যায় রৌদ্র-ছায়া-মেঘ , আসে বসন্ত...

লিখেছেন - -নূহা চৌধুরী | লেখাটি 1220 বার দেখা হয়েছে

উফ্ একটা মানুষের আসতে এতক্ষণ লাগে ? অপেক্ষা জিনিসটা নিশিতার একদম পছন্দ না , কিন্তু রায়ানের জন্য এমন কোন দিন নেই যে ওর ঘন্টা দুয়েক বা তার চেয়ে বেশি অপেক্ষা করা লাগে নাই ।

রাগ করতে যেয়েও নিশিতার রাগ করতে পারে না , ঐ যে হাঁপাতে হাঁপাতে রায়ান আসছে , হয়তো পৃথিবীর সবচেয়ে ভাল বন্ধু কিংবা সবচেয়ে ভাল প্রেমিক কিংবা নিশিতার জীবনের সবচেয়ে দামি যা , সেই রায়ান ।

এতো সময় লাগলো যে ?

স্যরি একটা কাজে আটকে গিয়েছিলাম , পাঞ্জাবীর পকেট থেকে রুমাল বের করে ঘাম মুছতে মুছতে রায়ানের উত্তর ।

আজকের দিনেও কাজ ?

কি আশ্চর্য ! কাজ করা লাগবে না ?

আজ আমাদের বিয়ে , রায়ান !

তো কি হয়েছে ? বিয়ে হলেই যে কাজ বন্ধ করে দিতে হবে তা তো না !

নিশিতা আর কিছু না বলে অন্য দিকে মুখ ফেরালো , ওর চোখে পানি চলে এসেছ , ও কোন ভাবেই রায়ান কে চোখের পানি দেখাতে চায় না ।

কিছুক্ষণ দুইজনেই চুপচাপ বসে থাকে ।

একটা সময় নিশিতাই বলে ,

চলো ওঠা যাক !

হুঁ , সংক্ষেপে রায়ানের উত্তর ।

আমি স্যরি ।

নাহ্ , ইটস ওকে । আমার দেরি করা ঠিক হয় নাই ।

স্যরি , রায়ান ।

হেই মামা যাবা ? বলে রিকশা ডাকে রায়ান , নিশিতার স্যরি যেন ওর কানেই যায়নি !

শোন , ফার্স্টে তাপসের বাসায় যাবো , সেখানে লাঞ্চ সেরে তারপর কাজি অফিস,ওকে ? সারাদিন পেটে কিছু পড়ে নি ।

আবার তাপস ভাইয়ের বাসায় কেন ? প্রশ্নটা জিগ্যেস করতে যেয়েও করে না নিশিতা । ওর এখন খুবই কান্না পাচ্ছে , আজকের দিনটা ঝগড়া না করলে কি কোনভাবেই হতো না রায়ানের ? প্রচন্ড চোখ জ্বালা করছে ওর , ঠোঁটে কামড়ে কান্না আটকানোর প্রবল চেষ্টা চালাতে লাগলো ও ।

রায়ানের করা প্রতিটা কাজ নিশিতার ভাল লাগে , ও হাসলে ভাল লাগে , ও কথা বললে ভাল লাগে , ও নিশিতা বলে ডাকলে ভাল লাগে ...

রায়ান কি জানে ও কয়বার ওকে নিশিতা বলে ডেকেছে তাও নিশিতার মুখস্ত ! মোবাইলে পরিচয়ের পর ছমাস প্রেম , মাত্র আটবার দেখা .. এতোদিনে রায়ান ওকে নিশিতা বলে মাত্র ৯বার ... বিয়ের পর রায়ানকে বলতে হবে যাতে প্রতিদিন ওকে গুনে গুনে একশবার , উঁহু পাঁচশবার নিশিতা বলে ডাকে ।

এইযে তিন আঙ্গুলের মাথা দিয়ে পাখির বাচ্চার মত রায়ান খাচ্ছে , চোখে মুখে পরম তৃপ্তি এরকম একটা দৃশ্য দেখার জন্যেই তো নিশিতা যুগ যুগ বাঁচতে পারে ...রায়ান কি এটা জানে ? রায়ানের কিছু জানার দরকার নাই , নিশিতার পাশে থাকলেই হলো ।

রায়ান , বিকেল হয়ে যাচ্ছে তো ,যাবানা ?

যাবো , তার আগে একটু শোনো ।

দাঁড়াও চা নিয়ে আসি , আচ্ছা আমরা যে আসলাম , তাপসভাই রাগ করবে না ?

আরে ধুর , ওর এই ফ্ল্যাট টা তো আছেই এজন্য !

এই নাও চা ।

রায়ানের চোখে মুখে কেমন একটা অন্য আভা , এই রায়ানের সাথে নিশিতার পরিচয় নেই , শক্ত করে নিশিতার হাত ধরে রায়ান ...

রায়ান .. রায়ান ..না .. প্লিজ ....

তারপর যা হলো তা নিশিতা চায়নি , অন্তত এখন তো নাই ই ।

 

আকাশ কালো করে মেঘ জমেছে , বিয়ের দিনে বৃষ্টি নাকি শুভ , কিন্তু ঝড় এলে ?

গাল বেয়ে একটু একটু করে গরম পানির স্রোতটা নামছে নিশিতার ।

আচ্ছা রায়ান এরকম করলো কেন সেদিন ? জরুরী ফোন বলে বের হয়ে গেলো , নিশিতাকে কাজিঅফিসের সামনে থাকতেও বললো , কিন্তু আর এলো না কেন ?

 

রাত বারোটা পর্যন্ত একা একটা মেয়ে , রাস্তায় ...কতবার ফোন করেছে রায়ানের নাম্বারে ...ফোন সেদিন আর তুলেনি রায়ান ...কত কষ্ট করে কতদিন পর যখন রায়ানের দেখা পেলো ...হাসি হাসি মুখে একটা মেয়ের পাশে বসা ছবি ...গায়ে বিয়ের শেরোয়ানী ... স্টুডিও থেকে ঠিকানা জোগাড় ... রায়ানকে ধরে কান্না এবং পরিশেষে সব প্রশ্নের উত্তর.... এধরনের মেয়ে বিয়ে করা যায় না ......

 

ঠিক ই তো , এধরনের মেয়েকে বিয়ে করা যায় না .. আর কিছু বলেনি সেদিন নিশিতা , মাথানিচু করে চলে এসেছিলো ...

তারপর কত গুলো বছর কেটেছে , কতোবার ভেবেছে এই পঁচনধরা জীবনটাকে শেষ করে দিবে , কিন্তু বিধাতা সবাইকে অতোটা সাহস দিয়ে দুনিয়ায় পাঠান না , নিশিতা ও পথ মাড়াতে পারে নি , গত বছর গুলোতে কত গুলো বিয়ে ভেঙ্গেছে ওর ... নিজে স্বেচ্ছায় ছেলে পক্ষকে জানিয়ে দিতো ওর গল্প , তারপর আর কেইবা আগাবে ?

 

গিয়েছে একজন ...

তাঁর নাম কল্যাণ । নিশিতার সাথে যখন বিয়ের সম্বন্ধ টা প্রায় পাকা , প্রায় প্রতিবারের মত নিজ দায়িত্বে কুঠার নিয়ে বিয়ে ভাঙতে কল্যাণের সাথে দেখা করলো , সব বললো এবং অবাক হয়ে লক্ষ্য করলো কল্যাণের মুখে হাসি ।

 

নিশিতা কে অবাক করে দিয়ে হাসতে হাসতেই বলল ,

দেখুন , এখন তো আমি আপনাকে ছাড়া আর কাউকে ভাবতেও পারবো না , আমি সারাজীবন একটা সত্‍মানুষকে পাশে চেয়েছি , আপনাকে আর হারাতে চাই না ।

সেই কল্যাণের সাথে নিশিতার আজ বিয়েই হয়ে গেলো .. নাহ্ ঝড়টা আসি আসি করেও আর আসেনি ...তবে বৃষ্টি হয়েছে খুব ...

মানুষের জীবনে সবসময় ঝড় আসবে এমন তো না ... মাঝে মাঝে করূণাময়ীর করূণাধারায় নিশিতারা ভিজে যায় ...আজকের বৃষ্টিও হয়তো তেমনি কিছু ...

 

যে বিশুদ্ধ আবেগ নিয়ে কল্যাণ নিশিতার জীবনে কল্যাণ বয়ে নিয়ে এসেছে তা দিয়েই নিশিতার হাজার রাতের রাতজাগা দুঃখটা ভেসে যাবে ... অন্তত কল্যাণ তো তাই কথা দিয়েছে ...

 

 

Share