ষা নিয়ে… গভীর সেই দৃষ্টিতে অপেক্ষার পাশাপাশি নির্ভরতাও দেখতে পেয়েছে উৎসুক কেউ কেউ। কিন্তু টুংটাং শব্দগুলো মেয়েটার জন্য কোন পরিচিত মুখাবয়বের বার্তা আনেনি। এরপর অপেক্ষার দৃষ্টিটা নিরাসক্ত হয়ে গেছে… এখন বেশ কিছুক্ষণ হলো উইন্ডাচাইমটা প্রানপণ চেষ্টা করেও আর মেয়েটার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারছে না! বোকা ঘন্টি তবু বেজেই যাচ্ছে টুং…টাং টুং…টাং…

 

বেলা প্রায় মরে এসেছে। অনাকাঙ্খিত টেবিলটা এখন আর অনাকাঙ্খিত নয়। এসময় কাঁচ গলে এসে এখানে বিকেলের মায়া আলো খেলা করে। আশেপাশে কেউ কেউ উশখুশ করছে। বোধহয় তারা এসময়ের নিয়মিত খদ্দের। এই টেবিলটাতেই তাদের এসে বসবার কথা। কোমল রোদটুকু কারো প্রেয়সীর মুখে কমলা রঙের নকশা কাটে, সেই সাথে হয়ত কেউ রঙিন চোখে ভবিষ্যতের স্বপ্ন আঁকে… নিতান্তই দূর্ভাগ্য বশে টেবিলটা আজ তাদের হাতছাড়া হয়েছে।

 

মেয়েটা এবার আর তাদের আক্ষেপটাকে দীর্ঘ করলো না। একবেলার এই অচেনা অতিথি বের হয়ে যাবার সময় কফিশপের কর্মচারীরা মেয়েটার লাল রঙের ট্রাভেল ব্যাগটার উপস্থিতি জানতে পেলো। বেচারা আজ সারাবেলা পায়ের কাছে পরে ছিলো অবহেলায়!

 

কিছুক্ষণ পর মেয়েটাকে খুঁজে পাওয়া গেলো সুসজ্জ্বিত উজ্জ্বল আলোর কামরায়, দামী সব প্রসাধন সামগ্রীর মাঝখানে। মাঝবয়সী ঘরোয়া চেহারার কেউ একজন মহিলা ভালবাসাময় দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছেন। বধুবেশে মেয়েটা পুরো ঘরের দীপ্তি বাড়িয়ে দিয়েছে! কোন ধরণের হইচই ছাড়াই মেয়ে তৈরী হয়ে গেছে, মহিলার তা কিছুতেই বিশ্বাস হতে চাইছে না। মায়ের হাত চেপে বাহিরে এসে মেয়েটা বেশ অবাক হলো। হঠাৎ আয়োজন বলে মনেই হচ্ছে না, সব কিছু বেশ গোছানো, পরিপাটি!! শুধু একটা অগোছালো প্রশ্ন ঘুরঘুর করছে চারপাশে… এত বছরের মুগ্ধ দৃষ্টির মানুষটা আজ কেন এলো না???


Share