রৌদ্রালোকে

লিখেছেন - নাজমুন নুসরাত | লেখাটি 1344 বার দেখা হয়েছে

১.

''দোস্ত দেখ দেখ,তোর নায়িকা আসছে।''

 

ধ্রুব চোখ গরম করে আতিকের দিকে তাকাল। এইসব ফাজলামি ও একদম পছন্দ করেনা। কখন কোন সময় কার সাথে একটু হাসি ঠাট্টা করেছিল...না,ঠিক করে বলতে গেলে একটু অ্যাফেয়ার টাইপেরই হয়ে গিয়েছিল সেগুলা নিয়ে এখন ভেবে লাভ কি?

 

মেয়ে গুলা শুধু শুধু ওর প্রতি দুর্বল হয়ে যায়,এতে ওর কি করার আছে? অবশ্য ও যে ব্যাপারটা উপভোগ করেনা তা না। তবে ও সবচেয়ে বেশী এনজয় করে ওর বন্ধুদের হিংসা। ওর চেয়ে দেখতে ভাল,পড়ালেখায় ভালো এমন ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা কেন যেন ওকেই বেশী পছন্দ করে। ধ্রুব জানে কারণটা ওর ব্যাক্তিত্ত। আর যাই হোক ধ্রুব ছেঁচড়া না। সে কখনও গায়ে পড়ে মেয়েদের সাথে কথা বলেনা। আর কখনও সে নিজের লিমিট ক্রস করেনি।

 

''life goes on,and u have to move on'' এই হল ধ্রুব'র পিক আপ লাইন। ভার্সিটি লাইফে এসে মানুষ একটু আধটু প্রেম করেই। কিন্তু ধ্রুবর কথা হল ''আমাকে আমার বাবা মায়ের চেয়ে বেশী ভালো কেউ চিনেনা। একমাত্র তারাই পারে আমার মত শয়তানের জন্য পারফেক্ট শয়তানী খুঁজতে। তো আমি এত কষ্ট করবো কেন?'' মজার ব্যাপার হল যেসব মেয়ে ধ্রুবর প্রেমে পড়ে তারা এসব জানে। জেনেও ওরা কেন যেন নিজেদের আটকে রাখতে পারেনা।

 

 

 

''মেয়েটা এত সুন্দর!! সত্যি করে বলতো তোর ওকেও ভালো লাগেনা?'' আতিকের সন্দেহ মাখা প্রশ্ন। ধ্রুব মনে মনে হাসে।

 

''ওর চেহারা ভালো বলে ওকে ভালো লাগতে হবে?''

 

''না কিন্তু প্রথমে তো সেটাই দেখে মানুষ''

 

ধ্রুব আবার নিতুর দিকে তাকাল। আসলেই অনেক সুন্দর নিতু। অনেকেই ওর জন্য পাগল। কিন্তু নিতু ওদের দিকে ফিরেও তাকায় না। মাঝের কয়েকটা মাস নিতুর সাথে অনেক ঘুরেছে ধ্রুব। নিতুকে ওর ভালও লাগে। কিন্তু শুধু বন্ধুর মত ভাললাগাতেই সেটা সীমিত। নিতু ওকে পছন্দ করে এটা সে জানত। কিন্তু ভেবেছিল ও বুদ্ধিমতী মেয়ে,ঠিক সামলে নিবে। কিন্তু নিতু পারেনি। এবং অবধারিত ভাবে ওদের বন্ধুত্তেরও ওখানেই ইতি ঘটেছে। ধ্রুবর খারাপ লাগে কিছুটা,নিতু বন্ধু হিসেবে খুব ভালো ছিল। কেন যে বন্ধু হয়েই থাকতে পারলনা! নিতু এখন ওর সামনে এলে এমন ভাব করে যেন ওখানে ধ্রুবর কোনও অস্তিত্তই নেই। ধ্রুবও পারতপক্ষে ওর সামনে পড়েনা।

 

 

 

 ২.

 

ফ্যাকাল্টির সামনে ধ্রুবরা সবাই আড্ডা মারছে। আজকে ফার্স্ট ইয়ারের ওরিয়েনটেশন ক্লাস। আর ফার্স্ট ইয়ারের মেয়েদের দেখাও ওদের আরেকটা উদ্দেশ্য। কথা বলতে বলতেই ধ্রুব খেয়াল করলো ওদের থেকে একটু দূরে একটা মেয়ে অনেকক্ষণ ধরেই দাঁড়িয়ে আছে। প্রথমে ভেবেছিল নতুন তাই হয়ত বুঝতে পারছেনা কোথায় যেতে হবে। কিন্তু ফার্স্ট ইয়ারের সবাই ক্লাসে ঢুকে যাওয়ার পর ও মেয়েটা ওখানেই দাঁড়িয়ে আছে। ক্লাসের টাইম হওয়াতে ওরা ক্লাসের দিকে যাচ্ছিল। কি ভেবে ধ্রুব মেয়েটার সামনে এসে জানতে চাইল '' আপনি ফার্স্ট ইয়ারে পড়েন?''

 

''আমাকে বলছেন?''

 

এটা কি ধরনের কথা হল? তোমাকে না বলে কি ভুতকে বললাম নাকি? যত্তসব ন্যাকামি। বিরক্তি চেপেই ধ্রুব আবার বলল ''হ্যাঁ,আপনাকেই বলছি''

 

''আমি তো সেকেন্ড ইয়ারে পড়ি''

 

''ও ,কোন ডিপার্টমেন্ট?''

 

''এখানেই''

 

ধ্রুব একটু অবাক হল। ও আগে মেয়েটাকে দেখেছে বলে মনে হয়না।

 

''ক্লাস নেই? এখানে দাঁড়িয়ে আছ যে?''

 

''আমার ফ্রেন্ডরা আসবে,ওদের জন্য অপেক্ষা করছি''

 

''ও,কি নাম তোমার?'' ধ্রুব ভদ্রতা করে জিজ্ঞেস করলো।

 

''জী, তিতির'' একটু মাথা ঝাকিয়ে ধ্রুব সরে এল। ক্লাসের দেরি হয়ে যাচ্ছে।

 

 

এরপর প্রায় সময় তিতির সাথে করিডোরে দেখা হয় ধ্রুবর। কিন্তু দুজনে কোনও কথা বলেনা।

 

মাঝে একবার ধ্রুব দেখেছিল তিতির বাইরে দাঁড়িয়ে আছে, মুখ দেখে মনে হচ্ছিল অনেক চিন্তিত। তাই সে জানতে চেয়েছিল সমস্যা কি। প্রথমে একটু ইতস্তত করে তিতির বলেছিল ওর একটা ইমারজেন্সি কল করা দরকার। কিন্তু ওই মুহূর্তে মোবাইলে ব্যালান্স নেই। ধ্রুব নিজের সেলফোন বের করে দিয়ে বলেছিল ফোন করতে। তিতির করেনি। অথচ একটু পরেই ওর সামনে দিয়ে অন্য এক ফ্রেন্ড যাচ্ছিল,তাকে ডেকে মোবাইল চেয়ে নিল বেয়াদব মেয়েটা!!! এবং স্বাভাবিকভাবেই ধ্রুব এতে প্রচণ্ড অপমান ফিল করেছে। ও গেলো সাহায্য করতে আর ফাজিল মেয়ে কিনা ভাব দেখায়!! ভালো,দেখাক ভাব। ধ্রুব যেন থোড়াই কেয়ার করে। যেখানে অন্য মেয়েরা ওর সাথে কথা বলতে পারলে বর্তে চায় সেখানে এই মেয়ে ওকে দেমাগ দেখায়!! হাহ্...

 

এরপর থেকে তিতিরকে আর সহ্য করতে পারেনা ধ্রুব। মাঝে মাঝে নিজের উপরই রাগ লাগে ওর। মানুষের মন বড়ই আজব প্রকৃতির। যেখানে মেয়েরা বেশী কথা বলতে আসলে ওর বিরক্ত লাগে সেখানে তিতির ওকে পাত্তাও দিচ্ছেনা দেখে ধ্রুবর এত গায়ে লাগার কারন কি? পরে ওর মনে হয় ওর মেল ইগোই এর জন্য দায়ী। তারপরও ওর তিতির নামের মেয়েটার উপর থেকে রাগ কমলোনা। একদিন সেমিনারে ওর ফ্রেন্ড এর সাথে তিতিরকে হেসে  কথা বলতে দেখে ওর মনে হচ্ছিল এক থাপ্পর দিয়ে মেয়েটার দাত সব ফেলে দেয়। সবার সাথে হাসতে পারে কিন্তু ওর দিকে তাকালেই পেঁচার মতো মুখ হয়ে যায় মহারানীর। নবীন বরনের দিন তো  তিতিরের গান শুনে সবাই প্রসংশায় পঞ্চমুখ। মুখ তেঁতো করে ধ্রুব এটা স্বীকার করতে বাধ্য হল যে মেয়ে আসলেই ভালো গায়।

 

এভাবেই হয়তো দিন কেটে যেত। কিন্তু ভাগ্যবিধাতার মনে সম্ভবত অন্য কিছুই চলছিল।

 

 

 

 ৩.

 

বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিবে বলে মাত্র বাসা থেকে বের হয়েছে ধ্রুব। নিউ মার্কেটের সামনে এসে এদিক ওদিক রিক্সা খুঁজতে খুঁজতেই চোখ পড়লো ওদের দিকে। তিতির রিকশায় বসে আছে। খুব হেসে হেসে কথা বলছে । পাশে একটা ছেলে। তিতির ওকে খেয়াল করলনা অথবা হয়তো করেও না দেখার ভান করলো। আর ধ্রুবর হল মেজাজ খারাপ। যাই হোক,রিক্সা ঠিক করে রওনা দিল ধ্রুব। ফ্রেন্ড এর বাসায় গিয়ে দেখে যে সবাই এসে গেছে। ধ্রুবর মুখ গোমড়া দেখে আতিক জানতে চাইল কি হয়েছে। তিতিরের কথা বলল ধ্রুব। আতিক একটু অবাক হল মনে হয়

 

''ওকে দেখে তুই এত খেপলি ক্যান?''

 

''খেপব না? ওকে হাসতে দেখলে আমার মনে হয় দাঁত গুলা খুলে ফেলে দিই। পাশের ছেলেটা কেমন গাধার মতো হাসছিল ওর কথা শুনে,যেন জীবনে এত মজার কথা শুনেনাই''

 

''হয়তো ওর বয় ফ্রেন্ড ছিল। ওর কথা শুনে হাসবে নাতো কি তোর তোর কথা শুনে হাসবে ?''

 

আতিকের কথা শুনে ধ্রুব একটু থমকে গেলো

 

''বয় ফ্রেন্ড কেন হবে?''

 

''হবে না কেন সেটা বল্ ভাই! ভার্সিটি পড়ুয়া একটা মেয়ের অ্যাফেয়ার থাকতেই পারে। not a big deal''

 

কেন যেন ধ্রুবর কথাটা মানতে ইচ্ছা করলনা। ওর শুধুই এটাই মনে হচ্ছে যে ওই ছেলেটা তিতিরের বন্ধু হতে পারে,অথবা কাজিন...কিন্তু বয় ফ্রেন্ড শব্দটা মাথায় আসলেই ওর প্রচণ্ড রাগ হচ্ছে। আর সাথে আরও কিছু অনুভব করছে। না মানতে চাইলেও ধ্রুব বুঝতে পারছে সেটা কি। ধ্রুবর হিংসা লাগছে। হিংসা!!! আর হিংসা কাকে লাগছে? রিক্সায় তিতিরের পাশে বসা গাধা ছেলেটাকে!!! কেন লাগছে? গাধা ছেলেটা বেয়াদব মেয়েটার বয় ফ্রেন্ড এটা ভেবে!!!

 

আড্ডার পুরোটা সময় ধ্রুবর আর মন  বসলোনা। বারসেলোনা আর রিয়েল মাদ্রিদ এর মধ্যে কে বেটার এটা নিয়ে যখন তুমুল তর্ক হচ্ছে তখনো ধ্রুব চুপ। এইমুহুরতে ওর মাথায় তর্ক চলছে ''ছেলেটা তিতিরের  বয় ফ্রেন্ড/ ছেলেটা তিতিরের বয় ফ্রেন্ড না''

 

 

 

৪.

 

দুদিন যাবত ধ্রুব বাসায় গুম ধরে বসে আছে। কোথাও যাচ্ছেনা। ওর শুধু একটা জায়গাতেই যেতে ইচ্ছা করে আর সেটা হল ক্যাম্পাস। আর কারনটাও ওর এখন আর অজানা না। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি,এ দুদিন ধ্রুব বসে বসে হিসেব করেছে তিতির ওর সাথে কয়বার কথা বলেছে,কয়বার ওর দিকে তাকিয়ে হেসেছে। সংখ্যাটা ওর মনঃপূত হচ্ছেনা। ফেসবুকে বসে তিতিরের প্রোফাইল বের করেছে। প্রাইভেসি দেয়া যদিও...প্রোফাইল পিক দেখা যায়। আর ওটা দেখেই ধ্রুবর মনে হল এতকিছুর মাঝে ও কখনও খেয়াল করেনি,তিতিরের চোখ অনেক সুন্দর। এই চোখের দিকে তাকিয়ে সে সারা জীবন কাটিয়ে দিতে পারে। এক অদ্ভুদ শিহরন বোধ করলো ধ্রুব। একেই কি ভালবাসা বলে?

 

নিজেকে পাগল পাগল লাগছে ধ্রুবর। কেন যেন খুব কষ্ট হচ্ছে বুকের মাঝে। প্রোফাইল পিক টা ডাউনলোড করলো সে। খুব যত্ন করে এডিট করে শুধু চোখ টা রাখল। ল্যাপটপে ডিসপ্লে দেয়ার পর ওর মনে হল যে হ্যাঁ এখন তিতির ওর কাছে আছে।

 

সাধারনত এই সময়ে বন্ধুরাই সবচেয়ে বেশী কাজে আসে। ধ্রুবর বেলায়ও এর কোন ব্যাতিক্রম হলনা। দুদিন ধ্রুবকে ভার্সিটিতে না পেয়ে দল বেধে সবাই ওর বাসায় হাজির। চানাচুর,চা আর গরম গরম শিঙ্গারা খেতে খেতে ওরা গম্ভীর মুখে সব শুনল। ল্যাপটপের ডিসপ্লেতে তিতিরের চোখের ছবি দেখে ওরা সিওর হল যে ধ্রুব ভালভাবেই প্রেমে পড়েছে। অনেক তর্ক বিতর্কের পর ধ্রুবর বন্ধুরা শপথ নিল যেভাবেই হোক,ধ্রুব তিতিরের মাঝে প্রেম ওরা ঘটাবেই। ওদের খুশী হবার আরেক পরোক্ষ কারন যদি ধ্রুব আসলেই তিতিরের সাথে সেটেল্ড হয়ে যায়,তাহলে অন্তত ওদের লাইন ক্লিয়ার হয়ে যাবে। যে মেয়েকেই ওরা পছন্দ করে ঘুরে ফিরে সবাই ধ্রুবর সাথেই টাঙ্কি মারে। ওর এক অতি দরদি বন্ধু তো বলেই দিল ''দোস্ত,কোন প্রবলেম হইলে আমারে বলবি। ভাবিরে দরকার পড়লে উঠায় নিয়ে আসুম''  

 

তবে সবাই একটা কথা বলল,ধ্রুবর আগে তিতিরের সাথে সরাসরি কথা বলা উচিত।

 

 

ক্লাসের বাইরে ধ্রুব অপেক্ষা করছে। তিতিরের সাথে আজকেই কথা বলবে সে। কিভাবে ওকে ভালবাসি বলবে এটা নিয়েই রাতে হাজারবার প্র্যাকটিস করেছে। পড়া শিখতেও ওর এত সময় লাগেনা । আগে কখনও কোনও মেয়ের সাথে কথা বলতে এত লজ্জাও লাগেনি ওর। অবশ্য আগে কোন মেয়েকে এভাবে ভালও তো বাসেনি।

 

তিতির ক্লাস থেকে বের হয়ে এসেছে। ধ্রুব ডাকল '' তিতির,একটু শোন ''

 

''বলেন ভাইয়া। '' ভাইয়া ডাক শুনে ধ্রুব দমে গেলো। এত কিছু থাকতে ভাইয়া কেন? ও কিছুনা,জুনিওর দেখে ভাইয়া ডেকেছে আরকি। আঙ্কেল তো আর ডাকেনাই। মনে মনে নিজেকে প্রবোধ দিল ধ্রুব।

 

''তোমার সাথে কিছু কথা ছিল,চল ক্যান্টিনে যাই''

 

''যা বলার এখানে বলেন। আমার ক্লাস আছে। দেরি হয়ে যাবে।'' এ পর্যায়ে এসে ধ্রুবর গলা শুকিয়ে গেলো। এখানে কিভাবে বলবে ও?

 

''বলেন না?''

 

ধ্রুব বলতে গেলো যে আমি তোমাকে অনেক ভালবাসি তিতির। কিন্তু ওর মুখ দিয়ে বের হল

 

''আমি......না মানে...তুমি তো অনেক ভাল গান করো,একটা প্রোগ্রাম করবো আমরা...ওখানে গান করবা?''

 

''এই কথা বলার জন্য ডেকেছেন?'' তিতিরের ভাবভঙ্গি একটু নরম হয়ে এসেছে। প্রশংসা শুনলে সব মেয়েই মনে হয় একটু গলে যায়।

 

''আর কি বলার জন্য ডাকবো? '' অসহায় ভঙ্গিতে বলল ধ্রুব। নিজেকে একশো একটা লাত্থি দিতে ইচ্ছা হচ্ছে ওর।

 

''আসলে আমি তো শখের গান করি,প্রোগ্রামে গাওয়ার সেই যোগ্যতা এখনো হয়নি...তবুও থ্যাংকস বলার জন্য'' বলে চলে যাচ্ছিল তিতির।

 

মনে মনে এবার নিজেকে হাজারটা লাত্থি মারল ধ্রুব। আবার ডাকল ''তিতির আরেকটা কথা ছিল''

 

ঘুরে তাকাল তিতির '' বলেন?''

 

যা হওয়ার হবে, বলে দে বলে দে বলে দে...চোখ বন্ধ করে বড় একটা শ্বাস নিল ধ্রুব,তারপর হড়বড় করে বলে দিল ''তোমাকে এটা বলার জন্য ডেকেছি যে আমি তোমাকে ভালবাসি। অনেক ভালবাসি। আমি চাই তুমিও আমাকে ভালবাস''

 

রাগে তিতিরের মুখ লাল হয়ে গেলো। ধ্রুবর মনে হচ্ছিলো এখন যদি তিতির ওকে সবার সামনে থাপ্পর মেরে দেয় তাহলে কি হবে?

 

তিতির এমন কিছুই করলনা। ঠাণ্ডা গলায় বলল

 

''সবাই আপনার ব্যাপারে যা বলে সেটা একদমই ঠিক দেখছি। ভালবাসা আপনার কাছে খুব সস্তা ব্যাপার তাই না? আজকে এর সাথে কালকে ওর সাথে...বুঝলাম আপনি এরকমই। কিন্তু আমাকে নিজের মতো মনে করার কোনও কারন নেই। আর কখনও আমার সাথে কথা বলতে আসলে আমি চেয়ারম্যান স্যার কে নালিশ করতে বাধ্য হবো'' এরপর গটগট করে হেঁটে উলটা দিকে চলে গেলো তিতির।

 

ধ্রুবর মনে হল থাপ্পর মারলেই বোধহয় ভাল হত।

 

ধ্রুব আর তিতিরের গল্পের পরের অংশ-

 

 

৫.

 

ধ্রুব তিতিরকে এরপর আর কিছু বলেনি। এমনকি নিজের বন্ধুদের ও কিছু বলতে বা করতে নিষেধ করেছে। কিন্তু ওর পাগলামি কমেনি বৈ বেড়েছে। প্রতিদিন কয়েকবার করে তিতিরের ক্লাসের সামনে হেঁটে যায় তিতিরকে এক নজর দেখার জন্য। একদিন তিতিরের রিক্সার পেছন পেছন গিয়ে দেখে আসলো ওর বাসা কোথায়। মাঝে মাঝে বাসার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তিতিরকে কখনো দেখা যায় না,কিন্তু ধ্রুব ওর হলেও হতে পারতো শ্বশুরবাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে অনেক শান্তি পায়।

 

ঠিক কিসের জন্য এসব করে ও নিজেই বুঝেনা। শুধু এটা বুঝে যে ওর ভাল লাগে। ওর প্লে লিস্ট ''im so lonely broken angel'' আর ''মেয়ে আমি বখাটে নই'' টাইপের গানে ভর্তি হয়ে গেছে । মাঝে মাঝে বেসুরো গলায় গাইতেও চেষ্টা করে ''আমিতো প্রেমে পড়িনি ,প্রেম আমার উপরে পড়েছে'' আর বলে ক্লাসিক একটা গান দোস্ত,ক্লাসিক গান।

 

আতিক ওর অবস্থা দেখে বলেই দিল একদিন ''তোরে পাগল রোগে পাইসেরে'' ধ্রুব কিছু বলেনা। ও যে পাগলের সাথে সাথে ছাগলেও রুপান্তরিত হচ্ছে তা নিয়ে ওর নিজেরও আর সন্দেহ নাই। আগে ওর ইচ্ছা ছিল ভালো একটা চাকরি করবে। এখন দৈনিক ওর ইচ্ছা পরিবর্তন হয়। আজকে মনে হচ্ছিল ফুচকা বিক্রির পেশাটা খারাপ না( তিতিরকে খুব শখ করে ফুচকা খেতে দেখেছে আজকে ),আগের দিন মনে হয়েছিল রিক্সা চালালে কিবা এমন ক্ষতি হবে( তিতির রিক্সা করেই আসা যাওয়া করে )...

 

ধ্রুব খুব ভালোভাবে বুঝতে পারছে এভাবে কিছুই হবেনা। প্রতিদিন সে অপেক্ষা করে আজকে হয়তো খারাপ কম লাগবে, খুব বেশী সৌভাগ্যবান হলে একটা অ্যাক্সিডেন্ট হয়ে যাবে আর অ্যাম্নেশিয়া হয়ে তিতিরের কথা ওর মনেই থাকবেনা...কিন্তু ফলাফল শূন্য। প্রতিদিন আগের দিনের চেয়ে বেশী খারাপ লাগে। এভাবে চলতে থাকলে দেখা যাবে একসময় তিতিরের বিয়ে হয়ে গেছে আর সে মজনুর মতো সারাজীবন দাড়িগোঁফের জঙ্গল নিয়ে বিরহে কাতর হয়ে জগৎসংসারের উপর বোঝা হয়ে পড়ে আছে। নিজের এত সাজানো গোছান লাইফ কোন বোকা লোকই নষ্ট করবে। আর ধ্রুব বোকা না। পাগলামি করছে ঠিকই কিন্তু ওর চিন্তা ভাবনা একদম স্পষ্ট । তাছাড়া এখনকার মজনুরা অনেক ডিজিটাল। এত সব দুঃখ কষ্টের মাঝেও সে ভালোভাবে খোঁজ নিয়ে জেনেছে তিতিরের কোনও বয়ফ্রেন্ড নেই (উপরঅলাকে অশেষ ধন্যবাদ ) ।

 

ওদের দুই বোন এক ভাই এর মাঝে বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। ভাই বাইরে পড়াশোনা করে...যেহেতু তিতির সবার ছোট তাই পড়াশোনা শেষ হওয়ার আগে তিতিরের বিয়ে হবার কোনও সম্ভাবনা নেই।

 

 

৬.

 

সারারাত জেগে এখন খুব খিদা লেগেছে ধ্রুবর। কিন্তু মায়ের সামনে তো অনেক বড় গলায় ''এইসব আমি খাবোনা'' '' আমার কথা কেউ ভাবে না'' বলে চলে এসেছিল। এখন আবার যেতে লজ্জা লাগছে। মায়ের সামনে লজ্জা লাগার কোনও কারন নেই যদিও। ছোটকালে কোন কিছু দিবে না বললে বিচ্ছুর মত মায়ের সাথে লেগে থাকতো ধ্রুব। না দিয়ে যাবে কই। আর এখন একবার না শুনলেই আত্মসম্মান নিয়ে টানাটানি শুরু হয়ে যায়। নাহ! পিচ্চিকালের বেহায়া ধ্রুবই ভালো ছিল। মনে মনে ভাবে সে। এমন সময় মায়ের চিৎকার শোনা গেলো

''ধ্রুব...বাইরে আয় জলদি। খেয়ে আমাকে উদ্ধার কর ''

 

বাইরে এসে ধ্রুব দেখল টেবিলে ওর জন্য নাস্তা অপেক্ষা করছে আর তাও ওর পছন্দের!! কখন বানালো মা এসব? যাই হোক,আগে পেট পুজা তারপর অন্য কথা।

খাওয়া শেষে মনে হল এবার চিন্তা করা যায়। পেট ঠাণ্ডা হলে মাথা চমৎকার কাজ করে। উঠে চলে আসবে তখনি মা ওর সামনে এসে দাঁড়ালেন। ''কোথায় যাচ্ছিস?''

বিরক্ত হলনা ধ্রুব। খেয়ে দেয়ে ওর এখন বেশ একটা ফুর্তি ফুর্তি ভাব এসেছে। জবাব দিল ''বাইরে যাবো''

''তোর কি হয়েছে আমাকে বলে তারপর যা''

''সর তো মা,আমার কিছুই হয়নি'' বলে মাকে পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে এল সে।

 

মুখে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল ওর। মহিলা বড়ই চালাক। সব সময় বুঝে ফেলে যে ওর মনে কি চলছে। ধ্রুব একদম সিওর যে সে মায়ের মতই হয়েছে। ওর বাবা এমন খামখেয়ালি যে সামনে দিয়ে চলে গেলেও ভালমত দেখেন না। ধ্রুব দ্রুত হাঁটতে লাগলো। খুব জরুরি কাজ আছে আজকে। ওর জীবন মরনের প্রশ্ন জড়িত এর সাথে। গত কয়েকদিন ধরে ও নিজের সাথে যুদ্ধ করেছে এটা নিয়ে।

 

 

৭.

 

তিতির সে কখন থেকে অপেক্ষা করছে সবার জন্য। ভেবেছিল ওই লেট করেছে। কিন্তু এসে দেখল আর কেউই আসেনি তখনো। ফ্রেন্ডদের কল দিয়ে যাচ্ছে অনবরত কিন্তু ওরা ফোন ধরছেনা। মনে মনে ভাবল সে ''আর ১৫ মিনিট থাকব,এর পর চলেই যাবো''

 

আনমনে নিজের কোকের গ্লাসে চুমুক দিল তিতির। না আসাই ভাল ছিল। কয়েকদিন ধরে এমনিতেই ওর কিছু ভালো লাগছেনা। লাগবেই বা কেন? যেখানেই যায় সেখানেই ধ্রুবকে দেখছে ও। ক্লাসের বাইরে তাকালে বারান্দায় ধ্রুব। লাইব্রেরীতে গেলে সেখানেও ধ্রুব । একই ডিপার্টমেন্টেই যেহেতু পড়ে,দেখা যেতেই পারে। কিন্তু সেদিনের ঝাড়ি দেয়ার পর থেকে মনে হয় একটু বেশীই দেখা যাচ্ছে ধ্রুবকে।

 

ঝাড়ি দেয়ার পরে তিতিরের একটু খারাপ লেগেছিল এভাবে কথা শুনানোর জন্য। একটু বেশীই কড়া কথা বলে ফেলেছিল সেদিন। কিন্তু কি করবে সে? সবার কাছে ধ্রুবর ব্যাপারে যা যা শুনেছে...ওর এমন ছেলে একদম পছন্দ না। প্রথমদিন কথা বলে খারাপ লাগেনি তিতিরের। কিন্তু ওর বন্ধুরাই পরে ধ্রুবর সব কাহিনী ওকে বলেছে। এরপর থেকেই ধ্রুবকে দেখলে ও দূরে দূরে থাকে। ধ্রুব যখন নিজের মোবাইল থেকে ওকে কল করতে বলল তখনো সে এড়িয়ে গেছে। উদ্দেশ্য ছিল ছেলেটাকে বোঝানো যে তিতির ওকে এক পয়সার পাত্তাও দেয়না। নবীন বরনের দিন ধ্রুব উপস্থাপনা করেছিলো। তিতির দেখল আসলেই খুব সুন্দর করে কথা বলে সে,আর এটা দিয়েই মেয়ে পটায়!

 

ওর ফ্রেন্ডরা সবাই ''ইশ!! ধ্রুব ভাইয়া কি সুন্দর করে কথা বলে!!!'' আর '' ইশ!! ধ্রুব ভাইয়া কি হ্যান্ডসাম!!!'' বলে বলে ওর কান ঝালাপালা করে দিয়েছে।

 

তবে তিতির চিন্তাও করতে পারেনি ধ্রুব ওকেই এসে আবার প্রপোজ করবে। আর প্রপোজালের কি ছিরি! ''আমি চাই তুমিও আমাকে ভালবাসো''...কথাটা মনে পড়তেই আবার রাগ উঠে গেলো তিতিরের। বেশ করেছে সে কথা শুনিয়ে।

 

 

আবার ঘড়ি দেখল সে। ৫ মিনিট আছে। কে যেন দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকল। ঘাড় ফিরিয়ে দেখতেই তিতির দেখল সেটা ধ্রুব।

 

ধ্রুব তিতিরের সামনে এসে দাঁড়াল। তিতিরও দাঁড়িয়ে গেলো । ৫ মিনিট জাহান্নামে যাক,ও এখনি বের হয়ে যাবে। তিতিরের রুদ্রমূর্তি দেখে ধ্রুব তাড়াতাড়ি বলল ''প্লীজ রাগ কোরোনা,আমি কয়েকটা কথা বলেই চলে যাবো। আর কখনই তোমাকে বিরক্ত করবোনা...প্লীজ প্লীজ প্লীজ''

ধ্রুবর গলায় এমন কিছু ছিল যে কারনে তিতির ওকে কোন কটু কথা বলতে পারলনা। আবার নিজের চেয়ারে বসে গেলো।

 

ধ্রুব ওর সামনের চেয়ারে বসলো। আজকে ধ্রুবকে একদমই নার্ভাস লাগছেনা। ঠিক উদ্ধত না,ওর চোখে কেমন অন্যরকম একটা আভা দেখল তিতির।

''তোমার বেশী সময় নষ্ট করবনা আমি। ক্যাম্পাসে কথা বলতে চাওনা বলে এখানে এসেছি।'' ধ্রুব পকেট থেকে একটা ভাজ করা কাগজ বের করলো।

''সামনাসামনি বলতে গেলে অনেক কিছু বলা হয়না। এর আগেরবারও গোলমাল করেছি। তাই চিঠির চেয়ে বেস্ট কোনও উপায় খুজে পেলাম না। এটা তোমার জন্য '' চিঠিটা বাড়িয়ে দিল ধ্রুব।

 

 

প্রিয় তিতির,

 

জানি প্রিয় ডাকার অধিকার তুমি আমাকে এখনো দাওনি,এবং ভবিষ্যতেও দিবে বলে মনে হয়না। কিন্তু তুমি চাও বা না চাও তুমি আমার কাছে সবসময় প্রিয় থাকবে। প্রথম যেদিন তোমাকে দেখেছিলাম তোমাকে অনেক ন্যাকা মনে হয়েছিলো। যার জন্য আমি দুঃখিত। এরপরের ঘটনা গুলো বলে তোমার সময় নষ্ট করতে চাইনা।

 

আমার গানের গলা খুব খারাপ। কিন্তু তুমি এত সুন্দর গান গাও দেখে আমি ঠিক করেছিলাম গান গাইতে না পারি কিন্তু তোমাকে সঙ্গ তো দিতে পারি। তাই একটা গীটার কিনেছি আমি। আমার খুব ইচ্ছে তুমি যখন গান করবে আমি তখন গীটার বাজাবো। এখনো শিখতে পারিনি কারন যার জন্য শিখব সেই যদি না থাকে তাহলে খামোখা নিজের নখ ভেঙ্গে,হাত ছিড়ে আর কি লাভ? তাই বলে বলছিনা যে আমার প্রতিভা বিকাশের সুযোগ দেয়ার জন্য তুমি আমাকে হ্যাঁ বল। কিন্তু এরকম আরও অনেক প্ল্যান করেছি আমি যা একমাত্র তোমার সাথেই সম্ভব হতে পারে।

 

আসল কথায় আসি। যদি বলি তুমি আমার জীবনের প্রথম নারী তাহলে ডাহা মিথ্যা হবে। কিন্তু এটা সত্যি যে তুমি আমার জীবনের শেষ নারী যাকে আমি সারাজীবন পাগলের মতো ভালবেসে যাবো। আমার নামে হয়তো অনেক কিছুই শুনেছ কিন্তু এটা কেউ বলতে পারবেনা যে আমি মিথ্যাবাদী।

 

আজকে নাহয় কালকে তুমি বিয়ে তো করবেই। আর যেহেতু পাত্র তুমি এখনো ঠিক করনি তাহলে আমাকে একটা সুযোগ দিয়ে দেখতে পারো। পাত্র হিসেবে আমি খারাপ না। কথা দিচ্ছি ঠকবেনা।

আমি এটাও বলবনা যে আমি তোমাকে ছাড়া মরে যাবো। আমার জীবনে আগে আমার বাবা মার অধিকার,এর পরে আমার। তাঁরা আমাকে অনেক আদর ভালবাসা দিয়ে বড় করেছেন যার মূল্য শোধ করা এ জীবনে অসম্ভব। তবু সারাজীবন এই চেষ্টাই থাকবে যাতে ওদের জন্য কিছু করতে পারি। তাই আমাকে নিয়ে ভয় পাওয়ার কোনও কারন নেই।

 

জানি জীবনে অনেক ভুল করেছি। এবং ভুলতেও সময় লাগেনি। কিন্তু এবার প্রথম মনে হল তোমাকে পাওয়ার জন্য যদি আরেকবার চেষ্টা না করি তাহলে সেটাই হবে আমার লাইফের সবচেয়ে বড় ভুল। নিজেকে আরেকটা চান্স দিতে খুব ইচ্ছা হল। কিন্তু আমি এও জানি জোর করে আর যাই হোক ভালবাসা পাওয়া যায়না। তাই আজকের এই চিঠি সে চেষ্টার শেষ অধ্যায়। তুমি এর জন্য আমাকে ইচ্ছা মতো গালাগাল করতে পার।আমি কিচ্ছু মনে করবোনা। আমি এখন বাইরে দাঁড়িয়ে আছি। তুমি যদি বের হয়ে চলে যাও আমি ধরে নিব এ গল্প এখানেই শেষ।

এবং কথা দিলাম এর পর আর কক্ষনো তোমাকে বিরক্ত করবোনা।

 

আর যদি আমার সাথে কথা বল তাহলে বুঝে নিব যে.........বাকিটা লেখার সাহস আমার হচ্ছেনা। লিখতে গিয়ে যদি আমি বিশ্বাস করে ফেলি??

 

 

-একান্তই তোমার হতে চাওয়া ধ্রুব

 

 

৮.

 

শীতকালের রোদ ধ্রুবর অনেক ভালো লাগে। সারাদিনের রঙচংহীন কুয়াশাচ্ছন্ন আকাশ হঠাৎ যেন উজ্জ্বল আলোয় আলোকিত হয়ে যায়। ধ্রুবর মনে হল এই আকাশের সাথে ওর জীবনের অনেক মিল আছে। এখন দেখার বিষয় যে ওর আকাশ কি তিতির নামের রৌদ্রালোকে আলোকিত হবে? না এমনি বিমর্ষ কুয়াশাচ্ছন্ন হয়ে থাকবে... তবে একটা কথা ধ্রুব জানে,একবার যদি তিতির ওর ভালবাসা গ্রহন করে নেয় আর ওকে দূরে যেতে দিবেনা ধ্রুব। সময় কাটানোর জন্য একটা সিগারেট জ্বালালো সে। মনে হচ্ছে অনন্তকাল ধরে ও এখানে অপেক্ষা করছে...

 

সিগারেট যখন প্রায় শেষের দিকে তখন দেখল তিতির বের হচ্ছে। সিগারেটটা ফেলে দিল ধ্রুব। এবং মন খারাপ করে দেখল তিতির ওকে অতিক্রম করে সামনে চলে গেছে।সামনে গিয়ে একটা রিক্সা ঠিক করলো। তারমানে এখানেই শেষ সব। বুকটা কেমন খাঁ খাঁ করছে ওর। চোখ কেমন যেন জ্বালা করছে। মাথা নিচু করে ধ্রুব হাঁটতে শুরু করলো।

''এই যে, রিক্সায় উঠে আসেন।''

ধ্রব শোনেনি প্রথমে। ওর মাথায় এখন একটাই চিন্তা,তিতির বিহীন এই জীবন সে কিভাবে কাটাবে? আবার ডাক শুনে পাশে তাকিয়ে দেখে রিক্সায় তিতির বসে আছে!

''আমাকে বলছ?''

''আপনার পাশে আর কেউ আছে যে তাকে বলব? উঠে আসেন''

ধ্রুব উঠে বসলো তিথির পাশে। ওর এখনো কিছু বোধগম্য হচ্ছে না। তিতিরই বলল

''আপনাকে দেখে মনে হচ্ছিল বাসায় যেতে পারবেন না। বাই চান্স কোনও অ্যাক্সিডেন্ট হলে আমাকেই দোষ দিতেন। আপনাকে বাসায় ড্রপ করে দিব''

 

কিছু বললোনা ধ্রুব। বলার মতো আসলে ওর অবস্থাই নেই। তবুও মস্তিস্কের এক কোণে এটাই মনে হল এই সময়কে উপভোগ করাই এখন বুদ্ধিমানের কাজ হবে। আর কখনও তো তিতিরের সাথে ও কথা বলবেনা। তিতির কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল

''আমাকে আপনার ন্যাকা মনে হয়?''

হায়রে নারী!!! পুরো চিঠিতে কিছু যদি চোখে পড়লো তাও সেই ন্যাকা শব্দটাই?

''প্রথমে মনে হয়েছিলো। কিন্তু তার জন্য সরি বলেছি না?''

আবার চুপ। ধ্রুবর মনে হচ্ছিল এ মুহূর্তে তিতিরের মনের কথা জানার জন্য যদি ওকে বিনিময়ে নিজের সব বিসর্জন দিতে হয় তাও সে হাসতে হাসতে দিয়ে দিবে। শুধু একবারের জন্য যদি মেয়েটার মন বুঝতে পারত সে!

তিতির এবার ব্যাগ থেকে চিঠিটা বের করে ধ্রুবর হাতে দিল '' নিন''

 

ধ্রুবর আসলেই খুব কষ্ট পেল। সারারাত জেগে চিঠিটা লিখেছিল। কত কাটাকুটি করেছে। ওর শেষ স্মৃতি হিসেবে চিঠিটা রাখতেও তো পারত মেয়েটা। নাহ,মেয়েরা আসলেই অনেক নিষ্ঠুর হয়। অনেক কষ্টে হাত বাড়িয়ে নিল চিঠিটা। রাগ করে ফেলে দিতে যাবে তখনি তিতির চিৎকার করে উঠল

''কি করছেন আপনি?''

''ফেলে দিচ্ছি,রেখে কি করবো?'' এবার ঝাঁঝ দেখিয়ে বলল ধ্রুব

''আমি তো আপনাকে ফেলে দেয়ার জন্য চিঠিটা দেইনি।''

''তাহলে কেন দিয়েছ? এটা কি আমি এখন বাঁধাই করে রেখে দিব প্রমান হিসেবে যে আমি ছ্যাঁকা খেয়েছি?''

''আপনি চিঠিটা শেষ করবেন।''

''মানে?''

''মানে হল আমার চিঠির শেষটা পছন্দ হয়নি। আপনি বলেননি যদি আমি আপনার সাথে এসে কথা বলি তাহলে আপনি কি বুঝে নিবেন''

 

খুব নরম ভাবে বলল তিতির। ধ্রুব তাকিয়ে আছে তিতিরের দিকে। ওর চোখের পলক পড়ছে না। আবার বলল তিতির

''আপনি শেষের কথা গুলো কিভাবে লিখেন তার ওপর সব নির্ভর করছে।'' ধ্রুব এবার একটু নড়ে বসলো যেন।

''তোমার কাছে কলম আছে?''

''আছে।'' ব্যাগ থেকে কলম বের করে দিল তিতির। ধ্রুব কলমটা নিল। চোখটা কুঁচকে কি যেন ভাবল কিছুক্ষণ। এরপর রিক্সায় বসে ঝাকুনি খেতে খেতেই কাগজে কি কি যেন লিখল। তিতির খুব আগ্রহ নিয়ে দেখছিল ওর কাজ কারবার।

পাঁচ মিনিট পর ধ্রুব ওর হাতে কাগজ দিল। চিঠির একদম নিচের খালি জায়গায় কিছু লিখেছে ধ্রুব। অনেক একে বেঁকে গেছে,তবুও কষ্ট করে পড়া যায়।

''আপনি কালকেও কিন্তু দিতে পারতেন ''

''পারতাম । কিন্তু কালকে পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হলে আমি মরেও যেতে পারি। '' ধ্রুব অনেক গম্ভীরভাবে বলল।

 

তিতির আর কিছু না বলে পড়তে শুরু করলো...

 

''তিতির,

 

আমরা দুজন মিলে নতুন একটা গল্প লিখব,যেখানে তুমি হবে আমার রাজকন্যা...আর আমি হবো রাজকন্যার ইচ্ছা পুরক ।আজ থেকে তোমার সব স্বপ্ন আমার,তোমার সব দুঃখ কষ্ট আমার...আর আমার সুখ,আনন্দ আর ভালবাসা সব শুধুই তোমার। তুমি পাশে থাকলেই হবে। তোমাকে ছাড়া আমার আর কিচ্ছু লাগবেনা।

 

আমার খুব পছন্দের কয়েকটা লাইন শুধুই তোমার জন্য। অনেক আগে কোথাও পরেছিলাম। খুব ভালো লেগেছিল,কিন্তু বিশ্বাস করিনি...এখন সত্যি মনে হচ্ছে

আমি একা হলেই বুঝি তুমি ছাড়া আমি কত একা

আমি ঘুম হারালেই বুঝি তোমায় ছাড়া হয়না স্বপ্ন দেখা

আমি খণ্ডিত এক জীবন স্বপ্নচারী,শুধু তুমি এলেই পূর্ণ হতে পারি

ভুলগুলো সব ভুলে গিয়ে ভালবাসার গল্প হতো লেখা...!! ''

 

ধ্রুব অবাক হয়ে দেখল তিতিরের চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে। ও তো কান্না করার মতো কিছুই লিখেনি। তিতির বড়জোর হাসতে পারে খুশিতে,অথবা বকতে পারে রাগ করে...কিন্তু কাঁদছে কেন? কেউ কাঁদলে ধ্রুবর খুব বিরক্ত লাগে। কিন্তু এ মুহূর্তে খুব অদ্ভুদ একটা অনুভুতি হলো ওর। কাঁদছে তিতির,কিন্তু কষ্ট হচ্ছে ধ্রুবর! কিছু না ভেবেই হাত বাড়িয়ে তিতিরের হাতটা ধরল সে। ওর রাজকন্যার হাত।

 

 

Share