বিপরীত দুজন

লিখেছেন - -তৃপ্ত সুপ্ত- | লেখাটি 1256 বার দেখা হয়েছে

প্রথমেই বলে নিই, এটা একটা ঝগড়াটে মেয়ের গল্প । যারা ঝগড়া পছন্দ করেন না, তারা খবরদার আমার গল্প পড়বেন না।

আমি মহা ঝগড়াটে, গুন্ডি বেটি টাইপ মানুষ । আমার বন্ধু বান্ধবরা আমাকে খুব ভয় টয় পায়। কোথাও দেখা করার কথা থাকলে তারা আমাকে নির্ধারিত সময়ের আরও আধঘণ্টা পর সময় দেয় । কারণ অপেক্ষা করতে হলে আমি চেঁচিয়ে পাড়া মাথায় তুলি । সবসময় হইচই, কিছু না কিছু একটা আমি করতেই থাকি । চুপচাপ বসে থাকা মানুষগুলো বাঁচে কিভাবে এটা আমি কখোনোই বুঝে উঠতে পারিনি । জম্পেশ আড্ডা, তুমুল ঝগড়া, আর ঝগড়া শেষে কান্নাকাটি ছাড়া আমাকে আমার পরিচিতরা কখোনো ভেবে দেখেছে কিনা সে ব্যাপারে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে । আমার বাবা-মাও পারতপক্ষে আমাকে তেমন ঘাটায় না। আমার পাগলামীকে সম্ভবত তারাও ভয় পান । আমি নিজেও অবশ্য আমার ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তায় আছি । 

 

দাড়ান, দাড়ান !!

 

আপনারা কি ভাবছেন, আমি আমার স্বভাব নিয়ে চিন্তিত ??

মোটেই না। আমার চিন্তার বিষয় অন্য ।

 

আমি নিজের স্বভাবের ঠিক বিপরীত একটা ছেলের প্রেমে পড়েছি ।

আলতু ফালতু প্রেম নয়, কঠিন টাইপ । ছেলেটা বৃষ্টি ভালোবাসেনা, জীবনে দু’চারটে ফুল সে আমাকে উপহার দিয়েছে কিনা সন্দেহ । কবিতা, গল্প তার ন্যাকামী লাগে । আমার মতো একটা মেয়ের কোনো ভাবেই তার প্রেমে পড়ার কথা নয় ।

আমি প্রথম যেদিন আমার মাকে তার কথা বলেছি, সত্যি বলছি, বকা খাইনি মোটেই । মা বরং অবাক হয়েছিলো ভীষন । জানতে চাইছিলো এত লক্ষী একটা ছেলের মাথা হঠাৎ করে খারাপ হলো কেন !!

 

আমি নির্দ্বিধায় তাকে এড়িয়ে যেতে পারতাম । কিন্তু সমস্যা হলো এই ছেলে ছায়ার মত সারাক্ষণ আমার সাথে থাকে । যতক্ষন পাশাপাশি থাকি ততক্ষন তো বটেই, যখন চোখের আড়াল থাকি তখনও সে তার কঠিন মায়াজালে আমাকে জড়িয়ে রাখে । কি করছি, কি খাচ্ছি, কার সাথে ঝগড়া বাঁধালাম, কান্নাকাটি করছি কিনা সব ব্যাপারেই তার শতভাগ দৃষ্টি । সে এই উদ্ভট স্বভাবের আমাকে গত প্রায় সাতটা বছর ধরে সহ্য করে আসছে । আমি তার ধৈর্য্য দেখে দেখে ক্লান্ত, কিন্তু সে কখোনোই আমাকে ভালোবেসে ক্লান্ত হয়না ।

তার সাথে সম্পর্কের শুরুটা বলছি, দাঁড়ান ।।

 

আমি তখন সদ্য একটা প্রেমে ছ্যাকা খেয়ে পুরোপুরি কাবু অবস্থায় আছি । এই ছেলে আবার আমার মোটামুটি টাইপ বন্ধু । হঠাৎ সুপারম্যান এর মতো সে আমার জীবনটাকে ঠিক করার দায়িত্বে ঝাঁপিয়ে পড়লো। তার মতো শান্তশিষ্ট একটা ছেলে আমার প্রাক্তন প্রেমিকের সাথে মারামারি করে সে এক এলাহী কান্ড ।

ডিজুসের ‘দুই টাকায় সারা রাত প্যাকেজ ’ এর বদৌলতে কত রাত যে আমি তার ঘুমের বারোটা বাজিয়ে আমার বিখ্যাত কান্না শুনিয়েছি, তার কোনো হিসেব নেই । বিন্দুমাত্র বিরক্ত না হয়ে সে আমার কান্না শুনেছে ।

 

বই মেলা থেকে বই কেনা অথবা শপিং এ গিয়ে দুটো জামার মধ্যে ‘এটা বা ওটা’। রিকশায় চড়ে সারা বিকেল কাটিয়ে দেওয়া কিংবা দুটাকার বাদাম নিয়ে কাড়াকাড়ি, আমার সবকিছুতেই কি করে যেন সবার আগে তার নামটাই ফুটে উঠতে লাগলো ।

 

একটা সময় বুঝতে পারলাম, গাধাটা আমার প্রেমে পড়েছে । তার চাইতেও ভয়ঙ্কর ব্যাপার হলো সে একাই না,  আমিও হাবুডুবু খাচ্ছি !!!!!!!!

 

কিন্তু সমস্যাটা হলো, বেড়ালের গলায় ঘণ্টাটা বাঁধবে কে!!

 

যে আমি এতদিন আরেকটা ছেলের কথা বলে তার কানের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছি, সেই আমি তাকে কিভাবে বলি, “তোমাকে ভালোবাসি” ???

আর সে এতই লাজুক প্রকৃতির, যে তার আশায় বসে থাকলে এই জীবনে আমার আর প্রেম করতে হবে না ।

 

শেষমেষ অনেক চিন্তা ভাবনা করে একটা ফিচলে বুদ্ধি বের করলাম । একদিন এক বন্ধুর সামনে ব্যাপক পঁচানী দিলাম ।

 

“তোকে দিয়ে কিছু হবে না, প্রেমতো দূরে থাক ! বেকুব টাইপ ছেলেদের কেউ পছন্দ করে না । তুইতো কোন মেয়ের সাথে মিশতেই পারিসনা । কিভাবে যেন আমার সাথে মিশতে পেরেছিস । কোন মেয়ে পটানো তোর ক্ষমতার বাহিরে, হেন তেন, ব্লা ব্লা !!!”

 

আমার এই বিশাল ঝাড়ি খেয়ে বেঁচারা পুরোই হতাশ হয়ে ওই দিন রাতে আমাকে এস এম এস পাঠালো “তোমাকে বলতে ভয় লাগে,  আমি মনে হয় তোমাকে ভালোবাসি !”

 

বুঝেন অবস্থা !!!!!

সবাই কত রোমান্টিক ভাবে মেয়েদের প্রপোজ করে , আর সে কিনা একটা ফ্রি এস এম এস দিয়ে কাজ সারতে চায় !!!

 

যাই হোক, ব্যাপারটা নিয়ে আর বেশি ঝামেলা করিনি । বলাতো যায়না , যদি ভয়ে পালায় ? পরদিন দেখা করে ইয়া বিশাল এক উপদেশমূলক চিঠি হাতে ধরিয়ে দিলাম । তাতে হাজার বায়না আর ফিরিস্তি । মেনে নিয়ে ছিল তার সবই ।

 

সেই থেকে শুরু । এরপর কত দিন, সপ্তাহ, মাস, বছর কেটে গেল, কোনদিন এক মুহূর্তের জন্যেও মনে হয়নি তার ভালোবাসায় ভাটা পড়েছে । আমার সকালগুলো এখনও ওর ডাকে ভাঙে, রাতে ঘুমুবার আগে শেষ কণ্ঠস্বরটা আমি তারই শুনি । রেজাল্ট হওয়ার পর একটা দিনও সে বসে কাটায়নি । আমাদের ছোট ছোট স্বপ্নগুলো পূরণ করার জন্য প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্ত সে পরিশ্রম করে যাচ্ছে । যেন আমার বাবা-মার কাছ থেকে আমাকে মাথা উচুঁ করে চাইতে পারে । চাকরী, এমবিএ, আবার মাথা নষ্ট এই আমাকে একসাথে সামলাবার মত মানসিক শক্তি এই ছেলেটা পায় কোথা থেকে, আমার জানার খুব সখ ।

 

আমি খুউব আগ্রহ নিয়ে আমাদের ভবিষ্যত দেখার অপেক্ষায় আছি । ওর এই এক সমুদ্র ভালোবাসার বিনিময়ে আমি তাকে কখনোই কিছু দিতে পারিনি । তাই অপেক্ষায় আছি, হয়তো কখনো, কোন ভাবে এর প্রতিদান দিতে পারবো...

 

 

আজ পাগলটা আমার উপর ভিষণ রাগ করেছে । দুদিন পর তার জন্মদিন । নানা ফন্দিফিকির করে সে বুঝতে চাইছে আমার ব্যাপারটা মনে আছে কিনা !! কিন্তু আমি তো ভুলেই গেছি !!

বুদ্ধিটা ওর মায়ের । সবাই মিলে তার জন্মদিনটা ভুলে যাওয়ার ভান করছি আমরা ।আমি জানি, অনেক কষ্টে আছে সে । কিন্তু মাঝে মাঝে কষ্টও ভিষণ আনন্দের হয় । সারপ্রাইজ পার্টি হবে একটা ।

 

নীল রং তার ভিষন প্রিয় । তাই আকাশ রঙা শাড়ি আর নীলচে টিপ কপালে তার সামনে যাবো আমি । উপহার ভেবেছি একটা নীল খামের চিঠি ।

 

যাতে লেখা থাকবে অল্প দুটো না বলা কথা -

 

   “প্রিয়, তোমার সাথে এত ঝগড়া করি, কত মান অভিমান চলতে থাকে । কখনো মন খুলে বলা হয়ে ওঠেনা, তোমাকে ভীষণ ভালোবাসি ।

Share