নিয়ন আলো

লিখেছেন - -তৃপ্ত সুপ্ত- | লেখাটি 1121 বার দেখা হয়েছে

১.

- অই, তুই যাবি কি না সিধাসাপ্টা বল। তোর এইসব ছিঁচ কান্দন শোনার টাইম নাই আমার।

 

- দোস্ত, একটু আস্তে কথা বল প্লিজ। আমার মোবাইল একটু পরে তোর চিৎকারের চোটে পটল তুলবে। মাসের এখনো বেশ কয়েকটা দিন বাকী। একটু দয়া কর, প্লিজ…

 

- কিইইইইই!!! আমি চিৎকার করছি? যাহ তুইও জাহান্নামে যা, তোর মোবাইলও জাহান্নামে যাক। যাইতে হবেনা তোকে আমার সাথে। শালা ইন্দুরের বাচ্চা… তেলাপোকার কইলজা হাতে নিয়ে বসে থাক তুই।

 

- নিবি শোন… যাবোনা তো বলি নাই। অবশ্যই যাবো। শুধু যদি তুই দুইদিন পরে যাওয়ার প্রোগ্রামটা করতি!! আমার নতুন চাকরী। এখন কি চাইলেই ছুটি নেওয়া যায়, তুই ই বল!! তারচে বরং বৃহস্পতিবার রাতের বাসে যাই, শনিবার রাতে ব্যাক করবো। একটু বোঝার চেষ্টা করিস না ক্যান??

 

- এহ, কি আমার চাকরীওয়ালা আসছে… কয় টাকা বেতন দেয় রে? করিসতো বসের চামচামী। বৃহস্পতিবার অর্ণবের জন্মদিন না? আমি না থাকলে হবে? তুই না গেলে নাই। আমি একাই যাবো। ওকে সারপ্রাইজ দেয়ার সব প্ল্যান শেষ। এখন শুধু চট্টগ্রাম যাওয়া বাকি। তোর আজাইরা প্যাচাল ভালো লাগছে না।

 

- আচ্ছা ঠিক আছে। আমি দেখছি ছুটি ম্যানেজ করা যায় কি না। তবে যাইতে না পারলে দোষ দিতে পারবি না।

 

- আইচ্ছা। এখন ফোন রাখ। অর্ণব কল দিচ্ছে। ওর সাথে কথা বলবো… বাইইইইইই…

 

 

ফোনটা রেখে নিবেদিতা কিছুক্ষণ আপন মনে হাসলো। নিহাল যদি ছুটি নাও পায়, প্রয়োজনে ও চাকরী ছেড়ে দেবে। তাও নিবিকে একা যেতে দেবে না। এরকম একটা বেষ্ট ফ্রেন্ড তাকে দেয়ার জন্য নিবি সবসময় সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ জানায়। সেই পিচ্চিকাল থেকে দুজনের বন্ধুত্ব। পাশাপাশি ফ্ল্যাটে থাকতো দুই পরিবার। নিহাল নিবেদিতার চেয়ে বেশ ক’বছরের বড় হলেও নিবির চঞ্চলতা আর নিহালের চুপচাপ ভালোমানুষির জন্য বন্ধুত্ব হতে সময় লাগে নি।

 

নিবির কলেজের বন্ধুরা সবসময় ভাবতো নিহাল বুঝি তার বয়ফ্রেন্ড। এখনো ভার্সিটিতে অনেকেই তাই ভাবে। সব জায়গায় ওদের একসাথেই দেখা যায় সবসময়। তাই এমনটা ভাবাটা খুব একটা অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়। কিন্তু নিবেদিতা জানে, ওরা পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো বন্ধু জুটি। সবাই বলে ছেলে আর মেয়ের বন্ধুত্ব নাকি টেকেনা। সেই ধারণাকে কাঁচকলা দেখিয়ে দিব্যি ওরা বন্ধু হয়ে আছে।

 

 

২.

 

 

মোবাইলের রিংটোনে ঘোর ছুটে গেলো নিবেদিতার। পিচ্চিবেলার স্মৃতিগুলো নিয়ে মনের কোণে নাড়াচাড়া করছিলো এতক্ষন। অর্ণবের কল।

 

-   হ্যালো… কেমন আছো?

 

-   ভালো আছি, তুমি? ওয়েটিং এ ছিলে তখন।

 

-   আরে নিহালের সাথে কথা বলছিলাম। তুমি কল কেটে দিলে কেন!!

 

-   না, ভাবলাম বিজি বোধহয়।

 

-   ধুর বিজি। বাদ দাও, ডিনার করেছো?

 

-   হু, তুমি?

 

-   খাইনি এখনো। আচ্ছা শোন, কেমন চলছে সব? কবে আসবে এখানে?

 

-   নিবেদিতা, সামনের বেশ কিছুদিন হয়তো আসতে পারবো না। কাজের চাপ খুব বেড়েছে। তার ওপর মাস তিনেক পর বিয়ে, তখনতো বেশ কিছুদিন এদিকে সময় দিতে পারবো না। তাই…

 

-   আচ্ছা আচ্ছা, এত কৈফিয়ত দিতে হবে না। ব্যাপার না একদম। কাজকর্ম চলতে থাকুক।

 

-   থ্যাঙ্কস… আচ্ছা রাখি এখন। ভালো থেকো। বাই…

 

-   হু… বাই।

 

অর্ণব। নিবেদিতার হবু বর। পারিবারিক ভাবেই দেখেশুনে বিয়ে ঠিক হয়েছে দুজনের। নিবেদিতা কে পারিবারিক একটা বিয়ের অনুষ্ঠানে দেখে ওদের বাসায় বিয়ের প্রস্তাব পাঠায় ওরা। ভালো পরিবার, শিক্ষিত আর ব্যাবসায়ী ছেলে, নিবেদিতার পরিবার এই সম্বন্ধে বেশ খুশী। নিবেদিতাও আপত্তি করার কোন কারণ খুঁজে পায় নি। কথাবার্তা বলে সব ঠিকঠাক, নিবেদিতার পরীক্ষা শেষ হলেই বিয়ে।

 

এই সুযোগে দুজন দুজনকে জানার বেশ খানিকটা সময় পেয়েছে। বিয়ে ঠিক হবার পর পরিবারের অনুমতি সাপেক্ষে প্রেম করার অনুভূতি বেশ মজার। এর আগে নিবেদিতা নিহাল ছাড়া আর কোন ছেলের সাথে কখোনো তেমন ঘনিষ্ঠ হয়ে মেশে নি। সে এখন অর্ণবকে আবিষ্কারের নেশায় বুদ। এই স্বল্পকালীন প্রেমে বিরহের যন্ত্রনাও কিন্তু আছে। ব্যাবসার কাজে অর্ণবকে বেশ কিছুদিন চট্টগ্রামে থাকতে হচ্ছে। দেখা হয় না একদম। সামনের বৃহস্পতিবার তার জন্মদিন। নিবেদিতা ভেবে রেখেছে, হুট করে গিয়ে ওকে চমকে দেবে। বেশ এক্সাইটেড সে…

 

৩.

 

-   তোকে কতবার বলেছি, লাল ব্যাগটা আনিস না। তবুও এটাই নিয়ে এসেছিস। তোর কি আক্কেল জ্ঞান আর কোনদিন হবে না রে?? মাগো, কি ক্ষ্যাত ব্যাগটা… দূরে বসবি আমার কাছ থেকে তুই। নইলে মানুষ ভাববে আমার রুচিও তোর কাছাকাছি।

 

-   জ্বী না। কেউ এমন ভাববে না। সবাই বরং ভাববে এমন রাজপুত্রের পাশে এই পেত্নীটা কি করে।

 

-   কিইইইইই ?? আমি পেত্নী??? নাম, নাম এক্ষুনি বাস থেকে… আমি তোর সাথে যাবো না, নাম বলছি…

 

-   এহ!! তোর ইচ্ছা হলে তুই নাম। আমি বেতনের টাকা খরচ করে ডিলাক্স বাসের টিকেট কিনেছি, এত সহজে নামছি না।

 

-   তুই এত কিপ্টা ক্যান রে?? নাইমা মাত্র আমি তোর টাকা দিয়ে দিবো। এখন চুপচাপ বসে থাক। একটা বাড়তি কথা বললে বাসের লোকজন ডেকে তোর সিট বদলায়ে দিবো আমি। পিছনের সিটে ঝাঁকুনি খেয়ে ঝালমুড়ি হতে হতে যাবি।

 

-   যা ভাগ। কে কথা বলে তোর সাথে!!

 

 

নিহাল চোখমুখ ঢেকে ঘুমানোর আয়োজন করলো। নিবির এত্ত খারাপ লাগছে!! বাসে চড়লে তার ঘুম হয় না। অথচ নিহালকে জেগে থাকার অনুরোধ করতেও ইচ্ছে করছে না। বেচারা সারাদিন খাটাখাটনি করে এসেছে। ওর চাকরীটা আসলেই বেশ পরিশ্রমের। ছেড়ে দিতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু প্রথম বলে কথা…

 

ভোর হওয়ার ঠিক আগে আগে নিহালের ঘুম ছুটে গেলো। নিবির দিকে তাকিয়ে দেখলো, মেয়েটা প্রায় গুটিসুটি হয়ে তার কাঁধে মাথা রেখে ঘুমুচ্ছে। প্রায় বিদ্ধস্ত অবস্থা। নিহালের মনে পড়ে গেলো, নিবি বাসে ঘুমুতে পারে না। ইশ নিশ্চয়ই মেয়েটা সারা রাত চুপচাপ একা একা বসে কাটিয়েছে… নিহালের খারাপ লাগা শুরু হলো হঠাৎ করে।

 

আকাশে একটু একটু করে আলো ফুটে উঠছে। জানালার ফাঁক দিয়ে সেই মায়া আলোর ছটা নিবির চোখেমুখে এসে পড়ছে। নিবি মেয়েটা এত নিষ্পাপ আর লক্ষী, তার কথা ভেবে হঠাৎ বুকের ভেতরটা চিনিচিন করে উঠলো নিহালের। এই মেয়েটাকে ছাড়া সে কিভাবে থাকবে কে জানে!! পেছন দিকে দৌড়ে চলা রাস্তা আর গাছগুলো দেখতে দেখতে নিহালের ভেতর একটা অদ্ভুত অনুভূতির সৃষ্টি হলো……… হতভম্ব ছেলেটার আগে কখোনো এই অনুভূতির উপলব্ধি হয় নি। তার কানে কল্পনার হাজার কোলাহল বাজছে, যেখানে একটাই শব্দ নিবেদিতা হারিয়ে যাবে

 

 

৪.

 

বাস টার্মিনাল থেকে অর্নবের বাসা বেশ দূরে। সকাল সকাল মানুষের হইচই এ জায়গাটা ভরে উঠেছে। নিবির এই কোলাহল বেশ লাগছে। বহু বছর আগে একবার বাবার সাথে এসেছিলো চট্টগ্রাম। তখনকার তুলনায় জায়গাটা বেশ বদলে গেছে। আগে ছিমছাম পাহাড়ঘেরা একটা ছোট্ট নগরী ছিলো। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে নাগরিক যন্ত্রনা এই জায়গাটাকেও ক্ষমা করেনি। তবুও ভালো লাগছে সবকিছু। আজ অর্ণবের সাথে দেখা হবে, এটা ভেবেই তার সবকিছুকে মায়া লাগছে। আপন আপন অনুভূতি চারপাশে। নিজের আনন্দে মেতে উঠতে গিয়ে সে খেয়াল করেনি নিহাল কেমন যেন চুপচাপ হয়ে আছে।

 

 দু’জন দুটো ট্রাভেল ব্যাগ কাঁধে নিয়ে একটা রিকশা ডেকে তাতে চড়ে বসলো। এখানকার রাস্তায় রিকশা চড়ায় বেশ মজা। সকাল সকাল রাস্তার জ্যাম এখোনো জেঁকে বসে নি। টুংটাং শব্দ করে রিকশাটা এগিয়ে যাচ্ছে।

অর্ণব প্রায় শহরের শেষ মাথায় থাকে। ওর বাসার সামনে এসে রিকশাটা থামলো। নিবেদিতা দৌড়ে চলে গেলো সামনের দিকে। হঠাৎ ঢুকে  অর্ণবকে চমকিয়ে দিতে হবে। এটাও নাকি সারপ্রাইজ প্ল্যানের একটা অংশ!!

 

 

নিহালের আর ওদিকে যেতে ইচ্ছে করছে না। ওখানে এখন সে নিতান্তই অনাকাঙ্খিত। আগে কখোনো মনে হয়নি, কিন্তু আজ হঠাৎ অর্ণবকে তার প্রচন্ড হিংসে হচ্ছে। তার প্রতি নিবির অতিরিক্ত আগ্রহগুলো দেখে মেজাজ বিগড়ে যাচ্ছে বারবার। ওদের দুজন কে একান্ত কিছু সময় কাটানোর জন্য একা রেখে সে এলাকাটা ঘুরে দেখতে বের হলো। শহরের বাহিরের দিকে হওয়ায় এখনো গ্রাম গ্রাম ভাবটা রয়ে গেছে এখানে। মানুষগুলো খুব সহজ সরল। বেশ কিছুক্ষণ এদিক সেদিক অর্থহীন ভাবে ঘোরার পর নিহাল বুঝতে পারলো, সে আসলে একই জায়গায় বারবার ঘুরপাক খাচ্ছে। মাথার ভেতর কেবল একটাই শব্দ... নিবেদিতা...

 

ফিরে আসার জন্য ঘুরতেই বেশ কিছু মানুষের জটলা দেখে সে থমকে দাঁড়ালো। রাস্তার ওপর নিবি উপুড় হয়ে পড়ে আছে। মাথা থেকে টুপটাপ করে রক্ত পড়ে পিচঢালা রাস্তাটাকে আরো কালচে করে দিয়েছে। লোকজনের হইচই থেকে বুঝতে পারলো, দৌড়ে রাস্তা পার হতে গিয়ে একটা প্রাইভেট কারের সাথে ধাক্কা খেয়েছে সে।

 

 

চোখটা ঝাপসা হয়ে এলো তার। মাথার ভেতর আবার সেই পুরোনো কোলাহল ফিরে এলো। নিবেদিতা হারিয়ে যাচ্ছে... কিসের উপর দিয়ে উড়ে সে মেয়েটাকে হসপিটাল নিয়ে এসেছে, তা বোধহয় সে নিজেও জানেনা। একটাই চিন্তা ছিলো মাথায়, নিবি কে হারিয়ে যেতে দেয়া যাবে না। এই ছোটখাটো, ঝগড়াটে মেয়েটার মধ্যে তার জীবনপাখি। কিছুতেই তাকে হারিয়ে যেতে দেয়া যাবে না। কিছুতেই না।

 

 

প্রায় ৩৬ ঘন্টা পরে নিবেদিতার জ্ঞান ফিরেছিলো। ততক্ষণে তার পুরো পরিবার এসে পৌঁছে গেছে এখানে। সবার সাথে দেখাসাক্ষাত শেষ হবার পর নিহাল কেবিনে ঢোকার সুযোগ পায়। নিবির ছোট্ট শরীরটা বিছানার সাথে লেগে গেছে। গত কয়েক ঘন্টা বেশ ধকল গেছে এটার উপর দিয়ে।

নিহালকে দেখে শুকনো একটা হাসি দিয়ে বললো:

 

 

-   আমাকে ফেলে চলে গিয়েছিলি কেন গাধা? জানিস আমি কি ভয় পেয়েছিলাম? তুই জানিস না আমার কিছু হলেই আমি তোকে খুঁজি? প্রয়োজনের সময় এভাবে গায়েব হওয়ার অভ্যাস কেন তোর??

 

-   তার আগে বল, তুই ওভাবে দৌড়ে রাস্তা পার হতে গেলি ক্যান? তোর কিছু হলে আমার কি হতো বলতো?

 

-   কি করবো, আমি যে কিছু বুঝে উঠতে পারছিলাম না!! অর্ণবের ওখানে যে আরেকটা মেয়ে ছিলো। ওকে সারপ্রাইজ দিতে গিয়ে যে আমিই সারপ্রাইজড হয়ে গেলাম। অর্ণব বললো, ও যেমন তোর আর আমার মেলামেশাতে বাঁধা দেয় না, আমিও যেন তাদের মেলামেশাতে বাঁধা না দিই। এটা নাকি আজকালকার সমাজের ফ্যাশন! আমি ওকে কত বোঝালাম, তুই শুধুই আমার বন্ধু ও যে কিছুতেই বুঝতে চাইছিলো না!!

 

 

নিহালের খুব ইচ্ছা হলো মেয়েটাকে বুকের ভেতর জড়িয়ে ধরে বলে, কে বলে তুই শুধু আমার বন্ধু? তুই আমার জান পাখি… কিন্তু সে শুধু মুখে এটুকুই বললো-

 

 

-   কেউ যখন বিশ্বাসই করে না, তাহলে শুধু শুধু বন্ধু হয়ে থেকে লাভ কি বল? তার চেয়ে চল বিয়ে করে ফেলি। ঝগড়া করার সময়, কান্না করার সময়, আইসক্রীম খাওয়ার সময়, শপিং করার সময় প্রতিবার নিহাল, নিহাল… বিয়ে করার সময় অন্য কেউ… এটাতো ঠিক না। অর্ণব ব্যাটা জাহান্নামে যাক, তুই আমার কাছেই থাক… আজীবন…

 

 

নিবেদিতা তার কান্নাভেজা বড় বড় চোখ মেলে নিহালের দিকে তাকিয়ে আছে। সেই মায়াকাড়া দৃষ্টিতে ডুবে যেতে যেতে নিহাল ভাবছিলো জীবনটা আসলে ততটা নিষ্ঠুর না। এমন মায়াবী চোখের নিয়ন আলোর অপেক্ষায় একটা জীবন অনায়াসে কাটিয়ে দেয়া যায়……

 

Share