আমি নেই

লিখেছেন - -তৃপ্ত সুপ্ত- | লেখাটি 982 বার দেখা হয়েছে

১.

রাত বাজে দুটো। মাথার উপর সাঁই সাঁই করে ফুল স্পিডে ফ্যানটা ঘুরছে। চারপাশে সবাই ঘুমিয়ে আছে, আর গত কয়েকটা মাসের নিয়মিত অভ্যাসে আমি জেগে… প্রথম প্রথম এই রাত্রি জাগরণ আমার খুব বিরক্তিকর আর যন্ত্রনার মনে হতো, আমি চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে কাঁদতাম। কান্নার শব্দগুলো আমার ছোট্ট রুমটার দেয়ালে দেয়ালে বাড়ি খেয়ে প্রতিধ্বনিত হতো। প্রতিধ্বনির শব্দগুলো কিছুতেই কান্নার শব্দের মতো শোনাতো না, বরং ওই শব্দগুলো আমার কানে বাতাসের সরসর ধ্বনির মতো লাগতো… যেন অনেকগুলো হাহাকার আর দীর্ঘনিশ্বাস একসাথে মিলে হল্লা জমিয়েছে রাত দুপুরে আমার একান্ত জগতে। রাতগুলো ভয়ানক লাগতো, দিন পেরিয়ে সন্ধ্যা হলেই আমি অজানা ভয়ে ঘাবড়ে যেতাম… ভয়ঙ্কর রাতগুলো কিছুতেই পিছু ছাড়তো না…

 

ধীরে ধীরে রাতের অন্ধকার আমার সয়ে গেছে। এখন আর নির্ঘুম রাতগুলোকে ভয় পাই না। বরং অপেক্ষা করি প্রিয় সময়টুকুর জন্য। নীরবতা আজকাল আর অনাকাঙ্খিত নয়। সারাদিনের কোলাহল শেষে ওইটুকু নীরবতা না হলে এখন নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। দিনের আলোতেই বরং কুঁকড়ে যাই।

 

এককালে আমার প্রিয় সময় ছিলো ভোরের প্রথম আলো ফুটে ওঠার সময়টা। চারিদিকে ঝুপ করে সূর্যের মায়া আলো নেমে আসে। নরম তুলতুলে আলো… পবিত্র আলো… গায়ে মিষ্টি বাতাসের কাঁপন তোলা আলো। এখনও আমি সেই আলো দেখি। ওই আলো গায়ে মেখে ঘুমুতে যাই। কিন্তু ইদানিং সেই আলোটুকুই আমার সবচেয়ে অপছন্দের। দিনের শুরু মানেই তো রাতের শেষ, আবার সেই কোলাহলে টইটুম্বুর পৃথিবী… আমার পছন্দ অনেক বদলে গেছে। কিছুই যে আর আগের মতো নেই…

 

প্রিয় সম্পর্কগুলো বদলে গেছে, প্রিয় চেনা মুখগুলো আজ বহু দূরে… প্রিয় হাতগুলো আর জড়িয়ে ধরে না ভালোবেসে, আজকাল আর ভাত বেড়ে নিরন্তর ডাকাডাকিতে মাতে না কেউ। একই ঘরে থেকেও আমি সবার কাছ থেকে যোজন যোজন দূরের কেউ। সবার মাঝে থেকেও যে হারিয়ে যাওয়া যায়, তা আমি আমার প্রিয় মানুষগুলোকে দেখে শিখেছি। দরজার ওপাশে কত হাসি, কত গান অথচ এখানে আমি কেবল আমার আমিকে নিয়ে বাঁচি।

 

আজকাল আমি বোঝা হয়ে আছি সবার কাছে। এমন বোঝা, যা হঠাৎ কোন পথের মোড়ে হারিয়ে গেলে সবাই বাঁচে। আমাকে ঝেড়ে ফেলার অনেক চেষ্টা চালানো হচ্ছে, কিন্তু আমি নির্লজ্জ্বের মতো চেপে বসে আছি সবার কাঁধে। আমার প্রতি করা তুচ্ছতাচ্ছিল্যের মন্তব্যগুলো শুনে আজকাল আর মরে যেতে ইচ্ছে করে না। বরং অপরিচিত কোন বাতাস ছুঁয়ে গেছে ভেবে ভুলে যাই সব। নিজেকে বন্দী করে রাখি এই চার দেয়ালের কুঠুরীতে… মাঝে মাঝে খুব ইচ্ছে হয় আগের মতো পাখি হয়ে বাঁচি… রিকশায় করে ঘুরি ঘন্টার পর ঘন্টা… মোড়ের চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে বন্ধুদের সাথে বাজি ধরে গরম গরম সিঙাড়া আর চায়ের পার্টি দেই। ফুচকা খাওয়া হয় না কতদিন!! বন্ধুরাও আজকাল আর মনে করে না আমাকে। আমি বোধহয় বাতিলের খাতায় পড়ে গেছি সবার কাছেই। আমার মায়ের চোখের ভালোবাসার দৃষ্টিগুলোই হারিয়ে গেলো, আর বন্ধুরা তো বেশ দূরের মানুষ…

 

এত হতাশার মাঝে একমাত্র সঙ্গী আমার ছোট বোনটা… এই একটা মাত্র মানুষই আছে, যে এখনো আমাকে টেনে নিয়ে পাশে বসায়, এখনো গান শোনানোর আবদার করে। এখনো তার সব কথা না শুনে মন ঘুরিয়ে নিলে আগের মতো গাল ফুলিয়ে অভিমান করে। একমাত্র সেই আছে, যার চোখের দিকে তাকালে আমি সেই পুরাতন আমাকে দেখতে পাই। আয়নাটাও আজকাল বেঈমানী করে…

 

কিন্তু তারও সীমাবদ্ধতা আছে। তার জন্যেও কেউ ভালোবাসার নীলপদ্ম নিয়ে অপেক্ষা করে। তাকে নিয়ে স্বপ্ন সাজানোর এখনো কেউ আছে… আমার অস্তিত্ব আমার পিচ্চি বোনটার কাছেও যন্ত্রনা বৈকি… তবুও যে সে এখনও আমার দায় থেকে মুক্তি পেতে চায় না, আমার হারিয়ে যাওয়া যে তার একান্ত কাম্য নয়… এর জন্য তার কাছে আমি বড় কৃতজ্ঞ…

 

আমারও কেউ ছিলো… যাকে ভেবে আমার দিনরাত্রি কেটে যেতো… যাকে আমি আমার মিষ্টার পারফেক্ট ভাবতাম… এমন কেউ যাকে ভালোবেসে হাজার বর্ণিল স্বপ্ন বুনেছি। বোকা ছিলাম… কখনো ভাবিনি, মিষ্টার পারফেক্ট কেবল মিস পারফেক্টদের জন্যেই পৃথিবীতে আসে। নিজেকে সেই নিঁখুত মানুষদের দলে ফেলার দুঃসাহস আমার কখোনোই ছিলো না… আর এখনতো সেটা কেবল স্বপ্নেই সম্ভব…

 

 

ভুল বললাম… স্বপ্নেও সম্ভব নয়… কারণ আমি স্বপ্ন দেখতে ভুলে গেছি। লাল নীল রুপালী স্বপ্নেরা আজকাল আর আমার কাছে ধরা দেয় না… আমার রাতগুলো নির্ঘুম আর দিনগুলো ধূসর ঘোলাটে…

 

২.

 

এইতো সেদিনের কথা, এখনো চোখ বুজলে দেখতে পাই। আমাকে ঘিরে হল্লাহাটির শব্দ। গায়ে হলুদের সাজে হলুদিয়া পাখী হয়ে বসে আছি সবার মাঝে। বান্ধবীদের কিচিমিচিতে ঘর ভরে আছে। গায়ের ওপর ঢলে ঢলে অশ্লীল উপহাস ছুঁড়ে দিচ্ছে আমার দিকে। আমি চোখমুখ খিচে লজ্জ্বা লজ্জ্বা অনুভূতি নিয়ে বসে আছি। মা আসছে কিছুক্ষণ পরপর… একটাই বুলি… “কিরে, তোদের কিছু লাগবে?” মাকে কি করে বলি, "কিচ্ছু লাগবে না। শুধু তোমাকে একটু জড়িয়ে ধরতে চাই মা…" এর মাঝে দুবার আমার হবু বরের উৎসুক টেলিফোন। কে বলবে, আমাদের এরেঞ্জড ম্যারেজ? মানুষটা একদম আমার স্বপ্নের মতো… ঠিক যেমনটা আমি চেয়েছিলাম।

 

কনে দেখা অনুষ্ঠান নিয়ে আমি বেশ চিন্তায় ছিলাম। “হেঁটে দেখাও…” “মেয়ে, তুমি কি রাঁধতে পারো?” টাইপের প্রশ্নের জবাব মুখস্থ করছিলাম ভয়ে ভয়ে। কিন্তু ওরা যখন দেখতে আসে, আমাকে কোন পরীক্ষাই দিতে হয় নি। হাসিখুশী মা মা চেহারার একজন আমার চিবুক ধরে বললো “বাহ, তোমার চোখ দুটো তো দারুণ সুন্দর!! কাজল দিও সবসময়, বেশ লাগবে দেখতে” একজন মহা সুপুরুষ যুবক আমাকে বারান্দার আলো আঁধারীর কোণে দাঁড়িয়ে বললো, “শুনেছি তুমি নাকি বৃষ্টি খুব পছন্দ করো? আমার সাথে ভিজবে?”

আমি হ্যা, না কিছু বলার আগেই দেখলাম, আমার এই ছেলেটার সাথে বিয়ে ঠিক হয়ে গেলো… কি সেই মজার দিনগুলো!!

 

 

আমি ক্যাবলাকান্তের মত মা কে জিজ্ঞাসা করতাম, "ওমা, ওরা কি দেখে আমাকে পছন্দ করল? ছেলেটা বোকা নাকি"

মা হাসতো আর বলতো, "আমার মেয়ে কি কোনো দিকে কম, হু?"

 

মানুষটার সাথে আমি একদিন বেড়াতে গিয়েছিলাম ধানমন্ডি লেকের ধারে। কপোত-কপোতীর ঝাঁকের মাঝে আমরাই বোধহয় সবচেয়ে বোকাসোকা ছিলাম। আমি হাত চোখমুখ সব নাড়িয়ে চাড়িয়ে বকবক করেই যাচ্ছিলাম। পিচ্চিকালের গল্প, প্রথম কলেজ যাওয়ার গল্প, বান্ধবীদের সাথে ঝগড়ার গল্প, প্রথম ক্রাশ খাওয়া ছেলেটার চেহারার বর্ণনা…

 

তিনদিনের পরিচিত একটা মানুষকে আমি এত গোপনীয় সব কথা কিভাবে বলেছিলাম, সেটা চিন্তা করে আমি আজও অবাক হই!! সেই মানুষটাও নিপাট ভালোমানুষের মত আমার কথাগুলো চুপচাপ হজম করছিলো। আমি অনেকক্ষণ বকবকানি শেষ করার পর তাকে বললাম, “আপনাকে বোর করছি নাতো?”

সে মুচকি হেসে জবাব দিলো “এত তাড়াতাড়ি গল্প শেষ? আমি এখনো অনেক শুনতে চাই”

 

আমি সেদিন তার সামনে আমার শৈশব কৈশর পুরোটা মেলে দিয়েছিলাম। আমি তাকে জানালাম, আমার বান্ধবীরা আমাকে বোকারত্তি ডাকে। আমাদের গ্রুপের একমাত্র আঁতেল উপাধিধারী মেয়েটা হলাম আমি। আমি রাত জেগে শত শত উপন্যাস পড়ে ফেলেছি, ভালোবাসার গল্প কবিতা পড়ে আমি অহরহ গল্পের নায়কদের প্রেমে পড়ি, দুঃখ গল্প পড়ে কেঁদে বুক ভাসাই, কিন্তু কখনো কোনো বাস্তব চেহারা আমাকে আচ্ছন্ন করেনি। আমি আমার কল্পনার সাথে কাউকে মেলাতে পারিনি, যতক্ষণ না আমি তাকে দেখেছি…

 

 

হ্যা, আমি প্রথম দিনই স্বীকার করে নিয়েছিলাম, আমি তার প্রেমে পড়েছি। মানুষটা কিন্তু আমার সিধাসাধা স্বীকারত্তি শুনে হাসেনি একদম। বরং আমার হাতটা শক্ত করে চেঁপে ধরে আমাকে আশ্বাস দিয়েছিলো, ছাড়বেনা কখনো…

 

আমি তাকে পাড়ার মোড়ের সেই ছেলেটার কথা বললাম, যে গত চার বছর ধরে আমার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে, মেট্রিক ফেল করা ছেলেটা সারাদিন মোড়ে আড্ডা দেয়, আর আমাকে ইয়া বড়বড় প্রেমপত্র পাঠায়। সে শুনে খুব হেসেছিলো। বলেছিলো, বেশতো… বিয়ের পর তুমি আমি দুজনে মিলে ওর প্রতিটা চিঠির জবাব দেবো। আমরা দুজন হাত ধরাধরি করে বহুক্ষণ হেঁটেছিলাম। মায়াময় সেই দিনটা আজো আমার চোখে জ্বলজ্বল করে।

 

৩.

 

আমার এই নতুন জীবনে আমার মায়ের পরিবর্তনটাই আমাকে সবচেয়ে বেশি দগ্ধ করে। আমি মায়ের লক্ষী মেয়েটা… ঘরোয়া, গোছানো মেয়েটা… আরো কতশত বিশেষণে মা আমাকে সবার কাছে পরিচিত করে দিত… আমার ছোট বোনকে রোজ বকুনী দিয়ে বলতো, "কী, হতে পারবি আপুনীর মত?"

সেই মা ই আমাকে সবার আগে পর করে দিলো। মা আমাকে ডাকেনা, আমার সাথে কথা বলে না… এমনকি আমি যদি সামনে গিয়েও দাঁড়াই, তাও এমন আচরণ করে, যেন আমি এক অদৃশ্য মানুষ। আমার অস্তিত্বটাকেই মা উপেক্ষা করে চলেছে প্রতিনিয়ত।

 

আমাকে বলা মায়ের শেষ কথাটা ছিলো, “নিশ্চয়ই তোর দোষ ছিলো, নিশ্চয়ই তুই প্রশ্রয় দিয়ে ছিলি… নইলে কেউ খামোখা এমন করবে কেন? কোন পাপে আমি তোর মত মেয়েকে পেটে ধরেছিলাম, তার শাস্তি পাচ্ছি এখন!!”

 

আমি অনেক কেঁদেছি মাকে জড়িয়ে ধরে। বহুবার বলেছি, “মা, তোমার দিব্যি… ওই ছেলেটার দিকে আমি কখনো মুখ তুলে তাকিয়েও দেখিনি। কখনো হেসে দুদন্ড কথা বলিনি… কখনো তার দেয়া চিঠির জবাবে দুটো লাইন লিখিনি, কখখনো না মা… সে কি অপরাধে আমার মুখে এসিডের ছোট্ট বোতলখানা উপুড় করেছিলো, আমি জানিনা গো মা। শুধু একবার তোমার সোনা মেয়ের কথা বিশ্বাস করো... মা প্লিজ…

 

আমার কোন দুঃখ নেই বিয়েটা ভেঙে গেলো বলে, আমি পাড়ার মানুষের বিদ্রুপ শুনে বাঁচতে পারবো, চিরকাল আয়নায় আমার পোড়া, কালশিটে চেহারাটা দেখেও হেসে যাবো, শুধু তুমি একটাবার আমার কথা বিশ্বাস করো”

 

আমার মা আমার কথা বোঝেনি। ধীরে ধীরে আমার কষ্ট অনুভূতিগুলোতে মরচে পড়েছে। আমার উচ্ছলতাগুলো রাতের আঁধারে চাঁপা পড়ে গেছে। আমি ভয় পেতে পেতে অন্ধকারকে আপন ভাবতে শিখে গেছি। আমার বর্তমান জীবনে একমাত্র সত্য হচ্ছে, আমি এখনো বেঁচে আছি।

 

 

একজন অসফল, ক্লান্ত, বৃষ্টিবঞ্চিত মানুষ হয়ে… বেঁচে আছি…

 

 

Share