এই দূর পরবাসে

লিখেছেন - দুর্বা জাহান | লেখাটি 907 বার দেখা হয়েছে

বারান্দায় দাড়াতেই অলিভিয়ার চোখে চোখ পড়লো, একটু হাসি দিয়ে অন্যদিকে আমি

তাকালাম। অলিভিয়া সুন্দর করে সিগারেট টানে,ফুসফুসে নিকোটিনের ধোয়াগুলো

নিয়ে নাক-মুখ দিয়ে ছেড়ে দেয়,ওর এই শৈল্পিক সিগারেট টানার ভঙ্গি দেখে তখন

মনেহয় সৃষ্টিকর্তা এই মেয়েটার জন্যই হয়তো সিগারেট নামক বস্তুটির উপাদান

দিয়েছিল পৃথিবীতে!

 

চিন্তাগুলো অলিভিয়া থেকে সিগারেটকেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছে,বেশ বুঝতে পারছিলাম

আমি । এই ভেবে পকেটে হাত দিয়ে মনে পড়লো গত ২সপ্তাহ ধরে আমি সিগারেট খাই

না ।'খাই না' এই শব্দটা মাথায় আসতেই সিগারেটের তেষ্টা আরো একটু বেড়ে গেলো

আমার!

 

বারান্দার দরজা লাগিয়ে রুমে ঢুকলাম । বাইরে তাপমাত্রা মাইনাস ৬ডিগ্রি

সেলসিয়াস, তীব্র কুয়াশার সাথে গুড়িগুড়ি বৃষ্টি একদম স্যাঁতস্যাতে আবহাওয়া

। জার্মানিতে চলে আসার পর এই বিচ্ছিরি আবহাওয়া গা সওয়া হয়ে গেছে আমার ।

বাংলাদেশের আবহাওয়া আজকাল ভীষন মিস্ করি এই বিরক্তিকর আবহাওয়া দেখতে

দেখতে ।

 

ফোনটা তুলে নিয়ে কল দিতে যাব, মনে পড়লো ফোনের কার্ড নেই । চাকরি নেই, এ

মাসে একটা জব খুব দরকার অথচ ব্যাংকে আছে মাত্র ৩০,০ ইউরো । যে কারণে

আমার মত চেইনস্মোকারের গত ২সপ্তাহে সিগারেট খাওয়া বন্ধ ।

বিয়ারের গ্লাসটায় চুমুক দিতে দিতে ল্যাপি নিয়ে ঘাটাঘাটি করতে লাগলাম

হঠাত্‍ তিন্নির ছবিটায় চোখে পড়লো । মেয়েটার চোখ অস্বাভাবিক সুন্দর কলেজের

প্রথম দিন এই মেয়ের চোখ দেখে আমি প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম । ২টা বছর পর ওকে

বলতে যাওয়ার আগে তিন্নির বিয়ে হয়ে গেলো, আর বলা হয়নি এই মেয়েকে আমি কতটা

চাই!

তিন্নির কথা মনে পড়াতে বেশ খারাপ লাগতে শুরু করলো । ফেবুতে লগিন করে

নটিফিকেশন চেক করতে লাগলাম বিষন্নতা দূর করার জন্য । ৭বছরের আগের কথা

ভেবে আর কিইবা হবে!

 

"মনে পড়ে যায় কখনো পুরোনো তোমাকে

প্রতিটি কষ্ট মাখা দিনের ফাঁকে

হয়তো বদলে গেছো, হয়ে গেছো অচেনা তুমি

তবুও তোমাকেই ফিরে পেতে চাই দূরের আমি"

 

শীতের সাথে বিষন্নতা জেঁকে বসলো স্ট্যাটাসটা দেয়ার পর । ভালো লাগছে না আর

কিছু,ইচ্ছে করছে চলে যাই । প্লেন ভাড়া থাকলে চলে যেতাম, মাকে মনে পড়ছে ।

 

আমার কেনো জানি হু হু করে কান্না চলে আসলো, এতবড় হয়ে যাওয়ার পরেও । মাকে

দেখিনা কতদিন! আম্মু আগে আমার রুমে আসলে কত বিরক্ত হতাম, আজকাল মাকে

জড়িয়ে ধরে ঘুমাতে ইচ্ছে করে । কোলে মাথা রেখে শুয়ে থাকতে ইচ্ছে করে । আজ

কতদিন মায়ের হাতের রান্না খাইনা, সেই গাঁজরের হালুয়া ।

 

আমার চোখ ভিজে আসতে থাকে ।  আম্মু তার সব গহনা বেঁচে টাকা দিয়ে এই

ভিনদেশে পাঠালো, আজ মনে হয় কি এমন ক্ষতিটা হয়ে যেতো বাংলাদেশে থেকে গেলে!

জায়নামাযে যে ফোঁটায় ফোঁটায় চোখের জল পড়ে মার চোখ থেকে তা আমার জন্য,

এতটা নিঃস্বার্থভাবে ক্যানো ভালোবাসে?

 

ছোটবোনটার কথা মনে পড়ে, দিনরাত আব্দার করতো এটা দে ওটা দে । ডেঙ্গু জ্বর

হওয়ার পর আমাকে দেখতে চাইছিলো, যেতে পারিনি । বোনটা সাড়ে ৩হাত মাটির নিচে

চলে গেলো আমাকে না দেখে!

 

এই শহর আর ভালো লাগেনা, স্যাতস্যাতে আবহাওয়া, বাংলায় কথা না বলতে পারার

কষ্ট, মায়ের হাতের রান্না এগুলো ছাড়া জীবনটা থেমে থাকে আমার । কেউ আর

বলেনা, কোথায় বাবাটা আমার?

 

আমার যখন সবকিছু কনফার্ম হয়ে গেলো চলে আসার, বন্ধুরা দেখা করা বন্ধ করে

দিলো । যাওয়ার আগের রাতে সজীব এসে, জড়ায় ধরে বলে, শালা ***** এতটা পাথর

হলি যে  আমাদের রেখে সাদা চামড়ার দেশে চলে যাবি?

 

চোখ মুছে বারান্দায় দাড়ালাম, গানটা ছেড়ে এসেছি ল্যাপটপে । চারিদিকে

কুয়াশা । আকাশের দিকে তাকিয়ে চিত্‍কার করে বলতে ইচ্ছে করলো,

 

মিসিং য়্যু মা, মিসিং য়্যু অল!

 

"এই দূর পরবাসে তারা গুনি আকাশে আকাশে

কাটে নিঃসঙ্গ রাত্রিগুলো,

মাঝে মাঝে স্বপ্নের বেশে স্মৃতিরা এসে

আমাকে করে যায় বড় বেশি এলোমেলো ।

 

মনে পড়ে যায় বন্ধুদের আড্ডামুখর প্রহর

তুমুল উল্লাসে ভরা প্রিয় শহর,

সেখানে হয়তো সবাই ব্যস্ত মেলেনা সময়

তবু সেখানেই ফিরে যেতে চায় ফেরারী হৃদয় ।

 

এই একাকী জীবন ভালো লাগেনা আমার

প্রতিটি দিনের শেষে, প্রতিটি রাতের শেষে ।"

 

[আমার দূরপরবাসে থাকা মানুষ গুলোর জন্য অনেক বেশি খারাপ লাগে, । আমি ঠিক

তুলে আনতে পারিনি গল্প পুরো ব্যাপারটা, চোখে পানি এসে পড়ছিলো । আমরা

আমাদের কাছের মানুষগুলোর আশেপাশে থাকি,গলার রগ ফুলিয়ে মায়ের সাথে

চিত্‍কার করি কিন্তু কখনো ভাবিনা এদের ছাড়া জীবনটা কিভাবে থেমে থাকে ।

প্রতিটা মুহূর্তে এরা তাদের পরিবার,বন্ধু, প্রেমিকা,স্মৃতিময় শহর ছেড়ে

বহুদূরে থেকে যায় । নিজেকে রান্না করে খেতে হয়, একা একা ঈদ করতে হয়,

মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়ার কেউ থাকেনা । এরা তাদের কাছের মানুষগুলোকে রেখে

এতটা দূরে থাকে! চাইলেও পহেলা বৈশাখে,বইমেলা অথবা বন্ধুদের গেটটুগেদার

থাকতে পারেনা । শুধু নিজের কষ্টগুলো লুকিয়ে রেখে বলে 'Best of Luck' ।

 

আমাদের পেইজে এমন কয়েকজন আছে । রেজা শাওন, মাহমুদ জেনেভা, জয় কবির, রিয়েল

ডেমন,তৌসিফ হামিম. . . . .অনেক দূর দেশে বসবাসকারী লাইকার আছে । এই ছোট

অখাদ্য গল্পটা তাদের উত্‍সর্গ করছি ।

আমরা হয়তো আপনাদের কষ্ট ছুয়ে দেখতে পারবোনা তবুও আমরা আছি, অসম্ভব মমতা

নিয়ে কেউ না কেউ অবশ্যই আছে । লাভ য়্যু অল!]

 

 

Share