ভালবাসার গল্প

লিখেছেন - -তৃপ্ত সুপ্ত- | লেখাটি 2098 বার দেখা হয়েছে

“গুড মর্নিং পেন্সিল!! কেমন আছিস?”

 

সকাল বেলার প্রথম ম্যাসেজ এটা। সারাদিনের শত ব্যাস্ততার মধ্যেও মানুষটা আমাকে রোজ সময় করে এই ম্যাসেজ পাঠাতে ভোলে না। আমিও রোজ সকালে অপেক্ষায় থাকি, কখন ম্যাসেজটা আসবে… এই ম্যাসেজটা পেয়েই আমার দিন শুরু হয়। আর যদি কোনদিন ভুল করেও এটা না আসে, আমার সারাদিন প্রচন্ড খারাপ যায়। একটু পর পর ফেইসবুকে লগ ইন করি… বারবার তার ওয়ালে যাই, দেখি সকাল থেকে তার কোনো কর্মকান্ড আছে কি না? যদি দেখি সে আছে… প্রচন্ড অভিমান হয়… নিজ মনেই গাল ফুলিয়ে বসে থাকি, ভাবি সব্বার জন্য সময় আছে, কেবল আমাকেই ভুলে যাওয়া হয়েছে, হুহ!!

 

 

আর যদি সেখানেও খুঁজে না পাই, তবে মোটামুটি ভুমিকম্প হয়ে যায় মনের ভেতর… টেনশনে পড়লে মেজাজ ঠিক থাকে না, অযথা বাসার পিচ্চিগুলোর সাথে চেচামেচি করি, ছোট বোনটার সাথে অকারণে ঝগড়া বাঁধিয়ে দিই। বললে বিশ্বাস করবেন না… এই বুড়ো বয়সে আমি ফ্যাচফ্যাচ করে কাঁদি…আমার কান্না আবার বিখ্যাত কান্না, চুপচাপ কাঁদতে পারি না। ঘর মাথায় তুলে কান্নাকাটি করি। ভাইগুলো ভয়ে ভয়ে রুমের মধ্যে উকিঝুকি মারে, আম্মু পর্যন্ত চিল্লাচিল্লি থামিয়ে কিছুক্ষণ পর পর জানতে চায়, “তোর সেই বিশেষ ম্যাসেজ কি এসেছে??”

 

তারপর যখন সেই মানুষটা একটু করে আমাকে বলে, “কিরে বুড়ি… কি খবর তোর? খিদে পেয়েছে, খেতে দে…” ব্যাস অমনি আমি আর অভিমানটুকু মনে ধরে রাখতে পারি না। এমন গাধা থুক্কু গাধী আমি, একবারও মন খুলে ঝগড়া করতে পারি না।

 

অনেকক্ষণ ইতং বিতং লিখে ভূমিকা করলাম। এটা নাকি গল্প লেখার বিশেষ কায়দা। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত গল্পের মূল কাহিনী নিজের কাছে রাখতে হবে… পাঠক কে বিরাট ভাবনা চিন্তার মধ্যে ফেলে দিতে হবে। টানটান উত্তেজনা বিরাজ করবে সবার মধ্যে। সবাই পড়তে পড়তে ভাববে এরপর কি হতে পারে?? ভাবতে ভাবতে কাহিনী এগিয়ে যাবে সামনের দিকে। তারপর লেখার শেষভাগে এসে লেখক গুটিবাজী করবেন, মানে টেক্কার দান চালবেন। পাঠক স্তব্ধ হয়ে ভাববেন, এটা কি হলো!!! অথবা কেউ কেউ চোখের পানি ধরে রাখতে পারবেন না। আবার কেউ কেউ গম্ভীর হয়ে মাথা দুলাতে দুলাতে বলবেন, বাস্তবে এমন হয় না!! এইসব উক্তি যে লেখক পাননি, তিনি আসলে কোন লেখকই না। আর যদি দেখেন  নাহ, আপনার গল্প এসব কমেন্ট অর্জন করতে পেরেছে, তার মানে আপনি হিট থুক্কু আপনার লেখা হিট(আমার গবেষনা লব্ধ জ্ঞান, একমত হলে ভালো, না হলে আরো ভালো। তবে কেউ প্রতিবাদ করতে চাইলে আমি লেখক মানে লেখিকা কোনভাবেই দায়ী নই)

 

যাই হোক মূল বিষয় থেকে ১০০ হাত দূরে চলে এসেছি। আবার শুরু করি। উপরে যে ভদ্র লোকের কথা বর্ণনা করা হলো, নিশ্চয়ই তার পরিচয় জানার জন্য আপনাদের মনটা আঁকুপাকু করছে তাই না? পেরেছি আগ্রহ ধরে রাখতে? লেখক হিসেবে আমি সফল কিনা বলেন, হুহ?

 

ভদ্রলোক হলো আমার প্রিয় ভাইয়া। আমার অন্নন্নন্নেক প্রিয় জয়দা। কি হতাশ হলেন? বয়ফ্রেন্ড ভেবেছিলেন?? না বাবা… এইসব প্রেম কাহিনীর মধ্যে আমি আর নাই। বিরাট কষ্ট এক একটা প্রেম কাহিনী লেখা। যে পারে সেই লেখুক। আমি পারবো না :/

 

আমার গল্প আমার প্রিয় ভাইয়াকে নিয়ে। কিছু কিছু মানুষ আছে না, যারা প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত সৌভাগ্য নিয়ে পৃথিবীতে আসে? আমি মনে হয় সেই রকম একজন। না চাইতেই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সম্পদটা আমার হয়ে গেছে। আমার এখন একজন বড় ভাইয়া আছে, যে আমাকে অনেক ভালোবাসে। আমি এখন আমার সেই ভাইয়ার গল্প আপনাদের শোনাবো।

 

বংশের প্রথম সন্তান হওয়ার যে কি যন্ত্রনা, তা আমি হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি। পিচ্চিপিচ্চি একপাল ছেলেমেয়ে আপু আপু করে কান ঝালাপালা করে ফেলে অথচ আমার আপু ভাইয়া ডাকার মতো কেউ নেই!! এই দুঃখ কোথায় রাখি!! কাউকে ঝগড়াটে মুখ করে বলতে পারি না, ভাইয়া আজকে চকলেট না দিলে কিন্তু তোর শার্ট ধুয়ে দেবোনা। কারো সাথে আহ্বলাদ করে বলতে পারি না আপুনি, তোর লাল জামাটা আমি একদিন পড়ি? সাথে তোর ব্যাগ আর জুতোটাও নেবো কিন্তু… সে কি দুঃখ, সে কি দুঃখ… কেবলমাত্র বংশের বড় সন্তান যারা আছেন তারাই বুঝবেন…

 

এরকম এক দুঃখের দিনে আমার মতো গাধী মেয়ের লেখক হওয়ার ইচ্ছা জাগলো। লুতুপুতু টাইপ এক গল্প লিখে মেইল করে দিলাম বিখ্যাত “ভালবাসার গল্প” নামক পেইজে। আহা কি সেই উত্তেজনা!! দিনের ভেতর ৪০-৫০ বার পেইজ রিলোড দিয়েই যাচ্ছি, দিয়েই যাচ্ছি… প্রতিটা কমেন্টে মনে আনন্দের জোয়ার বয়ে যাচ্ছে। হুহ, আমিও এখন লেখক :D

 

গল্পের বিষয়বস্তু ছিলো একটা ঝগড়াটে মেয়ের গল্প। সব্বাই প্রশংসা করছে, আমার তো খুশীতে আইঢাই অবস্থা। এমন সময় বিড়ালের ছবি প্রোপিক দেয়া একজন কমেন্ট করে, “ঝগড়াটে মেয়েটার সাথে ঝগড়া করতে ইচ্ছা করছে” এই কমেন্ট পড়েতো আমারতো রীতিমতো টাশকিজনক অবস্থা। আমি ভাবি “ব্যাটা বলে কি??? চেনা নাই জানা নাই, ঝগড়া করতে চায়!!!” যাই হোক আমি নব্য লেখক, কি মনে করে খুশীতে বাকুম বাকুম করতে করতে দুম করে এই ভদ্রলোককে একখানা বন্ধু হওয়ার অনুরোধনামা পাঠিয়ে দিলাম। ওম্মা দেখি এক্সেপ্টও হয়ে গেছে।

 

এই হলো জয়দার সাথে আমার ফেইসবুক বন্ধুত্বের শুরু। ভার্চুয়াল এই মেকী মেকী আবেগী দুনিয়া আর ফেইক আইডির যুগে আমি কি করে যেন কিছু চমৎকার মানুষের সাথে জড়িয়ে গেছি। এক গাদা পিচ্চিকাচ্চা সকাল না হতেই আমার ওয়ালে এসে কিচির মিচির শুরু করে দেয়… পাখির ছানাপোনার মত ঝগড়াঝাটি করে আবার আমাকে বিচার দেয়। আমি গম্ভীর হয়ে তাদের অভিযোগ শুনি আর বিচার করি। যদিও বেশিরভাগ সময়ই সঠিক বিচার করতে পারি না, পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে যায়… তবে এই ছানাপোনাদের দলে সবার আগে হলো আমার জয়দা… এত বেশি কিচমিচ করে যে বোঝাই যায় না আসলে সবার মধ্যে ছোট কে?

 

রোজ রোজ মজার মজার খানাদানার ছবি আপলোড দিয়ে সবাইকে লোভ লাগিয়ে দেবে… আমার ধারণা ওর লিষ্টির সবাই ওর ওপর বিরাট খেপা। এতসব ভালো ভালো আইটেম কেউ যদি দেখিয়ে দেখিয়ে খায় তবে না খেপে উপায় আছে বলেন? দুই মিনিট পর পর পেন্সিল খিদে পেয়েছে… খিদে পেয়েছে… পাটকাঠির মত দেখতে একটা মানুষ এত কিভাবে খাই খাই করে, এটা একটা বিরাট রহস্য!!

 

আর রোজ রোজ এর সাথে তার, তার সাথে এর ঝগড়া বাধানোর ফন্দী খুজবে। পিয়াল(বিখ্যাত লেখিকা রাহনুমা কুমকুম) কে খেপাবে ইনা আর কিমুর কথা বলে, আবার ইনাকে(আরেক বিখ্যাত লেখিকা নাজমুন নুসরাত) তো রোজ রোজ নিত্য নতুন নাম না দিলে তার হবেই না। আমরা সবাই রোজ তার সাথে ঝগড়া করতেই থাকি, কিন্তু সবাই জানি… এই পাগল পাগল মানুষটাকে আমরা ভীষণ ভীষণ ভীষওওওওওওণ ভালোবাসি।

 

এতক্ষণ ধরে প্রশংসা করলাম। এবার একটু বদনাম করি? গল্পে নেগেটিভ পার্টতো থাকতে হবে নাকি?

 

এই টম বিড়ালের প্রোপিকওয়ালা ভদ্রলোক মাঝে মাঝেই দুম করে অসুস্থ হয়ে যান। কখোনো জ্বর, কখোনো রক্তে হিমোগ্লোবিন কমে যাওয়া। এই যেমন সেদিন অন্যমনষ্ক হয়ে রাস্তা পার হতে গিয়ে বাসের সাথে ধাক্কা খেয়ে চিৎপটাং হয়ে বিছানায় পড়ে আছেন দুদিন ধরে। কিছু বলতে গেলেই শুধু ফিকফিক করে হাসে। মায়ের হাতের পিঠা চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে গেলে আমরা যেমন অপরাধীর হাসি দিতাম পিচ্চিবেলায়? তেমন হাসি। বকা দিতেও মায়া লাগে তখন।

 

বাকিদের কথা জানি না, ভাইয়া অসুস্থ হলে আমার তখন দম বন্ধ হয়ে আসে। এখানে সারাদিন আমি নানা কাজকর্মে নিজেকে মাতিয়ে রাখি ঠিক, কিন্তু মনটা পড়ে থাকে সেই সুদূর অষ্ট্রেলিয়ায়… ওখানে কোন একটা দুই কামরার ঘরে আমার ভাইটা পড়ে আছে একা একা অসুস্থ হয়ে, কিছু হলে হঠাৎ দেখার কেউ নেই… এই ভেবে বার বার আমার চোখ ভিজে আসে। বোকার মতো প্রাথনা করি, ভাইয়ার অসুখটুকু আমার হোক, তাও ও অনেক ভালো থাকুক… সবসময়।।

 

তারপর আবার যখন দুষ্টু বেড়াল একটু সুস্থ হয়ে ফিরে আসে, আমরা আবার মেতে উঠি খুনসুটি আর ঝগড়াঝাটিতে… ভার্চুয়াল এই জগতটাকে আমার আবার তখন রঙিন মনে হয়… আবার ছোট্ট পিসির স্ক্রিনে চোখ রেখে ভেসে বেড়াই প্রিয় মানুষগুলোর মনে…

 

এতক্ষণ যারা আমার লেখাটুকু কষ্ট করে হজম করেছেন, তারা নিশ্চয়ই আমার ওপর খুব বিরক্ত হয়ে গেছেন?। এসেছেন ভালবাসার টক মিষ্টি গল্প পড়তে, আর আমি কি এক আত্মকথন চালিয়ে যাচ্ছি তাইনা? আপনাদের হতাশ করার জন্য আমি অত্যন্ত দুঃখিত। আমার এই ভাইটার প্রতি ভালোবাসাগুলো আমি বাক্সবন্দী করে রাখতে চাই বারবার। কিন্তু পারি না। আমি অনেক বোকাসোকা মেয়ে। কারো কাছে একটু ভালোবাসা পেলে সেটা হাজার গুণে ফিরিয়ে দিতে ইচ্ছে করে। সেই ভালোবাসার প্রকাশ ঘটাতে গিয়ে আপনাদের কিছুটা সময় নষ্ট করে ফেললাম… ভালবাসার গল্প পেইজের জন্মদিন উপলক্ষে কিছু লেখার কথা ছিলো, ভাবলাম বানানো গল্প তো প্রতিবারই লিখি। এবার নাহয় আমার, আমাদের ভালোবাসার গল্পটুকুই লিখি!!

 

শুভ জন্মদিন ভালোবাসার গল্প…

Share