শ্রদ্ধাঞ্জলী

লিখেছেন - -তৃপ্ত সুপ্ত- | লেখাটি 600 বার দেখা হয়েছে

আমার শৈশব কেটেছে হুমায়ুন মুগ্ধতায়। প্রতি জন্মদিনে আমার চাচা আমাকে দুটো বই কিনে দিতেন। শর্ত ছিলো, বইটার ভালো দিকগুলো নিয়ে দশটা পয়েন্ট তাকে লিখে জানাতে হবে। এই কান্ড তিনি করতেন, যেন বইটা আমি মনোযোগ দিয়ে পড়ি। বলাই বাহুল্য, সেই বইয়ের তালিকায় সবচেয়ে বেশি ছিলো হুমায়ুন আহমেদের বই। আমি মুগ্ধ হয়ে সেই ছাপার অক্ষরগুলো পড়তাম, আর সব সত্যি মেনে নিতাম। আমি কিছু না বোঝার বয়সেই হুমায়ুনবোদ্ধা হয়ে গেলাম।

 

স্যারের কোন বইটা আমার প্রথম বই, তা স্মৃতি হাতড়ে বের করতে পারলাম না কিছুতেই। বইকে ভালবাসার, বইয়ের প্রতি মমতা সৃষ্টির স্রষ্টার সব লেখনীই আমার কাছে মুগ্ধপাঠ। মানুষের আবেগ কিভাবে কালো কালো বিন্দু বিন্দু অক্ষরে ফুটিয়ে তোলা যায়, তা উনার চেয়ে ভালো কি কেউ জানে? হুমায়ুন আহমেদের পোকা বইটি আমার খুব অল্প বয়সে পড়া। এই বই পড়ার পর বহুদিন আমি স্বপ্নে নিজেকে পোকা হয়ে যেতে দেখতাম। দরজার ওপাশে পড়ে দুচোখের পাতা এক করার মত সাহস আমার ছিলো না। নীল হাতিটা হারিয়ে যাবার কষ্টে হু হু করে কাঁদতাম, বুকের ভেতর শূন্যতা সৃষ্টি হতো। আবার গভীর রাতে ঝুম ঝুম শব্দে ফিরে আসা আমার নীলহাতিটাকে কোলে তুলে নিতাম। আমার মনে হয় বাংলাদেশের সব শিশুরই একটা করে নীল হাতি আছে।

 

তারপর যখন আরেকটু বড় হলাম, আমার সামনে হুমায়ুন জগতটা আরো বিস্তৃত হলো। আমি চশমা পড়া ভোলা রাজপুত্রের প্রেমে পড়ে গেলাম। শুভ্রের মা যখন ওর অপটিকাল নার্ভ শুকিয়ে যাওয়ার চিন্তায় কাঁদতেন, বাংলাদেশের আরেক কোণায় এক কিশোরী মেয়েও লুকিয়ে লুকিয়ে চোখ মুছতো। শুভ্র যে কেবল তার উপন্যাসের প্রিয় চরিত্র ছিলো না। আরো অনেক কাছের মানুষ ছিলো, কাছের জন। বাংলাদেশে আমার মতো তরুনীর সংখ্যা কত তার নিখুঁত হিসেব কি করা যাবে কখনো?

 

আমি কখনো হিমুপ্রেমী ছিলাম না। হিমুর বোহেমিয়ান জীবন আমার অসহ্য লাগতো। তবুও পড়ার বইয়ের নীচে লুকিয়ে, কখনো রাত জেগে পিডিএফের পাতায় আমি হিমু পড়েছি। আমি যে খুব রুপা হতে চাইতাম। আমি মনেপ্রাণে চাইতাম কোন এক অপেক্ষার রাতে এসে হিমু তার নীলপদ্মগুলো রুপাকে দিয়ে বলবে, 'আজ তোমার অপেক্ষার সমাপ্তি দিন। চলো জোৎস্নাতে গা ডোবাই।' বাদলকে জড়িয়ে ধরে তাকে মানুষ হবার শিক্ষা দেবে। বাবাকে বলবে তোমার হিমালয় আজ গৃহী হয়েছে।

 

মিসির আলীর সেই নিবিড় পর্যবেক্ষণকে শ্রদ্ধা করেনি, এমন দুঃসাহসী সন্তান কি এদেশের আছে? মিসির আলী শূন্যে তাকিয়ে সমস্যা আর তার সমাধান বলে দেবেন, এটাই চিরচেনা, এটাই স্বাভাবিক। আমার চোখে মিসির আলী আর হুমায়ুন আহমেদ মিলে মিশে একাকার হয়ে যেত। মনে হতো স্যারই বুঝি চশমা চোখে ইজিচেয়ারে বসে আমাকে বলছেন 'কোন দুঃস্বপ্ন নেই। নেই কোন অমিমাংসিত কিছু। সব তোমার মনের ভুল, আত্ববিশ্বাস আনো, সব ঠিক হয়ে যাবে।

 

মুগ্ধতার এই ভ্রমনে কত রাবু আপা, মিলি, রুনু, মৃন্ময়ী, জরীর জন্য জল ঝরেছে। কত আনিস, আতাউরের সরলতা দেখে অবাক হয়েছি! কত নির্ঘুম রাত কেটেছে তার হিসেব করতে গেলে আমার একজীবন ফুরিয়ে যাবে, হুমায়ুন বন্দনা ফুরাবে না। তিনি এদেশের হাজার হাজার পাঠককে বই পড়া শিখিয়েছেন, বইকে ভালোবাসতে শিখিয়েছেন। জাদুকরী মুগ্ধতায় রাঙিয়ে দিয়েছেন আমাদের ধূষর জীবন যৌবন।

 

আমি সাধারণ মানুষ। দাঁতভাঙা উপমাময় সাহিত্য আমি বুঝিনা। তবুও আমার মতো তুচ্ছ পাঠকরা সাহিত্যের জগতে আনন্দময় ভ্রমন করতে পারে, কারণ আমাদের আপনি আছেন। আমাদের হুমায়ুন আহমেদ ছিলেন, আছেন, থাকবেন। ভালোবাসার সম্পর্কের কি কোন মৃত্যু আছে স্যার?

 

সহজ সরল ভাবে বেঁচে থাকা, মানুষকে ভালোবাসা, বৃষ্টিবিলাস, সমুদ্রস্নান, টিনের চালে বৃষ্টির শব্দে জীবনের অর্থ খুঁজে নেয়া আমি আপনার কাছ থেকে শিখেছি। আপনার জোছনা ও জননীর গল্প আমাকে মনে করিয়ে দিয়েছে আমি কত সাহসী জাতির ঔরশজাত। আমি নন্দিত নরকে নরকে পড়ে হাউমাউ করে কেঁদেছি। কেন আপনি রাবু আপাকে এত কষ্ট দিলেন? আবার কেঁদেছি অপেক্ষা পড়ে, আবার আবার মধাহ্ণ পড়ে... বাকের ভাইয়ের কষ্ট দেখে আমি আর মা দুজন দুদিকে মুখ ঘুরিয়ে কাঁদতাম। আপনার তিন ডব্লিউ পড়ে মনে হয়েছে আমি যদি হতাম এর একজন... কখনো বাবাকে কাঁদতে দিতাম না। গায়ের গন্ধ ঘসে দিতাম বাবার সারা গায়ে...আপনি যেদিন প্রথমবার নিউইয়র্ক গেলেন, সেদিন থেকে আপনার সুস্থতার জন্য রোজ প্রার্থনা করতাম। এখনো যে সাহিত্যে নোবেল পাইনি আমরা!! এখনো মিসির আলীর অমিমাংশিত রহস্যের সমাধান হয়নি। এখনো নিনিত অনেক ছোট্ট। ওকে নিয়ে লেখা টুকরো ঘটনাগুলো পড়া হয়নি এখনো...

 

আপনি কিভাবে আমাদের এত কষ্ট দিয়ে চলে গেলেন স্যার? ভালোবাসার কি কিছু কমতি ছিলো? কি হতো আর দশটা বছর রক্ত মাংশের হুমায়ুন আমাদের সাথে থাকলে? বইমেলায় গিয়ে আপনার পা ছুঁয়ে সালাম করার যে খুব ইচ্ছে ছিলো স্যার। হাসিখুশি একটা বাবা আমাদেরও ছিলো। আমরা দরিদ্র দেশের মানুষ। এদেশে কি রোজ রোজ হুমায়ুনরা জন্মে? আমাদের আর কাউকে চাইনা স্যার, কাউকে না। আজ বাঙ্গালী জাতির বড় দুঃখ দিন। এভাবে আমরা বহুদিন কাঁদিনা। এত আত্মার আত্মীয় আমাদের রোজ রোজ হারিয়ে যায় না। গোটা জাতিকে নির্ঘুম রাত কান্নাভেজা সকালে একা ফেলে রেখে আপনি অজানার দেশে পাড়ি জমালেন। কত শত ক্ষুদে লেখক আপনাকে দেখে সহজ ভাষায় লেখালেখি করতে শিখেছে, তার হিসেব কি আপনি জানেন? দৈনন্দিন দিনের খুঁটিনাটি ঘটনার গল্প আমরা কার কাছে শুনবো? একটা গোটা জাতিকে এতিম করে দিয়ে আপনি ওপারের অন্য কোন পৃথিবীতে স্বপ্ন জগতে বাস করছেন, তা আমরা কিভাবে মেনে নিই বলতে পারেন??

 

মৃত্যুতে সব শেষ হয়না স্যার। শেষ হতে পারেনা। বাংলাদেশের হাজার হাজার তারুন্য, যৌবন, বার্ধক্য আজ আবার নতুন করে হুমায়ুনকে খোলা চিঠি লিখছে আমার মতই। আমরা আবার সেই মুগ্ধতার জগতে ডুব দেবো। বাংলাদেশের অনাগত শিশুদের শৈশব শুরু হবে নীল হাতি পড়ে। তারা জানবে চান্নিপসর রাত শব্দটায় অধিকার কেবল আমাদের, তাদের। পরবর্তী প্রজন্ম কে অবশ্যই জানানো হবে তারা কত সৌভাগ্যময় জাতির সন্তান যাদের হুমায়ুন আহমেদ নামের একজন জাদুকর ছিলো। স্বপ্নের জাদুকর। অমরত্ব আপনি পেয়ে গেছেন স্যার। আপনাকে অমরত্ব প্রাপ্তির শুভচ্ছা জানাই...

 

 

 

আমার ভাঙ্গা ঘরে ভাঙ্গা চালা ভাঙ্গা বেড়ার ফাঁকে

অবাক জোছনা ঢুইকা পরে হাত বাড়াইয়া ডাকে

হাত ইশারায় ডাকে কিন্তু মুখে বলে না

আমার কাছে আইলে বন্ধু আমারে পাইবা না ।।

 

তুমি আমায় ডাকলা না গো তুমি রইলা দূরে

তোমার হইয়া অবাক জোছনা ডাকলো অচিন সুরে

হাত ইশারায় ডাকে কিন্তু মুখে বলে না

আমার কাছে আইলে বন্ধু আমারে পাইবা না

 

ঘর খুলিয়া বাহির হইয়া জোছনা ধরতে যাই

হাত ভর্তি চান্দের আলো ধরতে গেলে নাই

হাত ইশারায় ডাকে কিন্তু মুখে বলে না

আমার কাছে আইলে বন্ধু আমারে পাইবা না (হুমায়ুন আহমেদ)

 

Share