ছোট্ট একটা বাসা

লিখেছেন - নূহা চৌধূরী | লেখাটি 1426 বার দেখা হয়েছে

চায়ের কাপটা নিয়ে সুবিশাল এপার্টমেন্ট এর বিশাল ফ্ল্যাটের বারান্দায় এসে দাঁড়ালো নীতু । সচরাচর এতো তাড়াতাড়ি ঘুম ভাঙ্গেনা ওর । গত ৫ বছরে রাতে ঘুম কি জিনিস তা মোটামুটি ভুলে গেছে ও । ৫ বছর আগের স্মৃতি গুলো ফ্লাশব্যাক হয় শুধু । 

 

এই শোন , আমাদের না ছোট্ট একটা বাসা হবে । এই এতোটুকু , একটা খেলাঘরের মতো । সেটাতে থাকবে ছোট্ট ছোট্ট দুটো রুম , একটা এক চিলতে বারান্দা । 

হুম । 

আর ছোট্ট ছোট্ট সব ফার্নিচার থাকবে । একটা ছোট্ট টিভি , একটা ছোট্ট ফ্রিজ । 

আর একটা ছোট্ট বাবু ও থাকবে তা বললে না ? মুচকি হেসে অয়ন জানতে চাইলো । 

ধুর তোমার খালি ফাজলামো ! লাজুক হাসিতে নীতু ঝলমল করে । 

 

আচমকা পাশে রাখা ফোনের শব্দে নীতু বাস্তবে ফিরে আসে । এলার্ম টা বাজছে । প্রতিদিন ই বাজে , কিন্তু ওঠা হয় না । সংসারে ব্যতিব্যস্ততা দেখানোর প্রয়োজন ওর কখনোই পড়েনি । বিশাল বিত্তের মাঝে কেমন যেন দম আটকে থাকা অনুভূতি আর সাড়ম্বর ক্ষনস্থায়ী আনন্দ টুকু নিয়ে সময় তো কেটে যাচ্ছে ! 

 

এই যে জনাব তুমি এতো রাত জাগো ক্যান ? 

ভাবি । 

কি ভাবো ? 

ভবিষ্যত্‍ 

ভবিষ্যত্‍ কি ভাবো ? 

পরিণতি । 

ঐ তুমি এতো কমকম কথা বলো ক্যানো ? আমার মত বেশি কথা বলতে পারো না ? কিসের পরিণতি ভাবো ? 

আমাদের পরিণতি ভাবি নীতু । কি করে কি হবে তা ভাবি । জানো তোমাকে ছাড়া মুহুর্ত গুলো কেমন হবে ভাবতেই কেমন যেন দম আটকে আসে । 

অয়নের হাতটা শক্ত করে ধরে নীতু বলে , তুমি এমন ভাবো কেন ? আমাকে ছাড়াতো তোমার থাকতে হবে না । কোনদিন হবে না । আমি তোমাকে থাকতে দিবো না । 

 

দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাস্তবে ফিরে আসে । শক্ত করে বারান্দার গ্রীল ধরে থাকায় হাত টা লাল হয়ে গেছে । আকাশটায় খুব মেঘ করেছে । দু এক ফোঁটা জল নীতুর হাতেও পড়ে । 

 

এইযে মহারাজ শিগ্গির ক্যাফেটোরিয়ার সামনে এসো । 

এই বৃষ্টি তে ? 

হুম । এসো , তাড়াতাড়ি । 

কাকভেজা হয়ে অয়ন আসে । 

কি ব্যাপার এত জরুরী তলব ? 

আজ আমরা বৃষ্টিতে ভিজবো । হেসে নীতু জানায় 

ধুর আমার ভাল লাগে না । 

আমার লাগে । এই মামা যাবা ? তারপর ।অয়নের হাত ধরে একলাফে রিকশায় । 

 

নীতু , বৃষ্টিতে ভিজছো কেন ? ঘরে আসো । রুম থেকে কৌশিক ডাকে । তাড়াতাড়ি গ্রীলের ভেতর হাত নিতে যেয়ে লোহায় কেটে ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হয় ! 

লাল রক্ত । 

 

কাজি অফিস থেকে লাল শাড়ি পরা টুকটুকে নীতু আর হতভম্ব অয়ন বের হয় । 

নীতু ,কাজটা কি আমরা ঠিক করলাম ? 

খুব ঠিক করলাম । এখন আমরা একটা ছোট্ট বাসা নিবো । দু কামরার একটা বাসা । তুমি আর আমি থাকবো । 

আর মা ? 

দু রুম কি এমনে বলসি ? গাধা । চলো রিকশা নিই । 

আমি এমনি হতভাগা বিয়ের পর তোমাকে রিকশায় তুলে ঘোরাতে হচ্ছে । 

শোন যে দিন দু চাকার প্রাইভেটকার বের হবে ঐদিন আমাকে গাড়ি কিনে দিবা । তার আগে না । 

তারপর রিকশায় দুজন স্বপ্ন বুনতে থাকে । যতক্ষন না ঘাতক বাসটা পেছন থেকে এসে ধাক্কা দেয় , চোখ বন্ধ করার আগে রাস্তায় রক্তের মেলা দেখে আর্তচিত্‍কার বেরিয়ে আসে অ-য়-ন !!! 

 

হিস্টিরিয়া রোগীর মত কাঁপতে থাকে নীতু । চিত্‍কার শুনে দৌড়ে আসে কৌশিক । কৌশিককে জড়িয়ে ধরে কাঁদে নীতু । আমার ছোট্ট বাসাটা ভেঙ্গে গেলো কৌশিক আমার বাসাটা ... আমার ছোট্ট একটা বাসা ... 

 

 

নীতু কে ধরে থাকে কৌশিক । কি দেয়নি সে নীতু কে । অর্থ বিত্ত ভালবাসা । তার এতো বড় ফ্লাট থাকার পর ও একটা মানুষ কেমন করে একটা ছোট্ট বাসা কিংবা তার মত একজন কে রেখে একটা অপদার্থের জন্য এত ভালবাসা ধরে রাখে বোঝে না । দরকার ও নেই । শুধু নিতু কে ধরে থাকতে চায় ও । একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে নীতুকে আরো শক্ত করে ধরে থাকে কৌশিক।

 

 

 

Share