একবিন্দু জল

লিখেছেন - দুর্বা জাহান | লেখাটি 1054 বার দেখা হয়েছে

"ঠিক ভোর হওয়ার কিছুক্ষণ আগে অনিন্দিতা পাখির ডাক শুনতে পায়,নাহ প্রিয়াঙ্কা বেশ ভালো করেই পাখির ডাক রপ্ত করেছে । ব্যাগটা গুছিয়ে খুব চুপিসারে বের হয়ে আসে ও। বের হয়েই যুথিকে দেখে জড়িয়ে ধরে অনি,চার বান্ধবী জাপটা জাপটি করে ধরে রওনা হয়. . ."

 

এতটুকু পড়েই ঐশী বলে,মা তোমার বান্ধবীর লেখাটা সম্পূর্ণ তোমার মত তাইনা? নামটাও বেশ মিলে যায় ।

 

 

"হুম আমার খুবই কাছের বান্ধবী ছিল অনিন্দিতা" শোকেসে রাখা পুতুলগুলো মুছতে মুছতে অনিতা বলে ।

 

- লেখা দেখেই বুঝতে পারছি। তবে মা তোমার বান্ধবী কিন্তু দারুণ লিখে কথাটা বলেই ঐশী আবার ডায়রিটা পড়তে শুরু করে দেয়।

 

- ঐশী তুই কি সেজানের সাথে Break-up করে দিয়েছিস?

 

- হুম দিলাম । তুমি তো সব জানোই আম্মু ।

 

- তাই বলে এতদিনের সম্পর্ক এভাবে শেষ করে দিলি?

 

- আমি ওর সম্পর্কে ঐগুলো জানার পর ওকে ভালোবাসতে পারছিনা,Relation রাখারও কোন আগ্রহ পাচ্ছিনা ।

 

- কাজটা ঠিক হলো না রে ঐশী,সেজান ছেলেটা ভালো ছিল।

 

কথাটা বলে অনিতা আবার তার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, সামনে বাসা বদলাবে তাই সব পরিষ্কার করতে হচ্ছে । অনিতার কথাটা শুনে ঐশী খুব অবাক হয়ে তাকায়,তার মা কি করে বলে সেজানের সাথে Relation রাখতে?সেজানের সাথে ওর তিনবছরের সম্পর্ক,এই তিনবছরে এত বড় কথাটা লুকিয়েছে,একবারের জন্যও কথাটা ঐশীকে জানায়নি । কথাগুলো জানার পর ঘৃণায় ওর গা রি রি করছিল । অথচ সেজানের মাকে ঐশী কতই না শ্রদ্ধা করতো ।

 

আর সেজানের মত পিতৃপরিচয়হীন একজন যুদ্ধশিশু?অসম্ভব ! ঐশী মানতেই পারেনা এরকম একটা পিতৃপরিচয়হীন ছেলে তার বাচ্চার বাপ হবে ।

 

মাথার ভেতর থেকে ভাবনাগুলো তাড়িয়ে দিয়ে ঐশী ডায়রি পড়ার দিকে মনোযোগী হয় ।

 

"ওরা ভালো করেই জানতো ব্যাপারটা ৪জনের জন্য কতটা বিপদজনক,কিন্তু প্রিয়াঙ্কার কথা একটাই, দেশের এমন অবস্থায় হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকলে চলবে না,যুদ্ধে যেতেই হবে । কথাগুলো ওদের সবার মাঝে নাড়া দিয়েছিলো তাই যেখানে বাবা-মা তাদের কমবয়সী মেয়েদের বাঁচানোর জন্য গ্রামের দিকে যাত্রা শুরু করেছে ঠিক সেই সময়ে এই দুঃসাহসী ৪টা মেয়ে কোন এক অদ্ভুত ভোরে দেশের জন্য পরম মমতার কারণে ঘর ছেড়ে বের হয়ে পড়ে । জীবনটা আসলে কতটা কঠিন ধরা পড়ে তখন,পুরুষের চেয়ে ভিন্ন এই শারীরিক গঠন সব সমস্যার মূল হয়ে দাড়ায় । কোথাও সুযোগ পাচ্ছিলোনা ওরা, অবশেষে ভার্সিটির এক বড়ভাইকে খুঁজে পায়, একরকম জোর করেই ঐ দলের সাথে জড়িয়ে পড়ে । কিভাবে অস্ত্র পরিচালনা করবে সব খুটিয়ে খুটিয়ে শিখে নেয় ,প্রস্তুত হয় অমানুষ গুলোর বিরুদ্ধে দাড়ানোর ।

 

পৃথিবীটা তখন ওদের ৪জনের অন্যরকম হয়ে গেছে । একেকটা অপারেশন শেষে একসাথে সবাই খেতে বসতো ।ঐ মিলিটারিগুলোকে মেরে যে তৃপ্তি, সেই তৃপ্তি ওরা ক্ষুধার্ত পেটে মোটা চালের তরকারী বিহীন ভাতেও খুঁজে পেতো না ।

 

তবে কষ্ট যে হয়নি তাও না,এখানে আসার পর মেয়েসুলভ কোন চিহ্ন রাখা যাবেনা এজন্য তন্নী তার লম্বা চুলগুলো কেটে ফেলে । কাদার মাঝে হেটে হেটে পা বলে যে কিছু আছে বুঝতে পারতো না, পায়ে ঘা হয়ে যেতো তবুও সবকিছু উপেক্ষা করে এগিয়ে যেতো একটি স্বপ্নকে পূর্ণতা দিতে। স্বপ্নটা স্বাধীন বাংলাদেশের ।

 

যুথি প্রায়ই গুমরে গুমরে কাঁদতো ছোট বোনটার জন্য । আর অনিন্দিতা...দীর্ঘশ্বাস ছাড়া আর কি বা ছিলো ওদের কাছে! অবাক লাগতো প্রিয়াঙ্কা কে দেখে, এত প্রাচুর্যের মাঝে থাকা মেয়েটা কত দ্রুতই না এই পরিবেশের সাথে মানিয়ে নিয়েছে । প্রতিবার যখন গাইতো "আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি....." প্রতিবার চোখে ভিজে যেতো ওদের । ছোট্ট দেশটার জন্য বুকে এত ভালবাসা জমে ছিলো কে জানতো?

 

সব কিছুর একটা শেষ আছে,রাতের এক অপারেশনে গুলিতে যুথি আর তন্নী মারা গেলো । সংকেত আসলো পালিয়ে যাওয়ার,কিন্তু যুথির লাশটা দেখার পর অনিন্দিতার পা এত ভারি হয়ে ছিল চলার শক্তিটুকু হারিয়ে ফেলেছিলো ।বুকের ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে একাকার হয়ে যাচ্ছিল। আবেগের কাছে হেরে গেলো অনি, ডুকরে কেঁদে উঠলো । প্রিয়াঙ্কা শক্ত মুখ করে টেনে নিয়ে যেতে লাগলো ওকে । কিন্তু শেষ রক্ষাটাও হলোনা,ধরা পড়ে গেলো দুজনে ।

 

ক্যাম্পে ধরে নিয়ে আসার পর অত্যাচার শুরু হলো ।হঠাত্‍ আবিষ্কৃত হয়ে পড়ে এরা আসলে মেয়ে লোভী । তাই হায়েনার দলের ছিড়েখুড়ে খাওয়ার উপাদানে পরিণত হতে সময় লাগেনা । সবকিছুর শেষে বেয়নেট দিয়ে খুচিয়ে প্রিয়াঙ্কাকেও মেরে ফেলে । ইস্ কতই না কষ্ট হয়েছিল মেয়েটার !

 

প্রকৃতির এক অদ্ভুত খেলায় বেঁচে যায় অনিন্দিতা যদিও সেটাকে বেঁচে থাকা বলেনা । ছোট্ট দেশটা স্বাধীনের আনন্দের মাঝে অনি অন্তঃস্বত্তা হয়ে যখন ফিরে আসে কাছের মানুষগুলো প্রচন্ড ঘৃণা নিয়ে দূর দূর করে সরিয়ে দেয় ।

 

পৃথিবীটা আসলে কতখানি নিষ্ঠুর তখন চোখে পড়ে অনির,আড়াল হয়ে যায় সবার কাছ থেকে ।শুধু নিজেকে বাঁচাতে নয়,নিজের ভেতরে যে আরেকটা প্রাণ আরেকটা সত্ত্বা তাকে এই সমাজের অপমান থেকে রক্ষা করতে,বাঁচাতে । আশ্রয়হীন পৃথিবীকে খুব কষ্টের একটা স্থান মনে হয় তবুও নিজের আলাদা জগত্‍ তৈরি করে নেয় মেয়েটাকে নিয়ে ।"

 

এতটুকু পড়েই ঐশীর কেমন ভেতরটায় তোলপাড় শুরু হয়। জন্মের পর বাবা কেন,নিজের অন্য কোন আত্মীয় স্বজনকেও দেখেনি সে, ওর মা একা একাই সামলেছে সবকিছু । ঐশী এ নিয়ে প্রশ্ন ও করেনি কোনদিন । শুধু জানতো ঐশী খুব ছোট থাকতে বাবা রোড একসিডেন্টে মারা যায় ।

 

 আর আজ এতদিন পর, দম বন্ধ হয়ে আসে ঐশীর গলার কাছে কি যেনো দলা পাকিয়ে আছে. . ..প্রশ্ন করে ও,

 

"মা অনিন্দিতা কি তুমিই?"

 

 অনিতা কাজ থামিয়ে জানালার দিকে উদাস হয়ে তাকিয়ে থাকে,তার ধূসর চুলে বিকেলের রোদ্দুর খেলা করে, চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়া জল গালের জমিটাকে ভিজিয়ে দিয়ে যায়,অন্যপাশ থেকে ভেসে আসে ফুপিয়ে কান্নার শব্দ ।

 

Share