না চাহিলে যারে পাওয়া যায়

লিখেছেন - - দূর্বা জাহান | লেখাটি 2819 বার দেখা হয়েছে

    আমি ফেসবুকের ইনবক্স ঘাটাঘাটি শুরু করলাম এত হাজার টেক্সটের মাঝে, পুরাতন স্মৃতি মাথাচাড়া দিয়ে উঠলেই এরকম করি । নীলের সাথে আমার প্রথম পরিচয়, কথাবার্তা সব ফেবুতেই। আজ খুব দেখতে ইচ্ছে করলো আমাদের কথার শুরুটা । একটা সময় পেয়েও গেলাম,

 

    -হ্যালো!

     - জ্বী ।

     - ক্যামন আছেন?

     - ভাল । তুমি কেমন আছো তরী? কবিতা লেখা কেমন চলছে?

     - একটু টেনশিত আছি । আমি তো কবিতা লিখতে পারিনা!

     - তাহলে স্ট্যাটাসে যেগুলো লিখো সেগুলো কি? কিসে পড়ছো?

     - স্ট্যাটাসে তো মানুষ কত কিছুই লিখে । এবছর HSC দেয়ার কথা ছিল, দেইনি ।

    - তাহলে তো বেশ পিচ্চি! আমি আবার পিচ্চিদের তুই ডাকি, রাজী আছিস?

     - হেঃ হেঃ হেঃ । একটা সমস্যা আছে ।

     - কি সমস্যা?

     - আপনি যদি আমাকে তুই করে ডাকেন তাহলে আমিও তোকে তুই ডাকবো, এটাই আমার নিয়ম smile

 

    এতটুকু পড়তেই হেসে দিলাম, কি অদ্ভুত একটা মেয়ে ছিলাম আমি ! যা আসতো মুখে তাই । ল্যাপটপ বন্ধ করে আলো নিভিয়ে দিলাম । যত পড়বো কনভার্সেশনে গভীরতা ততটা বাড়বে, তাই উঠে পড়াই শ্রেয়!...

 

    কিছুক্ষণ পর এক প্রচণ্ড শূন্যতা অনুভব করলাম বুকে । সেই শূন্যতাটুকু কাটিয়ে উঠতে না পারলে হয়তো ঢেউ আছড়ে পড়বে চোখের জলে । ল্যাম্প জ্বালিয়ে কবিতার বইটা তুলে নিলাম,

 

    "বেশ কিছুকাল হলো চলে গেছো, প্লাবনের মতো

    একবার এসে ফের ; চর্তুদিকে সরস পাতার

    মাঝে থাকা শিরীষের বিশুষ্ক ফলের মতো আমি

    জীবনযাপন করি ; কদাচিত্‍ কখনো পুরোনো,

    দেয়ালে তাকালে বহু বিশৃঙ্খল রেখাথেকে কোনো

    মানুষের আকৃতির মতো তুমি দেখা দিয়েছিলে ।

    পালিত পায়রাদের হাঁটা, ওড়া, কূজনের মতো

    তোমাকে বেসেছি ভালো ; তুমি পুনরায় চলে গেছো ।"

 

    উফ্! বিনয় মজুমদার কি করে জেনেছিলো এ কথা? কবিতাটা পড়ে মনে হচ্ছে আমার জন্যেই লেখা । বারান্দায় চলে আসলাম আমি...

 

    ঐ দিনের পরিচয়ের পর নীলের সাথে আমি তুই সম্বোধন করে চালিয়ে দিচ্ছিলাম । নীল থাকতো অনেক দূরে,অনেক বেশি দূরে, বীরভূমের শান্তিনিকেতনে চারুকলায় পড়াশোনা করতো । আমি ঢাকার এক অখ্যাত কলেজে...দুইপ্রান্তে থাকা আমরা দুইজন সারাটাক্ষণ আজাইরা বকবক করতাম।

 

    হ্যাঁ সম্পূর্ণ আজাইরা বকবক । নীল আমাকে বলতো তার ঘনঘন প্রেমে পড়ার গল্প, আমি খোঁচাতাম । আমি শোনাতাম আমার রাস্তাঘাটে মারামারির গল্প ।নীল অবাক হয়ে শুনতো আমার কাণ্ডকারখানা । ও আমাকে ডাকতো দেবযানী বলে, আর আমি সন্ন্যাসী ।এভাবে আজাইরা বকবকের রাত পোহানোর একসময়, ইয়াহুতে তুমুল কথাবার্তা চলার এক ফাঁকে আমাদের দুজনের পৃথিবী বদলে গেলো ।

 

    আমি প্রচণ্ড কাঁদছিলাম ওর কথায়, আমার ভুলে । নীল সেই প্রথম আমাকে কল দিলো, কান্নার চোটে কথা বলতে পারছিলাম না । আমার জানা ছিলোনা ইণ্ডিয়া থেকে বাংলাদেশের কলরেট কত, ছেলেটা

 

চুপচাপ আমার কান্না শুনলো তারপর একটা পর্যায়ে আমি ফোন রেখে দিলাম ।

 

    লাইন কাটার পর ফোনটা বেজে উঠলো ছোট্ট এক বার্তায়,

 

    "তরী, এসবের মানে কি? প্লিজ ঘুমাতে যা । লাভ ইউ"

 

    এটা পড়ার পর আমার মাথা কাজ করছিলো না । ঝাপসা চোখে ফেসবুকে লগিন করলাম, ফেবুর নীল ব্যানারের নিচের স্ট্যাটাসবক্সে What's on your mind? লেখাটা পড়ে শুধু

 

মাথায় আসলো আমি সন্ন্যাসী নীলকে ভালবাসি । দ্রুত টাইপ করে লিখলাম,

 

    'আমি শুক্রাচার্যের কন্যা নই, তুমিও কচ নও । তবুও আমি তোমার দেবযানী'

 

    সন্ন্যাসী এক ঝাপসা চোখের স্যাতস্যাতে অনুভূতি হিসেবে জড়িয়ে ছিলো আমার মাঝে । সেখানে একগুমোট আবহাওয়ার সৃষ্টি হলো যখন ও ৩ দিনের দিন আমাকে জানালো সে কোন সম্পর্কে যেতে

 

চাইছেনা । আমি চুপচাপ সরে আসলাম, তার আগে শুধু প্রশ্ন করলাম, ক্যান ভালোবাসিস না?

 

    পারলোনা, আমি ওকে ভালবাসছি এটা জেনেশুনে সন্ন্যাসী দূরে থাকতে পারলো না । শুরু হলো এক কাহিনী, পৃথিবীর প্রাচীন কাহিনী,সবচে টিপিক্যাল কাহিনী, কাঁচা আম দিয়ে পুরান কাসুন্দি মাখানো কাহিনী, সবচে ফাউল কাহিনী যার নাম ভালুবাসা । দুই দিকে থাকা দুই মানব-মানবীকে ঘিরে এই কাহিনী আবর্তিত হতে লাগলো ।

 

    নেট স্পীডের সাথে তাল মিলিয়ে আমাদের ভার্চুয়াল প্রেম দূর্দান্ত মাত্রা পেলো । যখন স্কাইপেতে বকবক, ফেবুতে চ্যাটিং, ফোনের এসএমএসে আমরা জড়িয়েছি ঠিক ঐ সময় ফেসবুকের রিলেশনশিপ স্ট্যাটাস বদলে দিলাম । ঐন্দ্রিলা তরী ইজ ইন আ রিলেশনশিপ উইথ স্বপ্নীল নীল!

 

    নীরব প্রেমের দিকে আমরা কেউ পক্ষপাতী ছিলাম না,আমাদের কাছে প্রেম আসবে ভেঙেচুরে তোলপাড় করে, ঝড় বয়ে যাবে অনুভূতির । যাতে রবিঠাকুরের গান গাইতে পারি,

 

    বিরস দিন, বিরল কাজ প্রবল বিদ্রোহে,

    এসেছো প্রেম এসেছো তুমি কি আজ মহাসমারোহে...

 

    মহাসমারোহই বলা চলে, শত শত প্রশ্নবাণে জর্জরিত, অপ্রত্যাশিত সম্পর্ক । আমার নীল বেচারার জন্যে বেশ মায়াই হলো, ওকে দুর্ভাগাদের তালিকায় নাম লেখানোর জন্য স্বাগতম জানানো ছাড়া আর কোনো উপায় ছিলো না ।

 

    সন্ন্যাসীর পুরো সার্কেলটার সাথে পরিচিত হলাম ধীরে ধীরে । ওর শান্তিনিকেতনের বন্ধু, বাংলাদেশে থাকা বন্ধু , সবার সাথে আমার বেশ ভাল সম্পর্ক গড়ে উঠলো । দেখাও হতে লাগলো প্রায়, আমি তাদের কাছে খুব প্রিয় হয়ে উঠেছিলাম । সবাই আমার কাছে নীলের গল্প করতো, সেই চেইনস্মোকার নীল, স্পীডে বাইক চালাতে ভালবাসা নীল, ভবঘুরে নীল যার প্রেম করার কথা ছিলোনা অথচ আমার সাথে একটা

 

লুতুপুতু সম্পর্কে জড়িয়ে গিয়েছিল যে তার গল্প । যার সাথে শুরু হয়েছিল তুই দিয়ে সেটা এসে থেমেছিল তুমিতে, বহু চেষ্টা করেও কেউ কাউকে আর তুই সম্বোধন করতে পারতাম না ।

 

    আমি অসম্ভব আবেগ নিয়ে অপেক্ষা করতাম সন্ন্যাসী কবে ছুটি পেলে বাংলাদেশে আসবে, ওর ওয়ালে ভরে যেতো আমার প্রিয় গানে । ইনবক্সে আমাদের মাকড়শার জালের মত কথামালার বুনন চলতো,

 

মাঝে মাঝে কবিতার ক্যারেক্টার চেঞ্জ করে নিজেদের নাম দিয়ে একে অপরকে প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার কবিতাটি উত্‍সর্গ করতাম....

 

    ফেবু ফ্রেণ্ডলিস্টে মা বাদে পরিবারের অন্যরা থাকার কারণ সবাই জেনে গিয়েছিল, তারা দেখতো আমাদের কীর্তি । বাবা দুজনেরই ফ্রেণ্ডলিস্টে থাকার সুবাদে আমাদের অতি রোম্যান্টিক ওয়ালপোস্ট পড়ে খাবার টেবিলে খোঁচাতো । যখন সবকিছু এতটাই ঠিক তখন হলো গণ্ডগোল...

 

    নীলের মাঝে আমাকে নিয়ে একটা গা ছাড়া ভাব চলে এসেছিল টের পেয়েছিলাম আগেই তবে অত পাত্তা দেইনি ।

 

    হঠাত্‍ করে নীলের এক বন্ধু জানালো যে ও বাংলাদেশে এসেছে ৫দিন হলো ।

    আমি হতভম্ব হয়ে পড়লাম এটা জেনে, যার জন্যে এত অপেক্ষা এত আয়োজন সেই আমাকে কিছু জানালো না?

 

    আমাকে কল দিলো নীল,খুব অনুরোধ করলাম দেখা করার সে করলোনা ।কর্কশভাবে শুধু জানিয়ে দিল সে আমার মোহে পড়েছিলো ।

    কথাগুলো শুনে বেশ কিছুক্ষণ কাঁদলাম, তারপর অদ্ভুত শান্তভাবে ফেসবুকে রিলেশনশিপ স্ট্যাটাস বদলে সিঙ্গেল হয়ে গেলাম...

 

    রাত সাড়ে ১২টার দিকে মা আসলো রুমে, আমি অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে রাখলাম । কৈফিয়ত দেয়ার ভঙ্গীতে খুব নরমভাবে মা বললো, তোর বাবার কাছে শুনলাম তোর আর নীলের ব্রেক আপ হয়ে গেছে তাই আমাকে পাঠালো তোর কাছে শোয়ার জন্য । আমি তখন খুব ধীরে বললাম, মা কবিতা শুনবা?

 

    মা অবাক হয়ে গেলো আমার কথায় ।

 

    'আমি দেখি নাই তারে কোনদিন,

    ধরিনাই তার হাত মেঘ মেঘ কোনো জোছনায়,

    অথচ তার কথা ভেবে ভেবে

    মন আমার নিশ্চুপ রাতে পদ্মার পাড়ের মতন,

    ঝুপ. . . .ঝুপ. . . .ঝুপ. . .ঝুপ'

 

    মা, নীলকে তো আমি দেখিনাই, ওর জন্য এত মায়া ক্যান?

 

    কথাগুলো বলতে বলতে প্রচণ্ড কষ্টে আমার কণ্ঠ বুজে এলো । নিঃশব্দ কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলাম আমাকে একা থাকতে দিতে ।

 

    কান্না শেষের পর মনে হলো আমি আমার ভালোবাসা অপাত্রে দান করেছি । এরকম কারো জন্য কাঁদতে আত্মসম্মানবোধে লাগে...আমি নীল নামক এক ছেলের জন্য সেইরাতে আমার ভেতরের সব মায়ার উৎস বন্ধ করে দিলাম ।

 

    শান্তিনিকেতনে ফিরে যাওয়ার পর নীল কল করেছিল আমাকে অনেক কথা বললো, ওর কাজিন অসুস্থ ছিল, ব্যস্তছিল,আমাকে ভালবাসে সেটাও । আমি অজুহাতগুলো শুনে, নিজেকে শক্ত করে কথা বল্লাম,

 

    - নীল তুমি আমাকে ভালোবাসো? যদি বাসো তাহলে কি চাও?

    - ভালোবাসি তোমাকে চাই কিন্তু দায়বদ্ধতা ভাল লাগেনা ।

    - যে সম্পর্কে কোন দায়বদ্ধতা নেই সেটা টিকিয়ে রাখার প্রয়োজন দেখছিনা ।

    - আচ্ছা ঠিক আছে ।

    - 'কেঁদেও পাবেনা তাকে বর্ষার অজস্র জলাধারে' কার লেখা জানো?

    - নাহ্

    - অমিয় চক্রবর্তীর । জানো তো আমি যেদিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেই সেদিকে ফিরেও তাকাইনা, ভাল থাকো ।

 

    ফোনটা অফ করে দিয়েছিলাম কথাগুলো শেষ করে । বুকের ভেতর আশ্চর্য এক প্রশান্তি, কারণ আমি জানি আমার কোন দোষ ছিলোনা ।

 

    কোন কিছু থেমে থাকেনি চলছিল দূর্দান্তভাবে । আড্ডা গান হৈ-হুল্লোড়ে কেটে যাচ্ছিলো আমার বেলা । ব্রেকআপের পরেও নীলের বন্ধুদের সাথে সম্পর্ক আগের মতো রইলো বরং আগের চেয়ে ভাল হলো। ওদের কাছ থেকেই জানতে পারলাম নীল বাংলাদেশে ফিরে আসছে,ওর শান্তিনিকেতনে মন টিকছে না । এখানে এসে চারুকলায় ভর্তি হয়ে যাবে । শুনে কিছুই যায় আসলোনা আমার ।

 

    আচমকা ফোনটি বেজে উঠলো, সম্বিত্‍ ফিরে পেলাম, আকাশে ভোরের আলো। নীলের সাথে অতীতের কথা ভাবতে ভাবতে এমন ঘোরে চলে গিয়েছিলাম যে খেয়াল ছিলনা কিছুর । আবার কল, রিসিভ করার পর অপর প্রান্ত থেকে ভেসে আসলো চেনা কণ্ঠ, 'তরী আমি নীল। শাহবাগে আসতে পারবে আজ? ১১টায়? দেখা করবো ।

 

    আমি প্রথমে বিস্ময়ভাবটা কাটিয়ে উঠে সম্মতিসূচক উত্তর দিয়ে রেখে দিলাম ফোন। ওর সাথে পরিচয়ের ৬মাস পর দেখা, প্রথম দেখা, বাহ্!

 

    সকালে বের হয়ে পড়লাম, যখন শাহবাগে পৌছে গেছি ঘড়িতে বাজে সাড়ে ১০টা, নীলকে মেসেজে লিখলাম ।ছবির হাটে গিয়ে ফ্রাঁসোয়া প্রুফোর একটা সাক্ষাত্‍কার পড়তে পড়তে গুড়ের চা খাচ্ছিলাম, কিছুক্ষণ পর সামনে একটা ছায়া পড়লো ।

 

    দেখেই হেসে দিলাম আমি,

 

    - চিনলে কি করে?

    - ফেবুতে ছবিতে খুঁটিয়ে তো আর কম দেখিনাই দেবযানী। কিন্তু তুমি তো পিচ্চি!

    - হু এই পিচ্চির সাথেই প্রেম করেছিলা তুমি, ব্যাপার না!

 

    নীল একটু চুপসে গেলো । ওর চশমার গ্লাসটা খুলে পড়ে গেলো, ও সেটা ঠিক করতে চেষ্টা করছিল । আমার মনে হলো নীল আমাকে দেখে নার্ভাস হয়ে গেছে, ওর হাত কাপছে । অর্ক আর রাজীবকে ওর

 

সাথে দেখে খুশিই হলাম আমি । শুরু হলো আড্ডা....

 

    দুপুরের দিকে রাজীব প্রস্তাব দিলো নান্না মিয়ার মোরগ পোলাও খাওয়ার । রাজী হলাম, রিকশা ঠিক করার পর নীল আমার সাথে বসলো । আমি ওর সাথে টুকটাক গল্প করছিলাম, হুটকরে ও বললো, তরী আমি কি তোমার হাত ধরতে পারি?আমি নিঃসঙ্কোচে হাত বাড়িয়ে বললাম, অবশ্যই ধরতে পারো ।আমার হাত তুলতুলে ধরতে ভাল লাগবে ।

 

    নীল হাত ধরে চুপচাপ বসে রইলো, আমি বকবক করতে লাগলাম । এভাবে আমাদের রিকশাভ্রমণের সমাপ্তি হলো! একসময় আড্ডার ইতি টানলাম । নীল আমার নির্লিপ্ত আচরণে বুঝে ফেললো ওর ব্যাপারে আগ্রহী নই আমি, দুর্বলতাগুলো ঢেকে ফেলেছি বহু আগেই।

 

    এই ঘটনার পরে প্রায়ই আমাদের কথা হত ফোনে, খুব হাস্যকর আলোচনামূলক কথাবার্তাও উঠে আসতো, যেমন আমি গার্লফ্রেণ্ড হিসেবে কতটা ভাল অথবা নীল কতটা নির্বোধ যে আমাকে বুঝেনি ব্লা ব্লা ব্লা!

 

ও সেসবে কিছু না বলে শুনে যেতো ।

 

    আমার কেন জানি মনে হতে লাগলো নীল একটা চাপা কষ্টে আছে এবং সেটার কারণ আমি । সে আমাকে আবার চাইতে শুরু করেছে,বলতে পারছেনা কারণ সে নিজেই সম্পর্কটা নষ্ট করেছিল ।

 

    দীর্ঘ একটা সময়ে আর যোগাযোগ হলোনা । হঠাত্‍ আজকের মত মেঘলা একটা দিনে ভয়েস মেসেজ আসলো,

 

    "তরী, আমি জানিনা এটাকে কি বলে কিন্তু সত্যি বলছি আমার খুব কষ্ট হচ্ছে । আমি নিজে সব ভেঙে কষ্ট পাচ্ছি । আজ বিকেলে পাবলিক লাইব্রেরী থাকবো, আসবা তুমি?"

 

    ঠিক ঐ সময়ে মা আসলো কিন্তু থমকে গেলো আমাকে দেখে। আমি প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকালাম,

 

    - কি হয়েছে তোর?

    - তেমন কিছুনা, নীল দেখা করতে চাইছে । ভাবছি যাবোনা, বসো তুমি আমি কফি বানিয়ে আনি ।

    - যা ভাল বুঝিস তবে বুড়ি কেউ তার ভুল বুঝলে তাকে সুযোগ দেয়া উচিত ।

    - মা বাদ দাও । যে একবার করে সে বারবার করবে । এসব নিয়ে ভেবে লাভ নেই!

 

    আমি উঠে চলে আসলাম নিজের ঘরে । আলমিরা থেকে বের করলাম নীল রঙের শাড়িটা...

 

    রিকশা যখন পলাশীর মোড় ঝুম বৃষ্টি শুরু হলো । পাবলিক লাইব্রেরী যেতে যেতে শাড়ি পড়ে কাক ভেজা হয়ে গেলাম । ভেতরে যেয়ে দেখি লাইব্রেরীর সিড়িতে তুমুল বৃষ্টির মাঝে চুপচাপ বসে রয়েছে নীল,

 

আমি ধীরে ধীরে হেটে ওর পাশে গিয়ে বসলাম ।

 

    বর্ষার করুণাধারা বর্ষিত হচ্ছিল আমাদের দুজনের উপরে এবং সেই মুহূর্তে...

 

    ঠিক সেই মুহূর্তে আমি অসম্ভব ভালোবাসা নিয়ে নীলের হাতটা ধরলাম, এই হাত উপেক্ষা করে চলে যাওয়ার ক্ষমতা নিয়ে আমি পৃথিবীতে আসিনি । ভীষন মায়া নিয়ে আমি ছেলেটার হাত ধরে বসে থাকি ।

 

বর্ষার জল পূর্ণতা পেলো যখন আলতো ভাবে নীলের আঙুল আমার আঙুলের শূন্যস্থান পূরণ করলো...!

 

    'একদিন বৃষ্টিতে বিকেলে

    মনে পড়ে যাবে সব কথা,

    কথা দিয়ে কথাটা না রাখা

    ফেলে আসা চেনা চেনা ব্যাথা ।

    অদূরে কোথাও কোন রেডিওতে এই পথ যদি না শেষ হয়,

    আজ বৃষ্টির রঙ হয়ে যাবে নীল

    আর আকাশের রঙটা ছাই'

 

---------------------------------------------------------

 

(আমার নামে একটা অপবাদ আছে, আমি নাকি গল্পের নায়ক নায়িকাকে না মেরে শান্তি পাইনা । ছ্যাকামার্কা দুঃখী দুঃখী লেখাই আসে । সেই অপবাদ ঘোচাতে ব্যর্থ প্রচেষ্টা, একটা হ্যাপি এন্ডিং)

 

উত্‍সর্গ : দূরসম্পর্কের প্রেমিক শাহনেওয়াজ শুভ । ওর আমার কাহিনী বলার কিছুই নেই, সবাই দেখেছে জেনেছে সুসম্পর্কের থেকে একটা মানুষ কি করে দূরসম্পর্কের হয়. . . .বলেছিলাম না প্রেম আসবে ভেঙেচুরে তোলপাড় করে, এটা অনেকটা তাই ছিল । আমি ৪৫০০০ লাইকারের সামনে খুব জোর গলায় বলতে পারছি আমাদের প্রেম ছিল, ভালবাসার মত অসাধারণ একটা ব্যাপারে লুকানোর কিছু নেই । ওকে নিয়ে চাইলে অনেক কিছু লেখা যায় কিন্তু তা শেষ হবেনা । আমাদের যে সুন্দর সময়টুকু ছিল সেটার উপর শ্রদ্ধা রেখে এই উত্‍সর্গটুকু

সন্ন্যাসী অনেক বেশি শুভকামনা!


Share