ভালবাসা ভালবাসি

লিখেছেন - Escherichia Coli | লেখাটি 5335 বার দেখা হয়েছে

এবার রোযার আগে থেকেই ঈদের প্রস্তুতি নেয়া শুরু করেছে প্রীতি। একেতো শ্বশুড়বাড়িতে প্রথম ঈদ,তার উপর বিয়ের দের বছর পর এবার দেশে আসছে আমান। আমানের সাথে প্রীতির বিয়ে হয় এক বছর সাত মাস আগে,বিয়ের দুইমাসের মাথায়ই প্রীতিকে রেখে সুদূর সুইজারল্যান্ডে পাড়ি জমায় আমান। এরপর দুইবার আসি আসি করেও শেষ মুহুর্তে আর আসতে পারেনি আমান। তবে এবার সব নিশ্চিত,অগ্রীম টিকিটও কেটে রেখেছে আমান। তাইত ঈদ নিয়ে এতটা খুশীতে আছে প্রীতি। হানিমুনটাও এই ছুটিতে সেড়ে ফেলবে বলে,মনে মনে ঠিক করে রেখেছে প্রীতি। সব প্লানও করে রেখেছে ও,সেন্টমার্টিনেই যাওয়ার ইচ্ছা ওর। রাতের গল্পে আমানকেও সব বলে রেখেছে প্রীতি। এক কথায় এবার ঈদে পুরো আদাজল খেয়েই নেমেছে ও। প্রথম রোযা থেকেই তাই রান্নাঘরে আনাগোনা বেড়ে গেছে প্রীতির। ইফতারীতে গোপনে গোপনে টমি মিয়ার বইয়ের দু একটা আইটেম যে নিজের নামে চালিয়ে দিচ্ছে না তাও নয়। হাজার হোক শ্বশুড়বাড়িতে প্রথম রোযা। নতুন বৌয়ের খোলসে আর কয়দিন।

শ্বশুড়বাড়িতে শ্বশুর শ্বাশুড়ী ছাড়াও এক ননদ নিয়েই ঝড়ের বেগে সময় কেটে যায় ওর । ননদটাও একটা শয়তানের একশেষ,জীবনেও রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ায় না,আর কাজের বুয়ার হাতে রান্না সহ্য করতে পারেনা ও। তাই বাধ্য হয়েই সব এক হাতে করতে হয় প্রীতির। প্এরীতিও মনে মনে বলে যাও মহারানী,এক বার বিদেয় হও তারপর দেখব তোমার আয়েশগিরি। এভাবেই দিন কাটে প্রীতির,খুনসুটি আর সংসারটাকে গুছিয়ে নেয়ার চেষ্টায় সময়ের খেয়াল থাকেনা ওর। দিনের ক্লান্তির শেষে রাতে তো আছেই মহারাজ,রাতের ঘুম হারাম করে আমানের সাথে জমে উঠে রাতগল্প,কখনোও বা কম্পিউটারের স্ক্রীনে আবেগের বহিপ্রকাশ। কিন্তু তাতে কি আর আশা মিটে। সামনে থাকার আবেগটাই অন্যরকম,আলাদা এক অনুভূতি,আলাদা এক শিহরণ লাগে অস্তিত্বে। রাত জুড়ে চলে ইনিয়ে বিনিয়ে কথার খই ভাজা,কখনোও বা সেহরীতে গিয়ে শেষ হয় খই এর স্টক। দূরত্বের এই প্রতিযোগিতাও হার মানে কাছে থাকার আকুলতার কাছে।

দিন গুনে প্রীতি,অপেক্ষার শেষ বা খুশীর আগমনের । দেখতে দেখতে পনের রোযাও পার হয়ে গেল,যত দিন যায় ক্যালেন্ডারের পাতায় লাল কালিতে তারিখের ঘরে ছোবল বসায় প্রীতি। অপেক্ষার মাঝেও এক ধরনের ভাল লাগা আছে। বেঁধে দেয়া সময়ের অপেক্ষা যেন অসীম অপেক্ষা থেকেও ভয়ংকর। এই অপেক্ষায় এক ধরনের মুগ্ধতা,এক ভালবাসা যে মিশে থাকে। এর মধ্যেই শপিং শুরু করে দিয়েছে প্রীতি। পুরো লিষ্ট করে শপিং,বাবা মা,শ্বশুর শ্বাশুরী,ননদ,বড় ভাই,ভাবী,ভাগ্নে,ভাগ্নী,কেও বাদ যায়নি লিষ্ট থেকে। সবার দিকেই ষোলআনা খেয়াল রেখেছে ও। এর মধ্যে আবার লুকিয়ে সুকিয়ে হানিমুনের শপিংটাও সেড়ে ফেলতে হচ্ছে। ওর ননদটাও কেমন যেন,খালি ছুঁক ছুঁক করে। বারবার গিয়ে শপিং এর ব্যাগ খুলে এক চোরা দৃষ্টিতে তাঁকায়। ওর কাছ থেকে লুকিয়েই হানিমুনের শপিংটা করছে প্রীতি। এখনি কি শ্বশুড়বাড়িতে বলা যাবে হানিমুনের ব্যাপারে,নতুন বৌ হলে নাহয় একটা কথা ছিল। এতদিনে তো একটু লজ্জা করাই উচিত। আমান আসলেই সব জানানো যাবে।

উফফ,সময় যত ঘনিয়ে আসছে দম বন্ধ হয়ে আসছে প্রীতির,এইত আর মাত্র সাতদিন। ২৫ রোজায় আসবে আমান। মনে মনে ঠিক করে ফেলেছে প্রীতি,নিজেদের জন্যে কেনাকাটা আমানকে সাথে নিয়েই করবে। দোকানে শাড়িও দেখে এসেছে ও,নীল জমিনের উপর সাদা সাদা পাথর বসানো। কিন্তু কিনেনি ও,আমানের সাথে কিনবে বলে রেখে এসেছে। আমানের জন্যে পাঞ্জাবীও দেখে এসেছে গোটা কয়েক। অবশ্য আমান বলেছে সুইজারল্যান্ড থেকেই এবার শপিং করে আনবে,তারপরও প্রথম ঈদ বলে কথা। ইসস,বিয়ের আগেই কত ভাল ছিল,কি সুন্দর পছন্দ হলেই ফট ফট করে কিনে ফেলা যেত,এখন আবার আরেক জন লাগে। কিভাবে যেন মিশে যায় মানুষগুলো,পুরোটা জুরেই দখল করে নেয়। পুরোটা অস্তিত্বে যেন জানান দিয়ে যায় আমি আছি। ভাল্লাগেনা প্রীতির্। কত্ত দায়িত্ব,কত্ত ঝামেলা,চিন্তা,বৌ হয়ে আসলেই শান্তি নাই,দম ফেলারও সময় নাই , মনে মনে ভাবে প্রীতি। ঠোঁটের কোনে এক ঝলক বাঁকও খেলে যায় অজান্তেই।

কাল রাতেই প্লেনে উঠবে আমান,তারপর আর ২২ ঘন্টা। কেমন একটা ছটফট করছে প্রীতি। আজকে রাতে প্লেনে উঠার আগে ফোন দিয়ে উঠবে আমান। প্রীতি সেই সাতটা থেকে ফোন নিয়ে বসে আছে,ইফতারী বানানোর সময় একবারের জন্যেও ফোনকে চোখের আড়াল হতে দেয়নি ও। এতক্ষনে তো ফোন আসার কথা,দুশ্চিন্তা হয় প্রীতির। কিছু হলনা তো আবার। এর আগেও এভাবে দুইবার শেষ মুহুর্তে টিকিট বাতিল করেছে আমান। দম বন্ধ হয়ে আসতে থাকে প্রীতির। অজানা শঙ্কা,অজানা ভয় নিয়ে বসে থাকে মেয়েটা। ঐ,ঐ তো ফোন বাজল। দৌড়ে ফোনটা ধরে প্রীতি। আমানের গলাটা স্তিমিত লাগছে,ভয় হয় ওর। এবারো কি তাহলে... হুম,এবারো আসতে পারবেনা আমান,অফিসের এক জনের ছুটিতে কাজ করে দিতে হবে আমানের। এত কিছু বুঝতে চায়না প্রীতি। চোখ ঝাপসা হয়ে আসে ওর। গলাও ধরে আসে খানিকটা। চেষ্টা করে স্বাভাবিক থাকতে,তবুও পারেনা। হুট করে ফোন রেখে রান্নাঘরের দিকে যায় ও। সব প্লান,সব শপিং,সব স্বপ্ন,ভাললাগার অনুভুতি সবই যেন বৃথা। এত সাজিয়ে রাখা স্বপ্নগুলো আবারো ভেঙ্গে গেল। এরকম কেন মানুষ,এত দিন এত কষ্ট করে এত্ত কিছু করল ও,আর আমান কিনা এক পলকে বলে ফেলল আসতে পারবেনা। এরকম কেন হয় বারবার। রাতেও কিছু খায়না প্রীতি। রান্না করতেও ইচ্ছে হয়না ওর,লুকিয়ে লুকিয়ে দেখা একগাদা স্বপ্নকে ভিজিয়ে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে প্রীতি।

আমানের সাথে তারপর আর কথা হয়নি। একবারের জন্যেও ফোন দেয়নি আমান,প্রীতিও খোঁজ নেয়নি আর। আজ কিছু ভাল লাগছেনা প্রীতির,শয়তান ননদটাও যেন সুযোগ পেয়েছে। খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে শুধু মার্কেটে যাওয়ার কথাই বলছে। প্রীতির ইচ্ছা করছে শয়তানিটার দাঁতগুলা ভেঙ্গে দিতে। ঢঙ্গি একটা। তারপরও মার্কেটে যায় ও,হাজার হোক একটা মাত্র ননদ,ভাবী যেহেতু সহ্য তো করতেই হবে। মার্কেটে দোকানের রঙ্গিন আলোয় দেখে যাওয়া শাড়ির দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে প্রীতি। এবারের ঈদটাও একাই কাটবে ওর,শাড়িটা আর ভাল লাগছে না প্রীতির্। নীল জমিনে বিষন্নতার প্রলেপ লাগিয়ে দেয় ও। শ্বশুরবাড়ি থাকতে ইচ্ছেও করছেনা ওর,মনে হচ্ছে ঈদটা যেন আর না আসুক। ওর ঈদ না হলে আর কারোরই যেন ঈদ না হয়।

বিষন্ন দিনের শেষে মাত্র ঘুমাতে গেছে প্রীতি। সব কাজ শেষ করে,সেহরীর এলার্ম দিয়ে সবে একট ু অবষন্ন গা এলিয়ে দিয়েছে বিছানায়,এই সময় আবার কলিং বেল। ধুর,এক গাদা রাগ নিয়ে উঠে দাঁড়ায় প্রীতি। খুলবেনা খুলবেনা করেও দরজা খুলে প্রীতি। এহেম এহেম,বলেন তো দেখি দরজায় কে?কি পারলেন না?কে আবার এ যে আমাদের আমান ভাইয়া। পুরো জমে গেছে প্রীতি,নিজের চোখকেও বিশ্বাস হয়না ওর। মাথা দুলে উঠে বোধহয় পড়েই যাবে। কিভাবে সম্ভব,কথাও যেন হারিয়ে ফেলেছে মেয়েটা। চিমটির কারনেই সম্বিত ফিরে প্রীতির্।

-কি এখন বিশ্বাস হইছে?
-তুমি?তুমি না এবার আসবা না?তোমার অফিস?
-না এসেই পড়লাম আর কি,হাজার হোক হানিমুনে কি আর তোমাকে একা পাঠানো যায়?
-শয়তান কোথাকার।

বলেই কেঁদে ফেলে প্রীতি। এই মুহুর্তের জন্যে পৃথিবীর সব অপেক্ষাকে মেনে নেয়া যায়। সকল দু:খকে এক নিমিষে শুষে নেয় এই ভালবাসা। পৃথিবীর সকল বিষন্ন সময়কে ভাসিয়ে দেয়া যায় এই অশ্রু জলে,ভাসিয়ে দেয় প্রীতিও। মুখ লুকায় আমানের মাঝে,গভীর থেকে গভীরে।পরম যত্নে আমানও জড়িয়ে নেয় প্রীতিকে,একরাশ উষ্ণ ভালবাসা নিয়ে। দরজায় দাঁড়িয়ে কাঁদতে থাকা এই দম্পতিকে একাই ছেড়ে দেই আমরা। তাদের খুনসুটি,অভিমান,ভাললাগা,ভালবাসার মুহুর্ত গুলো একান্ত নিজেদেরই থাক।


উতসর্গে : প্রীতি ও আমান ভাইকে। পৃথিবীর সকল দম্পতিই অনেক বেশি অসাধারন। তাদের অসাধারন ভালবাসার মুহুর্তগুলো বড্ড বেশি আবেগি,পৃথিবীর এই সুন্দরতম সম্পর্ক গুলোয় এত আবেগ আছে বলেই সম্পর্কের গভীরতা এতটা। পরিবারের সাথে সবাই আনন্দ আর এই আবেগময় ভালবাসা নিয়ে ঈদ কাটান এই শুভ কামনা রইল। ঈদ মোবারক সবাইকে।

Share