শেষ ইচ্ছা

লিখেছেন - আয়শা কাশফী | লেখাটি 1116 বার দেখা হয়েছে

 

এই মুহূর্তে আমি যেই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি সেটা হল মিরপুর ১ নম্বর বাস স্ট্যান্ড।

বাস,গাড়ী,রিকশার হর্ন মিলেমিশে কেমন যেন মিশ্র একটা শব্দ তৈরি হয়েছে। শব্দটা

শুনতে কেন জানি খারাপ লাগছে না।চারিদিকে মানুষ পিলপিল করছে।আমার ধারণা  

পুরো ঢাকা শহরে যত মানুষ থাকে তার অর্ধেকের বসবাস মিরপুর এলাকায়।বসন্তের

দখিন হাওয়া বলে একটা জিনিসের নাম পড়েছিলাম গল্পের বইতে।এখানে অনেকটা

সেরকম বাতাস বইছে। পুরো পরিবেশের সাথে কেমন যেন বেমানান বাতাসটা।ড্রাইভার আজিজ

 মিয়া একটা ডাব হাতে দৌড়ে আসছে।তার মুখ চোখ উত্তেজনায় ভরপুর।

"নেন আফা। খিচ্চা টান দেন একটা।কইলজা পর্যন্ত ঠাণ্ডা।"

 

আমি আপাতত কইলজা পর্যন্ত ঠাণ্ডা করার কোন আগ্রহ বোধ করছি না।

যেই কাজে এসেছি সেই কাজ দ্রুত করে চলে যেতে চাচ্ছি।আমার সাথে এসেছে ফাহাদ।সে

ব্যাপারটা বুঝেও না বোঝার ভান করছে।ফাহাদ খুব সম্ভবত আমার হবু স্বামী।দুইজনের

বাসাতেই পাকা কথাবার্তা হয়ে গেছে প্রায়।আমি মত দেয়া মাত্র যে কোন মুহূর্তে ফুল টাইম

পতিদেবতা হয়ে যাবে।আমি ইচ্ছে করেই ঝুলিয়ে রেখেছি।গাধা টাইপ ছেলেদের ঝুলিয়ে রাখা

 একটা অবশ্য কর্তব্যের মধ্যে পড়ে।আমার চোখে চোখ পড়া মাত্রই সে অতি ব্যাস্ত ভঙ্গীতে

এদিক সেদিক তাকাচ্ছে।

 

এখন সে আপেলের দাম নিয়ে দোকানদারের সাথে দামাদামি করছে।

সম্মানজনক দামাদামি না, একেবারে সস্তা পর্যায়ের দামাদামি। নমুনা দেয়ার লোভ সামলাতে পারছি না-

"আপেলের কেজি কত মামা?"

"সবার কাছে বেচি একশ দশ। আপনার জন্য একশ।"

"কি বলেন মামা? আমি কি জীবনে এই প্রথমবার আপেল কিনছি নাকি? আশি টাকা করে দেন।"

"নব্বুই টাকার এক পয়সা কম নাই।"

"আচ্ছা আপনার কথাও থাকুক,আমার কথাও। পঁচাশি টাকা।"

"কয়  কেজি দিমু?"

"তার আগে বলেন, আপেল মিষ্টি তো?দেখি কাটেন একটা, খেয়ে দেখি।"

এই পর্যায়ে সে আপেল বিক্রেতার পাশে বসে তার পিঠে হাত দিয়ে কচকচ করে আপেল.

খেতে লাগলো।

 

আমার মাঝে মাঝে বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়,এই ছেলেটির লন্ডন

ইউনিভার্সিটি থেকে একটি এমবিএ ডিগ্রি আছে।আমি নিশ্চিত,আপেল বিক্রেতার মত

একটা লুঙ্গি পরিয়ে দিলে সেও মালকোঁচা মেরে নির্বিকার ভঙ্গীতে আপেল বিক্রি করতে

বসে যাবে।গম্ভীর গলায় বলবে,

"এক দাম একশ দশ।ফিক্সড প্রাইস।ভ্যাট আলাদা।"

ফাহাদের আপেল কেনা শেষ হয়েছে।সে লজ্জিত ভঙ্গিতে এগিয়ে আসছে।তার ফর্সা মুখ

লাল হয়ে গেছে।গরমের কারণে নাকি লজ্জায় সেটা বুঝতে পারছি না।

 

আমাদের গাড়ী গলি ঘুপচি টাইপের কিছু রাস্তার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে।আমি কি ভয় পাচ্ছি?

কি আশ্চর্য,আমি তো আর চাকরির ইন্টারভিউ দিতে যাচ্ছি না।তাহলে এমন নার্ভাস লাগছে কেন?

কিছু বুঝে ওঠার আগেই একটা একতলা টিনশেড বাড়ীর সামনে গাড়ি থামল।আমি গাড়ী

থেকে নামলাম।অনেক গুলো কৌতূহলী চোখ আমার দিকে তাকিয়ে আছে।এক ভদ্রলোক

এগিয়ে এলেন।শান্ত গলায় বললেন,

"ভেতরে এস মা।"

আমি কেমন যেন মন্ত্রমুগ্ধের মত এগিয়ে যাচ্ছি।ভদ্রলোক আমাকে ভেতরের দিকের একটা

ঘরে নিয়ে এলেন।সব জানালার পর্দা টানা।পুরো ঘরে কেমন জানি একটা অশরীরী ছায়া আছে।

বিছানার সাথে একজন মানুষ লেপটে আছেন।তার পুরো শরীর কঙ্কালসার।মাথার চুল

 জায়গায় জায়গায় উঠে আছে।বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা যায়না।ভদ্রলোক এগিয়ে গিয়ে তার

কানের কাছে মুখ নিয়ে বললেন,"ও এসেছে।"

 

বিছানার সাথে লেপটে থাকা মানুষটা ধীরে ধীরে চোখ মেললেন।তার অস্বাভাবিক উজ্জ্বল

 চোখ দুটো দেখলে কেমন যেন বুক ধক করে ওঠে।তিনি ইশারায় আমাকে কাছে ডাকলেন।

আমি শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছি।আমার তার জন্য মায়া লাগছে না।অসুস্থ মানুষ দেখলে আমি

এমনিতেই বিরক্ত হই।আর সে কাছে ডাকলে হই শঙ্কিত।মনে হচ্ছে এই বুড়ীর কাছ থেকে

নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা দরকার।

"একটু কাছে আসবে পুতুল?"

 

 আমি কেঁপে উঠলাম।আমার নাম রাত্রি।পুতুল নামে আমাকে

পৃথিবীতে শুধু একজনই ডাকতেন।অবিকল এভাবেই ডাকতেন।আমার মা।তিন বছর

আগে মারা গেছেন।এই তিন বছরে আর কেউ আমাকে এই নামে ডাকেনি।আমার বাবাও না।

আমি এগিয়ে গেলাম।শক্ত মুখে বললাম,

"আমাকে পুতুল বলে ডাকবেন না।"

মহিলা হাত বাড়িয়ে আমার এক হাত ধরলেন।আমার জন্য এটাকে মোটামুটি ভয়ংকর

একটা ঘটনা বলা যায়।প্রায় কঙ্কাল কিছু একটা আমার হাত ধরে আছে।কি সর্বনাশ!

আমি শিউরে উঠলাম।মহিলার চোখ থেকে টপটপ করে পানি পরছে।

এতে বিচলিত হওয়ার অবশ্য কিছুই নেই।অসুস্থ মানুষ দেখতে যাওয়ার প্রধান অসুবিধা-

তারা যখন তখন কেঁদে কেটে নাটক বানিয়ে ফেলে।নাটক আমার অতি অপছন্দ।

"তুমি কি এখনও রাতে দুঃস্বপ্ন দেখো গো মা?"

"মানে?"

"খুব ছোটবেলায় দুঃস্বপ্ন দেখে কানতা খুব।রাতে ঘুমাইতে পারতা না।তখন সারারাত

তোমারে কোলে নিয়া বারান্দায় হাঁটা লাগতো।"

আমি কঠিন গলায় বললাম,"আমি কখনই দুঃস্বপ্ন দেখি না।"

"তুমি অনেক বিদ্বান হইছো আমি শুনছি।সামনে কি তোমার বিবাহ?"

"আমার বিবাহ হলেও বা আপনার কি?"

মহিলা আহত চোখে তাকিয়ে আছেন।মৃদু গলায় বললেন,

"তুমি আমারে ঘিন্না পাও তাইনা?"

"আমি আপনাকে কোন কিছুই পাইনা।বাবা জোর করে আপনাকে দেখতে পাঠিয়েছেন,আমি এসেছি।

আপনার জীবনের শেষ ইচ্ছা পূরণ করলাম।এবার আমি বিদায় হব।"

আমি উঠে দাঁড়ালাম।মহিলা বললেন,

"তুমি ছোটবেলায় খাট থেকে পইরা গেছিলা একবার।পিঠের অনেকখানি কাইটা গেছিল।

ওইখানে একটু হাত বুলাইয়া দিতে মন চাইতেছে গো মা।আমি গত আঠারো বছরে যেই

স্বপ্নটা সবচে বেশিবার দেখছি সেইটা হইল তুমি দৌড়াইয়া আইসা আমারে কইতেছো

ব্যাথা পাইছি,আদর কইরা দেও।"

আমি অন্যদিকে তাকিয়ে আছি,তার মুখ দেখতে পাচ্ছিনা। শুধু তার তীব্র ফোঁপানির শব্দ পাচ্ছি।

 

আমার কোন অনুভূতি হচ্ছেনা। না হওয়াটাই স্বাভাবিক। একুশ বছরের

একজন তরুণীকে যদি এক রাতে তার বাবা ডেকে বলেন যে তিনি তার বায়োলজিক্যাল ফাদার

নন তাহলে তার রিঅ্যাকশন কি হয় এটা বুঝতে পারছি না বলেই আমার হতভম্ব ভাব কাটছে না।।

যাকে এতদিন মামনি বলে ডেকেছি তিনিও নাকি আমাকে জন্ম দেননি।কি আশ্চর্য কথা!আমার

পরীক্ষার সময় যারা সারারাত আমার সাথে জেগে থাকতেন তারা আমাকে জন্ম দেননি।মাই মাদার

 রচনায় আমি যাকে নিয়ে লিখেছি-"মাই মাদার ইজ দা বেস্ট মাদার অফ দা ওয়ার্ল্ড।"

সে নাকি আসলে আমার মা না!আমার আসল জন্মদাতা এবং জন্মদাত্রী ৫ সন্তান নিয়ে

দারিদ্রের আঘাতে যখন জর্জরিত,তখন আমার নিঃসন্তান মা বাবা এগিয়ে আসেন।

তাদের দরকার ছিল একটি সন্তান,আর আমার জনক জননীর দরকার ছিল অর্থ।প্রচণ্ড

অর্থকষ্টের সেই ভয়ঙ্কর দিন থেকে উদ্ধার পেতে তারা ৩ বছর বয়সী একটি সন্তানকে

বিক্রি করে দিলেন।

 

হ্যাঁ,বিক্রিই তো!আমার ভাবতেও কেমন অবাক লাগছে!তিন বছর

 বয়সে আমাকে বিক্রি করে দিয়েছে!আর আজকে ক্যান্সার আক্রান্ত আমার সেই বায়োলজিক্যাল

 মা শেষ ইচ্ছে হিসেবে আমাকে দেখতে চেয়েছেন।কাল রাতেই নিজের জন্ম ইতিহাস শুনেছি আমি।

মাত্র এক রাতের ব্যাবধানে কি করে আমি তাকে আমার সেই মায়ের আসনে বসাই, যিনি জন্ম না দিয়েও

১৮ বছর আমাকে পরম মমতায় আগলে রেখেছেন!আমি তো আমার মৃত মায়ের স্মৃতি নিয়েই ভাল ছিলাম।

আরেকজন জীবিত মা তো আমি চাইনি কখনও!

 

আমি তার বিছানার পাশে দাঁড়ালাম।কঠিন গলায় বললাম,"শুনুন,আমি

আপনাকে ঘৃণা করি।আপনি যতটা ভাবছেন,তার চেয়ে অনেক অনেক বেশি ঘৃণা করি।

এজন্য না যে আপনি আমাকে বিক্রি করে দিয়েছেন।আমি আপনাকে এজন্য ঘৃণা করি

যে আপনি আমার মৃত মাকেও আমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছেন।আমার মনে এক

মুহূর্তের জন্য হলেও এই চিন্তা এসেছে যে তিনি আমার মা নন।আর এজন্য আমি কখনও

 ক্ষমা করব না আপনাকে।"

 

আমার জন্মদাত্রী হাত বাড়িয়ে আবার আমার হাত ধরলেন।হঠাৎ কেমন জানি

অসহায় লাগছে আমার।তীব্র পানির পিপাসা লাগছে।

এই প্রথম আমি খেয়াল করলাম তার বিছানার অন্য পাশে অনেকগুলো ঝুনঝুনি রাখা।

অনেক পুরনো,কয়েকটা ভাঙা।আমাকে তাকিয়ে তাক্তে দেখে নিজেই বললেন,

"ছোটবেলায় ঝুনঝুনি না বাজাইলে খাইতে চাইতা না তুমি।"

'এগুলো এখনো রেখে দিয়েছেন কেন?"

"জানিনা ক্যান রাখছি।মনে হয় তোমারে রাখতে পারি নাই এজন্য।"

আমার কেমন যেন খাঁ খাঁ লাগছে।কেমন যেন অদ্ভুত একটা অস্থিরতা।অভিমানে

আমার গলার কাছে কিছু একটা বারবার দলা পাকিয়ে উঠছে।কেন বিক্রি করে দিলে

তোমরা আমাকে?উনি কোমল গলায় বললেন,

"আমারে মাফ করনের দরকার নাই।খালি আমার জন্য কখনও কষ্ট পাইও না।আঠারো

বছর আমি একরাতের জন্যও শান্তিতে ঘুমাইতে পারি নাই।তুমি এখন যাও মা।আমি ঘুমাব একটু।"

"আমার পিঠে আদর করে দিতে চেয়েছিলেন।আদর করবেন না?"

তিনি অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন।আমি চুল সরিয়ে তার কাছে এগিয়ে গেলাম।

আমি আমার পিঠে কোন হাতের স্পর্শ পাচ্ছিনা।শুধু একটু পরপর মনে হচ্ছে টপটপ

করে কিছু পড়ছে সেখানে।আবার দখিন হাওয়া বইতে শুরু করেছে।আমার মনের সেই

দমবন্ধ করা ভাবটা ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে দূরে কোথাও।আমার একহাত তার হাতের

মুঠোর মধ্যে।আমার বহুদিন পর মনে হল,

মা যেন অনেকদিন পর আমার হাত ধরে কিছু বলতে চাইছে।মনে হচ্ছে আমার ঘাড়ের ওপাশে মা

নিঃশ্বাস ফেলছেন।মাথা ঘুরিয়ে তাকালেই দেখব তিনি হাসিমুখে তাকিয়ে আছেন।মানুষ দুজন তো

আলাদা,তাহলে আমার তাদেরকে এরকম এক রকম লাগছে কেন?

কেন জানিনা,আমার খুব ইচ্ছে হচ্ছে এই মহিলাকে একবার মা বলে ডাকতে.........

 

 

( মানুষ খুব অসহায় প্রাণী। বাধ্য হয়ে মাঝে মাঝে সবচে আরাধ্য সম্পর্কটিকেও হয়ত বিসর্জন দিতে হয়। কিন্তু অনুভূতিটা সব সময়েই অমলিন। মা আর সন্তানের সম্পর্কেরঅনুভূতি জন্মগত নাকি প্রকৃতিগত সেটা আমি জানিনা। তবে এতটুকু জানি,মায়ের ভালবাসা কখনও ভুল হয়না, মিথ্যেও হয়না। পৃথিবীর সব মায়ের জন্য বিনম্র শ্রদ্ধা, যাদের শত সহস্র ত্যাগের জন্যই আমরা এতদূর এসেছি )

 

Share