না বলা কথা

লিখেছেন - নাজমুন নুসরাত | লেখাটি 1251 বার দেখা হয়েছে

যেদিন আমি ঘুমের কারনে ক্লাসে যেতে পারিনা বা হয়তো ভার্সিটি বন্ধ থাকে সেদিন আমার ঘুম আর ভাংতে চায় না। আলসেমি আমাকে জেঁকে ধরে। যখন খুব জাম্পেশ ঘুমের একটা আমেজে থাকি তখনি আমার কানে আসে তোমার কথা, ''আম্মু উঠ''

আমি তবু মটকা মেরে পড়ে থাকি আরেকটু ঘুমের লোভে। তুমি কিন্তু হাল ছাড়োনা

''আমার রাজকন্যা উঠ...প্রিন্সেস আর কত ঘুমাবি??'' বলতে বলতে সুড়সুড়ি দিতে থাকো। গায়ের চাদর সরিয়ে দাও...আর একটা সময় আমি বাধ্য হয়ে খুব বিরক্তি নিয়ে উঠি। এবং মাঝে মাঝে একটু চেচামেচিও করি। কি করবো বলো,রক্ত একটু বেশী গরম।

আবার যখন ক্লাসে যাওয়ার জন্য বের হতে যাই তখন রক্ষা নাই। আমার ক্লাস থাকে ৯.৩০ টায়। যার জন্য ৮টার ট্রেন ধরতে হয়। বাসা থেকে বের হৈ সাড়ে সাতটায়। কিন্তু বের হওয়ার আগে তোমার ঠিকই ঘুম ভেঙ্গে যাবে আর বলবে ''নাস্তা খাওনাই কেন? দুমিনিট অপেক্ষা কর,আমি দিচ্ছি''

যখন খুব ছোট ছিলাম তখন আমাকে ক্লাসে দিয়ে তুমি বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে। তখন তো স্কুল গুলোতে বসার তেমন ব্যাবস্থা ছিলোনা। সব বাচ্চার মায়েরা একসাথে পেপার বিছিয়ে অপেক্ষা করতে আমাদের কখন ছুটি হবে। বেশী আদর দিয়ে আসলে আমাদেরকে নষ্টই করে ফেলেছ তোমরা।

 

একটা মজার ঘটনা তুমি প্রায়ই বলো,আমার তখন ৫ বা ৬ বছর হবে। আমি তখন যা শুনি তাই শিখে ফেলি। ''কুত্তা বিলাই'' শিখে সম্ভবত কারো উপর প্রয়োগও করেছিলাম। তুমি যখন রেগে আমাকে মারছিলে তখন নাকি আমি বলছিলাম ''আমাকে আর মেরোনা,আমি আর কখনো কুত্তা বিলাই বলবনা !'' হাহাহা ছোটকালে দেয়া তোমার শিক্ষা এখন অনেক কাজ দেয় জানো? আজো কাউকে কড়া কথা বলতে পারিনা।

 

ছোটকালে যখন কবিতা মুখস্থ হতোনা তখন আমার তুমি আমাকে একটা খুব মজার পদ্ধতি শিখিয়েছিলে। কোনও একটা পছন্দের গানের সুরে কবিতা টা কয়েকবার আওড়াও। খুব সহজেই এরপর মনে থাকবে। আমার পড়ালেখা নিয়ে তুমি অনেক কষ্ট করেছিলে,তাই না আম্মু? বড় মেয়ে ছিলাম বলে আদর অনেক বেশী পেয়েছি আমি। কিন্তু তোমাকে সে তুলনায় জ্বালিয়েছি অনেক বেশী। 

 

ক্লাস ফোরে থাকাকালীন আমার এপেন্ডিসাইটিস অপারেশন হয়েছিল। অপারেশনের পর কয়েকদিন পানি খেতে দেয়া হয়নি আমাকে। আমি এটা নিয়ে অনেক কাকুতি মিনতি করতাম যাতে আমাকে একটু পানি খেতে দেয়া হয়। কিন্তু ডাক্তারদের নিষেধ ছিল বিধায় তুমি আমার এ আবদার পুরন করতে পারোনি। একবার হঠাত ঘুম ভেঙ্গে যাওয়ার পর আমি দেখলাম যে তুমি খুব সাবধানে লুকিয়ে পানি খাচ্ছো। আমার সামনে খেলে আমি কষ্ট পাব তাই তুমি আমি ঘুমালেই পানি খেতে। আরেকটা ব্যাপার মনে আছে আমার,ড্রেসিং করানোর সময় আমি অনেক চিৎকার করতাম। পুরো ক্লিনিকে আমি বিখ্যাত হয়ে গিয়েছিলাম শুধুমাত্র এই চিৎকারের কারনে। একদিন এভাবেই চেঁচামেচি করছি। ডাক্তার,নার্স সবাই আমাকে শান্ত করার চেষ্টা করছেন। এর মধ্যেই শুনি ডাক্তার বলছেন ''আপনি কাঁদলে আপনার মেয়েকে সাহস কে দিবে?'' আমি তাকিয়ে দেখি তুমি প্রাণপণে নিজের ঠোঁট কামড়ে কান্না সামলানোর চেষ্টা করছো,কিন্তু তোমার চোখ সে বাঁধা মানছেনা। এই দৃশ্যটা আমি আজো ভুলিনি। এটা দেখেই আমি চুপ করেছিলাম। সম্ভবত সেদিনই শিখেছিলাম,অনেক কষ্ট পেলেও মাঝে মাঝে সেটা দেখানো যায় না।

আমার সবচেয়ে পছন্দের মাছ ছিল ইলিশ,অথচ সে সময় আমার ইলিশ মাছ খাওয়া নিষেধ ছিল । সেবার সমুদ্রের তলদেশে ভূমিকম্প হওয়ায় ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ ধরা পড়েছিল। আমাদের বাসায় তো প্রায় প্রতিদিন তখন ইলিশ খাওয়া হত। কিন্তু তুমি একবারও মুখে দিতে পারনি। তোমার মেয়ে খেতে পারছেনা দেখে বুঝি ? মায়েরা এত বোকা কেন বলতো ?

 

 

 

স্কুলে একা যাওয়া শুরু করেছি ক্লাস টেন থেকে। তুমি অনেক বেশী চিন্তা করো এসব নিয়ে। আমার এখন মনে আছে আমার স্কুলের পাশেই আমার কোচিং সেন্টার ছিল। কোচিং শেষ করে স্কুলে যাবো এমনি কথা হয়েছিল। কিন্তু তুমি আমার কোচিং এর স্যার কে অনুরোধ করেছিলে যাতে উনি আমাকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে আসেন। তখন খুব বিরক্ত লাগত এগুলো দেখে। কিন্তু এখন বুঝি কত মায়া আর ভালোবাসা থাকলে মায়েরা এমন করে!

এরপর আমি প্রথম যেদিন ভার্সিটিতে ক্লাস করতে যাব,আমার এলাকারই একটা মেয়ের সাথে যাবার কথা হয়েছিল। তুমি আর আব্বু দুজনেই এসেছিল ষ্টেশনে পৌছে দিতে। কিযে ছেলেমানুষি কর তোমরা ! আমি এখন আর সেই ছোট মেয়ে আছি?

 

 

 

গত বছর আমরা তিন ভাইবোন মিলে নিজেদের জমানো টাকা দিয়ে তোমার জন্য একটা মোবাইল সেট কিনেছিলাম। জন্মদিনের উপহার হিসেবে। তোমাকে যখন দিলাম তখন দেখি তোমার চোখে পানি। প্রথমে তো তুমি বুঝতেই পারনি। কিন্তু পরে তুমি কোনমতেই নিবেনা,তোমার কথা ছিল আমরা কেন নিজেদের টাকা নষ্ট করলাম এভাবে? কেন নিজেদের পছন্দের কিছু কিনলাম না? অনেক রাগ হয়েছিল সেদিন তোমার উপর। মা হলেই কি নিজের জন্য ভাবা যাবে না নাকি!

বাসায় যখন আমাদের পছন্দের কিছু রান্না করো,তোমার নিজের সেটা কখনই ভালো লাগেনা। আগে বুঝতাম না। এখন বুঝতে পারি যাতে আমাদের কম না হয় সেজন্যই...ঈদের শপিং এ সবার বাজার করে ফেলার পর আমাদের খবর হয় তোমার গুলো বাকি। তোমার জবাব তখন এটাই থাকে যে ''তোমাদেরটা হলে আমারটাও হয়ে যায়''। অনেক বকাঝকা করার পরও মানতে চাওনা। তুমি এত জেদি কেন বলতো?

 

 

আমাদের অসুখের সময় রাতভর মাথার কাছে জেগে বসে থাকা এই তোমার কপালটা যখন জ্বরে পুড়ে যায়,আমরা কেউ তেমন পাশে থাকিনা। সবার কলেজ,ভার্সিটি থাকে। আমি জানি তোমার অনেক অভিমান হয়,আম্মু । কিন্তু এখন চেষ্টা করি যাতে তোমাকে সময় দিতে পারি।

 

 

 

নানু মারা যাওয়ার পর তুমি অনেক কষ্ট পেয়েছিল। তোমার শুধু এটাই মনে হত যে তুমি নানুর জন্য কিছু করতে পারেনি। কতদিন আমি বাসায় এসে দেখেছি তুমি একা একা বসে আছে,চোখ লাল। জড়িয়ে ধরে তোমাকে অনেকবার বলতে চেয়েছি

''আমরা আছি'' কিন্তু বলতে পারিনি কখনো। জড়িয়ে ধরে চুপ করে বসে ছিলাম শুধু।

 

 

তোমার জন্য কখনো কিছু করতে পারিনি। কখনো কিছু দিতে পারিনি। সব সময় নিয়েই গেছি। তুমিও কি একি জিনিস অনুভব কর নানুর জন্য? তবে সৃষ্টিকর্তার কাছে অশেষ ধন্যবাদ যে তিনি তোমার মত একজন মানুষ আমাকে মা হিসেবে দিয়েছেন।

 

লেখালেখির ব্যাপারটা আমি তোমার কাছ থেকেই পেয়েছি। অতটা ভালো লিখতে পারিনা,তবু মাঝে মাঝে একটু চেষ্টা করি। বেশ কিছুদিন ধরে পরীক্ষা বলে সে চেষ্টাও তেমন একটা করা হয়নি । কিন্তু মা দিবস নিয়ে লেখার সুযোগ ছাড়তে ইচ্ছা হলনা। লিখতে বসে শুধু তোমার কথাই আসছে। বছরের ৩৬৫ দিনই তুমি আমাদের জন্য খরচ কর,আর দেখোতো আমি শুধু মাত্র একটা দিন তোমার কথা লিখতে চাচ্ছি!

যতই লিখিনা কেন,এই কয়েকটা শব্দে কখনো বোঝাতে পারবোনা যে আমি তোমাকে কতটা ভালবাসি...তোমার সাথে অনেক ঝগড়া করি,রাগ দেখাই। কিন্তু বিশ্বাস করো পরে আমার এত্ত খারাপ লাগে!

 

তবে একটা কথা এখন আমি ভালো ভাবেই বুঝে ফেলেছি, রাজপুত্র বা রাজকন্যা হবার জন্য খুব বেশী কিছু লাগে না আসলে...তোমার মত একজন আম্মুই যথেষ্ট।

Share