চার দেয়ালের কাব্য

লিখেছেন - নাজমুন নুসরাত | লেখাটি 1132 বার দেখা হয়েছে

১.

আজকে ঠিক তিন মাস সাত দিন হল মা আমার সাথে কথা বলেনা।

 

প্রতিদিন কিন্তু ঠিক আমার টেবিলে এসে বাজারের লিস্ট রেখে যাবে। কোন কিছু আনতে ভুলে গেলে চিৎকার করে পুরো বাসা মাথায় তুলে ফেলবে। কিন্তু আমাকে সরাসরি কিছু বলবেনা। কারনটা খুবই ছোট। আমি তিন মাস সাত দিন আগে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করে ফেলেছি। মজার ব্যাপার হচ্ছে আমার পালানোটা বেশীক্ষনের জন্য ছিলনা। বিয়ে করে আবার বৌ নিয়ে বাসায় ফিরে এসেছিলাম। কি করবো? না এসে উপায় ছিলোনা। এখনো পড়ালেখা করছি,প্রতি মাসে আব্বু পকেটমানি যে দেয় তাতে নিজেরই টানাটানি হয়ে যায় । এমন একটা ছেলে কিসের ভিত্তিতে বৌ নিয়ে আলাদা থাকবে? আমার বন্ধুরা আমাকে বেশ কিছুদিন চালাতে পারবে। কিন্তু ওদের উপর শুধু শুধু চাপ দেয়ার কোন মানে হয়না। আর সবচেয়ে বড় কথা হল নিশি এটা মানবেনা। ওর কথা ছিল

''দরকার হলে গাছতলায় থাকবো''

বেকুব মেয়ে যদি এটা জানতো যে গাছতলায় থাকতেও আজকাল অনুমতি লাগে !

সেদিন বাসায় আসার পর কি হয়েছিল সেটা আপাতত নাই বলি। খুব সুখের কোন অভিজ্ঞতা না। সাথে বৌ ছিল বলেই মনে হয় দয়া করে ঘরে থাকতে দিয়েছে। তবে সেদিনের পর থেকেই মার আমার সাথে কথা বলা বন্ধ।

 

এসবের মধ্যে অদ্ভুত ব্যাপার হল নিশির সাথে আমার পরিবারের সখ্যতাটা। বেশীরভাগ সময় এটাই শুনেছি পালিয়ে বিয়ে করা বৌদের বাসায় মেনে নেয়না। আমার মা আমাকে দু চোখে দেখতে পারেনা ঠিকই কিন্তু নিশির সাথে দেখলাম অনেক খাতির হয়ে গেছে। শুধু মা না,ঘরের বাকি সবাই ওকে অনেক পছন্দ করে। আম দুধ মিশে গেলে আঁটি বাদ পড়লে যেমন হয় এখানেও তাই ঘটেছে। আমি এখন আঁটির পর্যায়ে আছি। বাবা অবশ্য মেনে নিয়েছেন। ছোটকাল থেকে বাবা কখনোই আমাকে কিছু করতে নিষেধ করেনি। ঝামেলাটা করতো মা।  বাবা নিশিকে অনেক পছন্দ করেন অনেক আগে থেকেই। ওহ,এখানে একটা কথা বলতে ভুলে গেছি। নিশির সাথে আমার বিয়ে হয়তো এমনিতেই হতো। পারিবারিকভাবে আমাদের সম্পর্কটা আগে থেকেই ঠিক করা ছিল। তখন অবশ্য ওকে আমার ভালো লাগত না। ঘটনাটা খুলেই বলি।

 

নিশির বাবা আর আমার বাবা বাল্যকালের বন্ধু।

আমি তখন কলেজে ফার্স্ট ইয়ারে ভর্তি হয়েছি। একদিন আমার বাবা এসে আমাকে বললেন যাতে আমি কোন মেয়ের সাথে বেশী না মিশি। আমি নাকি অলরেডি ''কমিটেড''। বাচ্চাকালে নাকি আমাদের দুজনকে একসাথে খেলতে বসালে পরে আলাদা করা যেতনা। তখন বড়দের মনে হয়েছিল আমাদের দুজনকে একসাথে ভালো লাগবে। এ কথায় সেদিন আকাশ থেকে পড়েছিলাম। ছোটকালে তো এটাও ভাবতাম যে স্পাইডারম্যান হয়ে ঢিশুম ঢিশুম মার দিয়ে ভিলেনকে পিটাবো। কিন্তু মারামারিতে কোনদিন তো জিততে পারলাম না!

 

মাত্র কলেজে ভর্তি হলাম। কোথায় নতুন নতুন বন্ধু বান্ধবী বানাব,মেয়েদের সাথে টাংকি মারব তানা...এ যেন উড়ে এসে জুড়ে বসার মত আমার গলায় ফাঁসির দড়ি পড়ানোর চিন্তাভাবনা চলছে। বাবার কথা শুনে মনে মনে বলেছিলাম দরকার হলে পালায় যাবো। তবু ওই মেয়েকে বিয়ে করবোনা!

 

এরপর একটা বিয়েতে নিশির সাথে দেখা হল। আমার কিন্তু ওকে দেখার অনেক শখ ছিল মনে মনে। কে সেই জন,যাকে আমার বাবা ছোটকালেই ছেলের বৌ বানিয়ে ফেলেছেন? এমন না যে ওকে দেখেই আমি ওর প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম। সত্যি কথা বলতে কি আমার ওকে অনেক দজ্জাল লেগেছিল। আমার মনে হয়েছিল ওকে বিয়ে করলে সারাজীবন আমাকে ''চাল নাই,চিনি নাই,আলু নাই,পটল নাই'' এই টাইপের কথা শুনতে হবে।

 

এরপর দুবছর কেটে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি। গোটা কয়েক প্রেমও করে ফেলেছি ততদিনে। সবগুলাই ক্ষণস্থায়ী। মাঝে মাঝে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নিশির সাথে দেখা হয়। আমি ওকে না চেনার ভান করি আর ও আমাকে।

এরকমই একদিন আড্ডা সেরে ঘরে ফিরছিলাম। হঠাৎ রাস্তায় দেখি নিশি উদ্ভ্রান্তের মত একবার এ মাথায় তো আরেকবার ও মাথায় যাচ্ছে। বোঝাই যাচ্ছে কোন সমস্যায় পড়েছে। আমি রিক্সাকে দাঁড়া করিয়ে ওকে ডাক দিলাম। আমার ডাক শুনে আমার কাছে ছুটে এলো সে।

 

''জলদি নেমে আসেন। আমাকে একটা ট্যাক্সি ঠিক করে দেন। খালাকে হাসপাতালে নিতে হবে'' ওর আঙ্গুলের ইশারার দিকে তাকিয়ে দেখলাম এক মহিলা ফুটপাথের উপর পড়ে আছেন। আমি রিক্সা ছেড়ে দিয়ে তাড়াতাড়ি একটা ট্যাক্সি ঠিক করলাম। যাওয়ার সময় ওকে জিজ্ঞেস করলাম খালার বাসায় ও জানিয়েছে কিনা। ও বলল নাম্বার জানেনা। আমি একটু অবাক হলাম ''তোমার আত্মীয়ের নাম্বার তুমি জাননা?''

 

''উনি তো আমার আত্মীয় না। দেখলাম রাস্তায় বেহুশ হয়ে পড়ে আছেন। কেউ কিছু করছে না। এরকম ফেলে কিভাবে যাই?''

''খালা ডাকলে না?''

এবার সে বিরক্ত হল

''কেন? খালা ডাকলে সমস্যা কি?''

 

আমি আর কিছু বললাম না। প্রথমে ভেবেছিলাম ওদেরকে হাসপাতালে পৌঁছে দিয়ে চলে আসব। কিন্তু এখন আমার খুব কৌতূহল হচ্ছে ও কি করে সেটা নিয়ে। ও গিয়ে রীতিমত ঝগড়া করে খালাকে ডাক্তার দেখাল। খালার ঘরের নাম্বার নিয়ে সেখানে খবর দিল।

আমি ওকে যত দেখছি ততই অবাক হচ্ছি। নিশির অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে আমি মানুষটার উপস্থিতি সে একদমই ভুলে গেছে! অবশেষে খালার কয়েকজন আত্মীয় আসার পর ওর মনে হয় খেয়াল হল যে আমি ওখানে আছি।

 

''আপনি এখনো গেলেন না?''

''না মানে তোমার যদি কোন সাহায্য লাগে...?''

''এতক্ষন পর্যন্ত কিছু বললেন না। কাজ শেষ হবার পর আর কি সাহায্য করবেন?''

''তুমি তো কিছু বলনি''

''এখানে যদি আপনার পরিচিত কেউ থাকতো আপনি কি বলার অপেক্ষায় থাকতেন?''

এভাবে কেন কথা বলে মেয়েটা? এত রাফ? মেয়েদের চেহারায় এত রুক্ষতা মানায় না।

''আচ্ছা নেক্সট টাইম আর ওয়েট করবোনা''

আমার কথা শুনে নিশি হেসে দিল।

 

 

আমি সেদিন ওর নাম্বার নিয়েছিলাম কিন্তু কল দেয়ার সাহস হয়নি। যদি আবার ঝাড়ি দেয়? তিন দিন পর ওই আমাকে কল দিল। ও না দিলে চতুর্থ দিন আমিই কল করতাম।

''হ্যালো নিলয়?''

''হ্যাঁ বলছি'' আমার তখন মনের মধ্যে আতশবাজি ফুটছে!

''সেদিন আপনাকে ঠিকমত থ্যাংকস দেয়া হয়নি। তাই আজকে ধন্যবাদ দিতে ফোন দিলাম।''

আমার বুকের ভেতর তখন কবুতরের বাক বাকুম শুরু হয়ে গেছে। ইশ! প্রতিদিন যদি নিশি আমাকে থ্যাংকস জানাতে ফোন করতো! সেদিন ও বেশী কথা বলেনি। কিন্তু এরপর থেকে আমি মাঝে মাঝে ওকে কল দিয়ে ওর হাল চাল জিজ্ঞেস করতাম। উদ্দেশ্য ছিল ওর গলার স্বর শোনার। আশ্চর্য হলেও সত্যি,ওর ভয়েসটা অনেক মিষ্টি ছিল। দজ্জাল মেয়েটার সাথে একদম যায় না !

 

ও যেখানে পড়ে সেখানে আমার পুরানো কয়েকজন বন্ধু ছিল। আমি ওদেরকে খুঁজে বের করলাম। দুদিন পরপর ওদের সাথে দেখা করতে চলে যাই। কাকতালীয় (!!!) ভাবে একদিন নিশির সাথেও দেখা হল।

কাকতালীয় ব্যাপারটা আরো ঘন ঘন ঘটতে লাগলো।

 

ওর প্রতি আমি কি অনুভব করতাম আমি জানিনা। শুধু এটা জানি যে ওকে দেখলে আমার হার্টবিট বেড়ে যায়। প্রচুর টেনশন হয়। আমার হাত পা কাঁপতে শুরু করে। আবার মনে হয় এই বুঝি ঝাড়ি মারতে আসল। মজার ব্যাপার হল এটা আমার ভালো লাগে। ওকে ভালবাসি এটা কখনো ভয়ে বলতে পারিনি। তবে আমার মনে হয় ও ঠিকই বুঝতে পারতো। প্রায়ই আমি নিজেকে জিজ্ঞেস করতাম,ও কি আমাকে ভালবাসে? প্রশ্নটার জবাব অনেক পরে পেয়েছিলাম।

 

 

আসল কথায় আসি। আমার আসলে এভাবে বিয়ে করার কোন প্ল্যান ছিলোনা।

ইচ্ছা ছিল পড়ালেখা শেষ করে তারপর আস্তে ধীরে ওকে বিয়ের কথা বলব। আমাদের মধ্যে মোটামোটি একটা বন্ধুত্ব হয়ে গেছে এতদিনে। আমিতো ওকে ঠিক ভাবে প্রপোজও করলাম না! প্রত্যেকবার দেখা করতে যাওয়ার আগে শপথ করে যেতাম,আজকে যেভাবে হোক ''আই লাভ ইউ'' বলবই। কিন্তু কিসের কি!

ওকে দেখলেই কথা বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় সময় যেটা হয়,নিশি আর আমি দুজনেই চুপ করে থাকি। একটা সময় ও বলে ''আচ্ছা,আজকে আসি'' আমি মনে মনে বলি ''আজকে হলনা,কালকে বলব'' সে কালটা হয়ত আর আসতোই না। সম্ভবত ভাগ্যও বুঝতে পেরেছিল আমার মত ভীতুর ডিমকে দিয়ে কিছু হবে না। তাই অন্য ভাবে আমাকে সুযোগ করে দিয়েছিল।

 

বেশ কিছুদিন ধরে লক্ষ্য করেছি নিশির অনেক মন খারাপ থাকে। ফ্যামিলিতে সমস্যা নাকি কি যেন। আমাকে কখনো ঠিক মত বলেনি। ও খুব চাপা স্বভাবের মেয়ে। ব্যাক্তিগত ব্যাপারে কথা বলতে চায়না। কিন্তু ওকে কি করে বোঝাই যে ওর মন খারাপ থাকলে আমার মনটাও খারাপ হয়ে যায়!

 

শেষবার যেদিন আমি ওর সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম। সেদিন দেখলাম ওর চোখ ফোলা।

অনেক জোর করার পর ও বলল যে ওর বড় বোনের বাচ্চা না হবার কারনে ওর দুলাভাই আরেকটা বিয়ে করতে চাচ্ছে। আর যেহেতু ঘরের মধ্যে পাত্রী আছেই,সেহেতু বাইরে এত কষ্ট করে খোঁজার কি দরকার? আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম।

 

''তোমার বাবা মা কি বলে?''

''ওরা তো মানতে চাচ্ছে না নিলয়। কিন্তু আপুর হাসব্যান্ড অনেক খারাপ একটা মানুষ। এই লোকটা প্রায় প্রতিদিন বাসায় এসে বাবা মাকে এটাই বোঝাতে চাচ্ছে তাকে বিয়ে না করলে আমার ক্ষতিও হতে পারে। ওরা অনেক টেনশনে আছে আমাকে নিয়ে। আমার আর বাসায় ফিরতে ইচ্ছাও হয়না এখন। এখনো গিয়ে দেখব বসে আছে ''

''তোমার আপু?''

''আমার আপু প্রতিদিন কল করে চিৎকার করে কাঁদে নিলয়। বলে আমার সংসার নষ্ট করিস না। আমি ওকে কি দোষ দিব বল ?''

আমি বুঝতে পারছিলাম নিশি কি বলছে। আমাদের সমাজের মেয়েরা এখনো এত অসহায়!

 

আমি হঠাৎ ঝোঁকের মাথায় বলে ফেললাম

''নিশি,আমাকে বিয়ে করবে?''

নিশি প্রথমে বুঝতে পারলনা। আমি আবার বললাম। নিজের কাছেই অদ্ভুত লাগছে যে আমি একটা মেয়েকে এভাবে বিয়ের প্রস্তাব দিচ্ছি!

নিশির চেহারায় প্রথমে বিস্ময় এবং তারপর রাগ ফুটে উঠল

''আমি আমার সমস্যার কথা বলছি আর তুমি সেটা নিয়ে তামাশা করছ?''

''না নিশি,আমি তোমাকে অনেক ভালবাসি। আমি আসলেই তোমাকে বিয়ে করতে চাই। এবং আজকেই। তুমি ভেবে দেখো।''

যে কথাটা বলার জন্য মাসের পর মাস অপেক্ষা করেছি,সেদিন সে কথাটা কত অবলীলায় বলে ফেললাম! 

বুঝতেই পারছেন নিশি ভাবার জন্য বেশী টাইম নেয়নি।

 

 

 

২.

 

 

 

আমার সামনে এখন যে মেয়েটা বসে আছে তার নাম আনুশকা। এবার এসএসসি দিল। এই মেয়েকে পড়াতে আমার অসম্ভব বিরক্ত লাগে। মেয়েটা অনেক বেশী মেধাবী। কিন্তু বড্ড বেশী কথা বলে। মাথা ধরে যায় ওর বকবক শুনলে। আমি ভেবেছিলাম এ মাসেই টিউশনটা ছেড়ে দিব। কিন্তু বিয়ে করে এখন ফেসে গেছি। আগে স্টুডেন্ট পড়াতাম এক্সট্রা ইনকামের জন্য। এখন এটাই আমার একমাত্র ভরসা।

 

''স্যার,ভাবি কেমন আছে?''

''ভালো। তোমার ম্যাথ বইটা নাও।''

''বই তো কোথাও পালাচ্ছেনা স্যার। আপনি ভাবির কথা বলেন আজকে।''

''ওর কথা কিছু বলার নেই।''

''আপনি এত রসকসহীন কেন বলেনতো ? আমার তো অবাক লাগে এটা ভেবে,আপনি কিভাবে বিয়ে করে ফেললেন? আপনাকে তো অতটা রোম্যান্টিক লাগেই না। অন্য কোন ছেলে হলে কত খুশী হতো বউয়ের কথা বলে। জানেন আমাদের কলেজের একটা স্যার নতুন বিয়ে করেছে। ক্লাসে আসলে ১৫ মিনিট শুধু বউয়ের কথাই বলে...'' বাকি কথা গুলো আমি ভালো মত শুনিওনাই।

 

ও যখন একটানা কথা বলে নিঃশ্বাস নেবার জন্য একটু সময় নিয়েছে ঠিক তখনি আমি বই ওর হাতে ধরিয়ে দিলাম।

''এ প্রবলেম গুলো সল্ভ করো''

''প্রবলেম তো স্যার সল্ভ করতেই হবে। সেজন্যই তো পড়ালেখা করি। নাহলে কি আমি এসব ছাইপাশ পড়তাম নাকি? কবে বিয়ে করে ফেলতাম! আমার না স্যার বিয়ে করার অনেক শখ। আপনি কত লাকি! আপনি লাকি হলেও ভাবি অনেক আনলাকি। আচ্ছা স্যার,ভাবিও কি আপনার মত সারাক্ষন গোমড়া মুখ করে রাখে নাকি? ''

 

ইচ্ছা হচ্ছিল ঠাস করে একটা থাপ্পর দেই। অনেক কষ্টে নিজেকে সামলালাম। ইদানীং খুব ছোটোখাটো জিনিসেই রেগে যাচ্ছি। এটা একদম ঠিক না।

 

 

 

বাসায় এসে সোজা বিছানায় শুয়ে পড়েছি। প্রচণ্ড রকম ক্লান্ত লাগছে আজ। নিশি এসে রুমের লাইট জ্বালাল। আমি চোখের উপর হাত দিয়ে রাখলাম। তীব্র আলো আমার একদম বিরক্ত লাগে। আমার অন্ধকার বেশী প্রিয়।

 

''শুয়ে পড়লে যে? খেতে আসো''

''তুমি খেয়ে ফেল।আমার শরীরটা ভালো লাগছে না।''

কপালে একটা ঠাণ্ডা স্পর্শ অনুভব করলাম। চোখ খুলে দেখলাম নিশি আমার কপালে হাত দিয়ে দাঁড়িয়েছে।

''জর নেই তো''

''তুমি কি আজকাল থার্মোমিটারের কাজ করছ?'' আমি হেসে জিজ্ঞেস করলাম।

নিশি আমার পাশে বসলো। চেহারাটা বিষণ্ণ হয়ে আছে ওর। আস্তে আস্তে বলল

''আমি তোমাকে অনেক বিপদে ফেলে দিলাম তাই না?''

''এ কথা কেন বলছ?''

''আমার জন্য তোমাকে কত কিছু শুনতে হচ্ছে।''

আমি হাসলাম। মেয়েটা আসলেই পাগল। নিশি হাসলোনা।

''আমি কেন হুট করে বিয়ে করার ডিসিশানটা নিলাম বলতো ?''

''আমাকে বিপদ থেকে বাঁচাতে?''

''নাহ,ভুল। আমি ভেবেছিলাম তুমি জানো''

''তুমি তো কিছু বলনা,কিভাবে জানব?''

 

আমার খুব মায়া হল ওর জন্য। আমি জানি মেয়েটা প্রতিনিয়ত নিজেকে দোষারোপ করে যাচ্ছে। আমি আলতো করে ওর হাতে আমার হাত রাখলাম। আমার এখনো বিশ্বাস হয়না যে এই মানুষটা এখন আমার। মনে হয় স্বপ্ন দেখছি।

''আমি সেদিন এটা দেখলাম যে আজ হোক কাল হোক,এরকম আরো অনেক সমস্যা আসবে। তোমার বাবা মার যে সব ছেলেকে অপছন্দ হবে  তাতো না। কিন্তু আমার যে তোমাকে খুব বেশী দরকার ছিল! মানছি আমরা হুট করে বিয়ে করে ঠিক করিনি। কিন্তু আমার কখনোই মনে হয়নি যে আমি ভুল করেছি। আমার জীবনে যে গুটিকয়েক ভালো কাজ করেছি,তোমাকে বিয়ে করাটা তার মাঝে একটা।''

 

নিশি অনেকক্ষণ চুপ করে ছিল। আমি গুছিয়ে কথা বলতে পারিনা। আজকেও মনে হয় ওকে বোঝাতে পারলাম না...

''তুমি কি এটা জান যে আমি তোমাকে অনেক ভালবাসি?'' ভেজা গলায় বলল সে। অনেক মায়া হল আমার।এই দজ্জাল মেয়েটার মাঝে যে এত মায়া আছে আগে বুঝতে পারিনি।

''যে মুহূর্তে তুমি আমাকে বিয়ে করতে রাজি হয়েছিলে তখন থেকেই জানি''

 

 

 

৩.

 

মনটা ভীষণ খারাপ লাগছে আজকে। আজকে আমাকে বাসার কেউ উইশ করেনি। অথচ অন্য সব বছরে রাত বারটায় কেক এনে হুলুস্থুল ব্যাপার হতো। আমি কি আসলেই অবাঞ্ছিত সবার কাছে? নিশি আমাকে রাতেই উইশ করেছিল। কিন্তু বাবা মা আর প্রত্যয় কি করে ভুলে গেল?

 

 

প্রচণ্ড রাগ নিয়ে আনুশকাকে পড়াতে এসেছি। আনুশকা যথারীতি টেবিলে এসেই কথা বলা শুরু করে দিলো।

''স্যার জানেন,আজকে না মার্কেটে গিয়েছিলাম। বাপরে,এত গরম পড়েছে আজকে! আমার মনে হচ্ছিল আমি যেকোনো মুহূর্তে হিট স্ট্রোক করবো। তারপর জলদি একটা আইস ক্রিম কিনে নিলাম। ভেবেছিলাম শুধু চকলেট ফ্লেভার নিব। কিন্তু পরে ভ্যানিলা আর ম্যাঙ্গো ফ্লেভার টাও নিলাম। এত মজার স্যার। কি বলব!''

আমি জবাব দিলাম না।

''স্যার,কথা বলেন না কেন? আপনি কখনো আইসক্রিম আর কোক একসাথে খেয়ে দেখেছেন? ট্রাই করে দেখবেন একদিন। আমি কনফার্ম আপনার অনেক ভালো লাগবে। ভাবীকে নিয়ে যাবেন একদিন। এখন এসব করবেন নাতো কখন করবেন?''

 

ভেবেছিলাম অন্যদিনের মত আজকেও সহ্য করে নিব। কিন্তু আজকে আমার কি হল জানিনা। আমি ফেটে পড়লাম।

''জাস্ট স্টপ দিস নুইসেন্স! তুমি কি বোঝনা আমার তোমার বকবক শুনতে ইচ্ছা করেনা? তোমাকে পড়াতে আসার জন্য যদি আমাকে এভাবে টর্চার সহ্য করতে হয় তাহলে আমাকে মাফ করো। আমি কালকে থেকে আর আসবনা।''

এক নিঃশ্বাসে এগুলা বলার পর আমি বের হয়ে গেলাম। আনুশকা মাথা নিচু করে বসে ছিল। বের হয়ে আনুশকাদের গেটের সামনে দাঁড়ালাম। এখন মনে হচ্ছে বাড়াবাড়ি করে ফেলেছি। আবার কি ভেতরে যাবো?

এসব ভাবতে ভাবতে দেখলাম আনুশকা বের হয়ে এসেছে। ওর হাতে একটা বড় প্যাকেট।

''স্যার আপনি আমাকে কিছু নোট দিয়েছিলেন,এগুলো আর লাগবেনা।''

আমি কি বলব বুঝতে পারলাম না। প্যাকেটটা হাতে নিলাম।

ও আবার বলল

''আমি যে আপনাকে এত বিরক্ত করি আগে বুঝতে পারিনি। পারলে ক্ষমা করে দিবেন''

 

 

বাসায় আসার পথে আনুশকার মোবাইল থেকে একটা ম্যাসেজ এলো।

''স্যার আমি আর কখনো আপনাকে বিরক্ত করবোনা। এই শেষ। প্যাকেট টা খুলে একটু দেখবেন প্লীজ? ''

আমি প্যাকেট টা খুললাম। ভেতরে একটা বার্থডে কার্ড,আর ছোট একটা গিফটের বক্স। গিফটের উপর লেটার প্যাডের পাতায় কিছু লেখা।

 

''শুভ জন্মদিন স্যার,আপনি আমাকে একদম পছন্দ করেন না আমি জানি। কিন্তু আমি আপনাকে অনেক বেশী পছন্দ করি। কেন যেন মনে হয় আমার বড় ভাই হলে আপনার মতই হতো। আপনার জন্মদিন সরাসরি উইশ করার ইচ্ছা ছিল,কিন্তু আপনার যা রাগ! আমার সাহস হলনা। আপনার আর ভাবীর জন্য খুব শখ করে একটা জিনিস কিনেছি। আশা করি ভালো লাগবে। আর কোন একদিন ভাবীকে নিয়ে আমাদের বাসায় আসবেন? আমার তাকে খুব দেখার ইচ্ছা।''

গিফট বক্সের ভেতরে একটা খুব সুন্দর ফটো স্ট্যান্ড। আমার মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। আমি আসলেই একটা অমানুষ।

 

বাসায় এসে দেখলাম বাবা ড্রয়িং রুমে বসে টিভি দেখছে। আমার ছোট ভাই প্রত্যয় নিজের পড়াশোনা নিয়ে ব্যাস্ত। মা কিচেনে ব্যাস্ত। কারো আমাকে উইশ করা তো দুরের কথা আমার সাথে কথা বলার সময়টুকু পর্যন্ত নেই। নিজের উপর বিতৃষ্ণা ধরে গেলো আমার! রুমে এসে দেখি নিশি পড়ছে। ওর ফাইনাল পরীক্ষা আর কিছুদিনের মধ্যে। আমি কিছু না বলে বিছানায় শুয়ে পড়লাম।

 

''শুয়ে পড়লে কেন? ৮টা বাজে। আর একটু পরেই তো খাবার সময় হয়ে যাবে।''

''আমি খাবোনা,তুমি খেয়ে নিও। আমি একটু ঘুমাব''

নিশি পড়া ছেড়ে উঠে এলো।

''তোমার কি মন খারাপ?'' আমার মাথায় হাত রেখে জিজ্ঞেস করল ও।

''আমি আজকে খুব খারাপ একটা কাজ করে ফেলেছি।''

অনেক অনেক অনেক খারাপ একটা কাজ।

আমি নিশিকে আনুশকার কথা বললাম। চিঠিটা পড়তে দিলাম।

''আমি অনেক খারাপ তাই না নিশি? শুধু মানুষকে কষ্ট দি ''

''তুমি অনেক বেশী ভালো নিলয়,কিন্তু তুমি এত বোকা যে চারপাশের মানুষের ভালবাসা বুঝতে পারনা। আমি আর তুমি কালকে আনুশকাকে গিয়ে থ্যাংকস দিয়ে আসব''

''তুমি যাবে সত্যি? মেয়েটা অনেক খুশী হবে দেখো''

''অবশ্যই যাবো। এখন ঘুমাও। তোমার না মাথা ব্যাথা করছে? আমি মাথা টিপে দিচ্ছি''

''আরে না। তুমি পড়োতো,যাও। ''

নিশি কিছু বললনা। কিন্তু চলেও গেল না। আমার মাথায় হাত বুলাতে লাগলো।

যাক,কেউ একজন অন্তত আমাকে নিয়ে চিন্তা করে!

 

 

 

৪.

 

''এই,জলদি উঠ''

কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম জানিনা। নিশির ধাক্কায় ঘুমটা ভাংলো। এখনো রাত।

''এই মায়ের শরীরটা না খুব খারাপ করেছে। জলদি আসো''

আমি ধড়মড় করে উঠে গেলাম। মায়ের খারাপ লাগছে? কি হয়েছে? এত করে বলেছিলাম যে নিজের শরীরের অবহেলা না করতে। কে শুনে কার কথা? মা নিজে যা বুঝে তাই করবে। আমার সাথে না হয় কথা বন্ধ। প্রত্যয়কে নিয়ে ডাক্তারের কাছে গেলে কি হয়? এসব ভাবতে ভাবতে আমি বাবা মায়ের রুমে গেলাম।

 

রুমটা অন্ধকার। নিশি আমার পিছনে এসে ঢুকল। কিছুই দেখা যাচ্ছে না।

''লাইট বন্ধ কেন?'' আমার প্রশ্নের কেউ জবাব দিলনা। এই সময়েও কি আমার সাথে কথা বললে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে? আমি অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে লাইটের সুইচের কাছে গেলাম। লাইট জ্বালিয়ে নিজের চোখে হাত দিয়েছি। হঠাৎ করে চোখে আলো পড়াতে ভালো মত তাকাতে সমস্যা হচ্ছে।

 

''হ্যাপি বার্থডে টু ইউ,হ্যাপি বার্থডে টু ইউ

হ্যাপি বার্থডে ডিয়ার নিলয়,হ্যাপি বার্থডে টু ইউ''

 

তীব্র আলোয় তাকাতে বেশ কষ্ট হচ্ছে। অনেক কষ্টে চোখ মেলে দেখলাম প্রত্যয় গিটার বাজাচ্ছে,পেছনে বাবা মা আর নিশি দাঁড়িয়ে আছে। একটা ছোট টেবিলে একটা কেক রাখা।

 

আমি ঘড়ির দিকে তাকালাম। আমার জন্মদিন শেষ হতে আর ১০ মিনিটের মত আছে।মা আমার দিকে এগিয়ে এসে বললেন ''তোর জন্মদিন বলে আজকে কথা বললাম। কালকে থেকে আবার কথা বলা বন্ধ'' আমি কিছু বললাম না। অনেক বেশী অভিমান হচ্ছে আমার। এতদিনের রাগ ক্ষোভ সব মনে হচ্ছে চোখ দিয়ে বের হয়ে আসতে চাচ্ছে। ছিঃ,ছেলেদের কান্না করা সাজে না!

 

''শুভ জন্মদিন,নিলু' বলে মা আমাকে জড়িয়ে ধরলো। আজকে আমি অন্য সময়ের মত বলতে পারলামনা যে ''নিলু ডেকোনাতো মা,নিজেকে মেয়ে মেয়ে লাগে'' আমি মাকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরলাম। অনেকদিন পর মনে হচ্ছে আমি আবার সেই ছোট নিলু হয়ে গেছি। যে মায়ের বকা শুনে মাকে জড়িয়ে ধরে বলতো ''সরি মা,আর হবেনা''

 

নিশির চোখে পানি। বাবা আর প্রত্যয় হাসছে। কারো মুখে হাসি,কারো চোখে অস্রু। কিন্তু অনুভূতিগুলো একই সুরে বাঁধা। চার দেয়ালের কাব্যে মাঝে মাঝে ছন্দপতন হয় ঠিকই,কিন্তু শেষের দিকে এসে অন্ত্যমিলটা খুঁজে পেতে সময় লাগেনা।

 

এটাকেই হয়ত জীবন বলে।

 

 

Share