ও পোড়া চোখ সমুদ্রে যাও

লিখেছেন - নূহা চৌধূরী | লেখাটি 1025 বার দেখা হয়েছে

হোঁত্‍কা মোটা মরিচ টার দিকে আমি এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি , এই বিশাল স্বাস্থ্যবান মরিচ সম্প্রদায়ের একটা কুত্‍সিত নাম আছে , সেই নামটা হলো বোম্বাই মরিচ । নাম যাই হোক , এই মরিচের খুবই চমত্‍কার একটা সুগন্ধ আছে এবং সেই জন্যেই এই আগুনের মত ঝাল মরিচ ডলে এক গামলা ভাত অনায়সে খেয়ে ফেলা যায় । মরিচের দিকে তীক্ষ্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আমার মনে হলো , সাকিব খুবই ভুল কথা বলেছে , আমার আম্মা কিংবা আব্বা মোটেও জন্মের সময় আমার মুখে বোম্বাই মরিচের রস দেন নাই , কারণ আমার সম্পর্কে গার্জিয়ান লেভেল থেকে যে সমস্ত কমপ্লিমেন্ট আসে তার মধ্যে এক নম্বর হলো , আমি খুবই সুইট একটা মেয়ে । বন্ধুমহলে যদিও ধারণাটা পুরোই বিপরীত এবং তাদের মধ্যে নিরানব্বুই শতাংশের ধারনা আমি করলার মতো তিতা এবং জনাব ইহান সাকিবের ধারনা আমি এই দুনিয়ায় আসার আগে আমার আম্মা অবশ্যি অবশ্যি একটা গোটা মরিচ বাগান একাই শেষ করেছিলেন , এবং এটা নিয়ে কি এক গবেষনা করে আজকে বাবা সাকিব তার মূল্যবান থিসিস পেপার দিয়েছেন যেটাতে কিনা তিনি একশতে একশ দশ পার্সেন্ট গ্যারান্টি সহ এইটা লিখেছেন যে আমি অবশ্যই এক বাগান বোম্বাই মরিচ ধ্বংসের ফসল এবঃ নিচে সই ও দিয়ে দিয়েছেন । পুরো ক্লাসের সামনে এহেন জিনিস হাতে পেয়ে আমার খুব রাগ উঠে গেলো , আমি বেয়াদবটার গালে কষে একটা থাপ্পড় মারার ইচ্ছা খুব কষ্টে দমন করে শুধু বললাম ,

        সাকিব শোন ...

        সে চোখে মুখে একটা "আমি কি হনুরে" টাইপ ভাব এনে বললো

        কি বলবি বল ?

        আমি গলায় দ্বিগুন তেজ এনে বললাম

        তুই একটা হারামী !

        সাকিবের চেহারা থেকে এক মুহুর্তের জন্য আমি কি হনু রে ভাবটা চলে গিয়ে ব্যাঙ ব্যাঙ একটা ভাব চলে এলো , এবং সে ব্যাঙের মত গলা ফুলিয়ে বললো

        হ্যাঁ স্মার্ট হারামী ! [:D]

        দৃষ্টি দিয়ে যদি কাউকে পুড়িয়ে ফেলার সিস্টেম থাকতো আমি অবশ্যই এই ছেলেকে তক্ষুনি পুড়িয়ে দিতাম , কিন্তু সেই সিস্টেম নাই বিধায় আমাকে মেজাজ টা সপ্তমে তুলে বাসায় চলে আসতে হলো ।

 

        কিছু কিছু মানুষ থাকে যাদের কাছ থেকে যত দূরে থাকা যায় ততোই মঙ্গল । আমাদের ব্যাঙকুমার সাকিব এই গোত্রের । এই ছেলের সাথে দুই মিনিট হাসি খুশি ভাবে কথা বলার জো নেই সে একটা না একটা ফালতু কথা বলে মেজাজ খারাপ করে দিবে । কিন্তু ঘটনা হলো গত এক সপ্তাহ ধরে আমার ভয়াবহ মেজাজ খারাপ লাগছে । গত এক সপ্তাহে আমি একটা বার ও সাকিবের দেখা পাইনি । সে ক্লাসে আসে না , ফোন করে না , ফেসবুকে নাই , অরকুটে নাই , সে কোথাও নাই । এই বিরক্তির প্রাণীটার সাথে দেখা বা কথা না হলে কেন মেজাজ খারাপ হতে হবে এই জিনিসটা আমি বুঝতে পারছিনা । সাকিব আমার এমন কোন প্রাণের বন্ধু না যে একে ছাড়া আমি থাকতে পারবো না , আমি জীবনে হাতে গোনা কয়েকবার তাকে ফোন দিয়েছি তাও খুব একটা দরকার ছাড়া না । কিন্তু এই এক সপ্তাহে তাকে একদম না দেখে আমার ভেতর কেমন যেন একটা অস্বস্তি কাজ করতে থাকে , অনুভূতিটা একদম ই নতুন কিন্তু এতো বিচ্ছিরি যে বলার মতো না ।

 

        এরই মধ্যে একটা নিতান্তই ফ্যামিলি প্রোগ্রামে আমার পরিচয় হলো অর্ক এর সাথে । অর্ক আম্মুর স্কুল জীবনের বান্ধবীর ছেলে , নিপাট ভদ্র , মেডিকেলে পড়ছে , একদম সিনেমার নায়কের মত চেহারা । পরিচয় করিয়ে দেবার সময় আম্মা এবং অর্কের আম্মার চোখে মুখে যে দ্যুতি আমি দেখেছি তাতে পরিষ্কার বোঝা যায় এইটা নিতান্তই পরিচয় নয় । এঁরা অন্য কিছু চান । অর্কের লাজুক লাজুক হাসি , কিংবা ঠান্ডা মোলায়েম গলায় কথা বলার জন্যেই হয়তো আমি রাগ রাগ ভাবটা গিলে ফেলে ভাল ব্যবহার করলাম । সেখানে একটু প্রশ্রয় ছিল কিনা এই প্রশ্নের জবাব আমি দিবো না ।

 

        সাকিবের সাথে আমার কথা হয়না , দেখা হয় না একমাস । ভার্সিটি তে প্রায় দু মাসের একটা বন্ধ পড়েছে । এই একমাস টা আমার কেমন উড়ে উড়ে কেটেছে । অর্ক আর আমি খুব ঘুরে বেড়িয়েছি , এমন কোন দিন নেই যে আমরা বের হইনি । কিন্তু সমস্যাটা ছিল অন্য জায়গায় । অর্কের প্রতিটা ব্যাপার নিয়ে আমি তুলনা করতে থাকি সাকিবের সাথে । অর্ক এইভাবে ঝালমুড়ি খেলো সাকিবটা হয়তো এইভাবে করতো , অর্ক এভাবে হাঁটলো আরেএএ সাকিব ও তো এইভাবে হাঁটে ...এরকম আরো অনেক কিছু ! হঠাত্‍ করে আমার চারপাশটা অসহ্য হয়ে উঠে , আমার সোজা সরল দুনিয়াটা কেমন একটা গোলক ধাঁধাঁয় পড়ে গেছে । আমি কি চাই সেটাই বুঝতে পারছিলাম না । অর্ক ছিলো আমার জন্য রাজকুমার কিন্তু আমার মনের ভেতরের অলিতে গলিতে ব্যাঙকুমারের নামটা সারাক্ষণ প্রতিধ্বনিত হতে থাকলো । আমি খুব অসহায় হয়ে সবকিছু প্রকৃতির হাতে ছেড়ে দেয়ার একটা চেষ্টা নিলাম ।

 

        ক্লাস খোলার প্রথম দিন আমার খুব ভয় ভয় লাগতে থাকে , খুব ছোট থেকেই আমার এই সমস্যা । কিন্তু আজকে বুক দুরু দুরু করছে অন্য কারণে । আজ সকালে ঘুম থেকে উঠেই আমার মনে হলো আমি আর যাই করি , সাকিবের গায়ে জ্বালা ধরানো হাসিটা দেখা ছাড়া আমি থাকতে পারবো না । গত প্রায় দুমাসে আমি সাকিবকে দেখিনি সত্য কিন্তু এমন কোন রাত নেই যে রাতে তার ফেসবুক প্রোফাইলে গিয়ে তার প্রো ছবির এলবামের দিকে ঘন্টার পর ঘন্টা তাকিয়ে থাকিনি , চ্যাট হিস্টোরি গুলো আবার আবার পড়ে বেক্কলের মত হাসিনি , অর্কের সাথে ঘুরতে বেরিয়ে যত গল্প করেছি তার কেন্দ্রবিন্দু ছিল সাকিব এবং সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার প্রতিদিন আমি সাকিব কে একটা করে চিঠি লিখেছি । চিঠি গুলোতে শুধুমাত্র দুইটা লাইন ছিলো -

       

 

        "প্রিয় সাকিব ,

        তুই কেমন আছিস ?"

 

        আমি যতবার ই ব্যাপারটা অস্বীকার করতে চেয়েছি , পাত্তা দিতে চাইনি , মনকে এদিক সেদিক ঘুরিয়েছি কিন্তু কোন লাভ হয়নি , আমি আসলেই সাকিবকে ভালবেসে ফেলেছিলাম এবং সেটাকে অস্বীকার করার ক্ষমতা আমার ছিলো না ।

        অর্কের সাথে পুরো ব্যাপারটা শেয়ার করার পর ও স্মিত হেসে বলেছিলো

        এইটা আমি আগেই বুঝেছি , তোমার কোন সাহায্য লাগলে বলো , আমি আছি ।

        অর্কের প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া ছাড়া আমার আর কিছু করার ছিলো না , পৃথিবীতে দুই একটা অসাধারণ উদার মানুষ আসে , আমি খুব লজ্জিত ছিলাম আমার কাজের জন্য কিন্তু অর্ক আমাকে বোঝালো একটা খুব সাধারন একটা ব্যাপার । মানুষের মন খুব বিচিত্র একটা জিনিস । মনের কথা শুনতে যেয়ে উলটা পালটা কাজ না করলে নাকি পার্ফেক্ট মানুষ হওয়া যায় না ।

 

        আমি দুরু দুরু বুকে ক্লাসে হাজির হলাম , আমাকে দেখামাত্র আমাদের ক্লাস বিবিসি অর্পা দু হাত মেলে আমার দিকে প্রায় ছুটে এলো ।

        খবর শুনেছিস ? সাকিব তো ...

        আমার বুকের খাঁচা থেকে হৃত্‍পিন্ডটা লাফ দিয়ে বেরিয়ে যেতে চায় , আমি কোনরকমে উত্তেজনা আটকে জিজ্ঞেস করি

        কি হয়েছে ?

        অর্পা যা বলে তা শোনার জন্য আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না

        সাকিব নাকি তার এক মামাতো বোনকে পালিয়ে বিয়ে করে ফেলেছে ! আমি মোটামুটি হতবুদ্ধি হয়ে তাকিয়ে থাকি । আমার মুখে কোন শব্দ আসে না । কি বলবো বুঝতে পারি না ।আমার চারপাশ খুব শূণ্য শূণ্য লাগে । আমি দুর্বল ভাবে দাঁত বের করে হাসার একটা ট্রাই নিই , কোনমতে বলি

        বাহ্ বেশ খবর তো ! এই চমত্‍কার ব্রেকিং নিউজটা তুই কোথায় পেলি ?

        অর্পা হড়বড় করে অনেক কথা বলে , যার সারাংশটা অনেকটা এইরকম ,

        সাকিব ক্যান্টিনে একটা ঘোমটা দেয়া মেয়ে নিয়ে বসে আছে , যেই জিজ্ঞেস করছে বলছে এটা তার বৌ , এবং আমি যাওয়া ছাড়া নাকি এই বৌ কেউ দেখতে পারবে না । আমি তার হলেও হতে পারতাম বৌ সুতরাং আমি ছাড়া এই মেয়েকে প্রথমে দেখার অধিকার আর কারো নাই ।

 

        আমি নিজের দুর্ভাগ্যে বিস্মিত হয়ে গেলাম আর সাকিবের উপর এতো রাগ হতে লাগলো যে , যে কাজটা আগে সবার সামনে করি নাই আজ সেটা করবো ঠিক করে ফেললাম , চড় মেরে আজ ওর দুই পাটির দাঁত আমি ফেলবোই ।

 

        ক্যান্টিনে যেয়ে আমি মোটামুটি তব্দা খেয়ে গেলাম , সাকিবকে ঘিরে একটা ছোট খাট জটলা , আমাকে দেখা মাত্র ই হালকা গুন্জন উঠলো , পৃথিলা এসেছে , পৃথিলা এসেছে ।

        কোনমতে ভীড় ঠেলে সামনে যাই , সাকিব কে দেখে আমার খুব কষ্ট হতে থাকে , বুকের ভেতরটা কেমন হু হু করে ওঠে , এই ছেলেটা আজ অন্য কারো , কি ভয়ংকর ! শেষ পর্যন্ত আমার কপালেই ছ্যাঁকা খেয়ে বেঁকা হওয়া ছিলো !!

        সাকিব আমাকে দেখেই দাঁত বের করে ফেলে আনন্দে , শালা বিয়ে করে এতো খুশি হতে আমি আর কোন ছেলেকে দেখিনাই ।

        আমি আরেকটু কাছে যেয়ে বলি , তোর বউ দেখতে আসছি , আমি ছাড়া নাকি ঘোমটা উঠাবি না ?

        সাকিব হে হে করে হেসে বলে ,

        হ্যাঁ , তুই ছাড়া তুলবো না বলছি । নে তোল ।

        আমার তখন বুক টা কষ্টে ফেটে যাচ্ছে আমি কি বলব বুঝতে পারি না , হা ঈশ্বর এই ছিলো আমার কপালে !

 

 

        ঘোমটা তুলে আমি সবিস্ময়ে চিত্‍কার করে উঠি , এইটা কি !!!

 

        ভাল করে তাকিয়ে যেটা বুঝলাম , একটা ছেলের মুখে আমার ছবি লাগিয়ে রেখেছে ,সেইটার গলায় আবার মরিচের মালা , কি কিমভূতকিমাকার একটা দৃশ্য !!

        আমি আবার সবিস্ময়ে বলি এইটা কি !!

        পুরো ক্যানটিন তখন হো হো হাহা হাসিতে ফেটে পড়েছে !

 

        সাকিব দেঁতো হাসি হেসে , হাতে মরিচের মালা নিয়ে বলে মরিচ কন্যা , আমাকে বিয়ে করবি ?

 

        উহ্ চোখটা এতো জ্বালা করছে কেন ? পোড়া চোখটা খুব জ্বালায় তো !

Share