দিলাম হৃদয় খুলে

লিখেছেন - নূহা চৌধুরী | লেখাটি 1372 বার দেখা হয়েছে

"একটা বিকেল কীভাবে বিরক্তিকর করে ফেলতে হয়,তা মনে হয় তা তোর থেকে ভাল আর কেউ জানে না সাকিব ।" ফোনটা বন্ধ করতে করতে বিড়বিড় করলাম । মেজাজটা খুব খারাপ লাগছে । এই ছেলের সাথে আর কথা বলবো না কতবার ঠিক করেছি কিন্তু মনটাকে কেন জানি বেঁধে রাখতে পারি না ! 'হেইট দিস ফিলিংস , এন্ড হেইট ইউ আ লট !!' ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাস দিলাম আর কি কি করলে ও বুঝবে যে আমি রাগ করেছি চিন্তা করছি বসে বসে ... বুঝলেও কিছুই বলবে না ও । মিচকা শয়তান একটা ! রাগে গজগজ করতে থাকি !

 

ভাল লাগছে না কিছুই । ছোট্ট ফাজিল বোনটা বেশ কবার রুমে উঁকি দিয়ে গেছে , মাঝে মাঝে গা জ্বালানো ফিচিক ফিচিক হাসি , ইচ্ছে করছে কষে দুটো চড় লাগাই , খুব জোরে খামচে দেই , ওর আউলা বাউলা ঝাউলা চুলে চুইংগাম লাগিয়ে দেই ... দুনিয়ার সবাইকে আচ্ছামত বকে দেই , গলা ফাটিয়ে চিত্‍কার করি ... এরকম আরো অনেক কিছুই আমার করতে ইচ্ছে হয় যখন সাকিব আমাকে ইগনোর করে , বা জেনে বুঝে একগাদা বন্ধুর সামনে হেনস্তা করে ।

 

কিন্তু আমি কিছুই করতে পারি না , কারণ আমি রেগে গেলে প্রথমে আমার চোখ জ্বালা করে তারপর অবিরত পানি পড়তে থাকে এবং সেই পানি প্রথমে একটা পুকুর , তারপরে হ্রদ , তারপরে সমুদ্র সৃষ্টি করে ! আমি তখন সেই সমুদ্র দেখি এবং জীবনে সবচেয়ে বেশিবার নেয়া সিদ্ধান্তটা আবার নিই , সাকিবকে আমি ভুলে যাবো । ফোন থেকে নাম্বার ডিলিট করি , মেসেজ ডিলিট করি এবং ও যখন ফোন দেয় তখন আগের সব ভুলে গিয়ে আবার বেআক্কেলের মত গল্প জুড়ে দিই !

 

 

 

এই ছেলেকে আমি ভালবাসি কিনা আমি জানি না , সত্যি জানি না কিন্তু ওর জন্য আমার অন্যরকম একটা অনুভূতি হয় , অনুভূতিটা কেমন আমি ঠিক কাউকে বুঝাতে পারি না । হয়তো অনুভূতি রাঙানোর একটা ক্যানভাস থাকলে ভাল হতো । আমি সেই ক্যানভাসে লাল হলুদ নীল নানা রঙ চড়িয়ে সাকিবকে দেখাতাম ওর সাথে কাটানো প্রতিটা মুহুর্ত আমার কাছে কেমন নানা রঙে রঙিন হয়ে আছে !

 

ছেলেটা সব বুঝে আমি জানি , ওর চোখে তাকালে আমি বুঝতে পারি ওকে ঘিরে আমার অস্থিরতার প্রতিটা মুহুর্ত ও অনুভব করে কিন্তু কী এক অদ্ভূত নির্লিপ্ততা ওর মাঝে ... কোনদিন যদি ওকে দেখাতে পারতাম কতটা দীর্ঘশ্বাস মিশে আছে ওর ছবির দিকে তাকিয়ে কাটানো প্রতিটা রাতে !

 

এবং তারপর যখন আমি ওর নির্লিপ্ততায় খুব বিরক্ত হয়ে দূরে সরে যাই । একদিন , দুইদিন বড়জোর তিনদিনের পর সে এক অদ্ভূত জাদুতে আমাকে বশীভূত করে পরাজিত করে ফেলে । বিশ্বাস করুন পাঠক যে আমি কোন একটা কিছুতে হেরে গেলে কেঁদে বুক ভাসাই , সেই আমার হারতে একটুও খারাপ লাগে না !

 

 

আমি খুশি হই , হারার আনন্দে আমার চোখে জল আসে ! চোখের জলের ড্রাম উপচে উপচে পড়ে ... সিনিয়র কি জুনিয়র সবাই বলে তুই প্রেমে পড়েছিস , যাকে ঘিরে এতো অনুভূতির মেলা সেও বলে তোর ভাবগতি সুবিধের না । আমি কিছু বলি না , বলার মত কিছু খুঁজে পাইনা আসলে !

 

 

 

কোন এক শীতের রাতে তার ফেসবুক ওয়ালে মেয়ে বন্ধুদের ওয়ালপোস্টের মেলা বসে , আমার একটু একটু করে রাগ লাগতে থাকে । রেগে মেগে ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করি তোর মাইয়া ফ্রেন্ড হইসে না অনেক ? ও ওইপাশ থেকে বিটকেলে হাসি দিয়ে বলে , "ক্যান তুই জেলাস ?"

 এ পাশ থেকে আমি চিবিয়ে চিবিয়ে উত্তর দেই , "আমার কি ঠ্যাকা তোর মত লিলিপুটের জন্যে জেলাস হবো ?"

 

তারপর ফোন কেটে দিই , আমার গা জ্বালা করে , শুধু গা না চুল , নখ সবই জ্বলে কিছুই বলতে পারি না !

 

অনলাইন হয়ে রাতের পর রাত বসে থাকি যদি একটু চ্যাটে নক দিবে । সে তার ভাব খাওয়া নিয়ে ব্যস্ত থাকে । আমি ওর নামের কোনায় সবুজ বিন্দু নিয়ে বসে থাকি । আমি দেখি এবং অনেক পরে হয়তো কিছু একটা ভেবে নক দেয় আমি আনন্দে আটখানা হয়ে গল্প করতে বসি । রাতের একটা দুটো বাজে , ও ঘুমিয়ে যায় । আমি বসে বসে চ্যাট হিস্টোরি পড়ি,তারপর আবার পড়ি ...

 

 

 

আমার বছর দুয়েক আগের রাতের কথা মনে পড়ে , সাকিব খুব আকুতি নিয়ে আমাকে ভালবাসি বলেছিলো , দুই বছর আগে আমি অনেক ছোট ছিলাম মনে হয় , ভালবাসা কথাটা আমার কেমন জানি নিষিদ্ধ মনে হতো , খুব রেগে বলেছিলাম,"বেশি পেকেছিস না ? দেবো এক থাপ্পড় !"

 

সাকিব টানা একমাস প্রতিরাতে "আমি তোকে ভালবাসি" টাইপ মেসেজ দিতো । আমি কখনো গা করি নাই , তারপর একদিন হঠাত্‍ ও চুপ হয়ে গেলো । আমি প্রথম প্রথম খুব খুশি হয়েছিলাম , এসব ভাব ভালবাসার কথা আমার ভাল লাগতো না কখনোই । কিন্তু একবছরেই যেন আমি বদলে গেলাম , প্রতিদিন এখন ওর একটা ফোন কলের জন্য অপেক্ষা করি ! কী আশ্চর্য ! মন জিনিসটা এতো বিচিত্র কেন ?

 

 

 

একদিন ওকে মেসেজ দিলাম 'কাঠবিড়ালীর চারা লাফায় উঠোনে জানিস তার মানে ?' সে আনসার করলো , 'মনে হয় তোদের পেয়ারা গাছে পেয়ারা ধরসে , বাই দ্য ওয়ে একটা পিক তুলে এফবি তে আপলোডাইস লাইক দিবো নে !'

 

তারপর আমি ঠিক করলাম , আমি ওর কাছ থেকে হারিয়ে যাবো , অনেক দূরে চলে যাবো । আমি প্রতিবার ই ভাবি কিন্তু পারি না কখনো । এইবার একটা মোক্ষম সুযোগ আছে । জাপানি এনিম আর মাঙ্গা ক্রিয়েটিভিটির কম্পিটিশানে আমি সেকেন্ড হয়েছি পুরো এশিয়াতে । ওরা আমাকে তিনবছরের স্কলারশীপের একটা অফার দিয়েছে । সেখানে ফুকাওকা বলে একটা শহর আছে সেই ছবির মত শহরে আরো অনেক মাঙ্গা পাগলের সাথে হয়তো আমি ভালোই থাকবো !

 

 

 

যাবার আগে আমার খুব সাহস বেড়ে গিয়েছিলো হয়তো । একরাতে ওকে বললাম , "তোকে আমার খুব পছন্দ জানিস ?"

"হুঁম ..."

"কিছু বলবি না ?"

"কি বলবো ?"

"তোর কিছুই বলার নাই ?"

"না ..."

 

আমার রাগে চোখে পানি চলে আসে , "ছেলে , খুব ভাব না তোর ? তুই ভাব নিয়ে থাক , আমাকে আর পাবি না ..."

 

 

 

পরিশিষ্টঃ পৃথিলা নামের অতি আবেগি মেয়েটা কাউকে কিছু না বলে , এক শীতের ভোরে জাপানের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমায় ... লাস্ট তিনবছর ধরে ওর কোন বন্ধু বা ক্লাসমেট ওর কোন হদিস জানে না । একমাত্র ছোট্ট বোনটা মাঝে মাঝে ওকে ইমেইল পাঠায়, "আপু আমি সরি , সাকিব ভাইয়াকে নিয়ে তোমাকে আর কোনদিন কিছু বলবো না , দেশে ফিরে আসো , প্লিজ ..."

আর সাকিব ? ও হয়তো ভালো আছে , পৃথিলাকে ও খুঁজেছিলো কিনা আমি জানি না , কিন্তু এতোটুকু জানি সাকিবরা পৃথিলাদের মতো এতো বোকা হয় না , সস্তা আবেগের জন্য তাদের বুকে কোন জায়গা নাই !

 

কিংবা এমন ও হতে পারে , নিজের ভেতরে থাকা ইগোর জন্যে সাকিবরা পৃথিলাদের আবেগকে পাত্তা দেয় না ! কিন্তু একটা ব্যাপার জানি , পৃথিলার মনে যে বিশুদ্ধ আবেগ সৃষ্টি হয়েছিলো তার স্রষ্টা ছিলো সাকিব । এভাবে কাউকে ভালবাসতে না শেখালেও চলতো হয়তো ...

 

 

 

পরিশিষ্ট এর পরের কথাঃ  আমার প্রচন্ড ইচ্ছা ছিলো এ গল্পের একটা মধুর সমাপ্তি টানার । সেরকম লেখার অনেক চেষ্টাও করেছি । কিন্তু সব গল্পের মনে হয় হ্যাপী এন্ডিং হয় না , আমি খুব চেয়েও মনের মতো করে শেষ করতে পারিনি ।যাই হোক , তিনবছর পর আরেক মাঙ্গা কম্পিটিশানে ফার্স্ট হয়ে বছর তিনেক পর পৃথিলা দুদিনের ঝটিকা সফরে বাংলাদেশে আসে । কারণ কাকতালীয়ভাবে পুরস্কার বিতরণীর আয়োজন করে যৌথভাবে বাংলাদেশ এবং জাপান । পৃথিলার খুব ইচ্ছে ছিলো সাকিবের সাথে দেখা করার । কিন্তু মনের সাথে যুদ্ধ করে কি সিদ্ধান্ত নিয়েছিল আমার ঠিক জানা নেই ।

 

পৃথিলা সাকিবের গল্পের শেষটুকু প্রিয় পাঠক মনের মতো করে কল্পনা করে নিতে পারেন , ধন্যবাদ ।

 

Share