রূপার থালা কিংবা চন্দ্রাহতের গল্প

লিখেছেন - জানিফা সুলতানা | লেখাটি 1487 বার দেখা হয়েছে

জলের মাছকে ডাঙ্গায় ফেলে দিলে যেমন ছটফট করে, সে একটুখানির জন্য চোখের আড়াল হলে আমারও ডাঙ্গার মাছের মত হাঁসফাঁস লাগে! সব বিবাহিত মেয়েদেরই এমন হয় কিনা জানতে মন চায়। বিয়ের কয়েকদিন পর যখন সে আমাকে বাসায় একা রেখে কাজে চলে গেলো, আমার তখন মনে হচ্ছিলো যে আমি দম বন্ধ হয়ে মরে যাবো। আমি তার গায়ের শার্ট জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদছিলাম! শার্ট জুড়ে তার গায়ের গন্ধ মাখা ছিলো, আমি সেই গন্ধের আবেশে সারাটা দিন কাটিয়ে দিলাম।

ব্যাপারটা হয়ত খুব হাস্যকর। অবশ্য আমার সব কাজকর্মই হাস্যকর।

বাসার সবাই মিলে গাড়ি নিয়ে কোথাও ঘুরতে বের হলে আমি সব সময় পিছনের সীটের একেবারে বামে বসতে চাইতাম। সে সব সময় সামনের সীটের ডানে বসতো তাই। আমি কোণাকোণি বসে আড় চোখে তাকে দেখতাম। আমার কাছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য খুব তুচ্ছ মনে হতো তখন।

আমি কিছুতেই রাত জাগতে পারি না। প্রায়ই আপ্রাণ চেষ্টা করি জেগে থাকার জন্য। ওর ঘুমন্ত আদর আদর মুখের দিকে যখন তাকাই, তখন মনে হয় যেনো এই ঘুম-বাবুটার দিকে তাকিয়ে অজস্র বছর আমি কাঁটিয়ে দিতে পারবো।

এই ছেলেটাকে আমি অনেক বেশি যন্ত্রনা দেই, ভীষণ জ্বালাই; সে কোন গল্পের বই পড়তে বসলে, কিংবা পত্রিকা পড়ার সময়, কিংবা সুন্দর মুভি দেখার সময়, কিংবা নেটে কাজ করার সময়... বলা যায় শুধুমাত্র ঘুমানোর সময়টুকু ছাড়া বাকি সারাটা সময়ই হয়ত আমি ওকে বিরক্ত করি। তারপর মাঝে মাঝে সে যখন খুব বেশি বিরক্ত হয়ে যায় আমার উপর, আমার সব কাজকর্ম যখন ওর কাছে অসহ্য মনে হয়, তখন খুব দিশেহারা লাগে আমার। মাঝে মাঝে ভাবি যে আমি অবুঝ থাকবো না, ছেলেমানুষী, বাচ্চামী করবো না আর, সারা সময় চুম্বকের মত ওর পিছনে লেগে থাকবো না, তাকে বেশি জালাবো না। কিন্তু পারি না আমি!

"তাকে যতো তাড়াই দূরে দূরে.
তবুও সে আসে মেঘলা চোখে ঘুরেফিরে।"
"তুমি যাই করো, তাই আমার ভালো লাগে,
তুমি প্রচন্ড ঘৃনা নিয়ে যখন তাকাও,
তখন সে ঘৃনাটাকেও আমার মধুর মনে হয়,
এ আমার কেমন অসুখ হলো?
হে চন্দ্র, তুমি তো সকল অসুখ সারিয়ে দাও।
দয়া করে আমার এই অসুখটা সারিওনা।
এই অসুখেই যেন আমার মৃত্যু হয়।"

আমার বুদ্ধিশুদ্ধি কম হলেও, মাঝে মাঝে ফাঁটাফাঁটি সব বুদ্ধি খেলে আমার মাথায়। আচ্ছা অদৃশ্য হয়ে তো ম্যাজিকের মত সারাক্ষণ আমি তার কাছাকাছি থাকতে পারি, পাশাপাশি থাকব অথচ সে কিছুই টের পাবে না, বিরক্ত হবে না।

আমি তো এই জনমে ম্যাজিক দিয়ে অদৃশ্য হয়ে যেতে পারবও না, আকাশের তারা হয়ে তাকে স্নিগ্ধ আলোক দিতে পারবো না। ভালোবাসার জন্য মানুষ কতকিছু করে! আমি কেনো আকাশের তারা হয়ে তাকে জড়িয়ে রাখতে পারবো না!

"পৃথিবীর পথে আজ নাই সে তো আর;
তবুও সে ম্লান জানালার পাশে উড়ে আসে নীরব সোহাগে
পৃথিবীও নাই আর; দাঁড়কাক একা — একা সারারাত জাগে;
কী বা হায়, আসে যায়, তারে যদি কোনোদিন না পাই আবার।
নিমপেঁচা তবু হাঁকে: ‘পাবে নাকো কোনোদিন, পাবে নাকো
কোনোদিন, পাবে নাকো কোনোদিন আর"...

Share