ধূসর স্বপ্নের খন্ডচিত্র

লিখেছেন - -তৃপ্ত সুপ্ত- | লেখাটি 732 বার দেখা হয়েছে

১.

কদিন ধরে মন মেজাজ ভীষণ খারাপ শান্তার…. প্রতি রাতে দুঃস্বপ্ন দেখে ঘুম ভাঙা, আর বাকি রাত নির্ঘুম ঘরময় পায়চারী ইদানিং তার নিয়মিত ঘটনা। স্বপ্নগুলো এত অদ্ভুত যে কাউকে বলাও যায়না… রাতে যেটা ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন, দিনে সেটা ব্যাখ্যাহীন এলোমেলো….

 

একটা ভাঙা চশমা, এলোমেলো শাড়িতে পা জড়িয়ে যাওয়া উদাসীনী মেয়ে, আবর্জনায় পড়ে থাকা কিছু রং হারানো চুড়ি….. অপরিচ্ছন্ন ঘর…. ধূসর আর ছাল ওঠা দেয়াল… এগুলোই হলো শান্তার অদ্ভুতুড়ে স্বপ্নের খন্ডচিত্র। খুব সাধারণ দৃশ্য, কিন্তু পুরো ব্যপারটায় কেমন যেন নিঃসঙ্গতা আর সব হারানোর কান্না আছে….

 

মেয়েটাকে খুব পরিচিত লাগে শান্তার। কি যেন কি বলতে চায় ঠোঁট নেড়ে। কিন্তু ভাষাগুলো শব্দহীন, অস্পর্শী। শান্তা বালিশে মাথা চেপে ধরে। ঘুমের মাঝেই হাতটা বাড়ায়। কিন্তু মেয়েটা পালিয়ে যায় বারবার, প্রতিদিন। স্বপ্নশেষে কিছুতেই এলোমেলো স্মৃতির গাঁটগুলো মেলাতে পারেনা সে… এই ব্যাখ্যাহীন স্বপ্নগুলোর যন্ত্রনায় শান্তার জীবন দূর্বিষহ হয়ে উঠেছে।

 

আজকাল ঘুমুতে যেতেও ভয় লাগে তার। জেগে থাকা মুহূর্তগুলোতেও হতচ্ছাড়া স্বপ্নগুলো পিছু ছাড়েনা। চোখ বুজলেই চোখে ভেসে ওঠে সব। শান্তা পালিয়ে বাঁচতে চায়, কিন্তু স্বপ্নটা ওকে চেপে ধরে। আষ্টপৃষ্ঠে জড়িয়ে ফেলে। তার মনে হচ্ছে আর কিছুদিন এভাবে থাকলে হয়ত পাগল হয়ে যাবে সে….

 

২.

বাবার সাথে শান্তার যোগাযোগ খুব কম। একই ঘরে থেকেও দুজন মানুষের মধ্যে কয়েক আলোকবর্ষ দূরত্ব। শান্তা তার বাবাকে যতটা ঘৃণা করে ততটা আর কাউকেই কোনদিন করেনি…. প্রত্যেকটা মানুষ নাকি তার পিতৃ পরিচয় নিয়ে গর্ববোধ করে। অথচ সে তার জ্ঞান হবার পর থেকে এই বাবা নামক মানুষটাকে কেবল ঘৃণাই করে এসেছে। পিতৃপরিচয় পরিবর্তনের কোন উপায় যদি থাকতো, শান্তা অবশ্যই তার এই পরিচয়কে মুছে ফেলতো। এমনভাবে মুছতো যেন কেউ কখোনো জানতে না পারে, আহসান মারুফ নামক মানুষটার সাথে তার কোন সম্পর্ক আছে।

  

শান্তার বান্ধবীরা যখন তাদের বাবাদের কথা বলতো, তাদের চোখেমুখে কেমন যেন দ্যুতি ফুটে উঠতো। অথচ শান্তা কখনো এই অদ্ভুত অনুভূতির দেখা পায়নি। কখনো নিজের বাবাকে নিয়ে গর্বিত দুটো শব্দ উচ্চারণ করতে পারেনি। তার খুব অনুভূতিগুলোকে ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে হয়। বাবাকে নিয়ে গর্ব করতে কেমন লাগে, তা জানতে ইচ্ছে হয়।

 

এমন নয় যে আহসান সাহেব শান্তাকে অন্য কোন বাবার চেয়ে কিছু কম ভালোবাসেন। বুক উজাড় করা ভালোবাসা দিয়েও তিনি মেয়ের ভালোবাসা আদায় করতে পারেননি… তার বিশাল ধনসম্পদ, অথচ মেয়ের এসবের প্রতি বিন্দুমাত্র লোভ নেই… অবহেলায় ঘৃণাভরে সব দূরে ঠেলে দিয়েছে বারবার….

  

নিজ মেধায়, পরিশ্রমে সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে ইদানিং দরিদ্র শিশুদের লেখাপড়া শেখানোর জন্য একটা স্কুল খুলেছে। সকালে বাচ্চাদের, আর সন্ধ্যায় ওখানটায় বয়স্ক শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হয়। সারাদিন এই স্কুলটা নিয়েই মেতে থাকে শান্তা। যত আশা, স্বপ্ন সব একে ঘিরে।

  

এই ছোট ছোট বাচ্চা গুলোই শান্তার জীবন। এদের হাসির উষ্ণতায় সে প্রতিদিন সুখসাগরে অবগাহন করে। ছোট ছোট ইচ্ছাপূরণে যে রৌদ্রালোকিত প্রতিবিম্ব এদের চোখেমুখে খেলা করে, তা দেখেই বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা পায় শান্তা।

  

এই স্কুলটা দাঁড় করাতে তাকে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। বাচ্চাগুলো নিতান্তই পথশিশু। রাস্তার মোড়ে ভিক্ষে করা, পকেটমারি, এছাড়া ছোটখাট নানা বেআইনী কাজে এরা বিশেষ পারদর্শী। এদেরকে লেখাপড়ার গুরুত্ব বোঝাতে ভীষণ কষ্ট হয়েছে শান্তার। প্রথম প্রথম খুব যন্ত্রনা করতো। কিছুতেই পড়তে চাইতো না। নানাভাবে লোভ দেখিয়ে পড়াতে হত। তবে এখন ওসব ঝামেলা সামলে নেয়া গেছে। এখন ওরা নিজ আগ্রহেই স্কুলে আসে।

  

শান্তা এই বাচ্চাগুলোকে ভীষণ ভালোবাসে। এদের মুখের দিকে তাকিয়েই দুঃসহ অতীত ভুলে থাকার চেষ্টা করে সে। সেই অতীত যা তার ভালোবাসার মানুষটাকে পর করে দিয়েছিলো….

  

৩.

তখন সে মাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। পৃথিবীটা অনেক রঙিন। ইচ্ছেগুলো স্বপ্নের ফানুশে উড়ে ভুবন মাতিয়ে বেড়ায়। শান্তা ওর নামের মতোই শান্ত চিরকালই। অথচ সেই শান্ত মেয়েটাই উচ্ছলতার নতুন রঙে রাঙিয়েছিলো নিজেকে। অকারন হইচই, বন্ধু বান্ধবের সাথে বিশ্ব জয় করার স্বপ্ন দেখা… প্রথম যৌবনের সেই উদ্দাম দিনগুলোয় আসিফ আসে শান্তার জীবনে। বন্ধুত্ব ভালোবাসায় মেতে ওঠে দুজন।

 

আসিফের সাথে প্রথম দেখা হয়েছিলো ২১শের প্রভাফেরীতে। একটা সংগঠনের পক্ষ থেকে প্রভাতফেরীতে গিয়েছিলো দুজনেই। এরপর বৈশাখী র্যালীতে, মেলায় কিভাবে যেন বারবার দেখা হয়ে যেতে লাগলো। আসিফের ব্যক্তিত্ব, হার না মানা স্বভাব, সততা শান্তাকে মুগ্ধ করতো। ধীরে ধীরে বন্ধুত্ব… কখন যে দুজন একে অন্যের প্রাণের স্পন্দন হয়ে গেছে, টেরই পায়নি কেউ….

 

শান্তার দেশের প্রতি, দেশের মানুষের প্রতি মমত্ববোধই আসিফ সবচেয়ে ভালোবাসতো। দুজন মিলে দেশগড়ার সংকল্প নিয়েছে নিত্যদিন। অথচ সেই আসিফই যখন সত্যটা জানতে পারলো, শান্তা তাকে আর বেঁধে রাখতে পারেনি। মায়ার বাঁধন ছুটে গিয়েছিলো নিমেষেই….

 

খুব অবাক হয়েছিলো শান্তা। হিসেবটা এমন ছিলোনা কখনোই। তবে সেই থেকেই বুঝে গেছে, কিছু বাস্তবতা সে চাইলেও অস্বীকার করতে পারবেনা কোনদিনও। এর পর থেকে বরাবরই শান্তা একাই পথ চলে। একাই খোঁজে মর্ত্যের স্বর্গ...

  

৪.

বেশ ভালোই কেটে যাচ্ছিল দিনগুলো। কিন্তু এই স্বপ্নটা সব এলোমেলো করে দিচ্ছে। একটা স্বপ্ন যে মানুষকে এতটা অসহায় করে দিতে পারে, শান্তাকে না দেখলে বোঝা যাবেনা।

  ইদানিং বাবাও বেশ যন্ত্রণা করছে। বাবার কথা মনে হতেই ওর চোয়াল শক্ত হয়ে যায়। এই একটা মানুষের জন্যই শান্তার জীবনটা এত ধূসর…

 

শান্তা নিজের রুমে বসেছিলো। বাবা এসে ওর বিছানায় বসলো। সে উনার সাথে কথা বলেনা বহুদিন। বহুদিন পর আজ শান্তা তার সাথে কথা বললো। আহসান সাহেব আপন মনেই বলে যেতে লাগলেন,

 

 -   তুই একটা ভালো ডাক্তার দেখা মা। প্রায় রাতেই দেখি, বারান্দায় বসে থাকিস। তোর বোধহয় ভালো ঘুম হয় না। ডাক্তারকে সব খুলে বলিস। তোর সমস্যার কোন সমাধান আমি কখোনো করতে পারিনি। হয়তো ডাক্তাররা পারবে।

 

-   আমার কিছু হয়নি। আমি ভালো আছি। তুমি কেন এসেছো এখানে? দয়া করে চলে যাও।

 

-   শান্তা তুই নিজের কোন খেয়াল রাখিস না। তোর বয়স বাড়ছে। এবার একটা বিয়ে কর মা। তোর মা বেঁচে থাকলে হয়তো আমাকে এসব কথা বলতে হতো না। তুই রাজী হয়ে যা মা। আমি তোর  অনেক ভালো বিয়ে দেবো।

 

-   আমার মা মরে গিয়ে বেঁচে গেছে। আমাকে ফেলে গেছে সমাজের অবজ্ঞা নিয়ে বাঁচতে।

 

-   তোর কিসের অভাব? আমি পৃথিবীর সব সুখ তোকে এনে দেবো। তুই হয়তো জানিস না, আমার কত ক্ষমতা। আমার এক ডাকে কত মানুষ ছুটে আসে। আমি এই সমাজের একজন বিশিষ্ট সম্মানিত ব্যাক্তি।

 

-   সম্মান? সম্মান কাকে বলে তুমি জানো? তোমার কথায় যারা ছুটে আসে, তারা কি মানুষ? নাহ, তারা মানুষ নয়। মানুষের শরীরে আটকা পড়া কিছু বোকা প্রাণী। যারা বেঁচে তো থাকে, কিন্তু কোন গর্ব ছাড়া। দেশ মাটি মানুষ এর প্রতি ভালোবাসার সবচেয়ে গর্বিত অংশটাকে তাদের মাথা নিচু করে এড়িয়ে যেতে হয়। তোমাদের মতো মানুষকে শ্রদ্ধা করতে হয়। তোমাদের সপক্ষে যুক্তি দিতে হয়। তারা তো আমার চেয়েও হতভাগা।

 

তুমি সবসময় বলো   আমি কখনো তোমাকে ভালো বাবা হওয়ার সুযোগ দেইনি। তুমিতো নিজেই কখোনো ভালো সন্তান হতে পারোনি। নিজের মায়ের সাথে বেঈমানী করেছো। মাকে তুলে দিয়েছো শত্রুদের হাতে। যে মা অনেক ভালোবাসায় জড়িয়ে নেয় বুকে, তার বুকে ছোরা বসিয়েছো। আঘাতে আঘাতে ক্ষতবিক্ষত করেছো মাকে। মায়ের সেরা সন্তানদের হত্যা করেছো। তোমরা নিজের বোনকেও ক্ষমা করোনি। নিষ্ঠুর নির্মমতায় তার স্বপ্নগুলোকে চুরমার করেছো তোমাদের পৌরষত্বের দম্ভে। বারবার, প্রতিবার ততক্ষন পর্যন্ত, যতক্ষন তার মৃত্যু ঘটে শারীরিক কিংবা মানসিক ভাবে।

 

 

তুমিই বলো, আমি কি করে তোমাকে ভালোবাসি? কি করে তোমাকে নিয়ে গর্ব করি? কি করে কাউকে পরিচয় দিই, তুমিই আমার বাবা, আমি তোমার সন্তান?

 

 আমার দুঃখটা কি জানো? কিছুদিন পর হয়তো তোমার বিচার হবে। তোমার ফাঁসি হবে। কিংবা হয়তো তোমরাই জিতে যাবে। হয়তো স্বাভাবিক মৃত্যু হবে তোমার। কিন্তু কোন ক্ষেত্রেই আমি কখনো বলতে পারবো না, আমার বাবা একজন ভালো, সৎ মানুষ ছিলেন। আমাকে আমৃত্যু মেনে নিতে হবে, আমি একজন যুদ্ধাপরাধীর সন্তান……

 

তবে তুমি আমাকে আজ বাঁচিয়ে দিলে। কদিন ধরে একটা স্বপ্ন খুব যন্ত্রণা দিচ্ছিলো। এখন হঠাৎ উপলব্ধি করলাম, স্বপ্নের সেই মেয়েটা আমার মা, আমার বাংলাদেশ। যার দুরবস্থার  জন্য তুমি, তোমরা  দায়ী। মা আমাকে বারবার বলতে চাইছিলো, “আমাকে বাঁচাও”…. তাই আজ থেকে আমি পথে নামলাম। আবার একবার যুদ্ধ হবে। আবার ফিরে আসবে বায়ান্ন, ঊনসত্তর কিংবা একাত্তর। এবারো আমরা জিতবো, দেখো ?? কারণ আমার মায়ের এখনো আছে ষোল কোটি গর্বিত সন্তান.....

 

 (আমার কখনো কোন শান্তাকে দেখার সুযোগ হয়নি। কিন্তু তাও ভাবতে ভালো লাগে বাংলাদেশের শান্তার মত সন্তান আছে।)

 

Share