মায়ার বৃত্ত

লিখেছেন - -তৃপ্ত সুপ্ত- | লেখাটি 862 বার দেখা হয়েছে

আজ বোধহয় চাঁদটার লুকোচুরি খেলার খুব ইচ্ছে…. সেই কখন থেকে আমার সাথে দুষ্টুমি করছে… কিছুক্ষণ পরপর হারিয়ে যাচ্ছে মেঘের আড়ালে…. বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর থেকেই পিছু নিয়েছে আমার… ছোট বোনটা বলছিলো, আজ নাকি শুক্লপক্ষ… সিনেমায় নাটকে বহুবার শুনেছি, শুক্লপক্ষের রাতে চাঁদের আলো উঠোনে থইথই করে। দেখার সৌভাগ্য হয়নি কখনো… আজ দেখলাম… চোখ জ্বালা করা আলোতে শহুরে রাস্তাটার ভেসে যাওয়া…. হঠাৎ করে দেখলে মনে হয় আলোর নদীতে পা ডুবিয়ে হেঁটে যাচ্ছি… বড় বড় নাম না জানা গাছগুলো রাস্তাটার গা ঘেঁসে দাঁড়িয়ে আছে। মাঝেমাঝে চাঁদটা গাছের পাতার ফাঁকে হারিয়ে যাচ্ছে… হঠাৎ করেই আঁধারে ঢেকে যাচ্ছে চারপাশ… পরক্ষণেই আবার আঁলোর বান নামছে… এই আঁলো ছায়ার খেলা দারুণ লাগছে আমার… সত্যি বলছি, শুধু এই দৃশ্যটা দেখার জন্যে হলেও আমার আরো কিছুদিন বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করছে…..

 

কিন্তু সেটা সম্ভব নয়… আমার পৃথিবীতে বেঁচে থাকার মেয়াদ ফুরিয়ে যাচ্ছে খুব দ্রুত… আর মাত্র পাঁচ ঘন্টা পরে আমার মৃত্যু ঘটবে… পৃথিবীর সবকিছু

চলবে আগের মতই, শুধু আমি হারিয়ে যাবো… আবার চাঁদটা জোছনায় ভাসিয়ে নিয়ে যাবে পৃথিবী… আবার বৃষ্টি হবে… যখন ঝুম বৃষ্টি নামে, আমাদের বাড়ির টিনের চালে তখন  ঝমঝমিয়ে শব্দ হয়। চেঁচিয়ে না বললে কিছু শোনা যায়না…. আমার আর পুচ্চির একটা মজার খেলা আছে। এরকম বৃষ্টি হলে আমরা শব্দ ছাড়া কথা বলি মায়ের সাথে… মা ভাবে বৃষ্টির শব্দে বুঝি আমাদের কথা মা শুনতে পারছে না… মা তখন দ্বিগুন জোরে চেঁচিয়ে জানতে চায় আমরা কি বলছি… আমরা হেসে কুটিকুটি হই… আমাদের চালাকি মা কখনো ধরতে পারেনা… আমার মা টা যে কি বোকা না…. আমি মরে গেলে বোধহয় পুচ্চি আর ছুটকিটা মায়ের সাথে এভাবে খেলবে…

 

আমার এখনি অনুভব করছি লোডশেডিংয়ে হারিকেনের আলোটা টিমটিম করে জ্বলছে… পুচ্চি আর ছুটকি বাবাকে জড়িয়ে ধরে বসে আছে… বাবা একটার পর একটা গল্প শোনাচ্ছে… আমি অনেক দিন বাবাকে জড়িয়ে ধরি না.. কোথায় যেন বাঁধে… কিন্তু বাবা জানেন, আমিও দরজার পাটাতন ধরে গল্প শুনছি.. তাই বাবার কন্ঠস্বর ঠিক আমার কান পর্যন্ত পৌছায়…. এক একদিন আমরা তিন ভাইবোন মায়ের সাথে ঝুলোঝুলি করি, গান শোনানোর জন্য.. বাবা না বলা পর্যন্ত মা কখনোই রাজি হয়না… আমাদের মা খুব ভালো রবীন্দ্র সঙ্গীত গাইতে পারে…. মা যখন সলাজ কন্ঠে সুর করে গায়,

 

 

"চাঁদের হাসির বাঁধ ভেঙেছে উছলে পড়ে আলো।

ও রজনীগন্ধা, তোমার গন্ধসুধা ঢালো….."

 

 

আমরা অনুভব করি চাঁদ তার সব শুভাষীস দিয়ে আমাদের ছোট্ট ঘরটা ভরে দিয়েছে। আমার খুব খারাপ লাগছে এমন ছোট ছোট উৎসবগুলোতে আমি আর উপস্থিত থাকতে পারবো না….

 

কিন্ত আমি এসব কথা ভাবছিইবা কেন !! আমারতো বেঁচে থাকার প্রয়োজন ফুরিয়েছে। আমার ভালোবাসার মানুষটা আমাকে ছেড়ে অজানার পথে পাড়ি জমিয়েছে…. আমি অনেক চেষ্টা করেছি তাকে আঁকড়ে ধরে রাখতে… কিন্তু আমার মায়ার বাঁধন তার কাছে শেকল বেড়ি মনে হয়েছিলো…. আমি অনেক ডেকেছি পেছন থেকে, সে ফিরে চায়নি একবারও… আমার পৃথিবীটাকে বৃত্তের মাঝে বন্দী করে, তাকে কেন্দ্রবিন্দু বানিয়েছিলাম। সে আমার বৃত্তটাকে একলা ফেলে চলে গেছে নতুন কোন বৃত্তের সন্ধানে…. আমি আমার একলা, কেন্দ্রহীন বৃত্তটাকে সামলাতে পারছি না…. তাই এই বৃত্তটাকেই আজ মিটিয়ে দেবো। সূর্যের প্রথম কিরণের ছটা গায়ে লাগার মুহূর্তেই আমি হারিয়ে যাবো অসীমে….

 

নায়লাকে আমি অনেক ভালোবাসতাম… না না, ভুল বললাম। ভালোবাসি এখনো, হয়ত আগের চাইতেও বেশি…. ওর ভালোবাসার মায়াতে ভেসে যেত আমার পৃথিবী…. ফুলের প্রতি ওর ভীষন ভালোলাগা ছিল। গোলাপ কিংবা বকুল, শিউলি অথবা কাঁঠাললচাঁপা.. সবটাতেই ওর সমান উচ্ছাস….. আমি ওর নাম দিয়েছিলাম, পুষ্প…. এই নামে যখন আমি ওকে ডাকতাম, ও রোজকার অভ্যাসে হেসে উঠতো… সেই হাসিতে আমার পৃথিবী রঙিন হতো….

 

এই মেয়েটা বোধহয় কখনোই আমার ভালোবাসাটুকু অনুভব করেনি। কখনো বোঝেনি আমার অনুভূতির গান… নয়ত এভাবে ফেলে যেত না… অথবা কি জানি, হয়ত আমিই ওর স্বপ্নগুলোকে বুঝে উঠতে পারিনি। তাই আমিই পেছনে পড়ে গেলাম… ছুটে গেলো বন্ধন….

 

আমি বোধহয় একটু বেশিই অমনোযোগী হয়ে পড়েছিলাম ওর প্রতি। আবার হয়তোবা কিছুটা নির্লিপ্ততা, কিছুটা বিরক্তি চলে এসেছিলো ভালোবাসায়… বহুদিন মুখ ফুটে বলা হয়ে ওঠেনি, “ভালোবাসি”….  কিন্তু মনে মনে কত সহস্র কোটিবার যে বলেছি কথাটা, আমার পুষ্প বোধহয় শুনতে পায়নি। বিশ্বাস ছিলো, কখনো অনুভূতিগুলো হারিয়ে যাবেনা। তাই ওর নির্লিপ্ততাগুলো বিশেষ গায়ে মাখাইনি। ভেবেছি বুঝি ক্লান্তি এসেছে, ক্লান্তি শেষে আবার ঝলমলিয়ে রোদ উঠবে…

 

আমি বোকা ছিলাম। আমার পুষ্পের দূরে যাওয়া আমি বুঝে উঠতে পারিনি। যখন বুঝেছি, তখন মেয়েটা কিছুতেই আর আমার ছিল না। ওর উচ্ছাসগুলো আর আমাকে ঘিরে নয়। নতুন কোন চোখের স্বপ্ন ওর বুকে ঠাঁই করে নিয়েছে…. আমার বৃত্তে ও আর বন্দী থাকতে চায় না….

আমি জানি এই সম্পর্কের ব্যবচ্ছেদের জন্য আমি, কেবলমাত্র আমিই দায়ী। কিন্তু তাও আমার মেনে নিতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে…. আমি হতাশাগ্রস্থ হয়ে পড়েছি। পুষ্পহীন দিনরাত্রি আমার অসহ্য লাগছে…. তাই আমি আজ চলে যাবো। ভোরের সময়টা আমার খুব প্রিয়। সূর্যের আলো একটু একটু করে পৃথিবীর আঁধারগুলো মিটিয়ে দেয়। ভোরের ঠান্ডা বাতাস গায়ে বাড়ি দেয়। আমি শেষবারের মত এই মায়াময় দৃশ্যটুকু দেখতে চাই। তারপর আমি চলে যাবো না ফেরার দেশে।

 

 

 

আজকের দিনটার জন্য আমি বেশ কদিন ধরে তৈরী হচ্ছি। অনেকগুলো কাজ জমা ছিলো, সেগুলো শেষ করলাম। বাবাকে চোখের ডাক্তার দেখনোটা খুব জরুরী ছিল। আমার বাবাটা বরাবরই নিজের বেলায় খুব উদাসীন। কবে থেকে চশমার পাওয়ার পরীক্ষা করতে বলছি সবাই, বাবা শোনেনই না। ইদানিং আবার মায়ের বুকের ব্যাথাটা বেড়েছে। দুজনকেই একসাথে চিকিৎসা করাতে হলো। তবে মাকে বোধহয় আরও দু একবার ডাক্তারের কাছে নিতে হতে পারে…. ওটা নাহয় ছুটকি সামলে নেবে।

 

ছুটকির জন্য কিছু করতে পারলাম না। বোনটার খুব সখ ছিলো এবারের ছুটিতে সমুদ্র দেখতে যাবে। ওর অনেকদিনের সখ…. কি জানি, বাবা নিয়ে যাবে কিনা ?? পুচ্চিটার অবশ্য এসব সখ নেই। ওকে গত মাসের টিউশনির টাকায় একটা ভিডিও গেমস সেট কিনে দিয়েছিলাম। সে তাই পেয়েই লাফাচ্ছে…..

 

 

কারো কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আসা হয়নি। বলে এলে কেউ কি আর আসতে দিত? মা ভাত খাওয়ার জন্য ডাকছিলো। মাকে কিছু না বলেই চলে এসেছি। আজ রাতে বাসায় বোধহয় কারো খাওয়া হয়নি। মা কান্নাকাটি করছে নিশ্চয়ই। বাবা উঠোনে পায়চারী করেছে সারারাত। ওদুটো নিশ্চয়ই কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে গেছে। পুচ্চিটা এখন কার সাথে ঘুমুবে কে জানে? ওটাতো আমাকে জড়িয়ে না ধরে ঘুমুতেই পারতো না…. ছুটকির সাথে হয়তো মিল হয়ে যাবে এই দফা। আর দুজনে ঝগড়া করে বাড়ি মাথায় তুলবে না। আচ্ছা যদি করে, তবে ঝগড়া মিটিয়ে দেবে কে? আমিতো থাকবো না…..

 

 

আমার যাওয়ার সময় প্রায় হয়ে এসেছে। ভোরের আলো আসি আসি করছে। আর কিছুক্ষন পরেই আমার নামটা অতীত হয়ে যাবে। আমি যা চেয়েছিলাম, তাই হচ্ছে। সব যন্ত্রনার অবসান ঘটবে…. কিন্তু তাও কেন যেন ভালো লাগছে না কিছু। বাবার কন্ঠটা শেষবারের মতো শুনতে ইচ্ছে করছে…

করবোনা করবোনা করেও পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে চালু করলাম। বাবার নম্বরে রিং হচ্ছে….

 

 

-হ্যালো ভাইয়া, তুই কই!! সারারাত ধরে তোর নম্বরে চেষ্টা করছি। ভাইয়া তুই তাড়াতাড়ি আয়… বাবার শরীরটা কাল রাতে হঠাৎ খুব খারাপ হয়ে গেছে তুই যাওয়ার পর পরই। তোর নম্বর বন্ধ, আমি আর মা কি করবো বুঝতে না পেরে মেডিকেলে নিয়ে এসেছি। বাবাকে আইসিইউ তে রেখেছে। আমার খুব ভয় করছে ভাইয়া, তুই জলদি চলে আয়….

 

 আমি শুধু একটা শব্দ বলতে পারলাম, “আসছি….”

 

 

 

আমি দৌড়াচ্ছি…. যত দ্রুত সম্ভব বাবার কাছে পৌছুতে হবে। ওখানে আমার আজীবনের স্নেহের আশ্রয়েরা আমার জন্য অপেক্ষা করছে‍। আমি বাবাকে ওয়াদা করেছিলাম. বাবার হাতের লাঠি হব…. মাকে শেষ বয়সের নিশ্চয়তার স্বপ্ন দেখিয়েছি….. বোনটাকে এখনো বধূর সাজে দেখতে পারিনি, চাকরীর প্রথম বেতনের টাকায় পুচ্চিকে সাইকেল কিনে দেইনি এখনো….. কি বোকা আমি!! ভূলেই গিয়েছিলাম, জীবনে চলার পথে পুষ্পরা মাঝে মাঝে হারিয়ে যায়, কিন্তু কিছু মানুষের নিঃস্বার্থ ভালোবাসার মায়ার বৃত্তে বন্দী থাকতে হয় চিরকাল…..

Share