জীবন পুড়িয়া যায়

লিখেছেন - নূহা চৌধূরী | লেখাটি 835 বার দেখা হয়েছে

১. সালটা ছিলো একাত্তর , যুদ্ধের পোড়া আগুনে মান্দারী নামের গ্রামটা তখনো পুড়েনি , অত্যন্ত বাড়ি থেকে কয়েকদিন বের হতে না পারা খলিলুর রহমান পাটোয়ারী তাই জানতেন । গত কয়েকদিন ধরেই শরীরটা ভাল যাচ্ছেনা । গতকাল ই খবর পেয়েছেন তাঁর একমাত্র মেয়েটার ছেলে হয়েছে । বংশের প্রথম নাতি , দেখার জন্য মনটা আকুল হয়ে আছে । হওয়ার ই কথা ।

ছেলে না...ই খলিল পাটোয়ারীর , একটা নাতি হওয়াতে তিনি এবং তাঁর স্ত্রী অতি আনন্দিত । শরীর টা একটু খারাপ , তা না হলে কালই রওনা দিতেন ।

এলাকার অবস্থাও ভালো না , পাইক্যারা নাকি বড় রাস্তার অন্যপাড়ে স্কুলে নাকি ক্যাম্প করেছে , সাথে যোগ দিয়েছে মইত্যা হারামজাদা , সে নাকি রাজাকার হয়েছে , কুত্তার বাচ্চা ! দাঁতে দাঁত চাপলেন খলিল পাটোয়ারী ।

 

 

২. সুলতানা বেগম আকুল হয়ে কাঁদছেন , একটু আগে খবর পেয়েছেন তাঁর বাবা আর নেই ! পাকিস্তানের আর্মিরা নাকি তাঁদের বাড়ি ঘর সব জ্বালিয়ে দিয়েছে ! তিন দিনের বাচ্চা টা ট্যাঁ ট্যাঁ করে কাঁদছে , এই অপয়ারে লবন মুখে দিয়ে মারে নাই কেন , তাঁর খুব আফসোস হচ্ছে! এই অপয়া পোলার জন্যই আজ তিনি বাবাকে হারিয়েছেন ! পোলাটা রে কেউ থামায় না ক্যান !

 

 

৩. মেয়েটার জন্যে কলা ও দিয়ো , মুড়ি ভাজা হইছে নি ? তাগাদা দিলেন খলিল পাটোয়ারী ।

শোনেন , সাবধানে যাইয়েন , মইত্যা কিন্তু ওত পাতি রইছে , কুলসুমের মা কইসে আমারে , সেয় তো আফনের উফরে খুব খ্যাপা !

আরে বাদ দ্যাও , মইত্যা ও মানুষ ! ঘৃণায় মুখে থুথু চলে আসে উনার ।

 

 

৪. ঠিক খবর আনসোস তো জলিল ? খলিল মিয়া এখান দিয়াই যাইবো ?

ঐ দ্যাখেন কে যায় !

কে যায় ? খলিল জ্যাডা নি ও ?

আরে মতিমিয়া নি ?

হ জ্যাডা ! আমগো লগে যে একটু যাওন লাগে ..

কোন জায়গায় ? আমার একটু তাড়া আছে যে , সুলতানায় বাড়ি যাওন লাগবো !

চোখ দুটো ধিক করে জ্বলে উঠেই নিবে গেলো মতির !

চলেন জ্যাডা , কামে যাইবেন আর কি !

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন খলিল পাটোয়ারী , মইত্যা হারামজাদার পাশে হাঁটতেও গা গুলিয়ে আসে ।

 

 

৫. রহমত খালী খালের পাড়ে চোখ বেঁধে দাঁড় করানো খলিল সাহেব ।

মতি রাজাকার তার হাতে থাকা রাইফেল টার দিকে তাকিয়ে আছে , একটু পরেই পরম প্রতিশোধ নেবে সে , সুলতানাকে না পাওয়ার জ্বালাটা বুকের মধ্যে দাপাদাপি করছে ।

মতি কি আমারে মেরে ফেলবা ? ভরাট কন্ঠটা গমগম করে বাজে মতির কানে ।

মতি আমার চোখ খুলে দ্যাও , আমি নিজের চোখে আমার মৃত্যু দেখতাম চাই ।

চুপ ! চুপ শালা !

বেয়নেটের প্রথম খোঁচা টা বুকের বাঁ পাশে এসে লাগে ,

মইত্যা , আমার চোখ খুলে দে কইলাম , চোখ খুলে আহ্ !

 

ভীষণ ভাবে গর্জে উঠে মতির রাইফেল , খলিল সাহেবের গমগমে কন্ঠস্বর চাপা পড়ে যায় তার নিচে ...

 

 

৬. ছয় দিন পর ক্ষতবিক্ষত লাশটা রহমতখালি খালেই ভেসে আসে , চোখ বাঁধা ছিল কিন্তু বাঁধের কাপড়ের নিচে , কপালের ঠিক পরে একজোড়া চোখ ছিলো না , কোটরটা শূন্য ছিল ...

ঘর পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে , খলিল পাটোয়ারীর স্ত্রীর মনটাও পুড়ছিলো শোকের দহনে ...

পুড়েছে তারপরের বিশটি বছর ...

 

 

৭. মতি রাজাকারের ছেলের বিয়ে । খুব তাড়াতাড়ি ছেলের বিয়ে দিতে চাইছিলো সে , মেয়ে খুবই সুন্দরী , মেয়ে বলতে গেলে সুলতানার ফটোকপি , সুলতানার ই খালাতো বোনের মেয়ে , এই বংশের মেয়ে গুলার রূপ আছে মাশা আল্লাহ্ ।

আজ রাতটা মেয়ের বাড়ীতেই কাটাবে মতিরা ..

বিয়ের কাজ কাম শেষ , বেড়ার ঘরে শুতে খুবই আপত্তি ছিলো মতির । তারপরেও মেনে নিয়েছে ।

আজকের রাতটা যেন কেমন , কোনমতেই ঘুম আসছিলো না মতির । এপাশ ওপাশ করে অনেকটা রাত পার হয়ে গেলো ।

 

হঠাত্‍ করেই বেড়ার দরজা খুলে ঘরে প্রবেশ করলো খলিল পাটোয়ারীর স্ত্রী । হাতে একটা দা ...

 

মতি মিয়া কিছুই বলতে পারলো না ..

পরদিন তার লাশটা যখন পাওয়া গেলো বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে ছিলো ক্ষমা চাওয়ার প্রচন্ড আকুতি ।

 

বিশ বছর পরের একটা রাতে পোড়া জীবনে প্রশান্তির ঘুম ঘুমালেন খলিল সাহেবের স্ত্রী ।

 

 

 

[গল্পটা আমার বড়মার । গল্পের শেষের টুকু আমি আমার মত করেছি , কিন্তু বাস্তবের শেষটুকু পাঠককে জানানো প্রয়োজন , বড়মা তাঁর স্বামী হারানোর প্রতিশোধ নিতে পারেননি , তাঁকে শেষজীবনটা খড়কুটোর মত এখানে সেখানে ভেসে কাটাতে হয়েছে । মইত্যা রাজাকারের হয়েছে স্বাভাবিক মৃত্যু , কিন্তু একটা কথা আমার সবসময় মনে হয় , সেটা হলো মইত্যা রাজাকাররা হয়তো এ দুনিয়ায় পার পেয়ে যাচ্ছে কিন্তু সৃষ্টিকর্তার দরবারে তারা কখনোই ছাড় পাবে না , মইত্যাদের বিচার হবেই , হতেই হবে ।]

 

Share