সম্পর্ক

লিখেছেন - সাদ আহাম্মেদ | লেখাটি 1675 বার দেখা হয়েছে

আফসার কাল থেকে বেজায় অসুস্থ, একটু পরপর চোখ দিয়ে পানি পড়ছে।ঠান্ডা লেগে গলার অবস্থা এতোটাই খারাপ যে মুখ দিয়ে শব্দ করতে গেলেও চি চি আওয়াজ বের হয়।তার ছোট্ট চার বছরের মেয়ে নিতি একটু পরপর তার কাছে এসে ফিক করে হাসি দিচ্ছে।এর কারণ আফাসারের সারা মুখ ও নাক এমনই লালটু হয়ে আছে তাকে সহজেই একজন সার্কাসের জোকার হিসেবে চালিয়ে দেওয়া যাবে।সকাল ১১ টা বাজতে চলেছে এবং এখনো নাস্তা খাওয়া হয়নি তার।আর সহ্য করতে না পেরে আফসার গায়ে জামা দিয়ে নিচে গেলো দুটো পরোটা আর খাসীর পায়া কিনতে।সমস্যা হলো যখন নিতি মুখ গম্ভীর করে বললো, “আমিও যাবো”।

আফসার হাসিমুখে মেয়ের প্রস্তাব গ্রহণ করে বললো, “চল বেটি আজকে তোকেও খাসির পা খাওয়াবো”।

 

আফসারের বাসার নিচে বিখ্যাত মায়ের দোয়া হোটেল অবস্থিত যার মালিক খবির উদ্দিন।আজকে যখন আফসার খবির উদ্দিনের দোকানে গেলো তখন খবির উদ্দিন ঘোৎ ঘোৎ করছে।কারণ একটু আগেই তার হোটেলের এক বয় দুটো গ্লাস একসাথে ভেঙ্গে ফেলেছে।ভেঙ্গে ফেলেই তার কাজ শেষ হয়নাই, খবির উদ্দিনের কাছে এসে বলেছে, “ওস্তাদ গেলাসগুলা কুফা ছিলো।যেইসব কাস্টোমাররে এই গেলাসে পানি দিছি ওগো হোগগলে টিপস না দিয়া ভাইগ্যা গেছে”।

খবির উদ্দিন চুপ করে বয়ের কথা শুনলেন এবং হাসিমুখে বললেন, “ঠিক আছে বাবা মন দিয়া কাজ কর”।

 

আফসার উদ্দিনের এত ভালো আচরণের কারণ আজকে শুক্রবার।সে জুম্মাবারে সবার সাথে মৃদু কন্ঠে, আদব লেহাজ রেখে কথা বলে।আফসার যখন খবির উদ্দিনের সামনে গেলো তখন খবির উদ্দিন তার পান খাওয়া দাত সব বাহির করে বলে, “মামণিরে নিয়া আসছেন এইজন্য অন্তর থেকে শুকরিয়া জানাই।মামণির লেইগ্যা হোটেল ফ্রি।আর আপনে আইজকা বাকির কথা মাথায় আইন্যা শরম দিয়েন না”।

আফসার মৃদু হেসে বললো, “না আজকে আপনার আগের মাসের সব বিল দিয়ে দেবো।এখন আমার মেয়ের জন্য চমচম আর আমার জন্য পরোটা, খাসীর পায়া রেডি করেন”।

 

খবির উদ্দিনের হোটেল থেকে খাওয়া দাওয়া শেষ করে যখন আফসার বাসায় যাচ্ছিলো তখন পথে মাইশার সাথে দেখা।মাইশা আফসার যে বাসায় ভাড়া থাকে সে বাসার বাড়িওয়ালার মেয়ে।ভদ্রলোক এই মেয়েটাকে খুব ভয় পায়।কারণ মেয়েটা তাকে দেখলেই এমন একটা বিরক্তি ভাব নিয়ে কথা বলে আফসার লজ্জায় মরে যায়।এবং মেয়ের মুখেরও কোন ব্যালেন্স নাই।উইদআউট ব্রেক, সে এমন এমন সব ভয়ংকর অপমানজনক কথা বলে আফসারকে, আফসারের মনে হয়, হে খোদা কেন এই সুন্দর দুনিয়াতে পাঠালে?

আজকে মাইশা বেশ সাজুগুজু করেছে এবং আফসারকে দেখে অমন বিরক্তি ভাবও প্রকাশ করলোনা।বরং হাসিমুখে বললো, “আফসার ভাই আজকে আমার ডেট আছে বুঝলেন, কিন্তু সমস্যা হলো পকেটে টাকা নাই।খুবই লজ্জার মধ্যে আছি।দেখা গেলো, যার সাথে ডেট করতে গেলাম তার অর্থনৈতিক সমস্যা আছে।তখন তো আমি বিপদে পড়ে যাবো।আর আপনি তো জানেন আজকালকার ছেলেরা বেশিরভাগ আপনার মত বদলোক।পয়সাকড়ি পকেটে রাখেনা তাই না?”

 

মাইশার অপমান আফসার গায়ে মাখলোনা।মাত্র ইউনিতে থার্ড ইয়ারে পড়ে এই মেয়ে, এর কথা যদি গায়ে মাখে তাহলে তো সমস্যা।সে শুধুই গোবেচারা গাভীর মত হাম্বাহীন মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো।

মাইশা বললো, “ইয়ে মানে কাল তো দু তারিখ ছিলো।আপনি তো বেতন পেয়েই গেছেন, তাই ভাবছিলাম আপনার থেকে কিছু টাকা নিয়ে যাই।প্রতিবার ভাড়া দেয়ার সময়তো দুই একটাকা কমই দেন, সেগুলো জড়ো করলে পাচ-ছশো টাকা তো হবেই।ওইটাই নাহয় দেন।আল্লাহর কাছে আমি আর আমার ডেট পার্টনার দুহাত তুলে প্রার্থনা করবো”।

আফসার আমতা আমতা কন্ঠে বললো, “আমি তো সবসময় এক তারিখের মধ্যে ভাড়া পরিশোধ করে দেই, আর কখনো একটা টাকাও কম দেইনা আর কি”।

মাইশা ক্রুর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো, “ফকিন্নীর মত আচরণ করবেন না।সামান্য কিছু টাকা চেয়েছি।নাহয় ধার দিন।আছে তো”?

আফসার ভদ্রলোকের মত পকেট থেকে একহাজার টাকার একটা নোট বের করে মাইশার হাতে দিয়ে দিলো।এই মাসে তার হয়তো এজন্য ধূমপান অর্ধেক করে ফেলতে হবে।কিন্তু কিছু করার নাই।এই মেয়ের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য সে ধূমপান বন্ধ করে দিতেও রাজি আছে।

 

দুপুরে খাওয়ার আগ দিয়ে মাইশা আফসারের দরজায় ধাক্কা দিলো।আফসার মাইশাকে দেখে হতভম্ব।তোতলিয়ে জিজ্ঞেস করলো, “তুমি যাওনাই প্রেম করতে?”

মাইশা তড়িঘড়ি করে ঘরে ঢুকে বললো, “বদলোক আমি প্রেম করতে না ডেট করতে যাবার কথা বলেছিলাম।দুটা ডিফারেন্ট আছে।আর হঠাৎ করে কেন যেন মনে হচ্ছিলো আজকে আপনার বদমেয়েকে নিয়ে কোথাও যাওয়া দরকার।ওর চেহারা তো আপনি ফ্যাকাশে বানায় দিছেন ঘরে রাখতে রাখতে।নিতির দিকে তাকিয়ে মাইশা চোখ নাচিয়ে বললো, কিরে বেটি যাবি নাকি?”

নিতি দুহাত বাড়িয়ে মাইশার কোলে উঠে বললো, “মামনি কোথায় যাবা?”

নিতি মাইশাকে মামণি ডাকে, কেন ডাকে তা আফসার বুঝেনা।যখন বিপাশা আফসার ও তার মেয়েকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলো, তখন মাইশার এইচ.এস.সি পরীক্ষা চলছে।মাইশা সব পড়াশোনা বাদ দিয়ে নিতিকে নিজের মেয়ের মত মানুষ করেছে।এখনও করছে। আফসার যখন অফিসে চলে যায় তখন মাইশা ও তার মা যখন যে বাসায় থাকে তার কাছে নিতিকে দিয়ে আফসার নিশ্চিন্তে অফিস করে।

 

মাইশা আফসারের হাতে হাজার টাকার নোটটা ধরিয়ে দিয়ে বললো, “আপনি ফকির গোছের মানুষ।আমি আমার হাতে এই টাকা নিয়ে তাই নষ্ট করলাম না।কিন্তু আজকে আমাকে আর নিতিকে নিয়ে যখন বাহিরে ঘুরতে যাবেন তখন অবশ্যি এই পুরা টাকাটা খরচ করবেন।আমি তিনদিন ধরে প্ল্যান করে আসছি, আজকে কোথায় কোথায় যাবো, কোথায় কোথায় খাবো”।

আফসার মাইশার কথা কিছুই বুঝলোনা।তার না আজকে ডেট করতে যাওয়ার প্ল্যান ছিলো।তাহলে এইসব ঘুরাঘুরির কথা চিন্তা কেন করবে তিন দিন ধরে?তবে অবশ্যই সে বোকার মত মাইশাকে একথা জিজ্ঞেস করলোনা।শুধু আমতা আমতা করে বললো, “আমার কি যেতেই হবে?”

মাইশা বললো, “হ্যা যেতে হবে।আমরা দুই তরুণী তো একা একা কোথাও যেতে পারবোনা।আমাদের প্রটেক্ট করবে কে?”

নিতির দিকে তাকিয়ে মাইশা বললো, “কথা ঠিক আছেনা বেটি?”

নিতি কিছু না বুঝেই মাথা নাড়ায়।

 

বিকাল চারটার দিকে তিনজনের দলটি ধানমন্ডি রবীন্দ্র সরোবরে পৌছালো, আজকে এখানে একটা ছোট্ট অনুষ্ঠান আছে মাইশার কিছু বন্ধুর।তার বন্ধুরা আজকে সন্ধ্যাবেলা মোম জ্বালিয়ে রবি ঠাকুরের প্রেমের গান গাইবে।সিড়ির উপর বসে মাইশা ও আফসার অনুষ্ঠানের আয়োজন দেখতে লাগলো।নিতি একটু সামনে মাইশার বন্ধুদের কোলে কোলে ঘুরছে।আফসারকে চমকে দিয়ে মাইশা হঠাৎ করে জিজ্ঞেস করলো, “বিপাশা ভাবীকে এখনো মিস করেন?”

 

আফসার কিছু বলেনা।চুপ করে থাকে।এমন ভাব করলো যেন সে কিছু শুনেনি।তার মনে পড়ে বিপাশাকে সে যেদিন বিয়ে করলো তার সমস্ত আত্না জুড়ে একটা ভয়ংকর আলোড়ন চলছিলো।ভার্সিটি লাইফে এই মেয়েটাকে সে পাগলের মত ভালোবাসতো।আরেকজন এই মেয়েটাকেই ভালোবাসতো।তাদের আরেক ক্লাসমেট ফজলু।ফজলুকে বিপাশা সংক্ষেপে বলতো জুলু।জুলু সাহেবকে বিপাশা তার সমস্ত কিছু দিয়ে ভালবাসলো।সমস্যা হলো যখন ফজলুর বাসা থেকে বিপাশাকে মেনে নেয়নি।ফজলু যেদিন এই কথা জানায়, সাথে সাথে বিপাশা আফসারের কাছে এসে বলে, “অনেক ভালোবাসাবাসি করছো, এইবার চলো মোরা বিয়ে করি”।

আফসার হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলো।এই মেয়েকে সে কখনো জানায়নি, এবং অন্য কাউকেও কখনো বলেনি যে বিপাশাকে সে পাগলের মত ভালোবাসে।মেয়েটা কি করে বুঝলো সে জানেনা।তারা সেদিনই বিয়ে করলো।আফসারের তখন নতুন একটা ছোটখাটো কোম্পানীতে চাকরী হয়েছে।কোনরকমে টেনেটুনে তারা একবছর পার করলো।ভালোবাসাহীন এক বছর।সেই এক বছরে বিপাশা প্রতিদিন কেদেছিলো ফজলুর কথা ভেবে।ফজলু মাঝে মাঝে আফসারের বাসায় আসতো।যখন আফসার বাসায় থাকতোনা ঠিক তখনই আসতো।আফসারের সাথে যদি কোনভাবে ফজলুর দেখা হয়ে যেতো ফজলু তখন হাসিমুখে বলতো, “দোস্ত ভাবীর সাথে প্রেম করতে আসছি”।

 

আফসার হাসিমুখে বলতো, “এখন বাসা থেকে বের হ।আমি এখন তোর ভাবীর সাথে প্রেম করবো”।

একদিন আফসার যখন বাসায় আসে, তখন ফজলু গম্ভীর হয়ে আফসারের দিকে তাকিয়ে বললো, “দোস্ত এমন একজনের সাথে কেন জীবন পার করছিস যে তোকে ভালোবাসেনা, আরেকজনকে ভালোবাসে?”

বিপাশার হাতে তখন একটা ট্রাভেল ব্যাগ গুছানো।ফজলুর দিকে তাকিয়ে বললো, “তুমি একটু নিচে যাও আমি আসছি”।

বিপাশা কান্নাভেজা কন্ঠে তাকে বলেছিলো, “আমার মেয়েটাকে আমি রেখে যাচ্ছি তোমার কাছে।অনুগ্রহপূর্বক তুমি ওকে কখনো কষ্ট দিয়োনা”।

আফসার শান্ত কন্ঠে বলে, “তোমার মেয়ের জন্য তোমার কষ্ট হবেনা?সাধারণ কুকুর বিড়ালেরও বোধ করি তাদের সন্তানের জন্য প্রয়োজনীয় ভালোবাসা আছে”।

এতোটা কঠিন কথা আফসারের মুখে শুনে বিপাশা একটু ঘাবড়ে গেলো।আফসার নিজেই আবার বললো, “রাগ করোনা বিপাশা।তুমি যার জন্য এতকিছু ছেড়ে চলে যাচ্ছো, একবার ভেবে দেখো কতটা সুখী হতে পারবে?”

 

বিপাশার চোখে তখন ফজলু আর তার ভালোবাসা, আফসারের কথা কিছুই তার মাথায় আসেনি।সে চলে গিয়েছিলো, হারিয়ে গিয়েছিলো এবং আফসারের তাতে সেদিনের পর কখনো কোন দুঃখবোধ হয়নি।

অনেকদিন পর ফজলু আফসারকে ফোন দিয়েছিলো। তাকে ফোন করে বললো, “দোস্ত সুখী হতে পারিনাই”।

আফসার হাসতে হাসতে বলেছিলো, “ভাবী টাইপ কাউকে ভাগায় নিয়ে কোন নির্লজ্জ সুখী হইছিলো বলে শুনিনাই”।

ফজলু ফোন রেখে দিয়েছিলো।তারও অনেকদিন পর বিপাশা তাকে একটি চিঠি লিখে।চিঠিতে লিখা ছিলোঃ

“আফসার আমি যে অপরাধ করেছি তা ক্ষমার অযোগ্য এটা আমি জানি।তুমি আমাকে যে ভালোবাসা দিয়েছিলে আমি তা আজকে বুঝতে পারি।একটাই অনুরোধ করবো, নিতিকে তুমি কখনো বলোনা আমার কথা।কোনদিন না”।

 

চিঠিটা পাওয়ার পর আফসার ফুপিয়ে ফুপিয়ে কেদেছিলো।বিপাশার জন্য না, তার মেয়ের জন্য।আফসারের বাবা মা নেই অনেক আগে থেকে।এই একটা মেয়ে তার জীবনের সবকিছু, তার একটাই কষ্ট সে মেয়েটাকে মায়ের ভালোবাসা দিতে পারেনাই।

মাইশা আফসারের কাধে ধাক্কা দিয়ে বলে, “আফসার ভাই কোথায় হারিয়ে গেছেন?বলেন না, ভাবীকে মিস করেন এখনো?”

আফসার কিছু বলেনা আবারও।মাইশা জিজ্ঞেস করে আবার, “ভাবীকে আপনি কি ভালোবাসছেন কখনো?ভালোবাসলে এমন হলো কেন?ভাবী প্রতিদিন আমার সাথে এসে গল্প করতো।কখনো মনে হয়নাই সে অনেক সুখী।আপনি তাকে অনেক ভালোবাসেন নাই কেন?”

 

আফসার মাইশার দিকে তাকিয়ে বলে, “মেয়ে একটা ঘটনা বলি।বিপাশা যেদিন আমার কাছে বিয়ের কথা বলতে আসে, তখন নিতির বয়স এক মাস তার মায়ের পেটে।এই ব্যাপারটা সে আমাকে হাসতে হাসতে বলে।আমি হাসতে হাসতে বলেছিলাম কি জানো?আমি বলেছিলাম, কোন সমস্যা নাই, আমার ছেলেমেয়ের অনেক শখ।মাইশা তুমি কি তোমার উত্তর পেয়েছো?”

মাইশা কিছু না বলে আফসারের দিকে একটা অদ্ভুত দৃষ্টি দিলো, তার পর নিতির কাছে দৌড়ে গেলো।কারণ নিতি তখন পেট চেপে ম্যা ম্যা করছে। এটা তার বাথরুম ধরেছে বুঝানোর সংকেত।

রাত দশটার দিকে যখন বাসায় ফিরলাম, হঠাৎ করে দেখি নিতির গায়ে প্রচন্ড জ্বর।আফসারের মাথা ঠিক থাকেনা যখন মেয়ের কোন সমস্যা হয়। সারারাত সে মেয়ের পাশে বসে রইলো।মেয়ে কোন কথা বলেনা, কিছু খায়না।সকালবেলা সে ঠিক করলো অফিসে যাবেনা।তার কলিগ মাসুম ভাইকে ফোন করে বললো, ভাইজান আমি দুদিনের ছুটি নিতে যাচ্ছি।মেয়েটার শরীর খুব খারাপ।

মাসুম সাহেব চিন্তাযুক্ত কন্ঠে বললেন, “কোন সমস্যা নাই।দুদিন না চারদিন ছুটি নেন।বসরে আমি টাইট দিয়্যা রাখবো”।

মাইশা আজকে বাসায় নেই।নাহলে হয়তো আফসার ওকে ডেকে আনতো নিতির জন্য।ভরদুপুরে যখন আফসার ভাবছিলো মেয়েকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাবে তখন হঠাৎ নিতি চিৎকার করে কাদলো, “আব্বু আব্বু”।

 

আফসার মেয়েকে বুকে জড়িয়ে কাদতে কাদতে বললো, “মা কি হইছে তোর?মা চল ডাক্তারের কাছে যাই”।

আফসার অর্ধপাগলের মত রাস্তায় বের হলো মেয়েকে নিয়ে।মেয়ে কাল রাত থেকে কিছু খায়না।সকাল থেকে ১০২ জ্বর।তার মাথা তো ঠিক থাকারও কথা নয়।রাস্তায় একটা সি.এন.জিকে জোর করে আটকিয়ে শিশু হাসপাতালের দিকে রওনা দিলো।তার সমস্ত শরীর দিয়ে তখন দরদর করে ঘাম বের হচ্ছে।আফসার দরিদ্র মানুষ, তার সামর্থ্য নাই মেয়েকে নিয়ে বড় হাসপাতালে যাওয়ার।এই দুঃখে তার বুক ফেটে কান্না আসতে চায়।সে বারবার মেয়ের মুখ তার বুকে চেপে বলে, “মামণি তোর কিচ্ছু হবেনা।আব্বু আছেনা?আব্বু আছেনা?”

 

মেয়েকে হাসপাতালে ভর্তি করাতে করাতে সন্ধ্যা হয়ে গেলো।তাও হতোনা যদিনা হাসপাতালে তার ভার্সিটির বন্ধু মিশুর বউ মিমি ডাক্তার না হতো।মিমি আফসারকে খুব কঠিন কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো, “মেয়ের তো মনে হয় ফুড পয়জনিং হয়েছে।একটু খেয়াল রাখতে পারেন না কি খাওয়াচ্ছেন না খাওয়াচ্ছেন”।

আফসার বললো, “ভাবী কাল রাতে চাইনীজ খেতে গিয়েছিলাম।মনে হয় সেখান থেকে কিছু হয়েছে”।

মিমি কপালে হাত দিয়ে বললো, “আপনার মত দুষ্টু লোকদেরই আল্লাহ বাচ্চা কাচ্চা দিলো।আমি আর আপনার ফাজিল বন্ধু অনেক চেষ্টা করেও এখনো আল্লাহর সদয় দৃষ্টি পেলাম না।এটাই আফসোস।শুনেন মেয়ে ঠিক হয়ে গেলে আমি আর আপনার কাছে দিবোনা।বিপাশা নাই, কিভাবে না জানি আপনি ওকে মানুষ করছেন।আমি ওকে রেখে দিবো ওকে?”

আফসার মিমির হাত ধরে বলে, “ভাবী মেয়েটা ছাড়া আমার কেউ নাই।একটু ঠিক করে দেন”।

মিমি চোখ মুছতে মুছতে বলে, “মেয়েটা আমারও।আর আল্লাহর কাছে যেয়ে বলেন, আমার কাছে কিছু বলবেন না।আমি কেউ না ঠিক করার”।

 

রাত আটটার দিকে আফসার হাসপাতালের বারান্দায় দাঁড়িয়ে একটু সিগারেট ধরানোর চেষ্টা করলো।এইসময় মাইশা দৌড়ায় দৌড়ায় হাসপাতালে আসলো।এসেই কাউকে কিছু না বলে আফসারকে জিজ্ঞেস করলো, “আমার মেয়ে কই?”

আফসার হাত দিয়ে নিতির ওয়ার্ড দেখিয়ে দিলে মাইশা কোন কথা না বলে দৌড় দিয়ে নিতির কাছে গেলো।আফসারও পেছন পেছন গেলো।সিগারেট আর পান করা হলোনা।নিতি তখন ঘুমাচ্ছে।মাইশা কিছুই কেয়ার করলোনা, সে নিতিকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললো, “মা তোর কি হইছে?আমার সাথে কথা বল”।

আমি মাইশাকে বলি, “ও ঘুমাচ্ছে।কিভাবে কথা বলবে?”

মাইশা কটমট চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বললো, “আপনি এতো খারাপ কেন?কাল থেকে এই অবস্থা, একবারও জানাতে পারলেন না?”

 

আফসার কোন উত্তর খুজে পাচ্ছিলো না।একটু পর মাইশার বাবা মা এলে মাইশা একটু স্বাভাবিক হয়ে বারান্দায় যায়।আফসার ওর কাছে স্যরি বলতে ওর পিছু নেই।মাইশা আফসারের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ করে বলে, “আপনার কি মনে আছে আফসার ভাই, কোন একদিন গভীর রাতে আমি আপনার বাসায় গিয়ে আপনাকে প্রপোজ করেছিলাম?আপনাকে কাদতে কাদতে বলেছিলাম, আমাকে বিয়ে করুন”।

আফসার বিব্রত বোধ করলো, তার ব্যাপারটা মনে আছে।এটা আজ থেকে দু বছর আগের কথা।সে কখনো এমন কিছু চিন্তা করেনি আগে।সে সেদিন মাইশাকে বলেছিলো, “বাসায় যাও”।

 

মাইশা অসম্ভব কষ্ট পেয়েছিলো।একমাস বিছানায় জ্বর নিয়ে পড়ে ছিলো।এরপর যখন আফসারের সাথে দেখা হলো, সে আফসারকে বলেছিলো, “আপনাকে ভয় দেখিয়েছিলাম।আপনি এত ভীতু?”

মাইশা তার দিকে গাঢ় চোখে তাকিয়ে বললো, “আবার বলছি আপনি আমাকে বিয়ে করবেন?আপনাদের ছাড়া আমি বাচবোনা।আমার কিচ্ছু চাইনা আপনার কাছে।আমি আপনাকে কোন গালাগালি করবোনা।খোচাবোনা, বাজে বাজে কথা বলে যন্ত্রণা করবোনা।আপনি শুধু আমাকে বিয়ে করেন”।

আফসার বিশাল যন্ত্রণায় পড়লো।সে কিছু বললোনা।পাচ মিনিট ভ্যাবলার মত মাইশার দিকে তাকিয়ে থাকলো শুধু।মাইশা কিছু না শুনে চলে গেলো নিতির পাশে।নিতি একটু চোখ মেলে আব্বু আব্বু করে ডাকছিলো।আমি পাশে যেয়ে বসলাম।মাইশার বাবা জহির সাহেব তার স্ত্রীকে নিয়ে বাহিরে চলে গেলো।যাবার আগে জহির সাহেব আফসারকে বললেন, “বাবাজী একটু বাহিরে এসেন,আপনার সাথে কথা আছে”।

আফসার বুঝতে পারলো, তারা হয়তো তাদের মেয়ের এহেন আচরণ প্রত্যাশা করেনি।কিছু কঠিন কথা শোনার অপেক্ষায় রইলো আফসার।

 

নিতি মাইশার কোলে যেয়ে প্রায় ঘুমিয়ে পড়ছিলো।আফসারের আঙ্গুলগুলো ধরে সে বারবার নাড়াচ্ছিলো।ঘুম ঘুম কন্ঠে সে বলছিলো, “আব্বু বাসায় যাবো”।

মাইশা নিতিকে জড়ায় ধরে বলে, “তোকে আমার বাসায় রেখে দিবো বুঝলি।তোর আব্বু পচা”।

আফসার কিছু বলেনা চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে।মেয়ে ঘুমিয়ে গেলে, আফসার মেয়ের মাথায় চুমু দিয়ে বাহিরে আসে জহির সাহেবের সাথে কথা বলতে।জহির সাহেব তখন তার বউয়ের হাতে বানানো পান খাচ্ছেন।আফসারকে দেখে পানের পিক ফেলে বললেন, “বাবাজী আপনি কি ঠিক করেছেন এভাবেই জীবন চালাবেন?মেয়েটার আজ যে অবস্থা দেখলাম, আপনি বোকাসোকা মানুষ এই মেয়েকে একা একা মানুষ করবেন কি করে?”

 

আফসার মাথা নাড়ে।জহির সাহেব বলেন, “আমার মেয়েটা আপনার বাচ্চাকে ছাড়া কিছু বুঝেনা।সে আজকে বাসায় কি পাগলামী করছে এটা না দেখলে বুঝানো যাবেনা।শুধু মেয়ে না, মেয়ের মাও একই রকম পাগল আপনার মেয়েটার জন্য।আমি তাই অনেক চিন্তা করে ভাবছিলাম, আপনার আপত্তি না থাকলে আমি আমার মেয়ে আর আপনাকে নিয়ে ভালো কিছু ভাবি।কি বলেন?”

 

আফসার মূক হয়ে গেলো জহির সাহেবের কথা শুনে।সে মাইশাকেও কিছু বলতে পারেনি, তার বাবাকেও না।

 

তিন বছর পর কোন একদিন নিতিকে কোলে নিয়ে মাইশা আফসারের সামনে এসে বলে, “আমার বদ স্বামী, তুমি কি আজকের এই মহান শুক্রবারে আমাদের কোথাও ঘুরাতে নিয়ে যাবে?”

আফসার হাসিমুখে বললো, “হুমম।জায়গা ঠিক করো”।

মাইশা মিষ্টি হাসি দিয়ে বললো, “নাহ আজকে বাহিরে যাবোনা।আজ বাহিরে তুমুল বৃষ্টি হবে আমি দেখতে পাচ্ছি।আজ আমরা খিচুরী খাবো ডিমের ভর্তা দিয়ে।তারপর সন্ধ্যায় তুমি আমার আর আমার মেয়ের জন্য রবি ঠাকুরের গান গাইবে”।

আফসার ঢোক গিললো।সে তার এই জীবনে কোনদিন রবি ঠাকুর কেন বদি ঠাকুরের গানও গায়নি।কিন্তু মাইশার এইসব অদ্ভুত দাবী তাকে মেনে নিতে হয় সবসময়।মা মেয়ে তাকে খুব যন্ত্রণা করে কথা না শুনলে।তাই সে মাথা নাড়ে, ভালোবাসা নিয়ে।

 

******************************************************************************

 

 

বাহিরে ঝুম বৃষ্টি, এর মধ্যে এই লেখাটা লিখলাম।বৃষ্টি নামের প্রেয়সীকেই এই লেখাটা উৎসর্গ করলাম।

Share