অন্তরালের আত্মকহন

লিখেছেন - নাজমুন নুসরাত | লেখাটি 1105 বার দেখা হয়েছে

১.

 

 একটু বড় হওয়ার পর থেকে প্রায়ই আমাকে যে কথা শুনতে হয়েছে তা হল '' মেয়ে হয়ে জন্মেছ,মেয়েদের মতো থাকতে শিখো।'' একই কথা ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হওয়ার পরও শুনে যাচ্ছি।

আমি আজ পর্যন্ত বুঝলাম না মেয়েদের মতো থাকা আসলে কাকে বলে? যেখানে মানুষের মতো থাকাই শিখতে পারলাম না এখনো,সেখানে মেয়েদের জীবন যাপন শেখাটা একটু ঝামে...লার বটে। এইতো গতকালেরই কথা। ক্লাসে যাবো বলে রাস্তায় রিক্সার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। এমন সময় দুটো ছেলে অন্য একটা রিক্সাতে সামনে দিয়ে যাচ্ছিল। যেতে যেতে আমাকে এমন একটা কথা বলে গেলো যা মুখে আনতেও লজ্জা লাগছে। মানুষ এত কুৎসিত ভাষায় কিভাবে কথা বলতে পারে? আমি অবাক হয়ে খেয়াল করলাম আমার যতটা খারাপ লাগা উচিত ছিল ততটা লাগছেনা। প্রথম প্রথম খুব বেশি অপমান লাগত। কিন্তু প্রত্যেকবার মাথা নিচু করে সরে এসেছি। এখনও মাথা নিচু করে সরে যাই কিন্তু যেহেতু অপমান লাগেনা তার মানে আমি আস্তে আস্তে এসবের সাথে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছি। অবশ্য আমি তো জানি আমাকে মেনে নিতেই হবে। আমি কিই বা করতে পারি? আমার টুশী আপুর কথা মনে পড়ে গেলো। আমাদের এলাকাতেই থাকতেন। পাড়ার কিছু ছেলে উনাকে প্রতিদিন বিরক্ত করতো। শেষে আর সহ্য করতে না পেরে বড়দের কে বিচার দিলেন। বিচার তো হলইনা উলটা টুশী আপুকেই খারাপ মেয়ে হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হল। কি লাভ হল অভিযোগ করে? শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যাই করতে হল তাকে। উনি যদি প্রতিবাদ না করতেন তবে হয়ত আজকে বেঁচে থাকতেন। মেয়েদের এত সাহস থাকা ভালো না। এ শিক্ষা ছোটবেলা থেকেই পেয়ে এসেছি। এখনো মনে পড়ে টুশী আপুর আম্মুর কান্না। আমি আমার আম্মু কে এভাবে কাঁদতে দেখতে চাই না। আমি আম্মুকে অনেক বেশী ভালবাসি। অনেক বেশী।

 

 

 

 

লাইব্রেরীতে বসে নোট করছিলাম। পরীক্ষা সামনে। কিছুই পড়া হয়নি এখনো। এমন সময় অঙ্কুর এসে আমার পাশে চেয়ার টেনে বসল। আমি কিছু বললাম না। এখানে কথা বলা নিষেধ। ত্তবুও অঙ্কুর ফিসফিস করে জানতে চাইল

''তোর কতক্ষণ লাগবে রে?''

''বেশিক্ষণ না। কেন?''

''আজকে আমরা বন্ধুরা মিলে ঘুরতে যাওয়ার প্ল্যান করেছিলাম না? তোকে অনিরা কেউ বলেনি''

''নাতো''

''আচ্ছা প্রবলেম নাই,তুই জলদি কর,এরপর আমরা বের হব''

''অঙ্কুর,তোরা যা। আমার বাসায় কাজ আছে।''

''তুই সবসময় এভাবে পালাস কেন? একটা দিন বাসায় একটু দেরি হলে ক্ষতি কি?''

''নারে,আমি যাবনা। তোরা যা'' কলমটা হাতে নিয়ে আবার লেখা স্টার্ট করলাম। অঙ্কুর কিছুক্ষন বিষণ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে চলে গেলো। ওকে এভাবে না বলাতে আমার খারাপ লাগছে। কিন্তু কিছু করার নেই আমার। আমাকে অন্য কেউ একারনেই কিছু বলেনি কারন ওরাও জানে আমি যাবনা। কখনোই যাইনা। একটু মন খারাপ হয়ে গেলো আমার। একবার তো বলতেই পারত। কিন্ত ওদেরও কোন দোষ নেই। আমার ক্রমাগত না শুনতে শুনতে ওরা বলাই বন্ধ করে দিয়েছে। একদিক দিয়ে ভালোই হয়েছে আমার জন্য। বারবার মিথ্যা বলতে ভালো লাগেনা।

 

ব্যাগ নিয়ে বের হয়ে দেখি অঙ্কুর দাড়িয়ে আছে।

''কিরে তোরা এখনো যাসনি?''

''আমি যাইনি'' কেন যায়নি জিগ্যেস করতে গিয়েও করলাম না। আমি খুব ভালো ভাবে জানি অঙ্কুর আমাকে পছন্দ করে। আমিও কি করিনা? নিজের কাছে তো মিথ্যা বলা যায়না। কিন্তু আমি এ ভাললাগাকে কোন প্রস্রয় দিতে চাইনা। আমি জানি যেটা কখনও হবেনা, সেটা নিয়ে স্বপ্ন দেখাও অপরাধ। অঙ্কুর আমার পাশে পাশে হাঁটছে। মেইন রোডে এসে আমি রিক্সা নিলাম। ও তখনো দাঁড়িয়ে আছে। আমি জানি আমি চোখের বাইরে না যাওয়া পর্যন্ত ও দাঁড়িয়ে থাকবে। খুব ইচ্ছা হচ্ছে ওকে ডাকতে। ওকে বলতে যে চল্ আজ আমাকে বাসায় পৌঁছে দে। কিন্তু ইচ্ছাকে কিভাবে দমিয়ে রাখতে হয় আমি শিখে ফেলেছি।

আমি একবারও পেছনে তাকালাম না। 

 

 

 

২.

 

আমাদের নতুন বাসায় উঠে আসলাম কয়েকদিন আগে। এ কয়দিন জিনিসপত্র গোছাতে অনেক ব্যাস্ত ছিলাম। বাসাটা আমার বেশ ভালো লাগছে। আগেরটার তুলনায় অনেক খোলামেলা। বসার ঘরের বারান্দায় দাঁড়ালে অনেকটুকু আকাশ দেখা যায়। তবে দিনের বেলায় ওখানে আমার যাওয়া নিষেধ। রাত্রে যখন চারিদিকে অন্ধকার হয়ে যায় তখন আমি বারান্দায় গিয়ে বসি। খুব ভালো লাগে আমার।

বাসার সামনে একটা চায়ের দোকান আছে। সামনে কয়েকটা বেঞ্চ রাখা।ওখানে সবসময় কয়েকটা ছেলে বসে থাকে।আমি ক্লাসে যেতে আসতে দেখেছি সারাদিন ওরা ওখানেই বসা। ওই জায়গায় আসলে আমার হাঁটার গতি আপনাআপনি বেড়ে যায়। আমার চেষ্টা থাকে দ্রুত জায়গাটা পার হওয়ার। কালকেও ঠিক একই কাজ করতে গিয়ে আরেকটু হলে পড়েই যাচ্ছিলাম। নিজেকে সামলাতে যে কয়েক সেকেন্ড লাগলো তাতেই দেখলাম একটা ছেলে বেঞ্চ থেকে উঠে আমার দিকেই আসছে। আমি জলদি বাসার দিকে হাঁটা শুরু করলাম। 

''এই যে একটু শোনেন...আপনাকে বলছি?''

আমি দাঁড়িয়ে গেলাম। ছেলেটা আমার সামনে এসে দাঁড়াল। মনে মনে আয়াতুল কুরসি পড়ছি আর ভাবছি কিভাবে ঝামেলা থেকে বের হবো। ভয়ে আমার হাত পা কাঁপতে লাগলো।

''আপনারা এখানে নতুন না?''

আমি তাকিয়ে আছি।

''রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় এত তাড়াহুড়ো করা ঠিক না। অ্যাক্সিডেন্ট হতে পারে। আর এলাকায় কখনও কোনও সমস্যা হলে আমাদের কে বলবেন।'' একটু থেমে আবার ''আমাদেরকে এত ভয় পাওয়ার কিছু নেই'' বলে চলে গেলো ছেলেটি। আমি চুপচাপ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলাম।  

 

 

 

আম্মু রাতে খাওয়ার সময় বলল যে কালকে যেন ক্লাসে না যাই। আমাকে ছেলে পক্ষ দেখতে আসবে। ছেলে অনেক ভালো চাকরি করে। আমার ভাগ্য নাকি অনেক ভালো যে এরকম একটা বিয়ের প্রস্তাব এসেছে আমার জন্য। এখন সব ঠিকঠাক মতো হলেই হয়।

প্রতিবারের মতো এবারো আমাকে সেজেগুজে ওদের সামনে যেতে হবে। ওদেরকে বলতে হবে আমি রান্না করতে পারি,কোরআন শরীফ পরতে পারি,পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ি। মাথার ঘোমটা পড়তে দেয়া যাবেনা। তাতে ওরা ভাববে মেয়ে বেয়াদব...এরপর সময় নিয়ে আমার সব ভালো গুন ওদেরকে নাস্তা আর চায়ের সাথে গুলে খাওয়ানো হবে। আমাকেও হাসি মুখে সব শুনতে হবে। এরপর ওরা ভেবে দেখবে আমি পাত্রী হিসেবে যোগ্য কিনা। এর আগে দুবার আমাকে পাত্র পক্ষ দেখতে এসেছে। এই পুরো ব্যাপারটা এতই ক্লান্তিকর যে আমি বলে বোঝাতে পারবোনা। অস্থিরতায় সারারাত আমার ঘুম হলনা। 

 

 

আমাদের বসার রুমে মানুষ গিজগিজ করছে। আমি এক কোনায় জড়সড় হয়ে বসে আছি। ভারি শাড়িটা পরতে চাইনি আমি। আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে। একটু যদি খোলা বাতাস পাওয়া যেত কোথাও! এতক্ষণ প্রশ্ন উত্তরের পালা চলছিল। আমাকে আগেই সবাই শিখিয়ে দিয়েছে যাতে বেশী কথা না বলি। মেয়েদের নাকি বেশি কথা বলা উচিত না। হ্যাঁ আর না এর মাঝেই আমাকে জবাব দিতে হয়েছে।

অবশেষে সবচেয়ে কঠিন সময়টা এল,ছেলে আমার সাথে একা কথা বলতে চায়। আমি এই অংশটাকে সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করি। কি যে সব অদ্ভুদ প্রশ্ন শুনতে হয়!! আমাকে সেগুলার যথা সম্ভব ভদ্রভাবে উত্তর ও দিতে হয়। 

 

 

 

যাওয়ার সময় ওরা আমাকে আঙটি পড়িয়ে দিয়ে মিষ্টিমুখ করে গেলো। পাত্রী ওদের পছন্দ হয়েছে,তাই ওরা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিয়ে করিয়ে দিতে চায়। সমস্যা শুধু একটা জায়গাতেই,আমার ফাইনাল পরীক্ষা যে মাসে ওরা সেই মাসেই বিয়ে করাতে চাচ্ছে। আমার আব্বু বলেছিলেন আরেকটু পরে বিয়ে হলে ভালো হত। কিন্তু ওরা বিরক্ত হয়েছে। পাছে এত ভালো পাত্র হাত থেকে চলে যায় এই ভয়ে আব্বু আর কিছু বলেননি। 

ওরা চলে যাওয়ার পর আব্বু আমাকে ডেকে পাশে বসালেন।নিজের হাত আমার মাথায় রাখলেন। কিন্তু কিছু বললেন না। আব্বু এমনই। খুব কম কথা বলেন। কিন্তু আমাকে অনেক বেশী ভালবাসেন। আমার খুব খারাপ লাগছে হঠাৎ। আব্বুর উপর অনেক চাপ পড়ে গেলো। মেয়ের বিয়ে দেয়া আর হাতি পালা একই কথা। তার উপর এত জলদি সব যোগাড়যন্ত্র করা আরো কষ্টসাধ্য।

 

রাতে ঘুমাতে গিয়ে খেয়াল করলাম ঘুম আসছেনা। বারবার চোখে পানি চলে আসছে। আম্মু আজকে আমার সাথেই আছে। আমাকে জড়িয়ে ধরে অনবরত কেঁদেই যাচ্ছে। কিন্তু আমার কান্নার উৎস সম্পর্কে আমি সন্দিহান,কারন আমার মাথায় অঙ্কুরের কথাই বারবার আসছে। একটু সাহস করে যদি আমি বলতে পারতাম যে আমি কি চাই...তাহলে আজকে হয়তো এত কষ্ট হতোনা। আমার আম্মু আমাকে বিদায় দেয়ার দুঃখে কাঁদছে,আর তাঁর মেয়ে নিজের স্বপ্নকে বিদায় দেয়ার কষ্টে...

 

 

 

৩.

 

আজকে আমার বিয়ে। বিয়ের দিন নাকি মেয়েদের জীবনের সবচেয়ে বিশেষ দিন। আমার তেমন কিছু লাগছেনা। ভারি শাড়ি আর গয়নার মাঝে নিজেকে লুকিয়ে রেখেছি। পুতুলের মতো বসে থাকা ছাড়া আমার কিছু করার নেই। আমার আত্মীয় স্বজন সবাই চলে এসেছে। এখন বরের আসার পালা। কিছুখন পরেই আমার ছোট বোন এসে বলল বর এসে গেছে।

 

 

 

 

এর পরের ছোট্ট একটা ঘটনা টুকু একজন তৃতীয় পক্ষের লোকের মনের মাধ্যমে জানি...

 

''বিয়েতে এমন ঝামেলা করার কোনও দরকার ছিল? এরা আগে থেকে কথা বলে রাখে নাই নাকি। জামাইটাও দেখি কিছু বলছেনা। তারমানে আগে থেকেই ঠিক করা ছিল যে ওরা বিয়ের দিনেই যৌতুকের কথা তুলবে। স্বাভাবিক ভাবেই এত গুলো মানুষের সামনে নিজের সম্মান বাচানোর জন্য মেয়ের বাবা দাবি মেনে নিবেন। আহারে!!! মেয়েটার কোন জায়গায় যে গিয়ে পড়লো।''

 

 

আবার আমি-

আমি এতক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুনছিলাম ওদের কথা। আর অবাক হয়ে উনার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। আমার জীবন সঙ্গী হিসেবে উনার কি কিছু বলা উচিত না? কিন্তু উনি তো কিছুই বলছেন না। আমার আব্বু যখন উনাকে গিয়ে বললেন ''বাবা,তুমি কিছু বল?''

আমার হবু স্বামীর(!!!) উত্তর ছিল ''আঙ্কেল,আমি কিছু জানিনা। আমার ফ্যামিলির সাথেই আপনি কথা বলেন,ওদের কথাই আমার কথা'' আমি যার পরিবার কে নিজের পরিবার মনে করে নতুন জীবন শুরু করতে যাচ্ছি,তার কাছে আমার আপনজনের কোনও মূল্যই নেই!!! এত রাগ আমার আর কখনই লাগেনি। মনে হচ্ছিল সব ভেঙ্গে তছনছ করে দেই।

আমার আব্বুকে এত অসহায় আমি আর কখনই দেখিনি। আমি মনে হয় জীবনে এ প্রথম আব্বুর চোখে পানিও দেখলাম। আমার নিজের চোখের পানির জন্য সব ঝাপসা লাগছে। কিন্তু আমি এটা বুঝতে পারছি আব্বু এখন অনেক বড় ভুল করতে যাচ্ছে। সারা জীবনের অর্জিত সম্মান আজকে আব্বু ওদের পায়ের পাতায় বিসর্জন দিতে যাচ্ছে। আমি কি এভাবে দেখতে থাকব? এর চেয়ে মরে যাওয়া কি ভালো না??...কেউ কি কিছুই করবেনা? আমার আব্বুটাকে এভাবে অপমানিত হতে দেখে কেউ কি বাধা দিবেনা?  

আমার হঠাৎ কি হল আমি জানিনা... আমি উঠে দাঁড়ালাম।

 

 

 

পরিশিষ্ট-

 

''আজকের পেপার পড়েছিস?''

''কেন? কি আছে আজকে?''

''দাঁড়া। তোকে পড়ে শোনাই-

বিয়ের আসরে যৌতুক দাবি করার কারনে কনে নিজের বিয়ে ভেঙ্গে দিয়েছে...''

 

 

((    গল্পটা লেখার উদ্দেশ্য ছিল একরকম। কিন্তু শেষ করার পর দেখলাম অন্য রকম হয়ে গেছে। সত্যি কথা বলতে আমি খুশী হয়েছি গল্পটা এভাবে লিখতে পেরে। 

গল্পের বেশিরভাগ কল্পনা করে লিখলেও শেষের অংশটা সত্যি। কিছুদিন আগে এমন একটা ঘটনা পত্রিকায় এসেছিলো। যেখানে আপুটা অন্যায়ের সাথে আপোষ করেননি। এই লেখাটা সেই অসম্ভব সাহসী অজানা আপুর জন্য। ))

Share