একজন আধাপাগল এবং একটি ফার্মের মুরগি

লিখেছেন - আয়শা কাশফী | লেখাটি 1361 বার দেখা হয়েছে

"ওই মুরগী ,আমার প্রক্সিটা দিয়ে দিস মনে করে।নতুন প্রোজেক্টটা নিয়া হালকা বিজি আছি।"

আমি খুব সাবধানে ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস গোপন করলাম।রাফি শেষ কবে আমার আসল নাম ধরে ডেকেছিল সেটা মনে করার একটা ব্যর্থ চেষ্টা করলাম।এই ক্লাস আওয়ারে সে যে প্রোজেক্টটা নিয়ে বিজি আছে তার নাম হল মারিয়া।প্রতি মাসেই নিয়মের বিন্দুমাত্র ব্যাতিক্রম না ঘটি...য়ে এবং পূর্ব ঐতিহ্য বজায় রেখে রাফির গার্লফ্রেন্ড বদল হয়। যদিও তাদের গার্লফ্রেন্ড বলতে বাড়াবাড়ি রকমের আপত্তি আছে তার!তার ভাষায় ওরা হল তার একেকটা প্রোজেক্ট!সে এক্সপেরিমেন্ট করে দেখছে,কোন প্রোজেক্টটা তার জন্য উপযুক্ত!যেদিন তার কাউকে সত্যিই উপযুক্ত মনে হবে(সেই সুদিন আমরা আদৌ কোনোদিন দেখব এমন দুরাশা এখনো করে উঠতে পারিনি),সেদিন তার এই খোঁজ-দি সার্চ শেষ হবে।যদিও যেকোন মেয়ের সাথে ৩-৪ দিন ঘোরার পরই রাফি তার প্রতিযাবতীয় আগ্রহ হারিয়ে ফেলে এবং তার রাজ্যের খুঁত খুঁজে বের করে!সেসব খুঁতও হয় একেবারে অনন্য।

 

এই যেমন,মেয়ের হাসি হায়েনার মত,চোখ চাইনিজদের মত,অথবা সে ট্রেনের ইঞ্জিনের মত শব্দ করে চা খায়,হিন্দি সিরিয়াল দেখে... ইত্যাদি ইত্যাদি!একটা মেয়ের যে দোষ শুনে সবচে পুলকিত হয়েছিলাম সেটা হল সেই মেয়ে নাকি আর্জেন্টিনার সাপোর্টার,কট্টর ব্রাজিলিয়ান সাপোর্টার রাফি চিরশত্রু বিয়ে করবে নাকি!নৈব চ নৈব চ!

 

                              

                রাফির সাথে আমার পরিচয়ের ইতিহাসটা একটু বলি।প্রথম যেদিন আমাদের ক্লাস শুরু হয়,কোন ধরনের সংকোচের ধারেকাছে না গিয়ে উরাধুরা চেহারার একটা ছেলে আমার মাথায় টোকা দিয়ে বলেছিল,"এই মেয়ে, তোর নাম চিঠি ক্যান?আর কোন নাম খুঁজে পাস নাই?"

 

আমি পুরোপুরি হতভম্ব হয়ে বললাম,"কি আশ্চর্য!আপনি আমাকে তুই তুকারি করছেন কেন?"হা হা করে হাসতে হাসতে বেয়াদব ছেলেটা বলল,"এই পুচকা মেয়ে বলে কি!তাইলে কি আপনি করে বলব চিঠি?"

 

"আমার নাম চিঠি না, দিঠি"।

 

"ওই একই হল।তুই এরকম আঁতেলের মত প্রথম দিন ক্লাসে এসেই পড়ালেখা শুরু করছিস ক্যান?থাপ্পড় চিনস?"

 

তারপর আমাকে পুরোপুরি হতভম্ব করে দিয়ে সে আমার পাশে এসেই বসে পড়লো। দুর্ভাগ্যবশত,সেই আধাপাগল রাফিই এখন আমার সবচে কাছের বন্ধু।এখন আর আমাকে চিঠি ডাকে না ও।মাঝে কিছুদিন ডাকতো আঁতেল,তারপর কুনোব্যাঙ,এখন ডাকে ফার্মের মুরগী।প্রায় চার বছর ধরে আমরা একসাথে পড়ছি।এই চার বছরে ওকে মানুষ বানানোর সব অপচেষ্টাই আমার বৃথা গেছে।একদিন ওকে সিগারেট ছাড়তে বলেছিলাম, ওর উত্তর ছিল,"আর কোনোদিন আমার গুরুকে নিয়া উল্টাপাল্টা বললে এক্কেরে কানের নীচে খাবি কিন্তু!দুইদিন কানে শো শো ছাড়া কোন শব্দ শুনবি না!"

 

এবার আমার একটা হাল্কাপাতলা বর্ণনা দেই।আমাকে হয়ত দায়সারা ভাবে একটা মেয়ে বলে চালিয়ে দেয়া যায়।রাফির রূপবতী প্রোজেক্টদের মত আমি ঠোঁটে কটকটে রঙের ভয়ঙ্কর লিপস্টিক লাগাই না,হাইহিল জুতা পরে র‍্যাম্প মডেলদের মত গটগটিয়ে হাঁটতেও পারিনা।আরও বিপদের কথা,আমি ওদের মত রক মিউজিক এর সাথে ডিজে পার্টিতে নাচানাচি করতেও  বাড়াবাড়ি রকমের অপটু!গর্তজীবী প্রাণীর মত রোকেয়া হল এর দোতলায় আমার আস্তানায় আমি নিরুপদ্রব বসবাস করতে পছন্দ করি। এই যুগেও আমি কিনা রবীন্দ্রসংগীত শুনি আর শরৎচন্দ্রের প্রেমের উপন্যাস পড়ে ফ্যাচফ্যাচ করে কাঁদি!পোশাক আশাকেও আমাকে নব্বই দশকের মা-খালার সাথে মিলিয়ে ফেলা খুব একটা অস্বাভাবিক না।আমি ক্লাসে যাই বেঢপ লম্বা কামিজ পরে।চুলে থাকে লম্বা বেণী আর চোখে থাকে ফ্রেম দেয়া ভারী চশমা।হয়ত একারণেই কিউপিড বেচারা কোন ছেলের মনে এখনো আমার জন্য ভালোবাসার তীর বিদ্ধ করায় ঠিক সুবিধা করে উঠতে পারেনি!

 

                              

                অবশ্য এটা নিয়ে আমার বিশেষ কোন বিকার নেই।মন খারাপের সময়,মেজাজ গরমের সময়,অথবা আনন্দের সময়......সব সময়ই আমাকে ব্যাস্ত এবং খানিকটা বিরক্ত রাখতে বিধাতা রাফিকে একেবারে কমান্ডো ট্রেনিং দিয়ে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন!আমার মন খারাপ থাকলে সে রাত একটার সময়ও আমার হলের সামনে হাজির হয়,আমার প্রিয় ক্যাডবেরি চকলেট হাতে।একবার এক ছেলে আমার ডেস্কে তেলাপোকা ছেড়ে দিয়েছিলো।আমার কান্না দেখে রাফির কি হল কে জানে।এক দৌড়ে আমার ডেস্কের ভেতর থেকে সেটাকে উদ্ধার করে ওর পেন্সিল বক্সের ভেতর পুরে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে চলে গেল।ক্লাস শেষে বের হয়ে দেখি ছেলেটা বমি করার আপ্রাণ চেষ্টা করছে,আর রাফি ছেলেটার শার্টের কলার চেপে ধরে মুখ লাল করে বলছে,"আর যদি কোনোদিন দিঠির সাথে ফাজলামি করার চেষ্টা করিস......আজকে তো শুধু তেলাপোকা খাইয়েছি,এরপর একেবারে কাঁচা সাপ খাইয়ে দেব।"

 

এরপর শিস দিতে দিতে আমার কাছে এসে নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,"ওই মুরগি,বিশটা টাকা দে তো।"

 

"কেন?"

 

"আরে আজব মেয়েমানুষ!ফ্রী সার্ভিস পাইছস নাকি! তোর বডিগার্ডের ভূমিকা পালন করলাম...এখন আমার বেনসন খাওয়ার পয়সাটা অন্তত দে!"আমি হতাশ ভঙ্গিতে বিশ টাকা বের করে দিলাম।রাফি আহত গলায় বলল,"মেয়েমানুষ আর যাই হোক,কঞ্জুসি ছাড়তে পারবে না।ভদ্রতা করে হলেও তো দশটা টাকা বেশি দিতে পারতি!"

 

                              

                কিছু কিছু সম্পর্ক থাকে যেটা অনেক সময় অন্য সব জাগতিক সম্পর্ককে হারিয়ে দিতে পারে।যে সম্পর্ককে কোন সীমারেখা দিয়ে আটকে ফেলা যায়না।যেখানে থাকে কাছে থাকার তীব্র আকুলতা, মানুষটাকে একেবারে কাছাকাছি রাখতে চাওয়ার ছেলেমানুষি ইচ্ছা।রাফির সাথে আমার সম্পর্ক অনেকটা সেরকম।

 

কিন্তু ক্ষুদ্র একটা সমস্যা আছে। একটা ছেলে আর একটা মেয়ে সবচে কাছের বন্ধু হলে কোন এক বিচিত্র কারণে তাদের সম্পর্কটা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বন্ধুত্ব থেকে খানিকটা এগিয়ে যায়।প্রায়ই নিজেকে প্রশ্ন করি,আমি কি ওকে ভালবাসি??

হয়ত বাসি।কিন্তু আমার জীবনে ও একটা আলোর মত,যেটা আমার খুব কাছ দিয়ে যাবে,কিন্তু হাত বাড়িয়ে কখনো তাকে ছোঁয়া যাবেনা।ওর কি দায় পরেছে আমার মত একটা আঁতেলকে ভালোবাসার!ওর নিত্যনতুন প্রোজেক্টদের সাথে আমার তো তুলনাও চলেনা।না বাপু,ও বন্ধু আছে,বন্ধুই থাকুক।প্রেম ভালবাসার মত বায়বীয় ব্যাপার আর যাই হোক,আমার জন্য নয়।আর ভালবাসলেই যে তাকে পেতে হবে এমনটা তো আর সংবিধানে লেখা নেই।ও সব সময় হয়ত আমার কাছাকাছি থাকেনা,কিন্তু পাশাপাশি থাকে সব সময়। মিথ্যে বলব না, যখন ওকে অন্য কোন মেয়ের সাথে দেখি খারাপ লাগে......ভীষণ খারাপ।ভীষণ অভিমান হয়...

 

                  "ওই মুরগী কি করস?"রাফির ডাকে পেছন ফিরলাম।সাবধানে ডাইরিটা এক পাশে লুকিয়ে বললাম,  "আঁতেল মানুষ,কি করব আর বল?পড়ছিলাম।"

 

"পড়তে এত ভাল্লাগলে এইটা পড়।"হাই তুলতে তুলতে আমার দিকে দলামোচা করা একটা কাগজ এগিয়ে দিল।তাতে কয়েকটা লাইন লেখা-

"যারা কাছে আছে,

তারা কাছে থাকে

তারা তো পারেনা জানিতে

তাহাদের চেয়ে তুমি কাছে আছো

আমার হৃদয় খানিতে।"

 

 

 

আমি বিস্মিত হয়ে বললাম," এটা তুই নিজে লিখেছিস?"

 

"হুম।যদিও আমার আগে নিমাই ভট্টাচার্যও একবার লিখেছিল।"

 

"হুম"

 

"হুম মানে!আমি এত সুন্দর একটা কবিতা লিখে দিলাম তোকে,আর তোর প্রতিক্রিয়া হল একটা শুকনা ম্যাড়ম্যাড়ে হুম!"

 

"তাহলে কি বলব?"

 

"কি বলব মানে!তুই কি কিছু বুঝস নাই!"

 

"বুঝছি তো!"

 

"কি বুঝছিস?"

 

"বুঝছি যে এই কবিতাটা ভুলক্রমে তোর আগে নিমাই ভট্টাচার্য লিখে ফেলছে।"

 

রাফি হতাশ চোখে আকাশের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করলো,"বুঝে নাই,মাইয়া কিচ্ছু বুঝে নাই।"

 

তারপর  হঠাৎ দুই হাতে আমার কাঁধ ধরে ঝাঁকুনি দিয়ে বলল,"খালি পড়ালেখা বুঝলেই হবে?তাকা আমার চোখের দিকে।

 

দেখ কিছু বুঝিস কিনা।"ওর চোখের দিকে তাকিয়ে অভিভূত হয়ে গেলাম!প্রকৃতি কি কোন রসিকতা করছে আমার সাথে!

 

অনেকটা সাপ লুডু খেলার মত,যেখানে আমাকে প্রথমে খুশি মনে মই বেয়ে ওপরে উঠতে দেয়া হবে,তারপর এক পর্যায়ে সাপের কামড়ে মইয়ের তলদেশে পতন!আমার কি হেলুসিনেশন হচ্ছে?

 

                              

                         রাফি প্রবল বেগে মাথা নাড়তে নাড়তে বলল,"আমি ভেবেছিলাম তুই একটু হলেও বুঝিস।কিন্তু তুই তো একটা ফার্মের মুরগী! আমি যে এত মেয়ের সাথে ঘুরে বেড়াই,তাদের কাউকে শেষ পর্যন্ত কেন ভাল লাগেনা আমার?কারণ তুই-ই তো আমার ফাইনাল প্রোজেক্ট......এখন বল মুরগী,তুই কি আমার তুমি হবি?"

 

ওর কথা শেষ না হতেই ভ্যা করে কেঁদে দিলাম আমি!রাফি হতভম্ব হয়ে বলল,"এই মেয়ে কাঁদে ক্যান!!এই মেয়ে,এই... আরে বাবা মাফ চাই।কি বিপদে পড়লাম!থাক থাক তোর কিছু বুঝা লাগবে না।ইভ টিজিং এর মামলা খাওয়াবি নাকি!"

 

আমার কান্নার বেগ বাড়তেই লাগলো।।রাফি আমাকে ফেলে সোজা উল্টো দিকে হাঁটা দিল এবার।পেছন থেকে গিয়ে ওর হাতটা ধরলাম আমি।অবাক হয়ে পেছন ফিরল ও।আমি বললাম,"একটা কবিতা শুনবে?"উত্তরের অপেক্ষা না করেই শিশুদের মত চেঁচিয়ে উঠলাম-

 

"তাকিয়ে দেখি তোমার দুটি বিশাল কালো চোখ

দিন দুপুরে চেঁচিয়ে উঠি-একটা কিছু হোক!"

 

গাধাটা চোখ বড় বড় করে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। ইশ!ছেলেটার চোখ জোড়া এত সুন্দর কেন?

 

 

 

Share