স্বার্থপর

লিখেছেন - Raonaq UL Islam | লেখাটি 3904 বার দেখা হয়েছে

ফার্স্ট ইয়ারের মেয়েটা, আনিতা না ফানিতা কি যেন নাম, ভীষণভাবে জাবেদের পেছনে লাগল। ভীষণভাবে বলতে আসলেই ভীষণভাবে। অফটাইমে জাবেদ যেখানেই যাক, তার পেছন পেছন যাওয়া চাই ই। জাবেদ ব্যস্ত মানুষ, হয়তো খেয়াল করে না। মেয়েটা অবশ্য কম ধূর্ত নয়- হাতে নাতে ধরা মুশকিল। কি করে জানি অজুহাত দাড় করিয়ে দেয়। ঠোট বাঁকিয়ে হয়তো বলে- ‘না এমনি’। অথবা কথা না শোনার ভান করে ব্যস্ত হয়ে অন্য দিকে চলে যায়। জাবেদের পেছনে না ঘোরার অবশ্য কোন কারণ আমি খুঁজে পাই না।

সদ্য আগত মেয়েরা যেমনটা আশা করে- জাবেদ ঠিক হুবুহু সেই রকম।
টি-শার্ট-জিনসের সাথে মাথাভর্তি হেয়ার জেল দিয়ে সারাক্ষণ হাতে একটা
ট্যাবলেট নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। এই ট্যাবলেট মানে কিন্তু ডাক্তারের বড়ি নয়,
এটাকে বলা হয় ‘ট্যাবলেট কম্পিউটার’। সাত ইঞ্চি ছোট একটা জিনিসের মধ্যে পুরো বিশ্ব। ক্যাফের টেবিলে বসে কফির মগে চুমুক দিতে দিতে যখন সে তার ট্যাবের স্ক্রিণে হাত চালায়, বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়েগুলো প্রশংসার
দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। মনে হয় সবকয়টার মুখে একটা করে ল্যাবেন চুষ পুরে দেই। আমাদের মতো জ্ঞানী-গুণী মানুষগুলোর কোনও দাম নেই নাকি? জাবেদ ওসব কিছু খেয়াল করে না। সে তার নতুন নতুন প্রজেক্টের কাজকর্ম নিয়েই ব্যস্ত থাকে। চতুর্বিংশ শতাব্দীর রোবটগুলো কেমন হয়ে তার কিছু নমুনা এই শতাব্দীতেই খোদা তাআলা রেখে গেছেন।


অবশেষে একদিন মেয়েটা সাহস করেই ফেলল। ক্লাস শেষে ঘাসের ওপর আমরা ক’জন আরাম করছিলাম। জাবেদের বিশ্রাম টিশ্রামের বালাই নেই। সে একপায়ের ওপর একটা খাতা আর একহাতে ট্যাব নিয়ে কি যেন নকশা আকাচ্ছিল। মেয়েটা জাবেদের পাশেঘাসের ওপর বসে মিষ্টি করে একটা কাশি দিল। হাসি নয় কিন্তু- কাশি।

‘এক্সকিউজ মি- ভাইয়া…’, তার চোখে মুখে ছলনার হাসি, সাথে কৌতুক।

জাবেদ মাথা ঘুরিয়ে তাকায়- খুবই গুরুত্বের সাথে তার চেহারাটা দেখে। স্মৃতি
হাতড়ে মনে করার চেষ্টা করে চেনে কি না- মনে করতে না পেরে বলে- ‘সরি,
চিনলাম না’।

শুনে মেয়েটা হাসে। ভারি মিষ্টি হাসি, নরম হাসি। দেখলেই প্রাণ জুড়িয়ে যায়।

মুখে হাসি মেখেই মেয়েটা জবাব দিল, ‘আমার নাম আনিকা- ফার্স্ট ইয়ার’।
ইশশশিরে। নামটা ভুল করেছিলাম। ভাগ্য ভালো কোনদিন নাম ধরে ডাক দেইনি।

জাবেদের ভ্রু কিঞ্চিত কুচকে আবার স্বাভাবিক হয়ে যায়। চেহারায় অনুভূতির
কোনও ছাপই নেই। ওরে গাধা রে। এই-ই তো সুযোগ, আমি মনে মনে ভাবি। তোর জায়গায় আমি থাকলে…

মেয়েটা অল্প-স্বল্প কথা বলে, মাঝে মধ্যে আমাদের দিকে তাকিয়ে হাসে। অল্প
কিছুক্ষণের মধ্যেই এজ ইউজুয়াল জাবেদ তার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে এবং মেয়েটাকে আর কোনও কথা বলার সুযোগ না দিয়ে উঠে চলে যায়। আমি আর হামিদ দম বন্ধ করে বসে থাকি- সাসপেন্স। নিশ্চয়ই মেয়েটা এখন চোখ মুছতে মুছতে চলে যাবে দৌড়ে; অথবা রাগে গটগট করতে করতে চলে যাবে।

আনিকা কোনটাই করল না। সে আবারো আমাদের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসি দিয়ে উঠে চলে যায়। তার হাসি আমার মনে সন্দেহ ধরিয়ে দিলো। কেন জানি মনে হলো সে তার আশা ছাড়বে না, বরং দ্বিগুণ উদ্যমে চেষ্টা করবে। আমি দুশ্চিন্তা করতে করতে রাতে ঘুমোতে গেলাম- না জানি এখন কি হয়।

পরদিন মনে হলো, দুশ্চিন্তাটা আরও বেশি করা উচিত ছিলো- আমাকে নিয়ে।
কেননা দৃশ্যপটে কি করে যেন আমার আবির্ভাব হয়ে গেলো। মনে মনে নিজেকে গাল দিতে ইচ্ছে হলো- এজন্যই সাধ করে মানুষের জন্য চিন্তা করতে হয় না। সেদিন সকালে অফটাইমে ব্যাংকের সামনে আনিকার সাথে আমার দেখা। আধনিক এই ললনা আবার ফতুয়া-জিন্স ছাড়া কিছু পরতে জানেন না। সে তার সুন্দর রোদ চশমাটা ব্যাগে ভরতে ভরতে বলল- ‘আপনি দীপ্ত ভাই না? জাবেদ ভাই এর বন্ধু?’


আমি ভাবলাম- এই সেরেছে। নাম ঠিকানা নিয়ে এসেছে। না জানি কোন্ বড়লোক বাপের মেয়ে, দেখা গেল আমাকে ভার্সিটি থেকে বের করে দিলো। আমাকেই কেন ভার্সিটি থেকে বের করে দেবে, সেই চিন্তাটা অবশ্য আমার মাথায় এলো না। আমার আবার সুপার ব্রেইন। একসাথে বেশি জিনিস মাথায় আসে না। আমি কোনও মতে মাথা দোলালাম, বললাম, ‘হ্যা’। আর কি বলা যায় চিন্তা করতে করতে সাথে যোগ করলাম,

‘চিন্তা কোরো না, জাবেদ ওরকমই। কয়েকদিন যাক, ঠিক হয়ে যাবে’।

ব্যাপারটা নিয়ে সে খুব বেশি চিন্তা করছে বলে বলে হলো না। সে মাথা ঝাঁকাতে ঝাঁকালে বলল, ‘আমি চিন্তা করছি না। আপনি আছেন না?’

আমার মাথায় সশব্দে বাজ পড়ল। আমি তোতলাতে লাগলাম, ‘আ-আ-আমি আছি মানে?’ হাসল আনিকা। ‘আপনি আমাকে সাহায্য করবেন’।

হয়েছে কাজ। শেষ পর্যন্ত এই বাকি ছিল? হে আল্লাহ্। কেন এত অবিচার? পৃথিবীর এতো এতো পাপিষ্ঠ থাকতে কি না শেষ পর্যন্ত আমি? আমি কোনও চিন্তা-ভাবনা না করেই বললাম- ‘আমি পারবো না’। আমার বিরক্ত লাগল। কথাবার্তা ওখানেই শেষ হয়ে গেলে ভালো।

আনিকা কে আহত মনে হলো। ‘কেন? আমাকে সাহায্য করতে আপনার কি সমস্যা?’ আমি হাটতে লাগলাম। চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে। এখন মনে হচ্ছে মেয়েটার সামনে দাড়ানোই উচিত হয় নি। পেছনে হতবুদ্ধি গয়ে আনিকা দাড়িয়ে থাকল।

পরের কয়েকটা দিন আনিকা নামের এই মেয়েটা আমার জীবন অতিষ্ট করে তুলল। আমি মাথা চাপড়াতে লাগলাম- কেন যে হাসি দেখে মজে গিয়েছিলাম। কোনওভাবে সে আমার ফোন নম্বর যোগাড় করেছিলো। আমাকে দিনরাত ফোন করে জিজ্ঞেস করতে থাকে- জাবেদ ভাইয়া খেয়েছে কি না, জাবেদ ভাইয়া ঘুমিয়েছে কি না- এমনকি দুইদিন পর সম্বোধনটা শুধু নামে চলে আসল। জাবেদ সকালে কি নাশতা খেয়েছে, ঠিকমতো ঘুমিয়েছে কি না, সে কি রং পছন্দ করে এইসব। আমার সন্দেহ হলো- মনে হয় মেয়েটা আমাকেই পছন্দ করে। জাবেদের উছিলা দিয়ে আমার সাথে কথা বলার চেষ্টা
করছে। আমি বাধ্য হয়ে মোবাইল কোম্পানির কাছে মাসিক পনের টাকা গচ্চা দিয়ে আনিকার নম্বরটা ব্লক করে দিলাম।

আফসোস- আমার মতো গাধা যেন দুনিয়ায় দ্বিতীয়টা না জন্মায়।

দুনিয়াতে যে আরও ফোন নম্বর থাকতে পারে এই সামান্য জিনিসটা কেন জানি আমার মাথাতেই আসে নি। প্রত্যাশিতভাবেই, আনিকা অন্য আরেকটা নম্বর থেকে ফোন করে আমাকে জ্বালাতে লাগল।

অবশেষে ওর সাথে ক্যাম্পাসে ওর বান্ধবীদের সামনে আমার দেখা হলো। ওর
বান্ধবীদের সামনেই ওকে ঝাড়লাম আচ্ছামতো। বললাম, ‘তুমি তো আচ্ছা মেয়ে হে- মানুষকে বিরক্ত করতে তোমার জুড়ি নেই। তোমার কি লজ্জা শরম বলতেও কিছু নাই?’ আমার ঝাড়ি শুনে সে মিটিমিটি হাসল, তার বান্ধবীরা হতবাক হয়ে তাকিয়ে থাকল। আমি রাগ করে চলে গেলাম।

পরদিন সে ক্যাফেতে আমার টেবিলে এসে বসল। আমি শব্দ করে কফি খেতে থাকি। সে কিছুক্ষণ ইতি-উতি করে বলল, ‘আমি বোধহয় আপনাকে খুব বেশি বিরক্ত করে ফেলেছি’। বলেই সে ব্যাগ হাতড়াতে থাকে। খাইছেরে। এখন কি টাকা দিয়ে উসুল করবে নাকি? এতবড় অপমান? সে ব্যাগ থেকে একটা বাদামী রংয়ের খাম বের করল।

শেষ পর্যন্ত টাকা?

আনিকা বলল, ‘এখানে একটা চিঠি আছে। জাবেদ ভাইয়ার জন্য। তার কাছে পৌছে দেবেন প্লিজ। আমার এতটুকু উপকার অন্তত: করুন’। আমি নারী কন্ঠের আকুতি ফেলতে পারলাম না। মেয়েদের প্রতি সবসময়ই আমার কেমন জানি একটা মায়া কাজ করে।

আমি বললাম, ‘পৌছে দিতে আমার আপত্তি নেই। কিন্তু জাবেদ ওসব চিঠি-টিঠি পড়ে না। তুমি বরং মেইল করে দিও’।

আনিকা হাসল। ‘কিছু অনুভূতি ই-মেইলে প্রকাশ করা যায় না দীপ্ত ভাই। সেগুলোর জন্য চিঠি লেখতে হয়। আপনি চিঠিটা তার হাতে পৌছে দেবেন। আমি আপনার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকব’। সে উঠে চলে যেতে উদ্যত হয়। আমি পেছন থেকে ডাক দিলাম। সে ঘুরে তাকাল।

‘গত কয়েকদিন যখন তুমি বিরক্ত করছিলে, আমার মনে হয়েছিলো- তুমি আমার সাথে কথা বলার জন্যই এরকম করছ- জাবেদের উসিলা দিয়ে। এরকম মনে করার জন্য আমি দু:খিত’। আমি ঢোক গিললাম।

আমার কথা শুনে আনিকা হো হো করে হেসে উঠল। হাসতেই লাগল- হাসতেই লাগল। এর মধ্যে হাসির কি আছে আমি বুঝতে পারলাম না। আমি বোধহয় সারাজীবন গাধাই থেকে যাবো।

আমি কথামতো জাবেদের কাছে চিঠি পৌছে দিলাম। জাবেদ হাতে না নিয়েই বলল- ‘ওই

মেয়েটা?’ আমি মাথা ঝাকালাম। জাবেদ হাসতে হাসতে বলল, ‘টেবিলে রেখে দে। কাল ফেরত দিয়ে আসিস’। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘পড়ে দেখবি না?’
জাবেদ আবার হাসল। ‘এই যুগে চিঠি পড়ার সময় আছে? তুই ফেরত দিয়ে আসিস’। আমি কিছু বললাম না।

যুগের কথাটা আসলে সত্যি না। প্রস্তর যুগ হলেও জাবেদ কোনদিনই ওই চিঠি খুলে দেখতো না।

পরদিন আমি কালোমুখ করে আনিকাকে চিঠিটা ফেরত দিতে গেলাম। আনিকা হাসিমুখে জিজ্ঞাসা করল, ‘পড়েছে?’

আমি হাতের চামচ নামিয়ে রেখে বললাম, ‘না। ফেরত দিয়ে দিতে বলল’।
আনিকার মুখ থেকে হাসি মুছে গেলো। বলল, ‘আপনি চেষ্টা করেছিলেন?’
আমার মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। মেজাজ খারাপ করেই বললাম, ‘মেয়ে তোমার সমস্যা কি? একটার পর একটা ঝামেলা বাধাঁও। আরে আমি তো আগেই বলেছি, জাবেদ কোন মেয়ের চিঠিই খুলে দেখবে না কোনদিন, ওই দিনের পর থেকে। তোমরা শুধু শুধু-’, আমার কথা আটকে গেলো। মুখ ফসকে জিনিসপাতি বলে ফেলা আমার বদঅভ্যাস। আমি চুপ করে
গেলাম। পালাবার পথ খুঁজতে থাকলাম।

আনিকা কড়া চোখে আমার দিকে তাকাল। ‘দীপ্ত ভাই, কোন্ দিনের পর থেকে?’ আমি মাথা নিচু করে থাকলাম। আনিকা শক্ত কন্ঠে বলল, ‘দীপ্ত ভাই আপনি আমার দিকে তাকান’। আমি তাকালাম ভয়ে ভয়ে। কেন যে কন্ঠটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না! তার কড়া দৃষ্টি উপেক্ষা করে আমি কফি খেতে থাকলাম। আনিকা বলল, ‘জাবেদ ভাই এর নিশ্চয়ই কোনও কাহিনী আছে?...বলুন, আছে কি না?’ আমি আস্তে করে মাথা
ঝাঁকালাম।

আনিকা একটু দম নিয়ে বলল, ‘আমি সেই কাহীনি শুনতে চাই। গোড়া থেকে’। আমি বললাম, ‘কষ্টের কাহিনী। শুনে কি করবে? শুধু শুধু কষ্ট পাবে’। আনিকা বলল, ‘তবুও শুনব’। আমি বুঝলাম সে না শুনে ছাড়বে না। কাহিনীটা মোটামুটি সবাই জানে। তাই বলতে কোন সমস্যা দেখলাম না।

আমি জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম। বাইরের সুন্দর মিষ্টি রোদ ক্যাফের জানালা দিয়ে ভেতরে এসে পড়ছে। জানালার পাশের ফুল বাগানের ফুলগুলোর ওপর উড়ছে রং বেরংয়ের প্রজাপতি। সেই দিনটাও এমনি ছিল। আমি মনে করার চেষ্টা করি।

আমরা তখন ফার্স্ট ইয়ারে। আজকের জাবেদ আর তখনের জাবেদের মাঝে আকাশ পাতাল ফারাক। বাচ্চা ছেলেটা শুধুই দুষ্টুমি করে বেড়ায়। ব্যাগে রাখে সবসময় একটা ক্যামেরা আর শুধু ছবি তুলে বেড়ায়। একদিন হঠাৎ করেই ব্যাগ থেকে ক্যামেরাটা বের করে দিয়ে বলল, ‘আজ অনেক কিছু হবে, আমি ব্যস্ত থাকবো। ছবি তোলার দায়িত্ব তোর’। আমি ছবি তেমন একটা তুলতে পারি না, তবুও কোন আমাকেই তুলতে দিলো কে জানে।

তখন শীতকাল। ক্লাস ব্রেকের সময় সব ছাত্র-ছাত্রীরা ক্লাস বিল্ডিং এর মাঝের ফাঁকা জায়গাটাতে দাড়িয়ে রোদ পোহাতে থাকে। একটু রোদে যথেষ্ট আরাম পাওয়া যায়। জাবেদের হাতে একটা বাক্স। ছোট বাক্স। বাক্সের মধ্যে কি আছে সে কাউকে বলল না। ক্লাস বিল্ডিংয়ে অনেক ডিপার্টমেন্টেরই ক্লাস হয়। আমাদের কিছু দূরে আমাদের ফ্যাকাল্টির আরেক ডিপার্টমেন্টের ছেলেমেয়েরা দাড়িয়ে ছিল। জাবেদ তার হাতের বাক্সটা নিয়ে আস্তে আস্তে সেদিকে এগোতে থাকে। আমি ভিডিও অন করে দিলাম। হঠাৎ করেই সবার গুঞ্জণের মাঝ দিয়ে সে কবিতা আবৃত্তি শুরু
করে-

'তুমি হাসবে তাই-
বিরানতলীর ঘাসগুলো আমি,
কতদিন হলো মাড়াইনি।'

সাথে সাথে চারিদিকের গুঞ্জণ থেমে যায়। কিছুদিন আগে ওই ডিপার্টমেন্টের এক মেয়েকে উদ্দেশ্য করে কেউ একজন কবিতাটা লিখেছিলো। কে লিখেছিলো বের করা যায়নি। জাবেদ আস্তে আস্তে ওই মেয়েটার দিকেই এগোতে থাকে।

'তুমি কাঁদবে তাই-
স্বপ্নপুরীর সোনার কাঠিতে,
ঘুমটা তোমার ভাঙাইনি।'

কবিতাটা নিয়ে আমরা এতোদিন অনেক মজা করেছি। আজ জাবেদের আবৃত্তি শুনে মনে হলো, স্বয়ং কবি ছাড়া আর কারো পক্ষে এমন আবৃত্তি করা সম্ভব না। আমার বুক কেঁপে উঠল। যেই মেয়েটাকে নিয়ে কবিতাটা লেখা- সেই লাবণ্যকে দেখা গেল বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে। যেন নিজের চোখ-কান কোনকিছুকেই বিশ্বাস করতে পারছিলো না। আমার ভিডিও চলতে থাকে।

'তুমি বুঝবে তাই-
ছন্দবিহীন কাব্যগুলোকে,
এক এক করে সাজাইনি।'

জাবেদ আবৃত্তি করতে থাকে। তিন লাইন-তিন লাইন করে। আমি মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে যাই।

'তুমিই লাবণ্য তাই-
মেহেদীর লাল রং দিয়ে তোমার,
হাতদুটোকে রাঙাইনি।'

শেষ তিন লাইন বলে জাবেদ লাবণ্যর সামনে হাটু গেড়ে বসে পড়ে। তারপর ডানহাতের ওপর ছোট বাক্সটাকে খুলে তার ভেতর থেকে বের করে তাজা একটা হলুদ গোলাপ। লাবণ্য কয়েক সেকেণ্ড স্থির দৃষ্টিতে গোলাপটার দিকে তাকিয়ে থাকে। সবাই টান টান উত্তেজনার মাঝে শ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে থাকে। লাবণ্য গোলাপটা নেয়, তারপর হাতের মুঠোতে জড়িয়ে নিয়ে দৌড়ে চলে যায়। মুখে হাসি নিয়ে!

চারপাশ থেকে ছেলেমেয়েরা উল্লাসধ্বনি করে ওঠে। অনেকে তালি বাজাতে থাকে। জাবেদ দাত বের করে হাসতে থাকে। সকলে ওর পিঠ চাপড়ে দিতে থাকে। দারুণ মজার এক দৃশ্য।

জাবেদ আর লাবণ্য টানা তিন মাস চুটিয়ে প্রেম করল। পুরো ক্যাম্পাস বলতে
লাগল- ভার্সিটির সেরা জুটি। এরচেয়ে ভালো জুটি হয় না- আরো কত কি! আমার আর হামিদের হলো সমস্যা। জাবেদকে পাওয়াই যায় না।

তিনমাসের মাথায় কিছু একটা হলো, যেটা লাবণ্য-জাবেদ দুজনের কপালেই চিন্তার ভাঁজ ফেলে দিলো। ঠিক কি হলো, সেটা কেউ জানতে পারল না- কিন্তু কিছু একটা যেহলো সেটা সবাই জেনে গেলো। দিন সাতেক পর থেকে আমি আর কোনদিন লাবণ্যর ছায়াও দেখলাম না ক্যাম্পাসে। শুধু শুনলাম পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়ে আমেরিকা চলে গেছে, পড়াশোনা শেষ না করেই। ঠিক কি হয়েছিলো, জাবেদকে জিজ্ঞাসা করেও আজ পর্যন্ত জানতে পারিনি।

আমি কথা শেষ করে দেখলাম আনিকা বিমর্ষ মুখে বসে আছে। দু-তিনবার নাম ধরে ডাকার পর সে নড়েচড়ে বসল।

‘চলুন না দীপ্ত ভাই, বাইরে থেকে হেটে আসি’। আমি না করলাম না। ভেতরের কোলাহল আমারও সহ্য হচ্ছিল না। আমরা দুজন বাইরে বের হলাম। রোদ সরে গিয়ে আকাশে তখন মেঘ করেছে।

আনিকা হাঁটার সময় আস্তে আস্তে কথা বলতে থাকে, ‘মানুষ যেভাবে চিন্তা করে, কেন জানি কোন কিছুই কখনো সেভাবে হয় না। দুনিয়া খুব নিষ্ঠুর জায়গা। এখানে ভালোর কোন স্থান নেই’। তার এসব কথার মাথামুণ্ডু কিছুই আমি বুঝলাম না। আমার মুখের অভিব্যক্তিতে নিশ্চয়ই প্রশ্নবোধক আকা হয়ে গিয়েছিল। আনিকা সেটার জবাব দিল।

‘লাবণ্য আমার বড় বোন। আমার দু’বছরের বড়। ওকে সেই ছোটবেলা থেকে বোঝার চেষ্টা করে আসছি। কিন্তু আজ পর্যন্ত বুঝতে পারিনি’।

আমার ভ্রুযুগল কুঁচকে গেল। নিজেকে প্রতারিত মনে হতে লাগল। ‘তাহলে আগে-’ আমি বলতে চেষ্টা করলাম। আমার কথার মাঝ দিয়ে কথা বলল আনিকা।

‘সত্যি করে বলুন দীপ্ত ভাই। আমি লাবণ্যর ছোট বোন শুনলে আমার সাথে কথা বলতেন আপনি?’ শক্ত দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে আনিকা। আমি চুপ করে থাকি। বলার কিছু খুঁজে পাই না। হাসল সে।

‘বলতেন না। কিন্তু জিনিসটা জানা আমার জন্য জরুরী ছিল’। জোরে শ্বাস ফেলল সে।

আমি বুঝতে পারলাম না। ‘কোন জিনিসটা?’

আমার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসল আনিকা। ‘কিছু মানুষ হয় ভালো, কিছু
মানুষ হয় খুব ভালো। জাবেদ ভাই সেই খুব ভালো মানুষদের একজন। তিনি চাইলেই সত্যিটা জানিয়ে দিতে পারতেন। সবাই আপুকে ছি ছি করত হয়তো। তিনি সেটা করেননি। আপুর স্বভাব-চরিত্র নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুলুক এটা জাবেদ ভাই চান নি’। আনিকা একটু থেমে আবার বলতে শুরু করে। ‘আপুকে মাঝেমাঝে মনে হতো স্বর্গীয় দেবী, মাঝে মাঝে খুব স্বার্থপর একটা মানুষ। আপুর কাছে বাউণ্ডুলে এক ফটোগ্রাফারের চাইতে ভবিষ্যৎের জন্য আমেরিকার কোন বাংলাদেশী ব্যবসায়ীকেই বেশি নিরাপদ মনে হয়েছে। তার কাছে মনের চাওয়া পাওয়ার কোনও দাম ছিল না, সে শুধু চিন্তা করেছে নিজের ভবিষ্যৎের কথা। এমন ঘৃণ্য একটা কাজের পরও জাবেদ ভাই চুপ করে থেকেছেন। কেন থেকেছেন জানি না। আমার ধারণা ছিল
কাউকে না বললেও অন্ততঃ আপনাকে জানিয়েছেন, আপনি তার বিশ্বস্ত বন্ধু।
কিন্তু লাবণ্য আপুর ব্যক্তিত্বটা তিনি আপনার সামনেও ছোট করতে চান নি’।
হাসল আনিকা। ‘তার কাছ থেকে অনেক কিছু শেখার আছে’। সে চলে যেতে উদ্যত হলো।

আমি বললাম, ‘তুমি চিঠিতে তাকে কি লিখেছিলে?’ সে আমার দিকে ঘুরে দাড়াল। তারপর বলল, ‘আমার পরিচয়, আমি কেন এখানে এসেছি’।

আমি কিছুক্ষণ ভেবে বললাম, ‘তুমি একবার খামটা খুলে দেখ। আমার মনে হয় জাবেদ চিঠির উত্তর দিয়েছে। আনিকা খামটা ছিড়ল। ভেতরে একটা কাগজ তাতে লেখা-

প্রিয় আনিকা,

তোমাকে আমি দেখামাত্রই চিনেছি। লাবণ্যর মুখে অনেকবার তোমার নাম আমি শুনেছি। তুমি কি করতে চাও, সেটা তোমার একান্তই ব্যক্তিগত। যদি তুমি চাও তোমার আপুকে সবাই খারাপ জানুক, তাহলে তুমি সবাইকে ব্যাপারটা জানাতে পার।

কিন্তু আমার মনে হয় পৃথিবীর কোনও ছোটবোনই সেটা চাইবে না। বলে রাখছি- তোমার আপুকে আমি এখনো আগের মতোই ভালোবাসি।

শালা একটা চিজ। ঠিক একই রকম একটা খামে ভরে দিয়েছে। ওপরে কোনটারই কিছু লেখা ছিলোনা দেখে বোঝা যায় নি। আনিকা বলে, ‘আজ যাই দীপ্ত ভাই। আরেকদিন কথা হবে’। কিছুদূর গিয়ে আবার ঘুরে দাড়ায় সে।

‘আপনি খুবই দূরদর্শী একজন মানুষ। প্রথম দিন থেকেই আপনাকে আমি খুব পছন্দ করি’।

একটু থেমে সে যোগ করে, ‘আমি যদি বলি আমি আমার আপুর মতো স্বার্থপর নই, আপনি কি আমার কথা বিশ্বাস করবেন?’ খুবই কৌতুহূলী দৃষ্টি মেলে সে তাকিয়ে থাকে। আমি হেসে আস্তে মাথা ঝাঁকাই।

আনিকা চলে যেতে থাকে। আমি তার যাবার পথের দিকে তাকিয়ে থাকি।

যত বড় গাধাই হই না কেন, তার শেষ বাক্যের ইঙ্গিতটা বোঝার জন্য আইনস্টাইন হতে হয় না।

-

Share