অসমাপ্ত রঙিন স্বপ্ন

লিখেছেন - -তৃপ্ত সুপ্ত- | লেখাটি 2246 বার দেখা হয়েছে

একটা ছেলে, বোকা… বেশ বোকা। একটা মেয়ে, চঞ্চল… ভীষণ চঞ্চল। ছেলেটা মেয়েটা ভালোবাসতো, একজন অন্যজন কে… খুব ভালোবাসতো। রোজ নিত্য নতুন স্বপ্ন বুনতো… স্বপ্নালু চোখে। ভালোবাসার রঙিন স্বপ্ন বোনার শুরু কবে, দিনক্ষণ কেউ হিসেব করে রাখেনি। শুধু এটুকু জানা ছিলো কৃষ্ণচূড়া ঝরা হলুদাভ পথে ছেলেটা অপেক্ষায় থাকতো, মেয়েটার জন্য রোজ রোজ… পলাশের লালিমা গায়ে মেখে মেয়েটা পায়ে পায়ে সঙ্গী হতো প্রিয়তার… মেয়েটা কথা বলতেই থাকতো, বলতেই থাকতো… বোকা ছেলে মেয়েটার শব্দগুলোকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখতো গভীর মমতায়, ভালোবাসায়… মেয়েটার হাসির রিনিঝিনি শব্দে ছেলেটা মন ভেজাতো, আর মেয়েটা পরম নির্ভরতায় হাত রাখতো প্রিয়তার হাতে…

 

দিন পেরিয়ে রাত এলে, মেয়েটা বিছানায় গা এলিয়ে মেতে উঠতো মুঠোফোন আলাপচারিতায়, প্রিয়তার সাথে। ছেলেটা একা একা অন্ধকার মাঠে প্রিয়ার কানে কানে বলতো ভালোবাসার কথা। চেনা জানা একই গল্প রোজ রোজ বলে উঠতো ভিন্ন সুরে। মায়া খুনসুটিতে মেতে উঠতো হররোজ… তাতে কি!! দুজনারই জানা ছিলো ভালোবাসাটুকু মিথ্যে নয়। খুনসুটি কেবল চাদর মাত্র, ভালোবাসার চাদর।

 

পাওয়া না পাওয়া স্বপ্নগুলোর গল্প, আগামী ভবিষ্যত ইচ্ছে গুলোর গল্প… রঙিন বাড়ি, রঙচঙা দেয়ালিকার গল্প… ছোট্ট ছোট্ট পরীর গল্প… দেবদূত শিশুর টানাটানা চোখের কাব্য… আটপৌরে বিকেলে চায়ের পেয়ালায় ভালোবাসাকে খুঁজে নেয়ার গল্প… এই জোড়া ছেলেটি-মেয়েটি বেশ স্বপ্নবাজ। শুধুই ভবিষ্যত স্বপ্নে ডুব দিতে চাইত কেবল। সাধারন ভালোবাসাকে অসাধারণ ভাবে উপভোগ করতে চাইলে এদের দেখো তোমরা।

 

একমুঠো বাদামে, এলোমেলো ভাবে রাস্তায় হেঁটে যাওয়া বিকেলে ভালোবাসা খুঁজে পেতো এরা। কাকের চোখেও নাকি মায়া আছে, মেয়েটা বলেছিলো একবার। এরপর থেকে কাক দেখলে নিজের অজান্তেই হেসে উঠতো ছেলেটা। প্রিয়াকে মনে পড়ে যেত কেবল। এসব অবশ্য ছুঁতো মাত্র। মেয়েটা সবসময়ই থাকতো ছেলেটার মনে। আর মেয়েটা ক্লাস পরীক্ষার ফাকে মুঠোফোনে সঙ্গী হতো প্রিয়তার… এদের বেশ মজার জীবন। ভালোবেসে ক্লান্ত হতে দেখিনি দুজনের কাউকে কখনো!!

 

ছেলেটার মাকে মামণি ডাকতো মেয়েটা। সবসময় বলতো, তোমার মা কিন্তু আমার মামণি… এই ডাকটা মেয়েটার কেন জানি খুব প্রিয় ছিলো… ছেলেটাও হেসে অনুমতি দিয়েছিলো। বলেছিলো “তোমার মা, তুমি যা খুশি ডাকো, আমি বলার কে?!!” এরপর থেকে আমি মেয়েটার মুখে কতশত বার এই ডাকটা শুনেছি…

 

ছেলেটা খুব শান্ত স্বভাবের। কারুর সাথে রাগ করতে দেখিনি আমি কখোনো তাকে। চুপচাপ… আত্মভোলা। মেয়েটা খুব খেপে যেতো মাঝে মাঝে। রেগে কাই হয়ে বলতো “কেন এত চুপ থাকো? কেন কাউকে বলো না, কতটা ভালোবাসো আমাকে?” ছেলেটা খুব হাসতো শুনে। বলতো, ভালোবাসি এটা কি জানানোর ব্যপার? এটা উপলব্ধি করা যায় কেবল… যেমনটা তুমি করো, আমি করি। নাই বা জানলো লোকে, নাই বা হলাম সেরা জুটি সবার চোখে। আমার চোখে তুমিই সেরা… এটাই কি যথেষ্ট নয়??

 

মেয়েটা খুব অবাক হতো!! চিমটি কেটে দেখতো গায়ে, স্বপ্ন হয় যদি সব? যদি ঘুম ভাঙলেই ফুরিয়ে যায়??? সে যে খুব সাধারণ একজন। এত বেশী তার প্রাপ্য কি? স্বপ্নের মতো দিনগুলো বয়ে চললো… এক লহমায় দিন থেকে রাত... রাত থেকে দিন… মাস বছরের হিসেব বাড়লো… স্বপ্নগুলো বাড়তেই থাকলো… বাড়তেই থাকলো। ঝাপি ভর্তি স্বপ্ন, লাল নীল কালচে লালচে…… বাস্তব স্বপ্ন…

 

তারপর একদিন মেয়েটার বউ সাজার সখ হলো খুব। প্রিয়তার চোখে চোখ রেখে দেখা স্বপ্নগুলো বাস্তব করার বড়ো সখ ছিলো মেয়েটার। প্রতিবারের মতো এবারও মেয়েটা প্রিয়তাকে ছুঁয়ে বলে উঠলো বউ সাজতে চাই… নেবে আমায় তোমার উঠোনে? তোমাদের ওই শিউলী গাছটা রোজ সকালে উঠোনটাকে সাজিয়ে দেয়… আমার যে খুব মালা গাঁথার শখ!! শিউলী বোটার কমলা রঙে হাত রাঙাবার শখ!! নেবে আমায়, বলো??

 

প্রিয়তা আর কিইবা বলতে পারে? দুজনের যে এক কঠিন পণ ছিলো!! বাবা মাকে কষ্ট দেবেনা কখনো… সংসার সাজাবে, তবে প্রিয়মুখগুলোর হাসিমাখা স্মৃতি সঙ্গে নিয়ে। প্রিয়তা তাই হেসে বলে, একটু সবুর করো… তোমার মামণিকে জানাই আগে, বাবাকে বলুক এবার!!

 

হায়… এই কঠিন পণের পরিনতি যদি জানতো তারা! প্রিয়া যে খুব সাধারণ, আটপৌরে একজন… প্রিয়তার বাবা কি করে মেয়েটাকে ছেলের সঙ্গী হিসেবে মেনে নেবেন?? মেয়েটা তো রাজকন্যা নয়? সুন্দরী, রুপবতী নয়!! প্রিয়তার পাশে কি মানায় তাকে? ছেলে ভুল করতে পারে, তাই বলে তিনি কি করে মেনে নেবেন সেটা??

 

সেই প্রথমবার শান্তশিষ্ট ছেলেটাকে আমি চেঁচাতে শুনেছিলাম। খুব অসহায় লাগছিলো তাকে। সে জানতো, তার সব সব সব স্বপ্নগুলো ভেঙে যাচ্ছে তাসের ঘরের মতো। প্রিয়ার ভেতরের সৌন্দর্যটুকু তার বাবা দেখতে পাচ্ছেন না। ছেলেটা কাঁদলো… চেঁচিয়ে… কিন্তু তার বাবা অন্য ধাতুর তৈরী ছিলেন… কিছুতেই মেয়েটাকে মেনে নিলেন না, অনুমতি দেননি শিউলী বোটায় হাত রাঙানোর…

 

ব্যাপারটা জেনে প্রিয়া খুব কষ্ট পেয়েছিলো। কিন্তু তবুও মেনে নিয়েছে সে হাসিমুখে। বাবা মা যে বড় প্রিয়… ভালবাসার, শ্রদ্ধার... স্বপ্নভঙ্গের যন্ত্রণায় পিষ্ট হলো রোজ রোজ… কিন্তু তবুও চায় নি, বাবা কাঁদুক… মায়ের বুক খালি হোক… প্রিয়তা হারিয়ে গেলো জীবন থেকে।

 

নীল পাতার খামে একটা চিঠি লিখেছিলো প্রিয়তাকে…………

 

“প্রিয়তা,

 

অনেক ভালোবাসি তোমায়। তারচেয়েও বেশি সম্মান করি তোমার ভালোবাসাকে। আমার জীবনে বিশাল কোন পূণ্য ছিলো, তোমায় পেয়েছি। পেয়েছিলাম বলবো না, কারণ তুমি এখনো আমার। মৃত্যুর পূর্বদিন পর্যন্ত আমারি থাকবে। হয়ত তোমার নামের পাশে কখনো আমার নামটা লেখা হবে না, তবুও তুমি আমারি কেবল… কিছু কিছু ফুল ফুলদানিতে সাজানো যায় না। আমাদের স্বপ্নগুলোও তেমনি বাস্তবের ফুলদানিতে সাজানো হলো না। তাতে কি!! মনের কোণে সাজিয়ে নিয়েছি, মহাকাল ব্যাপি অমলিন থাকবে।

 

অসাধারণ একজন মানুষ আমার প্রতিটা রক্তকণার সাথে মিশে আছে। এই নিষ্ঠুর জগতে সেই একমাত্র, যাকে নিশ্চিন্ত মনে ভালোবাসা যায়। তার জীবনে সবচেয়ে নিষ্ঠুরতম মানুষটা হয়ত আমি, তার প্রতিটি অশ্রুকণার জন্য দায়ী আমি। তবুও প্রতিবার সে আমাকে জড়িয়ে নিয়েছে পরম আবেগে।

 

জানি আর কিছু হওয়ার নয়। জানি গন্ডির বাহিরে যাওয়ার ক্ষমতা বিধাতা ভুল করে আমাদের দুজনকেই দিতে ভুলে গিয়েছেন। জানি কখনো খোলা ছাদে মাদুর পেতে দেখা হবে না বিশাল আকাশ, গোনা হবেনা অগনিত নক্ষত্র। তবুও জেনে নিও প্রিয়, ভালোবাসাটুকু মিথ্যে নয়। এতটা ভালো কাউকে কোনদিন বাসিনি।

 

তোমাকে প্রথম দেখার দিনটা এখনো মন জুড়ে রয়ে গেছে। চোখ মুদলেই ভেসে ওঠে মনের পর্দায়, বায়োস্কোপের মতো। কি বোকাটাই না ছিলাম তখন। ভাবতেই অবাক লাগে! সিধাসাধা গোছানো মেয়ে হতে পারিনি কখনোই। অনেক অগোছালো এই কুৎসিত দেঁতো আমাকে কি মায়াবলে এত আপন করে নিয়েছিলে, বলবে? আমি জানি, বন্ধুদের আড্ডায় কখনো মুখ উঁচু করে বলতে পারোনি, আমার সে খুব সুন্দরী। বেশ খাড়া খাড়া নাক চোখ, রুপবতী, কেশবতী। আচ্ছা, কখনো কি ইচ্ছে হয়নি এমনটা বলার? মনে কি জাগেনি, সাধ? কি করে পারো এত মহান হতে? 

 

তোমার সাথে যে ক’টা দিন ছিলাম, স্বপ্নও বুঝি এতটা সুন্দর হয় না!! আমি এখনো চোখ বুজে তোমার ভালোবাসার তীব্রতাটুকু অনুভব করতে পারি। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, তুমি আমাকে আমার চেয়েও বেশি ভালো বেসেছো। কিন্তু ওই যে, অতি সুখ সবার সয় না!! আমারও সয় নি। আমি হারিয়ে যাচ্ছি তোমার জীবন থেকে।

 

যাওয়ার আগে একটা ছোট্ট অনুরোধ করি। যা কিছু হলো, তার জন্য বাবা মামণিকে কখনো দায়ী করো না। ওদের চেয়ে আপন পৃথিবীতে আর কেউ নেই আমাদের। অনেক ভালোবাসেন তোমাকে… আমাকে। ভালোই চান সবসময়। শুধু চাওয়াগুলো মেলাতে পারিনি আমরা… আমাদের দুটি প্রজন্মের চাওয়া পাওয়ার ঘাটতিটুকুকেই বোধকরি নিয়তি বলে। খুউব ভালো থেকো… ভালোবাসি…

 

প্রিয়া”

 

 

তারপর প্রিয়া হাসলো, ভাসলো প্রিয় মানুষগুলোর জন্য। নিজের জন্য আর বাঁচেনি কখনো, সাজেনি আর প্রিয়তার জন্য। সোনার কাঠির ছোঁয়ায় কোন এক অদৃশ্য জাদুকর প্রিয়ার স্বপ্নগুলোকে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছিলো, প্রিয়তা আর আসেনি রুপোর কাঠি নিয়ে…

 

ভাবছো নিশ্চয়ই প্রিয়তার কি হলো?? সে বড় কষ্টগাঁথা। ছেলেটা যে খুব বোকা ছিলো। হৃদয় ভর্তি ভালবাসা ছিলো, শুধু প্রিয়া ছিলো না পাশে… রাঙা পলাশের শোভা, কৃষ্ণচূড়ার রঙিন আবেগ আর সইতে পারে নি বোকাটা… হারিয়ে গেলো, ফুরিয়ে গেলো দিনে দিনে, নিজের অজান্তেই…

 

এভাবেই কিছু রঙিন স্বপ্ন অসমাপ্ত থেকে যায়…………………………

 

(আজকাল প্রায়ই ধোঁকার কথা, প্রতারণার গল্প শুনি। কারো কারো নাকি ভালোবাসা ফুরিয়ে যায়… টানটুকু নষ্ট হয়ে যায়। সেই ফুরিয়ে যাওয়া টানটুকু কি ভালোবাসা ছিলো আদৌ? ভালোবাসার মানুষটাকে কি কেউ ঘৃণা করতে পারে? ভুলে যেতে পারে? সত্যি এও কি সম্ভব?? ভালোবাসার মত পবিত্র একটা জিনিসকে মোহ’র সাথে গুলিয়ে ফেলবেন না। সত্যিকার ভালোবাসা কখনো ফুরায় না… বাড়তেই থাকে, বাড়তেই থাকে।

 

দুজন মানুষ নিজের সর্বস্ব দিয়ে একজন অন্যজনকে ভালোবাসে, অথচ নানা প্রতিকূলতায় এক হতে পারেনি, এমন কাউকে দেখেছেন কখনো? কষ্টটাকে, একটু কাছে পাওয়ার আকূলতাটুকু অনুভব করতে পারেন? তাদের চোখের কান্নাবৃষ্টিগুলোকে অনুভব করতে পারেন? সে যন্ত্রণাটুকু বিধাতা কারো শত্রুকেও যেন কখনো না দেন…)

 

Share