টুকুনের মা

লিখেছেন - আয়শা কাশফী | লেখাটি 837 বার দেখা হয়েছে

রাত দুটা বেজে আটচল্লিশ।খাবার টেবিলে গরম ধোয়া ওঠা ভাত, টমেটো দিয়ে পাবদা মাছ আর বেগুণ ভাজি। টুকুন খুব আগ্রহ নিয়ে খাচ্ছে।৩দিন পর বাসায় ফিরল ও। কি খেয়েছে এই ৩ দিনে, আদৌ খেয়েছে কিনা কে জানে। আমার রান্না ছাড়া কারো রান্নাই খেতে পারেনা ছেলেটা।বাবা মাঝে মাঝে রসিকতা করে আমাকে বলেন,"তোর বিয়ে হলে টুকুনকে যৌতুক হিসেবে শ্বশুর বাড়ী পাঠিয়ে দিতে হবে। না হলে না খেয়ে মারা যাবে তোর আদরের ভাই।"

 

মা যখন আমাদের দুই ভাইবোনকে আমার খামখেয়ালি বাবার হাতে ফেলে নিশ্চিন্ত মনে ওপারে যাত্রা করেছিলেন, আমার বয়স তখন এগারো,আর টুকুনের মাত্র তিন।আমার বাবা ছেলেমেয়ে মানুষ করা সহ সংসারধর্মে অসীম  পারদর্শী ছিলেন।তাইতো আমার স্কুল ইয়ুনিফরম আয়রন করতে গিয়ে কখনো পুড়ে ফেলতেন,আবার কখনো  টুকুনকে দুধ খাওয়াতে গিয়ে ওর বাঁদরামির কাছে হার মেনে পুরো ঘরকে পলাশীর যুদ্ধক্ষেত্র বানিয়ে ফেলতেন।

                              

তাই ওই একরত্তি বয়সেই বাংলা,সমাজ ,বিজ্ঞান ছাড়াও আর যেসব বিষয়ে আমাকে পাঠ নিতে হয়েছে সেগুলো হল রান্না করা, কাপড় ধোয়া,ঘর গোছানো এবং নাম না জানা আরও অনেক কাজ।কিন্তু সব কাজের মধ্যে সবচে কঠিন এবং হয়তোবা সবচে অসম্ভব যে কাজটা ছিল, সেটা হল তিন বছরের টুকুনকে সামলানো।আমার বয়স এবং অভিজ্ঞতা দুটাই সমপরিমাণে কম ছিল এই অতি গুরুত্তপূর্ণ চাকরীর জন্য। কিন্তু বিধাতা হয়ত মেয়েদের এক অদ্ভুত ক্ষমতা দিয়ে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন।একটা মেয়ে জন্ম নেয় কারো কন্যা  হিসেবে, কিন্তু যখন দরকার হয়,তার চিরাচরিত মাতৃত্ব জেগে ওঠে ।সেটা যে বয়সই হোকনা কেন।আমার আর  তাই টুকুনের বোন হওয়ার সুযোগ হলনা।আমার ভাইয়ের মা হিসেবেই ডিরেক্ট পদোন্নতি হল আমার।সেই থেকে যে শুরু,আজ অব্দি সিন্দাবাদের ভূতের মত চেপে আছে আমার ঘাড়ে।আমার রান্না ছাড়া খায়না,আমি চুল আঁচড়ে না দিলে চিরুনি ছুঁয়েও দেখেনা,এমনকি আমি যদি খেতে না ডাকি, খেতেও আসেনা সে। বড্ড অভিমানি হয়েছে।

 

"আপা কতক্ষণ ধরে একটা কাঁচামরিচ চাচ্ছি,তুমি কি কানা হয়ে গেলে নাকি?"- টুকুনের ডাকে চিন্তায় ছেদ পড়ল ।কাঁচামরিচ এনে নিঃশব্দে ওর সামনে রাখলাম।টুকুন খুব ধীরে ধীরে বলল,

"এই তিনদিন কোথায় ছিলাম জানতে চাইলে না আপা?"

"অপরাধীদের পালিয়ে থাকার জায়গার অভাব হয়না। তোরও যে হয়নি সেটা বুঝতে পেরেছিলাম" -খুব শান্ত গলায় উত্তর দিলাম আমি।

"আমি ভেবেছিলাম এত রাত পর্যন্ত আমার জন্য জেগে ছিলে।"

"তোর কারণেই জেগে ছিলাম।একটু আগেও পুলিশ এসে ঝামেলা করে গিয়েছে।তাই আর ঘুম আসছিলো না।" টুকুন একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল,"আপা,আমাকে হাজার পাঁচেক টাকা দিতে পারবে?হাত একদম খালি। তিনদিন ধরে পালিয়ে বেড়াচ্ছি ।টাকা পয়সা সব শেষ"।

                                                            

 টুকুন কখনই বাবার কাছে টাকা চায়না,কিছু আবদারও করেনা।তার ন্যায়-অন্যায় সব আবদার, কুকীর্তির স্বীকারোক্তি অথবা অঙ্ক স্যার এর বকা শুনে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না,সবই আমার কাছে।কতবার টিফিনের পয়সা জমিয়ে ওর পছন্দের হাওয়াই মিঠাই কিনে এনেছি,আবার ঈদ এর সালামির টাকা দিয়ে

ওর ভিডিও গেমস কিনে দিয়েছি।কত গরমের রাত নিজে না ঘুমিয়ে ওকে পাখার বাতাস করেছি।আমার বুক দিয়ে যাকে আগলে রেখেছি, সেই ভাই এখন পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে পথে প্রান্তরে ঘুরছে।টপটপ করে পানি পড়ছে আমার চোখ থেকে।কি করে পারল টুকুন?আমার ছোট্ট টুকুন,যে কিনা দেয়ালে টিকটিকি দেখলে ভয়ে দৌড়ে আসতো আমার কাছে,সেই নিষ্পাপ টুকুন কিভাবে পারল?সেই কত বছর আগে সদ্য দাঁড়ি গোঁফ কামাতে শুরু করা টুকুন

লাজুক মুখে আমাকে জানিয়েছিল মিলির প্রতি ওর দুর্বলতার কথা।বড্ড মিষ্টি মেয়ে মিলি।লতায় পাতায় আমাদের আত্মীয়। কত দিন বাসায় এসেছে।ওকে ওর পছন্দের চকলেট পুডিং বানিয়ে খাইয়েছি।কিছুদিন আগে বিয়ে ঠিক হয়েছিল ওর। ওরই পছন্দের অন্য এক ছেলের সাথে।টুকুনকে কখনই বন্ধুর চেয়ে বেশি ভাবতে পারেনি।

 

মিলির বিয়ে ঠিক হওয়ার পর থেকেই টুকুন বদলে যেতে লাগলো।একটার পর একটা সিগারেট খেত সারাদিন,চোখের নীচে কালি জমা হয়ে অদ্ভুত অবস্থা।

বিড়বিড় করে কি যেন বলত আপনমনে। কত বুঝিয়েছি,ভালবাসা জোর করে পাওয়ার জিনিস না।কিন্তু কি যেন একটা ঘোরের মধ্যে হারিয়ে যেতে লাগলো আমার ভাই।না,মিলির প্রতি কোন অভিযোগ নেই আমার। নিজেও তো একটা মেয়ে আমি।বুঝি ভাল করেই, চাইলেই তো আর ঝুপ করে কারো প্রেমে পড়ে যাওয়া যায়না। তবু কেন যে ছেলেরা এই সহজাত ব্যাপার গুলোকে জোর খাটিয়ে আদায় করতে চায়!মানুষের নিজেরই তার মনকে  নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা নেই,সেখানে অন্য একজন কি করে তার মনের অনুভূতি গুলোকে জোর খাটিয়ে বদলে ফেলবে?

                                                            

 আমার ভাইও জোর খাটাল,রাস্তায় মিলির রিক্সা থামানো থেকে শুরু করে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার হুমকি-বাদ যায়নি কিছুই।কিন্তু অসম্ভব সাহসী মেয়েটাকে হার মানানো যায়নি।মিলির বিয়ের ২দিন আগে হঠাৎ করে আবার স্বাভাবিক হয়ে গেল টুকুন।কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে কলেজেও গেল।সন্ধ্যা পার হয়ে রাত গভীর হল, টুকুন ফিরল না।

 

রাত ১১ টার দিকে যখন পুলিশ আসলো টুকুনের খোঁজে,আমি তখনো পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারিনি।ছোটবেলায় ভাত রান্না করতে গিয়ে হাত পুড়িয়ে ফেলেছিলাম একবার।আধো আধো বুলি ফোটা টুকুন চিৎকার দিয়ে কাঁদছিল,

"আমার আপার হাত ভাল করে দাও আল্লাহ।আমার হাত নিয়ে যাও"।

সেই টুকুন কি করে পারলো আরেকটা মেয়ের মুখ পুড়িয়ে দিতে?টুকুনরে,মিলির মিষ্টি মুখটা কি করে এসিড দিয়ে  পুড়িয়ে দিলি?তুই না ওকে ভালবাসতি?আসলে কি পেরেছিলি কোনদিন ভালবাসতে?নাকি শুধুই পেতে চেয়েছিলি?

                                                            

আহ!এই পোড়া চোখ আজকে এত পোড়াচ্ছে কেন?

দুঃখটাকে চেপে রাখতে পারি,কিন্তু চোখের পানি যে বড্ড অবাধ্য।ওই যে দেয়ালে ঝুলানো টুকুনের প্রথম স্কুল এ  যাওয়ার ছবি।আমার ওড়নার একটা প্রান্ত ধরে টুকুন সেদিন অবিরাম কাঁদছিল।কিছুতেই আমাকে ছাড়বে না। টুকুন সোফার উপরেই ঘুমিয়ে পড়েছে ক্লান্ত হয়ে।মাথাটা আবার একটু হেলে পড়ে গেছে।আমি একটা বালিশ এনে ওর মাথার নীচে দিলাম।কি নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে!বুকের ভেতর যে তোলপাড় হচ্ছে আমার, সেটাই কি সব মায়ের হয়?সব মা-ই কি সন্তানের বিচ্ছেদের কথা ভেবে এমন আকুল হন?আমি আলতো করে টুকুনের কপালে একটু আদর করে দিলাম।কাঁপা কাঁপা হাতে টেলিফোন সেটটা হাতে নিলাম।কিন্তু কত সুখের দুঃখের স্মৃতি আজকে মনকে ক্ষণে ক্ষণে দুর্বল করে দিচ্ছে!

                              

নাহ, পারব না আমি।নিজের এত আদরের ভাইয়ের সাথে  এমন কি করে করব?কিন্তু সাথে সাথেই মিলির মিষ্টি মুখটা ভেসে উঠল মনের ভেতর।হাসপাতাল থেকে ফেরার পর  কেমন দেখতে হবে ও?একটা পোড়া মাংসপিণ্ডের মত?ওর শরীরের দগদগে ঘা শুকিয়ে যাবে হয়ত,কিন্তু  মনেরটা কি শুকাবে কোনোদিন?নাকি সম্ভব সেটা?শিউরে উঠলাম আমি।এবার কোন দ্বিধা ছাড়াই থানার নাম্বার ডায়াল করলাম।কিছুক্ষণের মধ্যেই পুলিশ এসে পড়বে।নিজের রুমে এসে বারান্দায় দাঁড়ালাম আমি।চোখের পানিকে আর বাধা দেবনা।আজ আমার চোখের জলে সব দুঃখ মুছে যাক।আমার দুঃখ,মিলির দুঃখ।পুরুষের

 জেদ আর লালসার কারণে যেসব মেয়ের জীবন এলোমেলো হয়ে যায় তাদের দুঃখ।

                              

 মা মানে শুধু সন্তানকে মমতায় আগলে রাখা না,তার বিপদে শুধুই তাকে রক্ষা করা না।মা এমন একটা শব্দ, যেখানে একই সাথে অনেক খানি মমতা,আর পাহাড়সম দৃঢ়তা। সত্যিকারের মা-ই পারেন মমতাকে পাশে ঠেলে সন্তানের অপরাধে তাকে শাস্তি দিতে। হ্যাঁ টুকুন,তোকে আমি জন্ম দেইনি.....কিন্তু বিশ্বাস কর,আজকেই আমি তোর সত্যিকার মা হয়েছি........

 

 

 

(এবার কুরবানির ঈদ আমি আর আমার বড় ভাইয়া একসাথে করতে পারিনি।ভাইয়া আমাকে লঞ্চে উঠিয়ে দিয়ে আসার পর একটু পরপর কান্না পাচ্ছিলো।খুব মন খারাপ করে লঞ্চে বসেই লিখেছিলাম লেখাটা।এই লেখাটা তাদের জন্য যারা তাদের ভাইটিকে অসম্ভব ভালবাসেন।ভালবাসা খুব অন্ধ হয়।প্রিয় মানুষগুলোর ক্ষেত্রে ন্যায় অন্যায়ের বোধটা লোপ পায় অনেকসময়।আমি জানিনা গল্পের মেয়েটির জায়গায় আমি থাকলে এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারতাম কিনা।কিন্তু মনেপ্রাণে প্রার্থনা করি, পৃথিবীর কোন ভাই কিংবা কোন বোন যেন এমন পাশবিক কিছু কখনো না করেন যার কারণে তাদের ভাই অথবা বোনকে এমন সিদ্ধান্ত নিতে হয়।আমাদের ভালবাসা আর ভালবাসার মানুষগুলো হৃদয়ের কাছাকাছি থাকুক সব সময়। )

Share